দেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করে না

প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ১৩:১০

অনলাইন ডেস্ক

 

ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক বিশেষ উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জ ও ভারত সফর শেষে এক সাংবাদিক সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক বিশেষ উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। এতে দুদেশের সম্পর্কে এক নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে।’ আগামী বছর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশ সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। মোদি ওই সফরে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলেও জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। সংবাদ সম্মেলনের নানা দিক তুলে ধরা হলো

বাংলাদেশের ফেনী নদী থেকে ভারতকে ‘অত্যন্ত নগণ্য’ পরিমাণ পানি দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা যে পানি দিচ্ছি, তার পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। এটা নিয়ে কেন এত চিৎকার, আমি জানি না। যারা ক্ষমতায় থাকতে ন্যায্য হিস্যার দাবি করতে ভয় পায়, ভারত সফরে গিয়ে গঙ্গার পানি বণ্টনের কথা বলতেই ভুলে যায়, সেই বিএনপির মুখে এসব সমালোচনা মানায় না।
ভারতের সঙ্গে গ্যাস ও নদীর পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি নিয়ে বিএনপি নেতাদের সমালোচনার জবাবে শেখ হাসিনা দৃঢ়কণ্ঠে বলেছেন, দেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করে দেবে, এটা কখনও হতে পারে না। আমরা বিদেশ থেকে এলপিজি গ্যাস এনে প্রক্রিয়াজাত করে ভারতে রপ্তানি করব। এটা প্রাকৃতিক গ্যাস নয়। অন্য পণ্য যেমন আমরা রপ্তানি করি ঠিক তেমন। এটা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কিছু নেই।
সম্প্রতি ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফল নিয়ে অর্জিত সাফল্যগুলো তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম উপবিষ্ট ছিলেন। তারা ছাড়াও সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্যবৃন্দ এবং সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনের আগে সাংবাদিকদের মধ্যাহ্ন ভোজে আপ্যায়িত করেন প্রধানমন্ত্রী।

মানুষের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব আমার
দেশকে, দেশের মানুষকে আপন বলে মনে করেন বলেই কখন, কোথায়, কী ঘটছে তা কঠোরভাবে নিজ দায়িত্বে নজরদারি করেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আমি মনে করি এই রাষ্ট্র, এই দেশ আমার। এই দেশের মানুষ আমার মানুষ। তাদের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব তো আমারই। আমি যতক্ষণ পারি, সেই দায়িত্ব পালন করি। এটা নিয়ে এত প্রশ্ন কেন, সেটা আমার বোধগম্য নয়।
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করতে গিয়ে বলেন, কোনো অপরাধ ঘটলে অপরাধীদের ধরতে প্রধানমন্ত্রীকেই কেন নির্দেশনা দিতে হয়? কিংবা ছাত্রলীগের কেউ অপরাধ করলে তাকে বহিষ্কার করতেও কেন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই নির্দেশ আসতে হয়?
এ প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি বুঝি না, কেন বারবার এ প্রশ্ন সামনে আসে। আমি সরকারপ্রধান, দেশের কোথাও কিছু ঘটলে অবশ্যই তা দেখার দায়িত্ব আমার আছে। আমি তো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালাই না। তিনি বলেন, মাথা থাকলে মাথাব্যথা থাকবেই। আমি সরকারপ্রধান। ফলে কোথায় কী ঘটছে, সেদিকে সার্বক্ষণিক নজর রাখা আমার কর্তব্য। আমাকে তো এটা কেউ চাপিয়ে দিচ্ছে না। আমি নিজের অনুভূতি ও কর্তব্যবোধ থেকেই এটা করি। কখন কে কী বলবে, ওই চিন্তা কখনও করি না। দেশের জন্য সবসময় ভাবি বলেই সব কাজ করি। এ-সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, এর আগে একজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, ১২টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে রাতে ব্যস্ত হতেন। এগুলো দেখে আপনাদের (সাংবাদিক) বদঅভ্যাস হয়ে গেছে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ রাষ্ট্র চালানো দেখেছেন আপনারা, তাই অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে, আমার এটাই মনে হচ্ছে। আমি সবদিকে নজর না রেখে যদি খালেদা জিয়ার মতো এখন বলতাম পানির কথা বলতে ভুলেই গেছি, তাহলে নিশ্চয় খুশি হতেন। আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালাই না।

দেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করে না
ভারতের সঙ্গে গ্যাস দেওয়ার চুক্তি হয়েছে, এতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষা হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এলপিজি গ্যাস আমাদের দেশে উৎপন্ন হয় না। এখন এটা আমদানি করছি। রান্নায় এলপিজি ভরে সিলিন্ডার সরবরাহ করছি। আগে স্বল্প পরিমাণে আমাদের এলপিজি উৎপাদন হতো। আমদানিকৃত গ্যাস গ্রামে বিভিন্ন কোম্পানি সরবরাহ করছে। আগে ১০ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৬০০ টাকায় দামে বিক্রি হতো। বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়ায় এখন তা কমে ৯০০ টাকা হয়েছে। এখন অনুমোদিত ২৬টি কোম্পানি কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সঙ্গে আমরা বসেছিলাম। আমি গ্যাস বিক্রি করতে রাজ হইনি বলে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু খালেদা জিয়া সেখানে থেকে তাদের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও আমাকে গ্যাস বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমাকে আমেরিকায় দাওয়াত নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানেও আমি একই কথা বলেছিলাম। আমি তখন বলেছিলাম বিএনপি গ্যাস দিতে পারবে না। কারণ আমাদের অত গ্যাস ছিল না। সেটিই পরে প্রমাণ হয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের কথা যাদের মনে আছে তারা জানেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা আমাদের একটা ঘাঁটি ছিল। সেখানে বিপুল পরিমাণ আমাদের শরণার্থীকে তারা আশ্রয় দিয়েছিল। সেখান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করা হতো। ত্রিপুরা আমাদের শক্তি ছিল। তিনি বলেন, আমরা বড় আকারে এই এলএমজি গ্যাস আমদানি করছি। এরপর ভ্যালু অ্যাড করে সেটি রপ্তানি করছি। আমাদের যে রপ্তানি আয় সেখানে নতুন আরেকটি খাত যোগ হলো। দেশের স্বার্থ বিক্রির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করবে সেটি হতে পারে না। বরং যে যে সমস্যা ছিল সেগুলো একে একে সমাধান করেছি। তার সফরে ভারতের সঙ্গে যেসব চুক্তি হয়েছে, তার সব জায়গায় বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে।

ভারতকে নগণ্য পরিমাণ পানি দেওয়া হচ্ছে
বাংলাদেশের ফেনী নদী থেকে ভারতকে ‘অত্যন্ত নগণ্য’ পরিমাণ পানি দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যে পানি দিচ্ছি, তার পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। এটা নিয়ে কেন এত চিৎকার, আমি জানি না।
এ-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল খাগড়াছড়ি। এটা খাগড়াছড়ি থেকে মাটিরাঙ্গা হয়ে ভারতের সীমান্তবর্তী নদী। ওখানকার ৪০ কিলোমিটার বাংলাদেশের অংশে, একটি অংশ সোনাগাজী হয়ে সাগরে চলে গেছে। এর বড় অংশ বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তে। সীমান্তবর্তী নদীতে দুই দেশের সমান অধিকার থাকে। পদ্মা, মাতামুহুরীসহ এমন ৭টি সীমান্তবর্তী নদী আছে। আমরা আলোচনা করেছি, যৌথভাবে এসব নদী ড্রেজিং করব। আমরা এই নদী নিয়ে কাজ করছি। ফেনী নদীর পানি ভারতকে দেওয়া প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ভারতের রামগড়ের সাবরম এলাকায় খাবার পানির খুব অভাব। তারা আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে পানি তোলে। ভারতের সঙ্গে খাবার পানির চুক্তি হয়েছে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, পাহাড়টার নাম ভগবান টিলা। এটি বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তে অবস্থিত। আমরা যে পানি দিচ্ছি, তার পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। এটা নিয়ে কেন এত চিৎকার, আমি জানি না। কেউ যদি পানি পান করতে চায়, আমরা যদি তা না দিই, সেটা কেমন হবে?
বিএনপি নেতাদের কাছে প্রশ্ন রেখে শেখ হাসিনা বলেন, খালেদা জিয়া যখন ভারত গিয়েছিলেন, তখন কি তারা গঙ্গা চুক্তি করতে পেরেছিলেন? ফিরে আসার পরে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করল, খালেদা জিয়া বলেছিলেন যে, ভারতে গিয়ে গঙ্গার পানির কথা বলতে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। যে দল দেশের স্বার্থের কথা ভুলে যায়, তারা এত বড় কথা বলে কীভাবে?
এ-প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্থলসীমান্ত চুক্তি করলেন, তখন পত্রিকা পড়লে দেখবেন অনেকে বলেছে, দেশ বেঁচে দিল। কিন্তু তিনি আইন পাস করলেন। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর আমরা সীমানা নির্দিষ্ট করলাম। আমার প্রশ্ন, তারা (বিএনপি) কেন সীমানা নির্দিষ্ট করেনি? আমার স্বাধীন দেশ, আমার সীমানা নির্দিষ্ট থাকবে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে আমার প্রক্রিয়া শুরু করি। ভারতের সংসদে এ নিয়ে সর্বসম্মতভাবে আমাদের পক্ষে একটি আইন পাস হয়েছে। আমরা সীমানা নির্দিষ্ট করেছি। তারা তো ক্ষমতায় থাকতে ভোগবিলাস আর নিজেদের আখের গোছানো ছাড়া দেশের জন্য কিছুই করেনি।

চলমান শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত থাকবে
নিজের ঘর থেকে শুরু করে সন্ত্রাস-মাদক ও বিতর্কিত কর্মকা-ের বিরুদ্ধে চলমান শুদ্ধি অভিযানের কম্পন কতদিন স্থায়ী হবে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে। যেখানেই অনিয়ম হবে, সেখানেই ধরব। তবে এই অভিযান কতদূর পর্যন্ত যাবে, তা এখনই বলা যাবে না। অন্যায়-অবিচার ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে। যেখানে যেখানে সমস্যা আছে, সেখানে অভিযান চলবে। যারাই অন্যায় করবে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ অভিযান সম্পর্কে কৌতুক করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকের না-কি ক্যাসিনো খেলার অভ্যাস আছে। আমরা একটা দ্বীপে ব্যবস্থা করে দিতে পারি, সেখানে ক্যাসিনো খেলা হবে। ভাসানচরেও এটার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ একটি বিশাল সংগঠন। অনুপ্রবেশকারীদের ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে, এদের পরিহার করতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা গত ১০ বছরে দেশের যে পরিমাণ উন্নয়ন করেছি, তা আন্তর্জাতিভাবেও স্বীকৃত। কিন্তু বিএনপি সরকারের নীতিই ছিল ক্ষমতায় থেকে দুর্নীতি-লুটপাট, সন্ত্রাস, বিদেশে অর্থ পাচার এবং মানুষ খুন। গত ১০ বছর কোথায় ছিলেন, এখন কোথায় আছেন, দেশের বদলে যাওয়া সার্বিক প্রেক্ষাপট তুলনামূলক বিচার করার জন্য গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভারত থেকে আমরা পাইপলাইনে করে ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নিচ্ছি, যাতে আমদানি খরচ অনেক কমে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার নিজের মধ্যে একটা আত্মবিশ^াস আছে। যা করি দেশের মানুষের কল্যাণ ও দেশের স্বার্থেই করি। আমরা বাবা দেশকে স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। দেশের মানুষকে একটি ভালো জীবন দেবেন, এটাই ছিল জাতির পিতার স্বপ্ন। আমি তার সেই স্বপ্ন পূরণে কাজ করে যাচ্ছি। মনের তাগিদ থেকেই দেশের মানুষের কল্যাণে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি। তবে সমালোচকরা সমালোচনা করেই যাবে। আমরা কিন্তু অন্যায়কারীদের কোনো সতর্কবার্তা দেইনি; বরং সরাসরি অ্যাকশনে গেছি।

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৭ অক্টোবর ২০১৯

  • ৩ অক্টোবর ২০১৯

  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯