বাংলাদেশ-ভারত পানি বণ্টন চুক্তি ও নদী ঘিরে গড়ে ওঠে নগর সভ্যতা

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০১৯, ১০:৫৩

অ্যাডভোকেট খোকন সাহা

 

হাজার বছর ধরে যে নদীকে ঘিরে নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছে। সেই নদীই আজ নির্দয় মানুষের দ্বারা নির্যাতিত এবং নিপীড়িত। ফলাফল বিশ্বজুড়ে পরিবেশ বিপর্যয়। যার প্রেক্ষিতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে উঠেছে। এই দাবির প্রতি দিন দিন জনমত প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। পরিবেশকে সুরক্ষার দায়িত্ব যেহেতু মানুষের। তাই প্রকৃতিবিনাশী পথ পরিহার করে মানুষকেই প্রকৃতির সকল প্রাকৃতিক অপরূপসমূহকে সংরক্ষণ করে পরিবেশকে স্বাভাবিক রাখতে হবে।
প্রথমেই নদীর স্বাভাবিকত্বকে অক্ষুন্ন রাখার বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের চরম দুর্ভাগ্য যে এই নদী রক্ষার ক্ষেত্রে মানুষই আজ নদীর পরম শত্রুতে পরিণত হয়েছে। নদীর পানি দূষিত হচ্ছে মানুষেরই ব্যবহৃত বর্জ্য।   নদীর তীর দখল করতে করতে দেশের বেশিরভাগ নদীকে সংকীর্ণ করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ঢাকার চারপাশের নদীসহ জেলা পর্যায়েও চলছে নদীর তীর দখলের অদম্য প্রতিযোগিতা। ফলে প্রকৃতির প্রাণ নদীগুলো তার স্বকীয়তা হারিয়ে আজ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। আর এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে প্রকৃতির ওপর। ফলে প্রকৃতিও স্বাভাবিক আচরণ হারিয়ে জনদুর্ভোগের সীমাকে ক্রমে অতিক্রম করেছে। এর বিরুদ্ধে জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার কঠোর অবস্থান নিয়ে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা সত্ত্বেও এক শ্রেণির ভূমিদস্যু- সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে নানা ফন্দি-ফিকিরের মধ্য দিয়ে নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে নানা ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করে জেঁকে বসেছে। নদী দখলের এই প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে সম্প্রতি চলছে উচ্ছেদ অভিযান। এ অভিযানের প্রেক্ষিতে দেশের মানুষ অত্যন্ত খুশি। পরিবেশ রক্ষার সরকারি এ উদ্যোগকে জনগণ সাধুবাদ জানিয়ে এই উচ্ছেদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কতিপয় দুর্বৃত্তের কারণে পরিবেশের এ বিনাশী পথকে আজ প্রতিরোধ করে দেশবাসীকে আরও সজাগ ও সতর্ক হতে হবে। প্রকৃতির ওপর মানুষের এই অনাচার প্রকৃতি কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারছে না। ফলে অনাবৃষ্টি, তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে এক অসহনীয় পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে। নদী দখল, খাল দখল, জলাশয় ভরাট, গাছ কেটে উজাড় করে দিয়ে প্রকৃতিকে যে বিরূপ অবস্থার দিকে মানুষ ঠেলে দিয়েছে। প্রকৃতিও প্রতিশোধ স্পৃহায় এর প্রতিদান হিসেবে দিয়েছে পরিবেশের অসহনীয় ভারসাম্যহীনতা। সরকার, আদালত, পরিবেশবাদীসহ সচেতন নাগরিকের এখন একটাই দাবি। আর তা হলো প্রকৃতির অসীম সৌন্দর্য সংরক্ষণে করণীয় সকল পদক্ষেপ কঠোরভাবে গ্রহণ করা। সম্প্রতি মাননীয় হাইকোর্ট এক আদেশে বলেছেন যে, রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত যদি এমন কেউ নদী দখল করে- তাহলে তাদের কাউকেই যেন মনোনয়ন প্রদান না করা হয়। সকল মহলের এখন একটাই দাবি- পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপের পাশে এসে দাঁড়ানো।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের নদীর উৎস হলো উজানের দেশ ভারত। ভারত বাংলাদেশের উজানে অসংখ্য বাঁধ নির্মাণ করে শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে দেওয়ার ফলে দেশের প্রায় অর্ধেক নদী আজ শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। আবার বর্ষা মৌসুমে ভারতের নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধির ফলে সেদেশে বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হলে বাঁধের গেট খুলে দিয়ে বাংলাদেশের নদীর দিকে পানি ছেড়ে দেয়। প্রতিবছর উজানের পানিতে বাংলাদেশের বেশ কিছু জেলা বন্যা আক্রান্ত হয়ে মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ন্যায্য পানির হিস্যা থেকে দীর্ঘদিন বাংলাদেশ ছিল বঞ্চিত। স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গবন্ধুর সরকার পরবর্তী তথা ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকা-ের পর তৎকালীন সামরিক শাসিত সরকার থেকে ১৯৯৬ পূর্ববর্তী সরকারগুলো ভারত-বিরোধী রাজনীতিকে এদের রাজনৈতিক মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারে অবিচল থেকে অবৈধ সরকার পরিচালনার লোভে, ভারতের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক সৃষ্টির ফলে ভারতের নদীসহ সব ধরনের ন্যায্য দাবি আদায়ের সৎ সাহসটুকু ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। যার বিনিময়ে বছরের পর বছর বাংলাদেশের পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, মহানন্দাসহ উত্তরবঙ্গের অনেক নদী উজান থেকে আসা পানির হিস্যা থেকে বঞ্চিতই শুধু হয়নি। উল্লিখিত নদীগুলোকে ক্রমাগত পানি শূন্য খাঁখাঁ প্রান্তরে রূপান্তরে প্রচ্ছন্নভাবে ভূমিকা রেখেছে তৎকালীন অবৈধ সরকারগুলো। যা বলা চলে এক ধরনের অপরাধ। এ অপরাধ করেও তৎকালীন সরকারগুলো রাজনীতিতে টিকে থাকার প্রত্যাশায় ভারত-বিরোধী জিকির তুলে মাঠে-ময়দানে মাইকের সামনে অনবরত বক্তৃতা দিয়ে গেছে। ফলে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে ভারত অসম্ভব ঝুঁকি নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল, সেই ভারতই বাংলাদেশের দিক থেকে দীর্ঘদিন মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল। পাকিস্থানপন্থি সেসব সরকার পরিচালনায় ছেদ পড়ে ১৯৯৬ সালের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু তনয়া দেশরতœ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘ ২১ বছর পর রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফিরে আসার পর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবেশী সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। এরই মধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম বন্ধু-রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রটিকে স্বাভাবিক ও সুন্দর করার লক্ষ্যে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যার মধ্যে অন্যতম হলো- ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থেকে ভারতের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও হিংসাত্মক কার্যক্রম পরিচালনা করতে না দেওয়া। যা বিগত সরকারগুলোর প্রশ্রয়ে তারা করে আসছিল। ভারতও ধীরে ধীরে অভিমান ভুলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের দিকে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে। সেই সহযোগিতার অন্যতম হলো নদীমাতৃক, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের নদীর ন্যায্য হিস্যা প্রদান। স্মরণযোগ্য যে ১৯৯৬-এর পর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ-ভারত ন্যায্য পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদন করে। দুদেশের এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সম্পর্কের বরফও গলতে শুরু করে, যা এত বছর জমাট বাঁধিয়ে রেখেছিল অতীতের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী সরকারগুলো। সেই থেকে ক্রমে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের মনোভাব পাল্টে যেতে থাকে। যদিও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ভোট জালিয়াতির মাধ্যমে ২০০১ সালে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বিষবাষ্পকে ছড়িয়ে দিয়েছিল। অতঃপর ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের সোপানে দাঁড়িয়ে সফল রাষ্ট্রনায়ক জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার দুদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে বর্তমানে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যান- যা আজ এক গবেষণার বিষয়। বর্তমানে দুদেশের সরকার এবং জনগণের কল্যাণের প্রতি শতভাগ দায়বদ্ধ।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের নদীগুলোকে প্রাণ ফিরে পেতে ভারতের কাছে উজানে বাঁধ দিয়ে পানি আটকানোর পথ পরিহারের যৌক্তিক দাবি উপস্থাপন করেছে। ভারত সরকারও তা মেনে নিয়ে অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি তিস্তা নদীর সম পানি বণ্টন চুক্তির প্রক্রিয়াতে এসে উপনীত হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এ চুক্তিও দুদেশের চাহিদা অক্ষুণœ রেখে সম্পাদনের পথে কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
নদী দখলমুক্ত, নদীর প্রাণ ফিরে পাওয়া, প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণের প্রকাশ ঘটিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয়। এ দাবিকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। সবাইকে মনে রাখতে হবে- প্রকৃতির সঙ্গে বিরোধের ফলে আখেরে প্রকৃতির সন্তানদেরই বিরূপ আচরণের ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে। তাই প্রকৃতির স্বাভাবিক অবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া থেকে এখনই, এ মুহূর্ত থেকে সরে আসতে হবে। লোভ-লালসার বশবর্তী হয়ে নদী দখল, বৃক্ষ নিধন, খাল-বিল দখলের দুর্বৃত্তায়নের মনোভাব পরিহার করে প্রকৃতির সু-সন্তান হিসেবে পরিচয় তুলে ধরতে হবে। কেননা নদীই হলো একটি সভ্য জাতি গঠনের প্রধান সহায়ক শক্তি। যুগে যুগে দেশে দেশে নদীকে ঘিরেই আধুনিক সভ্যতা গড়ে উঠেছে। এ ইতিহাস ভুলে গেলে ক্ষতি নদীর নয়, ক্ষতি হবে গড়ে ওঠা নগর সভ্যতার। ফলে নদী খেকোদের গ্রাস থেকে নদীর স্বাভাবিক জীবনধারা পুনরুদ্ধারের সার্বিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এর ব্যত্যয় কোনোভাবেই আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করবে না।

লেখক : আইনজীবী; সাধারণ সম্পাদক, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগ

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

 

পুরনো সংখ্যা
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ আগস্ট ২০১৯

  • ০৮ আগস্ট ২০১৯