মালয়েশিয়ার লাঙ্কাউই : প্রকৃতি, প্রাচুর্য আর বৈচিত্র্যের এক মোহনীয় হাতছানি

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০১৭, ১৬:৩৫

অনলাইন ডেস্ক

সাবিহা সুলতানা

ট্রাভেলার নাকি টুরিস্ট- চিরন্তন এই দ্বন্দ্বের মাঝে এ্যাডভেঞ্চার প্রিয়, দুঃসাহসী ট্রাভেলাররাই যে এগিয়ে থাকবেন- এতে সন্দেহ নেই কোন। কিন্তু আমাদের মত যারা একেবারে ছা-পোষা সংসারী মানুষজন, যাদের মনপ্রাণ জুড়ে দুঃসাহসী ট্রাভেলার হওয়ার অদম্য ইচ্ছা; কিন্তু পরিবেশ ও পরিস্থিতি যাদের টুরিস্ট বানিয়েই ছেড়েছে, তাদের যেন বিড়ম্বনার শেষ নেই। তাই প্রতিটিবার যেকোন ভ্রমণের ক্ষেত্রেই মনে মনে অনেক এ্যাডভেঞ্চার করার ইচ্ছা সত্বেও ভ্রমণসঙ্গী আমার পাঁচ বছরের কন্যাটির সেফটির কথা মাথায় রেখে সেভাবেই ট্যুর প্ল্যান করতে হয়। তবে যেভাবেই আমরা আমাদের ভ্রমণ প্ল্যান সাজাই না কেন, দেশের বাইরে ভ্রমণে সবার আগে আমরা যে জিনিসটি মাথায় রাখার চেষ্টা করি তা হল, একটি দেশে তো বারবার যাবার সুযোগ না-ও হতে পারে। তাই,এই স্বল্প সময়ের প্রতিটি মুহুর্তের সর্বোত্তম উপভোগ যেন হয় তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সাথের বেবিটির স্বাচ্ছ্যন্দের কারণে কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন কম্প্রোমাইজ করতে হয়, ঠিক তেমনি আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে একেবারেই কম্প্রোমাইজ করা যায় না।
মালয়েশিয়া ভ্রমনের ক্ষেত্রেও তাই আমাদের এই ব্যাপারগুলোর দিকে দৃষ্টি রেখেই ট্যুর প্ল্যান করতে হয়েছিল। ভ্রমণ গ্র“পে আমরা দুই ফ্যামিলি, দুই বেবিসহ মোট সদস্য তিন জন। যেহেতু আমাদের ছুটি ছিল সব মিলিয়ে পাচ রাত-ছয় দিন, তাই অনেক কিছু ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও করা হয়ে উঠেনি। আমরা আমাদের দিনগুলোকে ভাগ করেছিলাম এভাবে- তিন রাত লাঙ্কাউই এবং দুই রাত কুয়ালালামপুর। কিন্তু মালিন্দো এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ঝামেলার কারনে সেটা উল্টাপাল্টা হয়ে যায়।
যাই হোক, আমরা বরাবরই বাজেট ট্রাভেলার। তাই, এবারও টিকিট দুইমাস আগেই কেটে রেখেছিলাম। ঢাকা টু কুয়ালালামপুর মালিন্দো এয়ারে চার ঘন্টা এবং কুয়ালালামপুর থেকে লাংকাউই এয়ার এশিয়ায় এক ঘন্টার ফ্লাইট। মাঝখানে চার ঘন্টা কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে সময় পার। তাই দীর্ঘ রাতের ভ্রমনের পর প্রথম মালয়েশিয়া দর্শন আমাদের লাংকাউই-তেই হয়েছিল। টিপটিপ বর্ষণমুখর সকালে এয়ার এশিয়ার প্লেনটি যখন ল্যান্ড করল লাঙ্কাউই’র বুকে, তখন বৃষ্টি ভেজা সোঁদা গন্ধে মাখানো এয়ারপোর্টটি কেন যেন খুব আপন করে নিল আমাদের। অতঃপর, ট্যাক্সি করে সোজা আমাদের হোটেল স্যান্ডি বিচে।
রিসোর্টে প্রবেশ করতেই যে দৃশ্য চোখের সামনে দেখা দিল এ যেন মেঘ না চাইতেই মহাপ্লাবন! আমাদের সামনেই দিগন্ত বিস্তৃত সুনীল সাগর তার ফেনিল জলরাশি নিয়ে আছড়ে পরছে যে আমাদের পায়ে! সাগরের একদম তীরেই আমাদের হোটেলটি। যাই হোক, মুগ্ধতা কাটিয়েই তল্পিতল্পা নিয়ে সোজা রুমে। রাতজাগা দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি সারা শরীরে, তাই ফ্রেশ হয়েই সবার আগে ঘুম।
ঘুম থেকে উঠে দুপুরে একটি ইন্ডিয়ান হোটেলে লাঞ্চ সেরে গন্তব্য ওয়াটার ওয়ার্ল্ড। আমাদের হোটেল থেকে এটি ছিল পায়ে হাঁটা দুরত্বে। বিকেল পর্যন্ত ওয়াটার ওয়ার্ল্ডের  রহস্যময় জগতে বিচরণ। হরেক রঙ আর নানা বৈচিত্রের সামুদ্রিক প্রাণী দেখে বিকেলটা বেশ চমৎকার কাটল আমাদের। বিশেষ করে ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পেঙ্গুইনদের কান্ডকারখানা দেখে সত্যিই আনন্দ পেলাম অনেক। আপনাদের গ্র“পে যদি ক্ষুদে সদস্য থাকে, তবে এই স্পটটি অবশ্যই মিস করবেন না। ওয়াটার ওয়ার্ল্ড থেকে বেরিয়ে আশেপাশে একটু ঘুরাঘুরি। এরপর ডিনার করে রুমে প্রত্যাবর্তন। পরদিন থ্রি আইল্যান্ড ট্যুর। এই প্যাকেজটি আগের রাতে আমাদের হোটেলের বাইরেই কিনেছিলাম। সকালে আমাদের হোটেল থেকে পিক করে তারপর তিনটি আইল্যান্ড ঘুরিয়ে দুপুরে ফিরে নিয়ে এল তারা। তিনটি আইল্যান্ডের প্রথমটি জিওফরেস্ট পার্ক। এখানে বোট থেকে নেমে একটু হাঁটতে হয়। তবে গন্তব্যস্থলে পৌঁছলে যে মন ভরে যাবে- এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই কোন। দ্বিতীয় আইল্যান্ডটি ছিল ঈগল আইল্যান্ড। এখানে নামতে হবেনা। বোটম্যানরা খাবার ছুঁড়তেই মুহুর্তে শত শত ঈগল হাজির। ঝাঁক-ঝাঁক ঈগলের এমন মিলনমেলা আগে কখনো দেখেছি বলে মনে পরে না। এবার তৃতীয় এবং সবচেয়ে সুন্দর আইল্যান্ড, নাম বারিস বাসাহ। শুভ্র বালুকা বিস্তীর্ণ এই দ্বীপটি মন ভরানো সৌন্দর্যের ডালা নিয়ে বরণ করল আমাদের। এখানে ঘন্টাখানেক কাটিয়ে একরাশ ভাল লাগা নিয়ে আইল্যান্ড ট্যুর সমাপ্ত করে আমাদের রুমে প্রত্যাবর্তন।
দুপুরে হোটেলের বিচেই ঝাপাঝাপি সেরে বিকেলে গন্তব্য অরিয়েন্টাল ভিলেজ। আমাদের ভ্রমণের সবচেয়ে থ্রিলিং পার্টটি এখানেই অপেক্ষা করছিল- ক্যাবল কার। লাঙ্কাউইর ক্যাবল কারে যে একবার উঠবে সে হরলিক্স বা নিডো ছাড়াই ভয়কে জয় করা শিখে ফেলবে।  এই রাইডে ঊঠার আগে আপনাকে একটা প্রস্ততিমুলক থ্রি-ডি সেশনে অংশ নিতে হবে, তারপর মুল অভি যা ন। আমরা যখন গিয়েছিলাম তখন স্কাই ব্রীজ বন্ধ ছিল (ডন-টু সিনেমার শেষ দৃশ্যে যেটার উপর শাহরুখ তার ভিলেনের বারটা বাজিয়েছিলেন), তাই সেটাতে উঠার সৌভাগ্য (কিংবা দুর্ভাগ্য) আমাদের হয়নি। ক্যাবল কারের অভিজ্ঞতা আর শেয়ার করছি না, যারা যাবেন তারা নিজেরাই বুঝে নিবেন। তবে এটার শেষ মাথায় এক জায়গা থেকে লাঙ্কাউইর সবগুলো আইল্যান্ড একসাথে দেখা যায়, আর সেটি যে এক অপার্থিব দৃশ্য- তা বলার অপেক্ষাই রাখে না।

ভ্রমন সংক্রান্ত টুকিটাকি
লাঙ্কাউইতে অনেক সুন্দর সুন্দর টুরিস্ট স্পট আছে। আমরা শুধু সময়স্বল্পতা আর বেবির কারণে ওয়াটার ওয়ার্ল্ড, থ্রি আইল্যান্ড ট্যুর, ওরিয়েন্টাল ভিলেজ, ক্যাবল কার রাইডিং, ঈগল স্কয়ার ভিজিট এই এ্যাক্টিভিটিগুলো করেছিলাম। আপনি অন্য জায়গাগুলোও ঘুরে আসতে পারেন।

শপিং
ট্যুরিস্ট স্পট বিধায় শপিং-ফ্রেন্ডলি না। কিছু কেনার কথা না ভাবাই ভাল; তবে ব্যতিক্রম চকলেট এবং এ্যালকোহল। এই দুই ধরণের জিনিস এখানে ডিউটি ফ্রি। চেনাং মলে দোতলায় রয়েছে চকলেটের বিশাল সম্ভার। আমরা এখান থেকেই চকলেট কিনেছিলাম। ইলেক্ট্রনিক্স জিনিস কুয়ালালামপুরের চেয়ে কম দামে পাবেন এখানে। আমরা একটা ক্যামেরাও কিনেছিলাম তাই এখান থেকে।

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ আগস্ট ২০১৯

  • ০৮ আগস্ট ২০১৯