মানবিকতারও একটা সামর্থ্য প্রয়োজন

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:০৯

ফাহমিদা হক


রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনাগ্রহ আর তীব্র আপত্তির কারণে প্রত্যাবাসনের আরেকটি উদ্যোগও ব্যর্থ হলো। ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাদের মিয়ানমারে পাঠানো হচ্ছে না দেখে তারা আপাতত কিছুটা স্বস্তি পেলেও রোহিঙ্গা শিবিরের উৎকণ্ঠা বহুগুণে বেড়ে গেছে। যার কারণে উখিয়া টেকনাফের সব ক্যাম্পেই রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসনের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে। এসব শিবিরে ৫-দফা দাবি সম্বলিত ইংরেজিতে লেখা প্রচারপত্র বিলি করতেও দেখা গেছে। এদিকে গত ২৫ আগস্ট লক্ষাধিক রোহিঙ্গার এক বিরাট সমাবেশে শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সকল রোহিঙ্গাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান নেতারা। যেখানে তারা সমস্বরে বলেছেন কেবল তাদের দাবি মানা হলেই তারা নিজের দেশে ফিরে যাবে।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে ‘গণহত্যা অভিপ্রায়’ নিয়ে সামরিক অভিযান চালিয়ে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল মিয়ানমার, যারা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে এখন ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বসবাস, যা কি না ঐ অঞ্চলের স্থানীয় জনগণের চেয়ে অনেক বেশি।
১৯৮২ সালে সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে নাগরিকত্ব বাতিল করার পর যারা রাষ্ট্রহীন বলে বিবেচিত, গত ২২ আগস্টসহ পরপর দুবার তাদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও নাগরিকত্বসহ সার্বিক অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে কোনো রোহিঙ্গা যেতে রাজি হয়নি। ফলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্পাদিত প্রত্যাবাসন চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ^কে নাড়িয়ে দেওয়া রাখাইন রাজ্যের ভয়াবহ নিধনযজ্ঞের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গাদের ফেরাতে মিয়ানমার আন্তরিক নয়, তারা এটা নিয়ে কূটনীতি এবং রাজনৈতিক খেলা খেলছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সামনে রেখে কোনোরকম অবকাঠামো সংস্কার ছাড়া এটা লোক দেখানো প্রত্যাবাসনের কথাই বলেছিল। মিয়ানমার এখানে মূলত নাটক সাজিয়েছে, যারা এই গণহত্যা করেছে এবং তাড়িয়ে দিয়েছে, তারাই যখন ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলে, কোনোরকম কাঠামোগত পরিবর্তন বা আইন সংস্কার করে নাগরিকত্বের ফিরিয়ে দেওয়ার আশ^াস ছাড়াই, তখন পাগলেও বুঝবে এটা ফিরিয়ে নেওয়ার কথা নয়, কেবলই মিয়ানমারের কৌশল মাত্র।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে নিজেদের তহবিল থেকে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা শরণার্থীদের জন্য খরচ করেছে। এই পরিস্থিতিতে হতাশা প্রকাশ করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিবিসি বাংলা’কে বলেছেন, প্রথম দিকে বিভিন্ন সংস্থা সাহায্য নিয়ে যেভাবে অগ্রসর হয়েছিলেন, সে সাহায্যের মাত্রা দিন দিন কমে যাচ্ছে। আগামীতে আরও কমতে থাকবে এবং তখনই নানারকম সংকট দেখা দেবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করতে পারে যা আইনশৃঙ্খলার ওপর প্রভাব ফেলবে। আর বাংলাদেশ এদের আশ্রয় দিয়েছে; কিন্তু এত বিশাল জনগোষ্ঠীকে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের নির্ভরশীল জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রায় ৫ লাখ শিশুর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। শিক্ষা আর কাজের অভাবে শরণার্থী কিশোর তরুণদের নানা অপরাধমূলক কর্মকা- আর উগ্রবাদে জড়ানোর ঝুঁকিও রয়েছে।
জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হিসাবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৮৩২ জন শিশু বসবাস করছে। এদের মধ্যে ৬০ হাজারের জন্ম হয়েছে ক্যাম্পের মধ্যেই। ইউনিসেফের এক প্রতিবেদন বলছে, এদের মধ্যে ৩ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু প্রায় ৩ লাখ। ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত ৪ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়েছে। প্রায় ২৬ হাজার শিশুর কোনোরকম শিক্ষার সুযোগ হয়নি। অন্যদিকে ইউনিসেফ বলছে, ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশু, যাদের ৯৭ শতাংশেরই কোনোরকম শিক্ষাই নেই, তারা বিভিন্ন অপরাধ, শিশুশ্রম, মানবপাচার অথবা বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে রয়েছে।
সব কিছু বিবেচনায় বাংলাদেশের মতো একটা রাষ্ট্র যেখানে নিজেদের জনগণের পূর্ণ নিরাপত্তাসহ মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খায় সেখানে এই বিশাল অশিক্ষিত ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর বোঝা নিয়ে কতদূর চিন্তা করার ক্ষমতা রাখে? মানবিকতারও তো একটা সামর্থ্য আছে! কূটনৈতিক দেন-দরবারের কারণে প্রথমবারের মতো চীন এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়েছে। কিন্তু চীনকে সম্পৃক্ত করেও সাফল্যের কোনো লক্ষণ এখনও নেই। রোহিঙ্গাদের মনে নিরাপত্তা তৈরি করে ফিরিয়ে নেওয়ার মতো উল্লেখযোগ্য কিছু করেছে মিয়ানমার, তেমন কোনো ইঙ্গিত এখনও দেখা যায়নি। বাংলাদেশের বাইরে তৃতীয় দেশ হিসেবে চীনই রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু চীন এক্ষেত্রে কতটুকু করবে তাই ভাববার বিষয়। স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে চীন নিজেদের স্বার্থে মিয়ানমাররের ওপর নির্ভরশীল।
অর্থনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত নিরাপত্তাসহ নানা ইস্যুতে মিয়ানমার ও চীন একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তাদের মধ্যে সম্পর্কও যে খুব ঘনিষ্ঠ তার প্রমাণ, কিছুদিন আগেই মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করেছেন মিয়ানমারের সেনাপ্রধান, যেখানে চীনা রাষ্ট্রদূত জোর দিয়েই বলেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে যে কোনো আন্তর্জাতিক চাপ সামাল দিতে চীন সব সময় মিয়ানমারের পাশে থাকবে।
ভারত আর চীনের সম্পর্ক বৈরী হলেও মিয়ানমার প্রশ্নে এই দুই দেশ গত দু-তিন দশক ধরে একই নীতিমালা অনুসরণ করে যাচ্ছে। ভারত বাংলাদেশের মিত্র দেশ হওয়া সত্ত্বেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের হয়ে তেমন কিছুই করছে না বা করতে পারছে না। এতদিন পরে হলেও বাংলাদেশকেই বুঝতে হবে নিজেদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ভারত বা চীন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে এসে দাঁড়াবে না। এই চরম সত্যটা বাংলাদেশ যত দ্রুত অনুধাবন করতে পারবে ততই বাংলাদেশের মঙ্গল।
মিয়ানমারের কৌশল সম্পূর্ণ পরিষ্কার, বাহ্যিকভাবে আন্তর্জাতিক চাপের কাছে মাথা নত করা, তাড়িয়ে দেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য পুনর্বাসনের নামে অনেক কিছু পরিকল্পনার নাটক করা, বাংলাদেশের সাথে চুক্তি সমঝোতাগুলো মানাসহ নানারকম পরিকল্পনার কথা আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে সময় ক্ষেপণ করা। অন্যদিকে আচরণে ইঙ্গিত দিচ্ছে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার কিছু নেই। তারা ফিরে গিয়ে ওখানে নিরাপদ থাকবে না; আর রোহিঙ্গারা যদি স্পর্শকাতর কিছু করে স্বেচ্ছায় পুনর্বাসনে ফিরে যেতে অস্বীকার করে, তবে তাদের ব্যাপারে মিয়ানমার নিজেদের দায় দায়িত্ব থেকে রক্ষা পায়। অথচ ওই দায় দায়িত্ব তারা কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। বাংলাদেশের সামনে এখন একটাই করণীয়- বিষয়টির সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিকীকরণের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা নিপীতিত রোহিঙ্গাদের তাদের প্রাপ্য মর্যাদা এবং নিরাপত্তা দিয়ে নিজ বাসভূমে ফিরিয়ে নেয়। অন্যদিকে সহানুভূতির সঙ্গে রোহিঙ্গাদেরও এটা বুঝিয়ে দিতে হবে যে, বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে তাদের ভার বইতে পারবে না। আর সেটি করার চেষ্টা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বা বাংলাদেশ কারও জন্যই কল্যাণকর হবে না।

লেখক : পরিচালক, সিসিএন

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৭ অক্টোবর ২০১৯

  • ৩ অক্টোবর ২০১৯

  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯