আপনজন

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ১৩:৫৪ | আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ১৩:৫৬

সমরেশ মজুমদার


বাংলাদেশে পার্ল পাবলিকেশন সে-সময় বেশ নামকরা, নামি লেখকদের বই ছাপতেন। তার কর্ণধার ছিলেন মেনু মিঞা। কলকাতায় বসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ১৬ বছর পরেও আমরা সেখানকার সাহিত্যজগতের খবর বেশি পেতাম না। শুধু কয়েকজনকেই যারা স্বাধীনতার স্বপক্ষে কলম ধরেছিলেন, তাদের নাম জানতাম, কবিতা পড়তাম। সেই ’৮৭ সালে মেনু মিঞা আমার কাছে এলেন। বললেন, ‘আমি কলকাতা থেকে সুনীল গাঙ্গুলি আর আপনার বই ঢাকায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করব। আপনি আমার সঙ্গে সহযোগিতা করুন।’
দোহারা চেহারা, মধ্য চল্লিশের মানুষটিকে এত ভালো লেগে গেল যে সে-বছর যখন প্রথমবার ঢাকায় গেলাম তখন মেনু মিঞা অনুরোধ করতেই ওই এলিফ্যান্ট রোডের বাড়িতে গিয়ে উঠলাম।
এখন বইমেলা চলছে। ’৮৭ সালের বইমেলার চেহারা শীর্ণ ছিল। মেনু মিঞা একটি তরুণ অধ্যাপকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল, যার কয়েকটি বই বের হলেও তখনও বিখ্যাত হয়নি। তরুণের নাম হুমায়ূন আহমেদ। সেই মেলায় পরিচয় হলো এক দম্পতির সঙ্গে, রাজুভাই এবং কল্পনা। একজন রাজনীতি করেন, দ্বিতীয়জন শিক্ষিকা। রাজুভাই একটু কম কথা বলেন, কল্পনার মুখে খই ফোটে। ওর মুখেই শুনলাম পরের দিন ওরা শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে যাবেন। জানলাম, নেত্রীর সঙ্গে ওদের অনেকদিনের সম্পর্ক, কল্পনা শেখ হাসিনাকে যা সত্যি বলে মনে করেন তা স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন, সংকোচ বোধ করেন না।
দেশের স্বাধীনতার জন্যে বাধ্য হয়েছিলেন বিদেশে গিয়েও মরীয়া আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে যে দুজন মানুষ তাদের একজন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, অন্যজন শেখ মুজিবুর রহমান। প্রথমজন সাফল্য হননি, দ্বিতীয়জন হয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রাণপুরুষ তিনি। তার আন্দোলনের কথা আমি পড়েছি, একইভাবে জেনেছি শেখ হাসিনার কথা। রাজুভাই এবং কল্পনা পরের দিন শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন শুনে কিন্তু কিন্তু করে জানতে চাইলাম, আমি সঙ্গী হতে পারি কি না!
রাজুভাই ইতস্ত করছিলেন। সে-সময় শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেত্রী হলেও তার নিরাপত্তার জন্যে অচেনা মানুষ হুট করে কাছে যেতে পারে না। কিন্তু কল্পনা তুড়ি মেড়ে উড়িয়ে দিল। বলল, ‘কোনো চিন্তা নেই। আপনি আমার দাদা। আপনাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি আমি নিয়ে রাখব।’
কল্পনার উদ্যোগেই পরের দিন বিকেলে সমস্ত নিয়ম মেনে আমি ওদের সঙ্গে শেখ হাসিনার সামনে পৌঁছাতে পারলাম, আমাকে দেখে একগাল হাসলেন শেখ হাসিনা, আপনি সমরেশ মজুমদার। বসুন। আপনার সঙ্গে আমার ঝগড়া আছে। কিন্তু তার আগে আপনার একজন ভক্তকে খবর দিই। তিনি কাউকে বললেন রেহানাকে ডেকে আনতে।
এলেন। ছিপছিপে তরুণী ঘরে ঢুকতেই শেখ হাসিনা বললেন, ‘দ্যাখ তো, একে চিনিস কি না!’ রেহানা কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আবার শেখ হাসিনার দিকে তাকাচ্ছেন। তখন শেখ হাসিনা আমার পরিচয় দিলেন। শোনামাত্র রেহানা দ্রুত ভেতরে চলে গেলেন। শেখ হাসিনা বললেন, ‘কী ব্যাপার কী হলো? হ্যাঁ, সমরেশবাবু, আপনার বিরুদ্ধে একটা ভয়ঙ্কর অভিযোগ আছে। আপনি বাংলাদেশের একটি সরল কিশোরীর জীবন নষ্ট করেছেন। কিছু বলার আছে?’
আমি হতভম্ব। গলা শুকিয়ে গেল। কল্পনা বলল, ‘সেকি? উনি তো গত পরশু প্রথম ঢাকায় এসেছেন। এর মধ্যে কখন...।’
মাথা নাড়লেন শেখ হাসিনা, ‘ইনি একটা উপন্যাস লিখেছেন যার কলেজে পড়া নায়িকা বাবা-মা ছেড়ে নির্জন পাহাড়ের আদিবাসীদের সঙ্গে বাস করছে, মা হয়েছে। কি যেন নাম উপন্যাসের? হ্যাঁ গর্ভধারিণী। এই উপন্যাস পড়ে আমাদের এক সেক্রেটারির কিশোরী মেয়ে ঢাকা থেকে চলে গিয়েছে চট্টগ্রাম পেরিয়ে পাহাড়ে। তার উদ্দেশ্য সে ওই নায়িকা হবে। অনেক কষ্টে তাকে ফিরিয়ে আনার পরে সে নিজের ঘরের বাইরে কোথাও যাচ্ছে না, কারও সঙ্গে কথা বলছে না। এই মেয়েটির জীবন যদি নষ্ট হয় তাহলে তার জন্যে আপনি দায়ী? কিছু বলবেন?’
বললাম, ‘এমন হতে পারে আমি ভাবতে পারছি না।’
‘ঠিক আছে, আমি ওর বাবাকে বলছি আপনাকে ওদের বাসায় নিয়ে যেতে। আপনি মেয়েটিকে বুঝিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনুন।’ শেখ হাসিনার কথা শেষ হতেই ওর বোন আমার লেখা গোটা চারেক বই নিয়ে এসে হাসিমুখে অনুরোধ করল অটোগ্রাফ দিতে। জানলাম, আমার লেখা তার ভালো লাগে।
শেখ হাসিনার অনুরোধে আমি সেই অফিসারের বাড়িতে গিয়েছিলাম। অনেক ডাকাডাকির পর আমার নাম শোনার পর মেয়েটি দরজা খুলে চোখ ছোট করে কিছুক্ষণ দেখার পর মুখ বেঁকিয়ে বলল, ‘এই লোকটা কে?’
ওর বাবা বললেন, ‘ইনি লেখক সমরেশ মজুমদার।’
মেয়েটির মুখে অবিশ^াস ফুটে উঠল, ‘না! অসম্ভব।’ তারপর ভেতর থেকে একটা বই এনে পৃষ্ঠা উল্টে বলল, ‘মিথ্যে কথা। এটা অন্য লোক, ছবির সঙ্গে কোনো মিল নেই।’ বলে বেশ রেগে গিয়ে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।
মেয়েটির মা বললেন, ‘বইতে আপনার যে ছবি ছাপা হয়েছে তা অনেক কম বয়সের, আপনার সঙ্গে মিল নেই, তাই চিনতে পারেনি ও।’
খবরটা নিশ্চয়ই শেখ হাসিনা শুনেছিলেন। পরের বছর রোজার সময় ঢাকা যেতে রাজুভাই বললেন, ‘আপনাকে ইফতারে দাওয়াত দিয়েছেন নেত্রী। যদি আপত্তি না থাকে তাহলে বিকেলে নিয়ে যাব।’
খুশি হয়েই গিয়েছিলাম। বিরোধীদলীয় নেত্রীর বাড়ির সামনে সামিয়ানা টাঙিয়ে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। জীবনে সেই প্রথমবার আমি ইফতারের খাবার খেলাম। খাওয়ার মধ্যপর্বে শেখ হাসিনা টেবিলের ওপাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘খুব খুশি হয়েছি আপনাকে দেখে। লজ্জা না করে পেট ভরে খান।’ শুধু তাই নয় আর একজনকে ডেকে নির্দেশ দিলেন আমাকে যতœ করে খাওয়াতে।
সেই সময়ে যারা সরকারে ছিলেন তারা আমার একটি উপন্যাস সম্পর্কে অপ্রসন্ন হলেন। ভোরের কাগজে পড়তাম ত্রিপুরার উগ্রপন্থিরা ভারতে খুনখারাপি করে বাংলাদেশে চলে যেত। সেখানে ক্যাম্প করেছিল এবং এই ব্যাপারে সেই সময়ের বাংলাদেশ সরকার কোনো ব্যবস্থা নিতেন না। ওই পটভূমিকায় তৎকালীন সরকার শুধু কানে শুনেই, বা যাচাই করে বইটিকে ব্যান্ড করে দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না, আমার ভিসাও বাতিল করেদিলেন, পরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দিন চারেকের মধ্যে আমি যে ভিসা পেয়েছিলাম তার পেছনে শেখ হাসিনার ভূমিকার কথা অনেকেই বলে থাকেন।
মাঝে মাঝেই বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে ঢাকায় যাই। ম. হামিদ এবং তার স্ত্রী ফাল্গুনির মাধ্যমে নেত্রীর কথা জানতে পারি। কিন্তু যার কাঁধে গোটা দেশের বিশাল দায়িত্ব তাঁকে অযথা বিরক্ত করতে চাইনি। কয়েক বছর পরে ঢাকায় যেতেই হামিদ এবং ফাল্গুনি বললেন, ‘নেত্রী বলেছেন আপনি ঢাকায় এলে ওর কাছে নিয়ে যেতে।’ ওরাই সময় স্থির করে নিয়ে গেলেন। শেখ হাসিনা তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। নিয়মকানুন মেনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছানো সহজ নয়। কিন্তু দেখলাম কোনো নির্দেশ থাকায় আমাদের ক্ষেত্রে কোনো কড়াকড়ি হলো না। আমরা একসঙ্গে বসে অনেক গল্প করলাম। দেখলাম সময় তাকে অনেক অভিজ্ঞ করেছে। কিন্তু ব্যবহারের আন্তরিকতা বিন্দুমাত্র কমেনি।
পরিচিত হয়েছে বলে অকারণে বিরক্ত করতে আমি চাইনি বলে ঢাকায় গেলেও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে যাওয়ার কথা ভাবিনি। কিন্তু একটা মজার ঘটনা ঘটে গেল।
একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকায় গিয়েছিলাম। আমি সেখানে সচরাচর থাকি, সেই ঢাকা ক্লাবের কাছে ছিল সম্মেলন কক্ষ। উদ্যোক্তারা আমাকে নিয়ে গিয়ে সেই প্রেক্ষাগৃহের প্রথমসারির আসনে বসিয়ে দিলেন, দর্শক উপচেপড়া প্রেক্ষাগৃহে শেখ হাসিনা এসে মঞ্চে উঠলেন। মঞ্চের সমস্ত আসন মন্ত্রী, নামি প্রতিনিধিরা ভরিয়ে দিলেন। আসনে বসার আগে শেখ হাসিনা দর্শকদের যখন সালাম জানাচ্ছেন তখনই তার দৃষ্টি পড়ল আমার ওপর। আসনে বসে ইশারা করলেন, যেন আমি মঞ্চে উঠে আসি। কিন্তু মঞ্চে তখন কোনো আসন খালি নেই। আমি অস্বস্তি নিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলাম।
অনুষ্ঠান শেষ হলে সবাই যখন উঠে দাঁড়িয়েছিলেন তখন একজন অফিসার এসে আমাকে অনুরোধ করলেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতে। আমি দ্রুত তার কাছে পৌঁছালে তিনি হেসে বললেন, ‘মাঝে মাঝে শুনতে পাই আপনি ঢাকায় এসেছেন। অথচ আমার সঙ্গে দেখা করেন না। কী ব্যাপার?’
আমি হাসিমুখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আপনি এতদিনে একটুও বদলে যাননি।’
কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীকে যখন মা অথবা দিদি বোন ছাড়া অন্য কিছু মনে হয় না তখন সেই দেশ নিজের দেশ হয়ে যায়।

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৭ অক্টোবর ২০১৯

  • ৩ অক্টোবর ২০১৯

  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯