সাকিবের এক বছর নিষেধাজ্ঞা, দুই বছরের সাজা

লঘু ভুলে গুরু দণ্ড

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০১৯, ১২:৫৬

অনলাইন ডেস্ক

 

একবার দুবার নয়, তিন তিনবার ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন। প্রতিবারই প্রত্যাখ্যান করেছেন। জুয়াড়িদের প্রস্তাব হেলায় উড়িয়ে দিয়েছেন। জানাননি ক্রিকেট দুর্নীতি দমন কমিশন সংশ্লিষ্ট কাউকেই। ছোট্ট এই ভুলের চড়া মাসুল দিতে হলো বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি ও টেস্ট অধিনায়ক সাকিব আল হাসানকে। ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব গোপন করায় সব ধরনের ক্রিকেট কার্যক্রম থেকে সাকিবকে ২ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা আইসিসি। এ যেন লঘু ভুলে গুরু দণ্ড।

ভুলটা স্বীকার করেছেন ওয়ানডে সংস্করণের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। অনকাক্সিক্ষত এই ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন সাকিব। আইসিসির কাছে স্বীকার করেছেন ভুলের কথা। তাই সাজাও কমছে। প্রথম বছরের নির্বাসিত অধ্যায়ে নতুন করে কোনো আইন না ভাঙলে তার শাস্তির মেয়াদ দীর্ঘায়িত হবে না। সেক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা কমে হয়ে যাচ্ছে এক বছরের। যার অর্থ দাঁড়াচ্ছে ২৯ অক্টোবর ২০২০ সালের আগে মাঠে ফিরতে পারবেন না সাকিব।

সাকিব যে নিষিদ্ধ হচ্ছেন সেটা কালই প্রচার হয়েছে সংবাদমাধ্যমে। উৎকণ্ঠা যা ছিল সেটা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও শাস্তির মেয়াদ নিয়ে। অবশেষে মঙ্গলবার রাতে এক বিবৃতিতে সাকিবকে তার শাস্তির কথা জানিয়ে দিয়েছে ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা আইসিসি। ভুল স্বীকার করে শাস্তি মেনে নেওয়ায় আপিল করার আর সুযোগ থাকছে না। তাই আগামী বছর অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলা হচ্ছে না তার।

ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন বিপর্যয়কে পেছনে ফেলে মাঠে ফেরার অঙ্গীকার করেছেন সাকিব। দুঃসময়ে তিনি পাশে পাচ্ছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তথা পুরো বাংলাদেশকেই। কাল সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বিসিবি সাকিবের পাশে আছে। ও বিষয়টিকে (জুয়াড়িদের) গুরুত্ব দেয়নি। কাউকে জানায়নি। ভুলটা ওখানেই হয়েছে।’

কাল এক বিবৃতিতে আইসিসি জানিয়েছে, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তিনবার সাকিবকে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ নিয়ে আইসিসি কিংবা বিসিবি কাউকে কিছু জানাননি সাকিব। সেটাই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়াল। আইসিসির বিধান রয়েছে ফিক্সিংয়ের কোনো প্রস্তাব পেলে তা সংশ্লিষ্টদের জানাতে হবে। সাকিব না জানিয়েই ফাঁদে পড়েছেন।

২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজ চলাকালে ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পান সাকিব। পরবর্তীতে ওই বছরেরই আইপিএলে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ-কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব ম্যাচের আগেও তাকে ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দেন জুয়াড়িরা। পরে ত্রিদেশীয় সিরিজ কিংবা আইপিএলে ম্যাচ গড়াপেটা করার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়।

ম্যাচ ফিক্সিং যেমন অপরাধ তেমনি অনৈতিক কিছুর প্রস্তাব গোপন করাও অন্যায়। প্রতিটি সিরিজের আগে ক্রিকেটারদের এই আইনের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়ে থাকে। এই ধরনের অন্যায়ের সাজা ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছরের নিষেধাজ্ঞার খড়গ। কিন্তু অসংখ্য ক্লাস করেও সেখান থেকে কিছুই শিখতে পারেননি সাকিব। তার নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে আইসিসির মহাব্যবস্থাপক (ইন্টেগ্রিটি) অ্যালেক্স মার্শাল বলেছেন, ‘সাকিব আল হাসান খুবই অভিজ্ঞ একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার। তিনি আইসিসির অনেক শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন এবং ধারা অনুযায়ী বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে অবগত আছেন। ফিক্সিংয়ের প্রতিটি প্রস্তাবই তার জানানো উচিত ছিল।’

অ্যালেক্স মার্শাল জানান, সাকিব ভুল স্বীকার করে নিয়েছেন, ‘সাকিব তার ভুল স্বীকার করেছেন এবং তদন্তে পুরোপুরি সহায়তা করেছেন। ইন্টেগ্রিটি ইউনিটকে ভবিষ্যৎ শিক্ষা কার্যক্রমে সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। যাতে তরুণ ক্রিকেটাররা তার ভুল থেকে শিক্ষা নেয়। আমি তার কাছ থেকে এই আশ্বাস পেয়ে খুশি।’

সাকিবের নিষেধাজ্ঞার খবরে বড়সড় একটা ধাক্কা খেল বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গন। এমন সময়ই অধিনায়ক নির্বাসিত হলেন যখন দরজায় কড়া নাড়ছে ভারত সিরিজ। আজ তাকে রেখেই দিল্লি বিমানে চড়বে টাইগাররা। ভারতের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি সিরিজে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ এবং টেস্টে দলের নেতৃত্বের জোয়াল পড়েছে মুমিনুল হকের কাঁধে।

আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন সাকিব। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ‘যে খেলাটাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, সেই খেলা থেকে নিষেধাজ্ঞা পেয়ে আমি দুঃখিত। তবে অনৈতিক প্রস্তাবের ব্যাপারটি আকসুকে না জানানোয় যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তা আমি মাথা পেতে নিচ্ছি। ক্রিকেটকে দুর্নীতিমুক্ত করতে আইসিসি আকসু সবচেয়ে বেশি ভরসা করে ক্রিকেটারদের সহযোগিতার ওপর। কিন্তু এক্ষেত্রে আমি দায়িত্ব পুরোপুরিভাবে পালন করতে পারিনি।’

ভবিষ্যতে এই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে না বলেও অঙ্গীকার করেছেন সাকিব। একই সঙ্গে তরুণদের প্রতিও বার্তা দিয়ে রাখলেন, ‘শত কোটি ভক্ত ও অন্যান্য খেলোয়াড়ের মতো আমিও চাই ক্রিকেট থাকুক দুর্নীতিমুক্ত। তাছাড়া আগামীর তরুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা যেন আমার মতো ভুল না করে সে জন্য আমি আইসিসির আকসুর দুর্নীতিবিষয়ক শিক্ষামূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে যাব।’

গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে টালমাটাল বাংলাদেশের ক্রিকেট। আচমকা ১১ দফা দাবিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটাররা ডেকে বসেন ধর্মঘট। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সাকিব। তাদের দাবি শেষ অবধি মেনেও নিয়েছিল বিসিবি। ক্রিকেটাররা ফেরেন মাঠে। সাকিব ফিরলেন একদিন পর। কিন্তু তার ফেরার স্থায়িত্ব হলো মাত্র একদিনের। ভারত সফরের চার দিনের অনুশীলন ক্যাম্পের শেষ দুই দিনেও আসেননি তিনি। তাকে ছাড়াই নিজেদের মধ্যে কুড়ি ওভারের প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছেন সতীর্থরা। সাকিবের অনুশীলনবিমুখ হওয়ার বিষয়টা রহস্যময়ী হয়ে উঠেছিল।

অন্যদিকে বিসিবিপ্রধান নাজমুল হাসান বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে যে ধরনের বিস্ফোরক কথা বলেছেন, সেটা বাংলাদেশ ক্রিকেটের নতুন বিপর্যয়ের একটা আলামত হিসেবে দেখা দিয়েছিল। বোর্ডের আইন ভেঙে একটি টেলিকম কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করায় ভারত সফরের আকাশে জমা হয় শঙ্কার কালো মেঘ। বিসিবি প্রধানের শঙ্কা ছিল- সাকিবসহ দলের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন ক্রিকেটার ভারত সফর থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে পারেন। যাকে ঘিরে এত কিছু হলো সেই তারই ভারতে যাওয়া হলো না। শুধু এই সফর নয়, অন্তত সামনের এক বছর দলের সফরসঙ্গী আর হচ্ছেন না সাকিব।

সাকিবের নিষেধাজ্ঞায় বাংলাদেশের ক্রিকেটের কিছুটা হলেও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। যেমনটা হয়েছিল মোহাম্মদ আশরাফুলের বেলায়। এবার বিপাকে দেশের ক্রিকেটের আরেক পোস্টারবয়। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিবের ক্যারিয়ারে আগেও বিপর্যয় এসেছিল। দুঃসময়কে জবাব দিয়ে সাকিব বরাবরই ফিরে এসেছেন। এবারো বীরপর্দে সাকিব প্রত্যাবর্তন করবেন এমনটাই প্রত্যাশা ভক্ত-সমর্থককূল তথা ক্রিকেট বিশ্ব।

- মানিক সরকার

পুরনো সংখ্যা
  • ১৭ অক্টোবর ২০১৯

  • ৩ অক্টোবর ২০১৯

  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯