শোকের আগস্ট শপথের আগস্ট

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৭, ১৬:২৬

অনলাইন ডেস্ক

“হে মহান, মহাবীর/ গর্ব তুমি বাঙালি জাতির/ তুমিই তো জাতির পিতা/ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।/ তুমি রবে ততদিন/ বাঙালি জাতির হৃদয়ে/ যতদিন তোমার অর্জিত বাংলার পতাকার/ সেই লাল রক্তিম সূর্য উদ্দীপ্ত হবে/ বাংলার পূর্ব আকাশে।” “শেষ হোক তাদের বেঁচে থাকার দিন/ যারা অবেলায় জাতিকে করেছে পিতৃহীন।” বাঙালির জীবনে আগস্ট মানেই শোকের মাস, বেদনার মাস। বেদনার এ মাসে প্রত্যয় ও শপথে শোককে শক্তিতে পরিণত করার অভয়মন্ত্রে আবার উদ্দীপিত হবে বাঙালি জাতি। শিরা, উপশিরা ও ধমনীতে আরও একবার জাগ্রত হবে পিতৃ হন্তারকদের প্রতি একরাশ ঘৃণা। বছর ঘুরে আবার এসেছে শোকের আগস্ট। আসছে ১৫ আগস্ট জাতির পিতার প্রয়াণ দিবস। এই দিন রাষ্ট্রীয় শোক দিবস। মাতৃভূমির স্বাধীনতা এবং এই দেশবাসীকে শোষণ-নিপীড়ন থেকে মুক্তি দিতে যিনি জীবন দিলেন, তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রের সবাই শোকাহত হওয়ার কথা- এই চিন্তা থেকেই দিনটিকে রাষ্ট্রীয় শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ‘বাংলা বিচিত্রা’র প্রতিবেদন।

দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনে জেল-জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন আর স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু ছিল বঙ্গবন্ধুর নিত্যসঙ্গী। তিনি নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন বহুবার। একাধিকবার ফাঁসির মঞ্চ তৈরি হয়েছিল তার জন্য। বাঙালির প্রতি তার বিশ্বাস ও আস্থা ছিল আকাশচুম্বী। সে জন্যই হাসিমুখে, নির্ভীকচিত্তে মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সব ধরনের জুলুম-নির্যাতন বরণ করেছেন তিনি। আমৃত্যু একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিবাদী ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর বিপথগামী একদল ঘাতকের হাতে তার নৃশংস হত্যাকা- ছিল জাতির ইতিহাসে এক বড় কলঙ্ক। দেশের স্থপতি ও নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে তার পরিবারের সদস্যসহ এমন ভয়াবহভাবে হত্যার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে দেশ ও জাতিকে বিপথগামী করার অপপ্রয়াস চালানো হয় পরবর্তীকালে। হত্যাকারীদের বিচার থেকে রেহাই দিয়ে জারি করা হয় কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ। সেই অধ্যাদেশ বাতিলের পর দেরিতে হলেও বিচার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কয়েকজনের মৃত্যুদ- কার্যকর হয়েছে। অন্যরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন দেশে। পলাতক খুনিদের দেশে এনে তাদের শাস্তি কার্যকর করা সরকারের দায়িত্ব।
একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে বছরের পর বছর এ নৃশংস হত্যাকা-ের বিচারের পথ রুদ্ধ থাকা ছিল আইনের শাসনের পরিপন্থী। এর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর অবদান মুছে ফেলার প্রক্রিয়াও নানাভাবে চালানো হয়েছে। ইতিহাসে যার স্থান সুনির্দিষ্ট ও স্বীয় মহিমায় সমুজ্জ্বল- তাকে অস্বীকারের মূঢ়তা বিভিন্ন সরকারের আমলে কম দেখানো হয়নি। অবদান ও গুরুত্বের দিক থেকে তুল্য নন, এমন একাধিক নেতাকে বঙ্গবন্ধুর সমান্তরালে তুলে এনে তাকে খাটো করার অপচেষ্টাও চালানো হয়েছে। স্বল্পকালীন সুবিধা হাসিল করা গেলেও চূড়ান্ত বিচারে তা সফল হয়নি।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানকে একটি কলোনি হিসেবে বিবেচনা করত পাকিস্তানি শাসকরা। সেই থেকে এ দেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার, নির্যাতনের বিরুদ্ধে যে সাহসী মহামানব দীর্ঘদিন সংগ্রাম করে এসেছেন, যৌবনের একটা দীর্ঘ সময় জেলে কাটিয়েছেন, তার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষুকে ভয় পাননি। অধিকার আদায়ে প্রতিটি সংগ্রামে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করেছেন, সফল হয়েছেন। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ এই বাংলাদেশের গোপালগঞ্জস্থ অজপাড়াগাঁ টুঙ্গিপাড়ায় যেদিন শেখ মৌলভী লুৎফর রহমানের ঘর ও বেগম সাহেরা খাতুনের কোল আলো করে যে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হয়েছিল সেদিন কেউ কি জানতো যে এই শিশুই বাংলার ভাগ্যাহত দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মুক্তির দূতরূপেই আবির্ভূত হবেন একদিন। ব্রিটিশ যুগে শৃঙ্খলিত বা পরাধীন বাংলার অন্ধকারাছন্ন সমাজে জন্মগ্রহণ করেও পরবর্তীকালে এতদঞ্চলের বাঙালিদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির দিশারীরূপে শেখ মুজিবুর রহমানের অভ্যুদয় ঘটেছিল জনগণের হয়ে অকুতোভয় আপসহীনভাবে ও দৃঢ় প্রত্যয়ে লড়াই সংগ্রাম করে যাওয়ার কারণে। বঙ্গবন্ধুর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় গ্রামের বিদ্যালয়ে। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা, দৃঢ় মনোবলসম্পন্ন এক দীর্ঘাঙ্গী মানুষ। ছাত্রাবস্থায় তার নেতৃত্বের গুণাবলী প্রকাশিত হতে থাকে। শৈশব, কৈশোরেই তিনি ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তৎকালীন ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে যোগদানের কারণে বঙ্গবন্ধু প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন। এরপর থেকে শুরু হয় তার বিপ্লবের জীবন। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর তিনি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। তার শৈশব-বাল্য-কৈশোর-প্রথম যৌবনের লালন গ্রামীণ পরিম-লের ওই গোপালগঞ্জে। কৃষির আর নদীর বাংলায় ভিত তৈরি হয়েছিল শেখ মুজিবের। পরবর্তীকালে জীবনের অধিকাংশ সময়ই তো কাটালেন মেট্রোপলিটন সিটি কলকাতায়, ঢাকায়। ১৯৪২-এ, ভর্তি হলেন ইসলামিয়া কলেজে, জড়িয়ে পড়লেন প্রত্যক্ষ রাজনীতির আন্দোলনের সঙ্গে। তার জন্য সেটিই যেন স্বাভাবিক, অনিবার্য ছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দুই বছর আগে সুভাষ বসুর নেতৃত্বে যে হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলন এবং সেই সময়ে ‘সিরাজ দিবস’ উদযাপনের সূত্রপাত, ওইসব কর্মকা-ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, ইসলামিয়া কলেজ থেকে মুসলমান ছাত্ররা অংশ নিয়েছিল। কলকাতার রাজপথে-ময়দানে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে মুসলমান ছাত্রদের সেই প্রথম শামিল হওয়া। পুলিশের লাঠিচার্জে ছাত্রনেতা আবদুল ওয়াসেকসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছিলেন। ঘরোয়া কথাবার্তায় স্মৃতিচারণা করছিলেন শেখ মুজিব। জানিয়েছিলেন, তাদের ইসলামিয়ার ছাত্রদের মধ্যে, বেকার হোস্টেলে কারমাইকেল হোস্টেলে ছেলেদের মধ্যে সেই তাপটা তখনও ছিল। পরে এসে তিনিও খানিক আঁচ পেয়েছিলেন। এর পরপর ’৪২-এর আগস্ট আন্দোলন, যে বছর থেকে কলকাতায় মুজিবের ছাত্রজীবন। দেশজুড়ে তখন গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল তরঙ্গ- ‘কুইট ইন্ডিয়া’, ‘ইংরাজ হটাও’ তুঙ্গে। এদিকে ১৯৪৪ সাল নাগাদ মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলন ক্রমে দানা বাঁধছে, ছড়িয়ে পড়ছে নানা জায়গায়। মুসলমান ছাত্ররা জড়ো হচ্ছে অঙ্গসংগঠন মুসলিম ছাত্রলীগে। মূলকেন্দ্র কলকাতার ওই ইসলামিয়া কলেজ। মুসলিম লীগের রাজনীতিতে তখন দুটি ধারা- খানিকটা বামঘেঁষা এরা- নুরুদ্দিন আহমেদ, মোয়াজ্জেম চৌধুরী, জহিরুদ্দিন আহমেদ, নুরুল আলম প্রমুখ। এখন থেকে পরিবারভুক্ত হলেন আরেক সহযোগী শেখ মুজিবুর রহমান।
বাঙালির প্রতিবাদী আন্দোলনের সঙ্গে তরুণ শেখ মুজিব শুরু থেকেই নিজেকে যুক্ত করেছেন। তিল তিল করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। ১৯০৬-এ মুসলিম লীগ সৃষ্টির সঙ্গে ১৯৪৯-এ আওয়ামী মুসলিম লীগ জন্মের মনস্তাত্ত্বিক কারণ অনেকটা অভিন্ন। মুসলিম লীগ জন্মের অনেক আগেই ব্রিটিশ ভারতের হিন্দু-মুসলমানের একমাত্র অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন ছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। কিন্তু ১৯০৩ সালে সরকারের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার কথা ঘোষিত হলে কংগ্রেসের প্রভাবশালী হিন্দু নেতারা এর বিরোধিতা করেন। ফলে মুসলমান নেতারা প্রথম হোঁচট খান। স্পষ্ট ছিল বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পিছিয়ে পড়া পূর্ববাংলার প্রভূত উন্নতি হবে। এ সময়ে ইংরেজদের তাঁবেদার ঢাকার নবাবরা বঙ্গভঙ্গের ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু ১৯০৫-এ সরকার কর্তৃক বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে কংগ্রেস, হিন্দু প্রেস এবং শিক্ষিত ধনিক হিন্দু প্রবল বিরোধিতায় মাঠে নামলে অনেক মুসলমান নেতার মধ্যে বিশ্বাস জন্মে কংগ্রেসের এখন আর অসাম্প্রদায়িক চরিত্র নেই। তাই মুসলমানের অধিকার সংরক্ষণে নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন চাই। আর এভাবেই ঢাকায় জন্ম নেয় মুসলিম লীগ। পাকিস্তান নামের রাষ্ট্র জন্মের পরপরই ভাষার প্রশ্নে দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালির অধিকার সংরক্ষণের প্রশ্ন আওয়ামী মুসলিম লীগ জন্মের নিয়ামক ছিল। তরুণ শেখ মুজিব কিন্তু এর আগেই নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন রাজনীতির সঙ্গে। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। পরের বছর আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি নিজ যোগ্যতায় এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সম্পাদকের পদ লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামের দলটি অসাম্প্রদায়িক ঘোষণা করে দলের নতুন নামকরণ করে আওয়ামী লীগ। ততক্ষণে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক পরিপক্বতা একটি বিশেষ মানে পৌঁছে গেছে। আর এর স্বীকৃতি হিসেবে দেখা যায় তিনি ১৯৫৩ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিব এ দেশবাসীর কাছে রাজাধিরাজ হয়ে ওঠেন সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে বিজয়লাভের মধ্য দিয়ে। জাতীয় পরিষদে এই প্রদেশের জন্য নির্দিষ্ট ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিই লাভ করে তার দল আওয়ামী লীগ। এ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় একাত্তরের মার্চে নজিরবিহীন অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসমুদ্রে ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এ ভাষণে সেদিন স্বাধীনতার ডাক দিয়ে ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের দিক-নির্দেশনা দেন তিনি।
বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ, ১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলে পূর্ববাংলায় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ১৬, ১৭, ১৮ মার্চে মুজিব ইয়াহিয়া আলোচনা কোনো আশাপ্রদ ফল দিতে না পারায় বাংলার স্বাধীনতা নিশ্চিত জেনে ইয়াহিয়া-ভুট্টোর শলাপরামর্শের পর বাঙালির অস্তিত্বকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্য ২৫ মার্চ রাতের আঁধারে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তান বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু নিশ্চিত বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি গ্রেফতার হচ্ছেন। তাই গ্রেফতারের পূর্ব মুহূর্তে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জনগণের কাছে ওয়ারলেসের মাধ্যমে পৌঁছে দিলেন। তিনি বাংলার নিপীড়িত-শোষিত গরিব মানুষের মাঝে আর জীবিত ফিরে নাও আসতে পারেন, সে কথা সব সময় তার মনে জাগরুক ছিল। মৃত্যু তাকে পিছু পিছু তাড়া করলেও বাংলার মানুষকে শকুনের থাবায় রেখে তিনি পালিয়ে বাঁচতে চাননি। তাই পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে বন্দী হয়ে আদমজী স্কুলে থাকাবস্থায় পালানোর কোনো চেষ্টা করেননি। বরং তিনি ভেবেছিলেন তার জীবনের বিনিময়ে যদি বাঙালির মুক্তি অর্জিত হয় তাহলে হাসিমুখে মৃত্যুর সঙ্গে আলিঙ্গন করে তার জীবন ধন্য হবে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতেই বঙ্গবন্ধুকে পশ্চিম পাকিস্তানে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই রাতে পাকিস্তানের হিংস্র বাহিনী বাংলার মানুষের ওপর যে তা-ব চালিয়ে ছিল, তা পৃথিবীর যে কোনো সভ্যতাকে লজ্জায় ডুবায়। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় ভারতের আগরতলায় ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে। মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলাকে মুজিবনগর নামকরণ করে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের আত্মপ্রকাশ ঘটে। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর অবর্তমানে উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধারা বঙ্গবন্ধুর সাহস, উৎসাহ, উদ্দীপনায় উদ্দীপ্ত হয়ে নিজেদের জীবনের বিনিময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জলে, স্থলে গেরিলা ও সম্মুখযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে মাসের পর মাস যুদ্ধ করতে থাকে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে সর্বক্ষেত্রে মার খেয়ে একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে ভারতও তার যথোপযুক্ত জবাব দেয়। বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ আক্রমণে পশ্চিম পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর মেরুদ- ভেঙে পড়ে। ফলে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পশ্চিম পাকিস্তান বাহিনীর যৌথবাহিনীর অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল শোষণহীন রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলা। রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্মের অপব্যবহার ও সমাজে ধর্মের নামে হানাহানির ঘটনা দেখেছিলেন তিনি। ভারতবর্ষের দাঙ্গার অভিজ্ঞতা তার ছিল। পাকিস্তানি শাসনামলে ধর্মকে সামনে রেখেই পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালিকে শাসন ও শোষণ করেছে। এজন্য সব ধর্মকে শ্রদ্ধা করলেও বঙ্গবন্ধু ধর্মান্ধতাকে ঘৃণা করতেন। ধর্মকে মেনে নিয়ে উদারনৈতিক চিন্তাধারায় অভ্যস্ত হয়েছিলেন তিনি। সব ধর্মের সহাবস্থান এবং বদ্ধ চিন্তার মুক্তিতেই ধর্মনিরপেক্ষতা পূর্ণতা পায়। সারা ভারতজুড়ে ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় তার ভূমিকার কথা আছে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ৬৩ থেকে ৭৫ পৃষ্ঠায়। প্রথাবদ্ধ, ধর্ম-শাসিত সংস্কারাছন্ন জীবন তিনি পছন্দ করেননি। অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়ার জন্য ধর্মের গ-ি ভেঙে প্রগতির পথে অগ্রসর হওয়ার পক্ষে ছিল তার নীতি-আদর্শ। বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত রূপটিকে ধরতে চেয়েছেন তিনি তার রাষ্ট্র পরিকল্পনায়, সংবিধান প্রণয়নে। আর এখানেই বঙ্গবন্ধু চিরস্মরণীয় একটি নাম। তিনি লিখেছেন, ‘আমি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য অনেক জায়গায় ঘুরেছি।’ বঙ্গবন্ধু ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১-দফা থেকে শুরু করে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পূর্বদিন পর্যন্ত দেশের গণমানুষের উন্নয়নের কথা বলেছেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে ছিল তার রাষ্ট্রনীতি। তিনি সবসময় শোষিতের মুক্তি কামনা করেছেন। আজীবন সংগ্রামে যেমন তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি, তেমনি স্বাধীন দেশের সমাজকে সব অপশক্তির কবল থেকে মুক্ত করার জন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিল তার বলিষ্ঠ ভূমিকা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাজার বছরের বাঙালির লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের অগ্রপথিক এবং তিনি গঠনে সহায়তা করেছিলেন বাঙালিদের জন্য একটি স্বাধীন ভূ-খ-, যার নাম ‘বাংলাদেশ’। এ জন্য আমরা গর্বিত আমাদের আগামী প্রজন্মও হবে গর্বিত। বঙ্গবন্ধু, বাঙালি এবং বাংলাদেশ বেঁচে থাকবে সে জন্যে। আর এ অমরত্বকে আমরা কেবল কবির ভাষাতেই যথার্থ বলে বোধ করতে পারি। ‘যতদিন রবে পদ্মা, মেঘনা, গৌরি যমুনা বহমান ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’
ঘাতকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে মহৎ ও সরলপ্রাণ ব্যক্তিদের উদারচিত্ততার সুযোগটিই গ্রহণ করে থাকে। ঘাতকরা ১৯৪৮ সালে ভারতের মহাত্মা মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধীকে প্রার্থনাসভায় প্রবেশকালে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার নিরাপত্তা দিতে চাইলেও মহৎপ্রাণ গান্ধীজী তা গ্রহণ করেননি। আমেরিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা মার্টিন লুথার কিংকে ১৯৬৮ সালের ৩ এপ্রিল দুর্বৃত্তরা হত্যার হুমকি দেয়। কিংয়ের সহকর্মীরা তাকে অন্যত্র চলে যেতে পরামর্শ দেন। কিন্তু নির্ভীক লুথার কিং কিছুতেই সেখান থেকে গেলেন না। বরং সবাইকে হিংসা ত্যাগ করার অনুরোধ জানালেন। পরদিনই আততায়ীর বন্দুকের গুলিতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ১২ জানুয়ারি, ১৯৭২ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। পরদিনই সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত হয়, রমনা গ্রিনের যে প্রেসিডেন্ট হাউসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়া খান আলোচনা চালিয়েছিলেন, সেই ভবনটিকেই প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে রূপান্তরিত করা হবে। কিন্তু কালবিলম্ব না করে উদারচিত্ত ও সরলপ্রাণ বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি সরকারি ভবনে বাস করবেন না, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের নিজ বাড়িতেই থাকবেন। এ দেশে কেউ তাকে খুন করতে পারে এমন দুর্ভাবনা বঙ্গবন্ধুর মাথায়ই ছিল না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ইতিহাসের বাঁকঘোরানো এক সিংহপুরুষ। জীবনের বিনিময়ে তিনি সেই জাতির জন্যই রচনা করেন ইতিহাসের এক অমোঘ অধ্যায়। পৃথিবীতে কোনো জাতিই মাত্র ৯ মাসে স্বাধীনতা লাভ করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর এক তেজোদ্বীপ্ত ভাষণেই উদ্বুদ্ধ গোটা জাতি সেই বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনেন। তিনি না হলে আর কত বছর পরে কে স্বাধীনতা আনতো তা কেউই বলতে পারে না। বঙ্গবন্ধু ছিলেন স্বভাব নেতা। কি বাল্যে কি কৈশোরে কি মত্ত যৌবনে সবখানেই ছিলেন তিনি এক কালজয়ী মহাপুরুষ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যার জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না, আরও শত শত বছর বাঙালি জাতিকে পরাধীনতার শিকল পরে মৃত্যুর যন্ত্রণায় দিন কাটাতে হতো। কেবল স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ নয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনেও তার অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে বাঙালি জাতির ইতিহাসে কলঙ্ক লেপণ করেছিল সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী উচ্ছৃঙ্খল সদস্য। ঘাতকের নির্মম বুলেটে সেদিন ধানম-ির ৩২ নম্বর সড়কের ঐতিহাসিক ভবনে শাহাদাতবরণ করেছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
ওইদিন নৃশংস হত্যাকা-ের শিকার হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও তাদের পতœী যথাক্রমে সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল এবং বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র শেখ রাসেল ও বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসেরসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের আরও ২৮ সদস্য। একই দিন ঘাতকের নির্মম বুলেটে প্রাণ হারান বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নীপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, শহীদ সেরনিয়াবাত, শিশু সুকান্ত বাবু, আরিফ, রিন্টু প্রমুখ। ঘাতকরা সেদিন বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িতে আক্রমণ করে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সব সদস্যকেই হত্যা করে।
ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। কিন্তু বাঙালি জাতির হৃদয়ের আসন থেকে সরাতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু যে সেখানে অমর, অক্ষয়, অবিনশ্বর। শত অপচেষ্টা করেও বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠা থেকে কি তাকে আলাদা করা গেছে? ছড়ায় বঙ্গবন্ধু, কবিতায় বঙ্গবন্ধু, গানে বঙ্গবন্ধু। শিল্প, কাব্য, সাহিত্য, পালাগান কোথায় নেই বঙ্গবন্ধু? বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ ও বাঙালি যতদিন থাকবে, বঙ্গবন্ধুও ততদিন বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন স্বমহিমায়।

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ২৭ আগস্ট ২০১৭

  • ১৩ আগস্ট ২০১৭

  • ০৬ আগস্ট ২০১৭

  • ৩০ জুলাই ২০১৭