বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ও শেখ হাসিনার অঙ্গীকার

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০১৯, ১২:১২

এস এ মালেক

 

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অধিকারী বলে দাবিদার প্রত্যেকেই জোরগলায় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের বাস্তবায়নের কথা বলেন। তবে, বিভিন্নজনের বলার ভাবভঙ্গি বিভিন্ন। যে ৪টি মৌলিক চিন্তাধারার ওপর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত, তা হলো- গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। এই ৪টি মূলনীতির প্রশ্নে বিভিন্নজনের নানারকমের ব্যাখ্যা রয়েছে। সেই পাকিস্তানের আমল থেকে এদেশের ধনিক-বনিক ও শাসকশ্রেণি এমন গণতন্ত্রে বিশ^াস করেন, যা শুধু সমাজের উঁচুশ্রেণির স্বার্থে সংরক্ষণ করে। এরাই বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন সরকার ও দলের পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তানের ২৩ পরিবার থেকে এখন কম হলেও ২৩ হাজার কোটিপতির জন্ম দিয়েছেন। এদের অনেকেই যুদ্ধে সমর্থন জুগিয়েছেন। এদের স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি পুঁজিপতিদের হটিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের পুঁজিপতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এবং তার পূর্বাপার সকল সময়ে এরা শ্রেণিস্বার্থে কাজ করেছেন। এরপর ধরুন গণতন্ত্রের কথা। পাকিস্তানের গণতন্ত্র ছিল স্বৈরশাসক সমর্থক গণতন্ত্র। মিলিটারি এবং বড় বড় আমলারাই পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে ঐ স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৩ বছর লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়েছে এবং বঙ্গবন্ধুর নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের ফলে বাঙালি একজন এক ভোটের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধু ও তার দল আওয়ামী লীগকে প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রশাসনের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। ঐতিহাসিক ৬-দফাভিত্তিক যে গণ-আন্দোলনের ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু ’৭০-এর নির্বাচনে বাংলাদেশে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন পেয়ে পূর্ব বাংলার জনগণের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হন। পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসনের দাবি ৬-দফার তার কতটা পাকিস্তান রক্ষার জন্য করা হয়েছিল, তা নিয়ে নিশ্চয়ই সন্দেহ আছে। বাংলার মানুষের অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু প্রমাণ করলেন, বাঙালিরা তার নেতৃত্বে সরকার পরিচালনা করতে চায়। পাকিস্তান তাতে রাজি না হওয়ায় এবং বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করায় বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে হয়। সুতরাং, গণতন্ত্র ও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাসে চিরঞ্জীব করে রাখবে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ’৭২-এ সংবিধান প্রণয়ন ও ’৭৩-এ নির্বাচনে বিজয়লাভ করে বঙ্গবন্ধুই প্রথম সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সেই গণতন্ত্রকে স্বৈরশাসন গণতন্ত্রে রূপান্তর করা হয়। দুজন সামরিক শাসক পরপর ১৫ বছর দেশ শাসন করে দল গঠন করে তারা দলীয় গণতন্ত্রের জন্ম দেয়। আসলে স্বৈরশাসক সমর্থিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় দেশশাসন করেছিল জিয়া। এরশাদের কর্তৃত্বে সেই গণতন্ত্র আরও স্বৈরতন্ত্র জন্ম দেয়। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু যে গণতন্ত্রে প্রত্যাশী ছিলেন তা পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের কারণেই সমর্থক ছিলেন না। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, বিশ^ আজ দুই ভাগে বিভক্ত : শোষক আর শোষিত। তিনি শোষিতের পক্ষে ছিলেন। পাকিস্তানের ২৩ বছরের কুশাসনের ফলে বাংলাদেশের জনগণ সত্যিকার অর্থে একটি শোষিত-বঞ্চিত শ্রেণিতে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর লক্ষ ছিল কৃষক, শ্রমিকশ্রেণির পূর্ণাঙ্গ মুক্তি। এ-কারণেই তাকে একটা পর্যায়ে দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি গ্রহণ করতে হয়। সুতরাং, বঙ্গবন্ধু ও তার দল আওয়ামী লীগের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ ছিল গরিব-দুঃখী-মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ। এদেশে সরকারি দলসহ অনেক দলের অনেক নেতা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী। কিন্তু সেই গণতন্ত্রের ধরন ও প্রকৃতি কি তারা কখনও তা সাধারণ মানুষকে বুঝিয়ে বলেন না। তাই ড. কামাল হোসেনের সংজ্ঞা ও বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক ও মেহনতির মানুষের সংজ্ঞা এক নয়। যে গণতন্ত্র মানুষের রুটি-রুজি ও সংকট নিরসন করতে পারে না, সেই ধরনের গণতন্ত্র বঙ্গবন্ধুর দর্শন হতে পারে না। গণতন্ত্রের সঠিক সংজ্ঞা দিতে হবে।

ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের রাষ্ট্রের অতি অত্যাবশ্যকীয় আর একটা নীতি। ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই এই নীতিকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে নেওয়া হয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশের লোকেরা একইভাবে জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ^াসী; তাই ধর্ম-বর্ণ-গোত্র ভেদে তাদের মধ্যে কোনো বিভিন্নতা থাকা উচিত নয়। যেহেতু রাষ্ট্র সকলের ও ধর্ম সম্প্রদায়গত বা ব্যক্তিগত, তাই কোনো ধর্মের বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা করা রাষ্ট্রের সমীচীন নয়। রাষ্ট্র ধর্মের ব্যাপারে এবং ধর্ম রাষ্ট্রের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকা বাঞ্চনীয়। এটা সমাজ ও সংস্কৃতির দাবি। বাঙালি সমাজ তাই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে দূষিত হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। আমাদের জাতীয়তাবাদের চেতনায় সাম্প্রদায়িকতার কোনো সুযোগ নেই। ধর্মনিরপেক্ষতার সুযোগ নিয়ে জনগণকে ভুল বুঝানো অমার্জনীয় অপরাধ।

বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা এ-অঞ্চলে এদেশে সহস্র বছর ধরে বিকশিত হয়ে আসছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব এই জাতীয়তাবাদী চেতনা জাতিসত্তায় রূপান্তর করা সম্ভব হয়েছে। উগ্রতা নয়, উদারতাই এই চেতনার মূল শক্তি। সম্প্রদায়গতভাবে আমরা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান। কিন্তু সাংস্কৃতিক চেতনাবোধে বাঙালি। এই বাঙালিত্ব রক্ষার সংগ্রামই হচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে বাঙালিরা তাদের নিজস্ব ভূখ- পূর্ব বাংলা স্বাধীন করে বাঙালির জন্য একটি প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করেছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে আর একটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্ব হচ্ছে বাঙালি চেতনাকে জাতীয়তাবাদে রূপান্তর করে স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা। তাই তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি।

চতুর্থ নীতি হচ্ছে- সমাজতন্ত্র তথা সামাজিক ন্যায়বিচার। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় বিশে^র দুটি সমাজ বিপ্লব সফল হয়েছে। একটা মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে গণচীন ও অপরটা লেলিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন। সমাজতন্ত্রে মার্কসবাদী দর্শনের ভিত্তিতে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক আজকের সেই সমাজতন্ত্রের পরিণতি দেখে বঙ্গবন্ধুর সময়ের বিদ্যমান বাস্তবতার তুলনা করা সমীচীন নয়। নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধু মার্কসবাদী দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তা না হলে শোষণমুক্ত সমাজের কথা বলতেন না। তবে ষাট ও সত্তরের দশকে বঙ্গবন্ধু উপলদ্ধি করেছিলেন, ব্যক্তি মানুষ স্বার্থ, রাষ্ট্র ও সমাজে বিলিন হওয়া উচিত না। বঙ্গবন্ধু কোনো দেশের বা বিশেষ দর্শনের নীতিতে বিশ^াস করতেন না। তিনি ভাবতেন নিজ দেশের জনগণের প্রয়োজন ও প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। সেই দর্শনে থাকবে শোষিত-বঞ্চিত, অবহেলিত ও সাধারণ মানুষের মুক্তির কথা। বঙ্গবন্ধু সেই পথ বাঙালিকে দেখিয়ে গিয়েছেন। প্রয়োজনে দৃঢ়তার সাথে বিদ্যমান প্রতিকূল অবস্থাকে মোকাবেলা করে বিশ^বাস্তবতার সাথে সামজ্ঞস্যপূর্ণ আর্থ-সামাজিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। এই কাজটি শেখ হাসিনা শুরু করেছিলেন। সারা জাতির উচিত তার নেতৃত্বে বিশ^াসী হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ ও জাতি গঠনে কাজ করে যাওয়া। শেখ হাসিনা তার পিতার কর্মসূচি থেকে বিন্দুমাত্র সরে যাননি। বিশ^বাস্তবতার কারণে হয়তো কোনো সময়ে কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে মাত্র। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথেই শেখ হাসিনা এগিয়ে চলেছেন।

লেখক : কলামিস্ট ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৭ অক্টোবর ২০১৯

  • ৩ অক্টোবর ২০১৯

  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯