বাংলাদেশ রেলওয়ে : ট্রেন পরিচিতি

প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০১৯, ১২:১৯ | আপডেট : ২৮ জুলাই ২০১৯, ১২:২৭

মঈনুল ইসলাম

কয়েকজন বাচ্চা-কাচ্চা একসাথে হয়েছে। তারা কী জানি একটা খেলায় মেতেছে ‘ওপেন-টি-বায়োস্কোপ’ নামে। দুজন হাতে হাত মিলিয়ে মাথার ওপর তুলে ধরে নিজেদের মাঝখানে তৈরি করেছে একটা তোরণ, আর বাকিরা একজনের কাঁধে আরেকজন হাত রেখে তৈরি করেছে একটা রেলগাড়ি। হয়তো পুঁ ঝিক ঝিক বলছে না, ওপেন-টি-বায়োস্কোপ বলে একটা ছড়া আওড়াচ্ছে; কিন্তু দলটা ঠিকই একটা রেলগাড়ির অনুকরণে চলছে, তোরণের ভিতর দিয়ে পেরিয়ে আসছে। ছোটবেলা থেকেই আমাদের মাঝে রেলের এই এক অপূর্ব দৃশ্য স্থান করে নেয়।

সেই ছোটবেলা থেকেই রেলে যাতায়াত, বাড়ি আমার সিলেটে, তাই ঢাকা গমনাগমনে এই রেলই ছিল আকাক্সিক্ষত বাহন। এমন কী মজার ব্যাপার হলো, আমার মা-বাবার বিয়েও হয়েছে ঢাকায় আর সিলেটে, বরযাত্রীরা বগি ভাড়া করে যাতায়াত করেছিলেন। আমার দাদাবাড়ি, নানাবাড়ি দুটোই সিলেটে, এই দুবাড়িতে যাতায়াতেও ট্রেন ব্যবহৃত হতো, সেই ট্রেন ছিল স্থানীয় ট্রেন, স্থানীয়রা বলতেন ‘লাতুর ট্রেন’। সেই ট্রেনে চলাচলের চেয়েও রোমাঞ্চকর ছিল রেলে পাথর কুড়ানো। তখন রেলে পাহাড়ি পাথর, বিশেষ করে জাফলং-এর সাধারণ পাথর ব্যবহৃত হতো। সেখান থেকে গোলাকৃতি পাথর কুড়ানো একটা পরম হবি ছিল আমার এবং আমার মতো সব শিশুরই। রেলের সাথে তাই কেন জানি না বেশ নস্টালজিয়া কাজ করে, এতটুকু বয়সেই রেলের অনেক স্মৃতি জমে গেছে।
যা হোক, মূল কথায় আসা যাক। বাংলাদেশে রেল স্থাপন করেছিল ব্রিটিশ সরকার। অনেকে মনে করেন, ব্রিটিশরা যদি রেল স্থাপন না করে যেতেন, তাহলে বাঙালিরা আজ অবধি রেলের ধারে-কাছেও যেতে পারত না। বাঙালি কী পারত, না পারত সে-তর্কে না গিয়ে সামনে তাকানো যাক, বাঙালিরা সব পারে।
যা হোক, বাংলাদেশের স্থলপথে চলাচলের সবচেয়ে নিরাপদ বাহন হিসেবে অনেকেই রেলের নাম উল্লেখ করেন। যদিও গত দু-তিন বছরে রেলে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে গেছে, এর পিছনে যেমন চালকের এবং পরিচালকের অদক্ষতা ও অসাবধানতা ছিল, তেমনি ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ রেলগাড়ির ব্যবহার। বাংলাদেশের রেল বিভাগ দীর্ঘদিন যাবতই সড়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন ছিল, ২০১১-তে বাংলাদেশ সরকার রেলকে আলাদা মন্ত্রণালয় হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং রেলের প্রথম মন্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন সিলেটেরই রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
রেলের ব্যাপারে কিছু বিষয় আলাদা আলাদা করে জেনে নেওয়া যাক। এখানে উল্লেখ করা জরুরি মনে করছি, আমি রেলের কেউ নই, আর সব যাত্রীর মতোই একজন সাধারণ যাত্রী মাত্র।

টিকিটের ধরন
টিকিট কেটে নিলে স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট বগির একটি বা একাধিক সিট নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থল পর্যন্ত বরাদ্দ পাওয়া যায়। স্থান ও ধরনভেদে টিকিটের মূল্য আলাদা। টিকিট হয় তিন রকম : স্ট্যান্ডিং টিকিট (বা দ-ায়মান পাস), সাধারণ টিকিট (বা আসন পাস), মাসিক টিকিট (বা এক মাসের পাস)। টিকিট সংগ্রহ করতে হয় যে কোনো স্টেশন থেকে, এবং সেই টিকিট সাধারণত কম্পিউটার কম্পোজ হয়ে নির্দিষ্ট ফরমেটে বেরিয়ে আসে। ছাপানো টিকিটের পিছন দিকে থাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা।
আরও এক ধরনের টিকিট আছে রেলের সাথে যুক্ত, যা হলো প্লাটফর্ম টিকিট। এই টিকিট দিয়ে রেলে ভ্রমণ করা যায় না, শুধু স্টেশনের প্লাটফর্মে ঢুকে আবার বেরিয়ে আসতে এই টিকিট ব্যবহৃত হয়। এই টিকিটের দাম মাত্র ২ টাকা (আগস্ট ২০১৭ : ১২)। টিকিটটি ছোট্ট এক টুকরো শক্ত কাগজ, হলুদ রঙের, তার গায়ে কালো কালিতে ছাপার হরফে লেখা।

আসনের ধরন
রেলের আসন আছে কয়েক প্রকারের। সাধারণত তিন প্রকার :
১. তৃতীয় শ্রেণি বা শোভন- যেখানে লম্বা লম্বা আসন থাকবে, গদি এবং চামড়ায় মোড়া;
২. দ্বিতীয় শ্রেণি বা শোভন চেয়ার (বা চেয়ার কোচ)- যেখানে পাশাপাশি দুটো (বা তিনটে) করে গদিমোড়ো চেয়ার থাকবে;
৩. প্রথম শ্রেণি (বা ফার্স্ট ক্লাস)- যা তাপানুকূল (বা শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত) এবং চেয়ার কোচ;
৪. কেবিন (প্রথম শ্রেণি)- বগিতে আলাদা আলাদা ছোট ছোট কক্ষ থাকবে, যাতে লম্বা আসন থাকবে এবং মাথার ওপরে আরেকখানা আসন থাকবে, দুটোতেই বিছানা পেতে ঘুমানো যাবে, অনেকে একে স্থানীয় ভাষায় কিংবা ব্রিটিশ আমলের ভাষায় ‘কূপ’ও বলে থাকেন।
৫. ভিআইপি বগি- এ-জাতীয় বগির আলাদা নাম আছে, আমার সেটা মনে নেই, এ-জাতীয় বগি সাধারণত ভিআইপিদের বহনের জন্য সংযোজিত হয়, পুরো একটা বগিই বিশেষ সুবিধা সংবলিত হয়ে থাকে, বিছানা পাতা থাকে, বেসিন থাকে, কমোড থাকে, সোফা থাকে, জানালায় পর্দা থাকে, রান্না করার সরঞ্জামাদি থাকে- বিস্তর সুবিধা সংবলিত একটা আলাদা বগি বলা যায়।
৬. নেই আসন- এটাও এক প্রকার আসন, কেননা টিকিটের গায়ে আসনের ধরন অংশে লেখা থাকে ‘নেই’, এর মানে হলো নির্দিষ্ট কোনো আসন আপনাকে দেওয়া হয়নি, যদিও আপনি ভাড়া ঠিকই দিয়েছেন, আপনাকে সারা পথ দাঁড়িয়ে যেতে হবে, অর্থাৎ স্ট্যান্ডিং বা দ-ায়মান টিকিট দেওয়া হলো, সুযোগ পেলেই এখানে-ওখানে খালি আসনে বসে বসে পা-কে আরাম দিয়ে যাবার অনুমতিপ্রাপ্ত।
আরও এক শ্রেণির আসন আছে, নাম সুলভ শ্রেণি, ওটা সাধারণত মেইল ট্রেনের বগিতে লেখা থাকে। বোঝাই যাচ্ছে, তৃতীয় শ্রেণিরও নিচে যদি কিছু থাকে, তবে সেসব সুবিধা সেখানে থাকে। তবে মাঝে মাঝে নতুন বগি হলে সুবিধাগুলো বেশি থাকে।

ট্রেনের ধরন
ট্রেন তার আকার-আয়তনের দিক থেকে দু-প্রকার সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই : ১. মিটারগেজ আর ২. ব্রডগেজ। নাম শুনেই বোঝা যায় ব্রডগেজ ট্রেনের আকৃতি একটু ব্রড বা বড়। মিটারগেজ ট্রেনও দুই লাইনে চলে, ব্রডগেজও তাই, তবে মিটারগেজ ট্রেনের তুলনায় ব্রডগেজ ট্রেন পাশে খানিকটা বড় হয়, সাধারণত এক থেকে দেড় ফুটের মতো। বাংলাদেশে ব্রডগেজ ট্রেন যদিও আমাদের মনে হয় যে, নতুন সংযোজন; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তান আমলেও বাংলাদেশে ব্রডগেজ ট্রেন চলত। পরবর্তীতে আবার ব্রডগেজের লাইনগুলো উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং এখন আবার অনেক স্থানেই ব্রডগেজ চালু করা হয়েছে। সাধারণত যেসব রেলট্র্যাকে পাশাপাশি ৩টি পাত দেখা যায়, সেখানে মাঝখানেরটিকে আশ্রয় করে চলে মিটারগেজ, আর দু-পাশেরটিকে আশ্রয় করে চলে ব্রডগেজ। বাংলাদেশে নতুন সংযোজিত ব্রডগেজ ট্রেনগুলো ভূমি থেকে একটু বেশিই উঁচু হয়ে থাকে।

সুবিধাদির দিক থেকে ট্রেন আবার চার প্রকারের :
১. মালবাহী গাড়ি - এগুলোতে থাকে আগের আমলের জরাজীর্ণ লাল কিংবা সবুজাভ রঙের বগি, যেগুলোতে বড় বড় দরজা দিয়ে মালপত্র ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে মাল বহন করা হয়; এ-ধরণেরই আরেকটা সংযোজন হলো কন্টেইনারবাহী গাড়ি, এগুলোর বগিগুলোতে থাকে শুধু একটা পাটাতন, যাতে বিশাল বিশাল কন্টেইনার বসিয়ে নিয়ে সেই পাটাতন-বগিগুলো একের পর এক জোড়া দিয়ে একটা ইঞ্জিন টেনে নিয়ে চলে; বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ-জাতীয় ট্রেনের সবচেয়ে শেষের বগিটা হয় একটা ছোট্ট ঘর, যেখানে ট্রেনের মাস্টাররা বসে ট্রেন নিয়ন্ত্রণ করেন।
২. মেইল ট্রেন- প্রচন্ড ধীর গতির এবং বেশ নোংরা বাহন, বগির ভিতরেই মালপত্র আর মানুষের সহবাস বগিগুলোকে রীতিমতো একেকটা খোয়াড়ে পরিণত করে এবং রেল বিভাগের চরম অবহেলায় এ-জাতীয় গাড়িগুলোর মেরামত তেমন একটা হয় না, তাই আসনগুলোর অবস্থা হয় করুণ এবং উঁইপোকা ও তেলাপোকাযুক্ত; এ-জাতীয় ট্রেনগুলো স্টেশন তো ধরবেই, কখনও কখনও যে কোনো স্থানেও থামিয়ে রাখে এবং সব সময়ই অন্যান্য ট্রেনকে প্রাধান্য দিয়ে চলে, অর্থাৎ যেখানে-সেখানে পার্শ্ববর্তী লাইনে দাঁড় করিয়ে অন্য ট্রেনকে পাশ কাটিয়ে যেতে দেয়, সেই হিসেবে বেশ শ্রদ্ধাশীল ট্রেন বলা যায় একে! উদাহরণ- সুরমা মেইল, চট্টগ্রাম মেইল ইত্যাদি।
৩. সাধারণ ট্রেন- এক্কেবারে মেইল ট্রেনের কাতারে ফেলা যায় না, আবার উচ্চ শ্রেণিরও নয়- এমন ট্রেনগুলো সাধারণ ট্রেন। এরাও উচ্চ শ্রেণির ট্রেনগুলোকে সমীহ করে চলে এবং যত্রতত্র ওভারটেক করতে দেয় ও স্যালুট ঠুকে।
৪. আন্তঃনগর ট্রেন বা ইন্টারসিটি ট্রেন- বেশ উচ্চবংশীয় ও মর্যাদাসম্পন্ন ট্রেন, এবং এরা বেশ প্রায়োরিটি বেসিসে সাধারণ ও মেইল ট্রেনকে অবদমিত করে রাখে। এদের সেবা তুলনামূলক উন্নত এবং এগুলোতে [এখানে উল্লেখিত] ১-৬ পর্যন্ত সব ধরনের আসনেরই বন্দোবস্ত প্রয়োজনভেদে করা যায় এবং হয়।
৫. আন্তঃদেশীয় ট্রেন- বর্তমানে চালু হওয়া এবং অতীতেও বাংলাদেশে চালু ছিল। এ-জাতীয় ট্রেনগুলো বাংলাদেশ ও নিকটবর্তী দেশে যাত্রী ও মালামাল বহন করে। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এ-রকম ট্রেন সেবা চালু আছে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে কলকাতার দিকে এই ট্রেন চলাচল করে। এই ট্রেনের গতি এতটাই তীব্র হয় যে, বর্ডার-স্টেশন ব্যতীত এই ট্রেন ব্রেক কষে না এবং প্রচ- দ্রুত গতিতে সব ট্রেনকে তোয়াক্কা না করে চলে। অন্তর্বর্তী প্রত্যেকটা স্টেশন এবং গেটঘর বা ক্রসিংগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা থাকে এবং কর্মচারীরা বাঁশির পর বাঁশি দিয়ে সতর্ক করতে থাকেন রেলের আশপাশের পথচারীদের। বর্তমান প্রচলিত ট্রেনটি মৈত্রী এক্সপ্রেস এবং এটি একটি ব্রডগেজ ট্রেন, পুরোটাই তাপানুকূল এবং নিরাপত্তা সংবলিত ও উচ্চমান ও সেবাপূর্ণ।

স্টেশনের ধরন
স্টেশনগুলো প্রধানত দু-প্রকার, আমি বলি তিন প্রকার :
১. জংশন- নামটা ব্রিটিশদের দেওয়া ঔঁহপঃরড়হ, সংক্ষেপে লেখা থাকে ‘জং’ দিয়ে- এসব স্টেশনে থাকে প্রচুর বিকল্প রেললাইন এবং ট্রেনগুলো এখানে দীর্ঘ বিরতি নিতে পারে এবং বগিগুলো উল্টে-পাল্টে প্রয়োজন অনুসারে আবার সংযোজন করতে পারে; উদাহরণ- আখাউড়া জংশন, কুলাউড়া জংশন।
২. সাধারণ স্টেশন- যেখানে ট্রেন থামবে এবং যাত্রী ও মালামাল উঠানামা হবে; জংশন এবং এ-রকম স্টেশনে উঠানামার সুবিধার্থে রেলের পাশে প্লাটফর্ম বা উঁচু বেদি থাকে এবং সুবিধাসংবলিত রেল অফিস থাকে; যেমন- ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশন।
৩. মরা স্টেশন- এই নামটা আমার মায়ের দেওয়া, কারণ এ-জাতীয় স্টেশনগুলো রীতিমতো করুণার পাত্র : কর্মব্যস্ততাহীন, অবকাঠামোহীন মরা মরুভূমি; একমাত্র মেইল ট্রেনগুলোই এদের সমীহ করে, সাধারণ ট্রেনগুলো বিপদে পড়লে কিংবা কোনো ট্রেনকে পাশ কাটিয়ে যেতে দিতে থামে, নয়তো কেউ তাকিয়েও দেখে না; কোনোরকমে একটা ছাপড়া ঘর নিয়ে বসে থাকে এগুলো, যেমন- বনানী স্টেশন।

ট্রেন, বগি ও আসন পরিচিতি
ট্রেনে কোন বগি সংযোজিত হবে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। হয়তো একই বগি ১০টা ট্রেনে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সংযোজিত হতে পারে, অর্থাৎ ব্যাপারটা মোবাইল ফোনের সিমের (রিম নয়) মতো, কোন মোবাইলে ব্যবহৃত হবে তার ইয়ত্তা নেই। তাই বগিগুলো সংযোজন করা হয়ে গেলে কর্মচারীরা দুটো কাজ করেন : বগির দুই পাশে, বাইরের দিকে, মাথার উপরে মুকুট পরিয়ে দেন, মানে নেমপ্লেট লাগিয়ে দেন। সেখানে লেখা থাকে ট্রেনটির নাম এবং গন্তব্য। যেমন : তূর্ণা এক্সপ্রেস, ঢাকা-চট্টগ্রাম।
প্রতিটা ট্রেনের আলাদা নাম আছে, উল্লেখ্য এখানে ট্রেন বলতে বোঝানো হচ্ছে কয়েকটি বগি সংবলিত একটা ইঞ্জিনকে, যারা একত্রে একটা নির্দিষ্ট সময়ে একটা নির্দিষ্ট গন্তব্যে চলাচল করে থাকে। অর্থাৎ ট্রেন বলতে কোনো নির্দিষ্ট বগি বা ইঞ্জিন বরাদ্দ নেই, যখন যেটা ব্যবহৃত হয়, তখন সেটাই সেই নাম ধারণ করে। বাংলাদেশের রেলব্যবস্থা যতটা জরাজীর্ণ, ট্রেনগুলোর নাম ঠিক ততটাই চমৎকার; অপূর্ব সব নাম সেই স্বাধীনতালগ্ন থেকে এমনকি পাকিস্তান আমল থেকেও প্রযোজ্য। যেমন- পাকিস্তান আমলে ছিল পাহাড়িকা এক্সপ্রেস, উল্কা এক্সপ্রেস; এখন চলে ঢাকা-সিলেটে জয়ন্তিকা, পারাবত, উপবন; ঢাকা-চট্টগ্রামে তূর্ণা, মহানগর (প্রভাতী) ও মহানগর (গোধূলী), সুবর্ণ; ঢাকা-নীলফামারিতে নীলসাগর; ঢাকা-খুলনায় সুন্দরবন; ঢাকা-রাজশাহীতে সিল্কসিটি; ঢাকা-নোয়াখালিতে উপকূল; লালমনিরহাট-শান্তাহারে করতোয়া; সিলেট-চট্টগ্রামে উদয়ন ইত্যাদি সব অপূর্ব নাম; পাহাড়িকা কিছুদিন আগেও চলত সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে।
কর্মকর্তারা মুকুট পরিধান শেষ করার পর বগির দরজার কাছেই একটা ছোট্ট প্লেট ঢোকানোর জায়গায় ঢুকিয়ে দেন একটা হার্ডবোড, যাতে লেখা থাকে বগির নাম : ‘ক’, ‘খ’ ইত্যাদি। কখনও কখনও বাংলা অক্ষরের ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু বগির নাম থাকে ‘এক্সট্রা-১’ কিংবা ‘এক্সট্রা-২’ ইত্যাদি। অনেকেই মুখে ‘গ’, ‘ঘ’, ‘চ’, ‘ছ’, ‘জ’, ‘ঝ’ ইত্যাদি বোঝাতে বেশ কসরত করেন, কেউবা গরু-ঘোড়া; চামচ-ছাতা; জাহাজ-ঝাড়– ইত্যাদি বলে বগি বুঝিয়ে থাকেন একে-অপরকে। এছাড়া ট্রেনের টিকিটের গায়ে ইংরেজিতে বাংলা অক্ষরের উচ্চারণ-বিকৃতিও থাকে, যেমন- ইঁয়ো (ঞ)-কে লেখা থাকে ঘবড়, উঁয়ো (ঙ)-কে লেখা থাকে টসড় ইত্যাদি।
বগির ভিতরে [মিটারগেজে] মাঝখান বরাবর থাকে আইল বা হাঁটাপথ, দুপাশে থাকে দুই সারি করে আসন। ব্রডগেজে আইলের একপাশে থাকে তিন সারি আর আরেক পাশে থাকে দুই সারি আসন। সেখানে প্রতিটা আসনকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয় ইংরেজি দুটো অক্ষর : ঈ এবং ড। অর্থাৎ লেখাটা থাকে এ-রকম : সি-২১ ডব্লিউ-২২। এখানে সি হলো করিডর আর ডব্লিউ হলো উইন্ডো। অর্থাৎ সি লেখা আসনটি করিডর বা আইল সংলগ্ন আর ডব্লিউ লেখা আসনটি জানালা সংলগ্ন।

একটা পূর্ণাঙ্গ ট্রেনে কয়েক ধরনের বগি থাকে :
১. বাহন বগি- সাধারণত যাত্রীরা যেগুলোতে চলাচল করেন; এগুলোতে দুপাশে অথবা একপাশে পায়খানা বা টয়লেট থাকে।
২. খাবার গাড়ি বা ফুড কার- এই বগিতে দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে থাকে মানুষ বহনের জন্য শোভন আসন, আর বাকি অংশে থাকে ডাইনিং টেবিল ও রান্নাঘর। এখান থেকে খাবার প্রস্তুত করে রেলওয়ের সাদা পোশাক পরে লোকজন খাবার পরিবেশন করেন বগিতে বগিতে এবং খাবার ঘরের ডাইনিং-এ।
৩. জেনারেটর রুম বা পাওয়ার কার- অনেকে একে বলেন ইঞ্জিন রুম, আসলে এখানে ট্রেনের ইঞ্জিন থাকে না। এখানে একটা বিশাল জেনারেটর পুরো ট্রেনের বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
৪. নামাজ ঘর- এই বগির দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে থাকে শোভন আসন, বাকিটা জুড়ে থাকে একটা ছোট্ট কক্ষ, যাতে, ট্রেনের ধরনভেদে কখনও মেঝেতে কিছু বিছানো থাকে, কখনও কিছুই থাকে না। মজার বিষয় হলো অধিকাংশ সময়ই এই কক্ষটি স্ট্যান্ডিং টিকেটধারীদের বসে যাবার জন্য উত্তম স্থান বিবেচিত হয়।
৫. গার্ড রুম- এই বগিতে এক-পঞ্চমাংশ জুড়ে থাকে যাত্রীদের আসন, আর বাকিটা জুড়ে থাকে ছোট একটা কক্ষ, যেখানে ট্রেনের গার্ডরা অবস্থান করেন, সেখানে আরও যিনি অবস্থান করেন, তিনি হলেন ট্রেনের পরিচালক। ট্রেনের পরিচালক হলেন ট্রেনের মূল হর্তাকর্তা।
অনেক কথাই তো বলার ছিল। আজকে আর না বলি। বেশি দীর্ঘ করলে পড়ার ধৈর্য থাকবে না।

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৭ অক্টোবর ২০১৯

  • ৩ অক্টোবর ২০১৯

  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯