দু’হাত বাড়িয়ে ডাকছে হায়দরাবাদ

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০১৭, ১৫:১১

অনলাইন ডেস্ক

সায়ন্তনী সেনগুপ্ত

নাম ছিল তার ত্রিলিঙ্গ দেশ। অর্থাৎ তিন লিঙ্গের দেশ। কালেশ্বরম, শ্রী শৈলম এবং দ্রক্ষরামামের ৩টি শিবমন্দিরে নাকি বিরাজমান ছিলেন মহাদেব। আলেকজান্ডার ডানকান তার ‘আ গ্রামার অফ তেলেগু ল্যাঙ্গুয়েজ’ বইয়ে বলেছেন সেই ত্রিলিঙ্গ থেকেই রাজ্যের নাম তেলঙ্গানা। অনেকে আবার মনে করেন ছত্রিশগড়ের গেন্ডু ভাষা থেকে তেলু শব্দটি এসেছে, যেটি নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তেলঙ্গানায় পরিণত হয়। তেলুগুভাষী জেলাগুলো নিয়ে একটি পৃথক রাজ্য গঠনের দাবি বহু দিন ধরেই ছিল। ২০১৪ সালের ২ জুন ভারতের ২৯তম রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ তেলঙ্গানার। অন্ধ্রপ্রদেশ ভেঙে নতুন রাজ্য হলেও ১০ বছর উভয়েরই রাজধানী থাকবে হায়দরাবাদ।
সাতবাহন, ইক্ষবাকু, কাকাতীয়, বাহমনি, কুতুবশাহি, মোগল ও নিজামদের দীর্ঘ শাসনকালকে সঙ্গী করে গড়ে উঠেছে তেলঙ্গানার ইতিহাস। শিল্প, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের অন্যতম পীঠস্থান রাজ্যটি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অফুরন্ত ভা-ার।

প্রসিদ্ধ তীর্থস্থান ভদ্রাচলম
১৫৯০ সালে কুলী কুতুব শাহের উদ্যোগে পত্তন এই শহরের, ভাগমতী দেবীর নামে নাম হয় ভাগ্যনগর। দু’বছর পরে ভাগমতী দেবী নাম পরিবর্তন করে হন হায়দারমহল, শহরের নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় হায়দরাবাদ। হায়দরাবাদের যমজ শহর সেকেন্দরাবাদ, মধ্যিখানে হুসেন সাগর। ১৫৬২ সালে এই বিশালাকার হ্রদটি খনন করান হুসেন শাহ ওয়ালি। হ্রদের মধ্যে ৬০ ফুট উঁচু বুদ্ধমূর্তিটি খুবই সুন্দর। হাইটেক এই শহরের অন্যতম মুখ্য আকর্ষণ চারমিনার। ভয়াবহ প্লেগ মহামারী নির্মূল করার স্মারক হিসেবে ১৫৯১ থেকে ১৫৯৩ সালের সময়কালে মহম্মদ কুলী কুতুব শাহের আমলে গড়ে উঠেছিল চারমিনার। ৪টি মিনারের ওপর নির্মিত অপরূপ কারুকার্যময় এই মিনারটি। নিজামের প্রধানমন্ত্রিত্বে ইস্তফা দিয়ে মীর ইউসুফ আলি খান (৩য় সালার জং) নিজেকে নিয়োজিত করেন এক ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা তৈরির কাজে, যা সালার জং মিউজিয়াম নামে খ্যাত। চারমিনার-এর কাছেই অবস্থিত ৪টি মহলের সমাহারে তৈরি চৌমহলা প্যালেস তৈরি শুরু হয় নিজাম সালাভাত জং-এর আমলে। শেষ হয় নিজাম আফসার-উদ্দৌলা বাহাদুরের আমলে। বড় ইমামবাড়া, ভিন্টেজ গাড়ি মিউজিয়ামের অন্যতম আকর্ষণ। দক্ষিণ ভারতের বৃহত্তম মক্কা মসজিদটি স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। মসজিদটিতে মক্কা থেকে আনা একটি ইট ব্যবহৃত হওয়াতে এই নামকরণ, আবার কেউ কেউ বলেন, মক্কা মসজিদের আদলে তৈরি বলে এই নাম মসজিদের। হুসেন সাগরের পাশেই অবস্থিত অসাধারণ লেসার শোয়ের জন্য প্রসিদ্ধ লুম্বিনী পার্ক। কাকাতীয় রাজা গণপতির সময়কালে তৈরি ইতিহাসখ্যাত গোলকোন্ডা ফোর্ট। দুর্গটির নির্মাণশৈলী অভিনব। হাতির আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য গজাল বসানো দরজা, ৩৬০ ধাপ উঁচু পাহাড় শিখরে দরবার হল, হারেম মহল, নাগিনা বাগ, তোপখানা এখানকার মুখ্য আকর্ষণ। কোহিনূর ও হোপ, দুটি রতœ এখান থেকেই আওঙ্গজেবের দখলে আসে। দুর্গটির বানজারা দরজা থেকে ১ কিমি দূরে ইব্রাহিম বাগে কুতুবশাহি রাজাদের পারিবারিক সমাধিস্থলটি পারসীয় ও পাঠান স্থাপত্যের মিলনশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন।

রামোজি ফিল্ম সিটি ট্যুর
হায়দরাবাদ থেকে ৪০ কিমি দূরে ২ হাজার একর জুড়ে গড়ে ওঠা রামোজি ফিল্ম সিটি বিশ্বের বৃহত্তম ইন্টিগ্রেটেড ফিল্ম প্রোডাকশন কমপ্লেক্স। ফিল্ম সিটির মধ্যে স্কুল, কলেজ, মন্দির-মসজিদ-চার্চ, রেলস্টেশন, বিমানবন্দর, ঝাঁ চকচকে রাস্তাঘাট হায়দরাবাদ ভ্রমণে অবশ্য দ্রষ্টব্য। আনুমানিক ১ হাজার ১২০ টাকা থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা খরচ হয় ট্যুরে। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত হয় ট্যুরটি। রামোজি ফিল্ম সিটির মধ্যে থাকতে চাইলে সেই ব্যবস্থাও আছে। এখানে তারা এবং সিতারা বলে দুটি বেসরকারি হোটেল আছে। দুই দিন এক রাতের প্যাকেজে খরচ পড়ে জনপ্রতি ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা।

ভদ্রাচলম ট্যুর
গোদাবরী নদীর দক্ষিণপ্রান্তে ভদ্রাগিরি পাহাড়ে শ্রীরামের মন্দিরের জন্য প্রসিদ্ধ এই তীর্থস্থান পুরাণ অনুযায়ী একসময় দ-কারণ্যের অংশ ছিল। বনবাসের ১৪ বছর শ্রীরাম, লক্ষণ ও সীতার সঙ্গে কাটিয়েছিলেন ৩২ কিমি দূরে পর্ণশালাতে। মন্দিরে রয়েছেন তির, ধন্,ু  শঙ্খ ও চক্র হাতে চতুর্ভুজ শ্রীরাম, লক্ষণ ও সীতা। জনশ্রুতি, লঙ্কার পথে শ্রীরাম এখান থেকেই গোদাবরী পার হন।

নাগার্জুন সাগর ট্যুর
শহরকে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করতে নির্মাণ করা হয়েছে বিশাল বাঁধ। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এই কৃত্রিম জলাধারে হারিয়ে গিয়েছে অতীতের ধান্যকটক, শ্রীপর্বত, বিজয়পুরী প্রমুখ বৌদ্ধকেন্দ্র। পুরনিদর্শন নিয়ে নাগার্জুন পাহাড়ের বুকে গড়ে উঠেছে মিউজিয়াম। মিউজিয়ামের বুদ্ধমূর্তিটি অনবদ্য। সিংহল থেকে বুদ্ধের বাণীর প্রচারে আগত মহাপণ্ডিত নাগার্জুনের নামে শহর নাগার্জুনকোন্ডা। এখানে ইতিহাসের স্মৃতি রোমন্থন করায় স¤্রাট অশোক নির্মিত মহাচৈত্য, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় খ্রিস্টাব্দে নির্মিত মঠ, বিহার, প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। দেভেরাকোন্ডা ফোর্ট এই অঞ্চলের অবশ্য দ্রষ্টব্য। ত্রয়োদশ শতকে ভেমুলা রাজাদের হাতে তৈরি হয় ফোর্ট। পরবর্তীকালে রাজা মাদা নায়ডু দখল করেন এটি। তার শাসনকালে নির্মিত বিস্ময়কর সিঁড়ি নিয়ে যায় শ্রীশৈলমের পাতালগঙ্গায়। তবে এই ট্যুরটি কিন্তু চাহিদার ওপর নির্ভর করে। পর্যাপ্ত পর্যটক না থাকলে ট্যুর বাতিল হয়ে যায়।
নাগার্জুন সাগর ট্যুর বাতিল হলেও শ্রীশৈলম ট্যুরে নার্গাজুন সাগর ঘুরে দেখা যায়। সকাল ১০টায় হায়দরাবাদ থেকে বেরিয়ে সন্ধ্যে ৬টায় শ্রীশৈলম পৌঁছয়। রাতে ওখানে থাকার ব্যবস্থা আছে। যাতায়াত এবং থাকার খরচ ১ হাজার ৮০০ টাকা। খাওয়া আলাদা। এ ছাড়াও আছে হায়দরাবাদ সিটি ট্যুর। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যে ৭টা পর্যন্ত। খরচ পড়ে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা।
হায়দরাবাদের বিরিয়ানি বিখ্যাত। মদিনা বিল্ডিংয়ের বিপরীতে ‘শাদাব’ বিরিয়ানির জন্য বিখ্যাত। মাধপুরের ‘বিরিয়ানি ঘর’-এরও সুখ্যাতি আছে। এখানকার আর এক বিখ্যাত জিনিস মুক্তা। মন মাতানো রং আর নানা ছাঁদের মুক্তার অলঙ্কার পাওয়া যায় হায়দরাবাদে।

কীভাবে যাবেন
কলকাতা থেকে ফলকনামা এক্সপ্রেস, শালিমার থেকে সাপ্তাহিক ট্রেন যায় সেকেন্দরাবাদ। প্রি-পেড অটো, প্রাইভেট গাড়ি ধরে চলে যাওয়া যায় ৭ কিমি দূরে হায়দরাবাদ। ইস্ট কোস্ট এক্সপ্রেস যায় হায়দরাবাদ ডেকান স্টেশন।

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ২৭ আগস্ট ২০১৭

  • ১৩ আগস্ট ২০১৭

  • ০৬ আগস্ট ২০১৭

  • ৩০ জুলাই ২০১৭