ঈদে যাওয়া-আসার রাস্তা

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৫:৪০

অনলাইন ডেস্ক

সুভাষ সিংহ রায় :

“একলার গৃহ সকলের গৃহ হয়, একলার ধন সকলের জন্য ব্যয়িত হয়। সেদিন ধনী দরিদ্রকে সম্মান করে, সেদিন পণ্ডিত মূর্খকে আসন দান করে। কারণ আত্মপর ধনী দরিদ্র পণ্ডিত মূর্খ এই জগতে একই প্রেমের দ্বারা বিধৃত হইয়া আছে। ইহাই পরম সত্য এই সত্যের প্রকৃত উপলব্ধি পরমানন্দ। উৎসব দিনের অবধারিত মিলন এই উপলব্ধিরই অবসর।” উৎসবের সার্থকতা এখানেই। উৎসবের আসল চরিত্র হলো অন্যকে টেনে আনা। বাংলাদেশের ঈদ উৎসব সবচেয়ে বড় উৎসব। নানা ধরনের ব্যত্যয় থাকলেও ঈদে মানুষ প্রিয়জনদের সাথে একত্রিত হয়। গত ২ সেপ্টেম্বর পবিত্র ঈদুল আজহা পালিত হলো। আর উৎসব উপলক্ষে মানুষ ঢাকা শহর ছাড়তে শুরু করে। নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য ঈদে বাড়ি ফেরা বেশ ব্যয়বহুল ও অনেক কষ্টের। গত ঈদুল ফিতরের দুদিন আগে এক সিমেন্ট পরিবহনের গাড়িতে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের কয়েকজনসহ বেশ কজন নিহত হন। তারা কি জানতেন না এভাবে বাড়ি যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। অবশ্যই জানতেন; কিন্তু পরিবারের ছয় সদস্যের একসাথে রংপুরের বাড়ি যেতে কম করে হলেও ২ হাজার ৫০০ টাকা লাগে। গার্মেন্টসে চাকরি করে এত টাকা তিনি কোথায় পাবেন। সরকারকে এখানে দায়িত্ব নিতে হবে। ঈদের সময় ভর্তুকি বেশি দিয়ে হলেও ১০০ টাকার মধ্যে ট্রেনে রংপুরে যাওয়া ও আসার ব্যবস্থা করতে হবে। এই সরকারের আমলে রেল যোগাযোগের অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এখনও অনেক অনেক দূর যেতে হবে। ভারতে পূজার সময় ভারতীয় রেল যে পরিমাণ নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তদের সাহায্যে এগিয়ে আসে সেক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি।
পত্রিকান্তরের খবর থেকে জানা যায়, মাননীয় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মন্ত্রী হওয়ার পরের আড়াই বছরে ৬৪ জেলার ২০৪টি উপজেলায় ৩৮১ দিন সড়ক-মহাসড়ক পরিদর্শন করেছিলেন। তার অধীন তদারক টিমগুলোও একইভাবে সক্রিয় ছিল। এখনকার তথ্য আমার কাছে নেই। এটুকু বলা যায়, সেই ধারা এখনও অব্যাহত আছে। গত ২৪ আগস্ট দাউদকান্দির টোলপ্লাজায় পরিদর্শনে গিয়ে বলেছেন, বন্যা ও ভারী বর্ষণের কারণে দেশের কমপক্ষে ৩০টি স্থানে রাস্তায় ৫০০ থেকে ১ হাজার মিটার পর্যন্ত রাস্তা ভাঙাচোরা আছে। এ মুহূর্তে দেশের বন্যার কারণে ৫০টিরও বেশি সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
সড়ক ও জনপদের যাত্রা শুরু হয় ১৯৬২ সাল থেকে। তখন এর আওতায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার সড়ক আর এখন তা প্রায় ২১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার সড়ক (২৪ আগস্ট প্রথম আলোতে বলা হয়েছে ২১ হাজার ১২৩ কিলোমিটার)। ঢাকা থেকে কক্সবাজারে যেতেই এখন লাগছে আট ঘণ্টা। ছুটি কাটাতে যাওয়ার ব্যাপার বাদ রাখলেও প্রিয়জনের সান্নিধ্যে ঈদ করতে কত লাখ লোক ছোটে, তার সঠিক হিসাব কোথাও নেই। কিছু যায় নৌ আর রেলপথে। তাদেরও যথেষ্ট ভোগান্তি সহ্য করতে হয়। কিন্তু সড়কপথে যাত্রীর ভোগান্তি অন্য সবকিছুকে পেছনে ফেলছে। মাননীয় মন্ত্রী ঈদ উৎসবের আগে সড়ক নেটওয়ার্ক কার্যকর রাখার জন্য অবিরাম ছোটাছুটি করেন মাসখানেক আগে থেকেই। ২৮ আগস্টের দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়, সড়কমন্ত্রী নির্বাহী প্রকৌশলীদের নির্দেশ দিয়েছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মহাসড়ক চলাচলের উপযোগী করতে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৫ জেলার সব জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক চলাচলের উপযোগী করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে বাংলাদেশের ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার মহাসড়কের পাশে রয়েছে স্থায়ী-অস্থায়ী বাজার। দেখা গেছে, প্রায় ২২৬টা অস্থায়ী বাজার রয়েছে; যেগুলো স্থানীয় প্রশাসন সেগুলোর লিজ দিয়ে থাকে। ৩ হাজার ৯০০ কিলোমিটার মহাসড়কের যানজটের এটাও একটা বড় কারণ। গত ঈদুল ফিতরের সময়ে সড়ক যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও হাইওয়ে পুলিশ যৌথভাবে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করে কিছুটা সফল হয়েছিল। কোনো কোনো জায়গায় জনপ্রতিনিধিরা এ কারণে ভীষণ রকমের অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তারপরও হাইওয়ে পুলিশ ৪২টি বাজার রাস্তার পাশ থেকে সরিয়ে দিতে পেরেছিল। পাঠকদের মনে থাকার কথা, গত ঈদের দুদিন আগে নির্মম দুর্ঘটনার শিকার হয়ে একই পরিবারের ছয়জনসহ মোট ১৭ জন গাইবান্ধায় মহাসড়কে মৃত্যুবরণ করেন। কম টাকার ভাড়ায় তারা সিমেন্টভর্তি গাড়িতে ঝুঁকি জেনেও উঠেছিলেন। সরকার এসব বিত্তহীন নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য অত্যন্ত সুলভে রেলগাড়ির ব্যবস্থা করতে পারে।

দুই
গত ৫ জুলাই প্রথম আলোর সংবাদ প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘ঈদযাত্রায় ২০৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত’। ঈদুল ফিতরের আগে-পরের ১৩ দিনে দেশে সড়ক, রেল ও নৌপথে ২৪০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। শুধু কি বাংলাদেশে, সড়ক দুর্ঘটনা গোটা বিশ্বের একটা বড় ধরনের সমস্যা। ২০১৬ সালে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যান তিনজন। কিন্তু ২০১৭ সালে কাটা পড়ে মারা যান ৩৪ জন। তবে নৌপথের আগেরবারের ১১ জন মারা গেলেও, ২০১৭-তে তা অনেক কমেছিল; ঈদুল ফিতরে মারা গিয়েছিলেন তিনজন। বিশ্বে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৩,৫০০।
প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ২০০০ সালে যা ছিল, ২০০৪-০৫ সালে তা বাড়লেও ২০১১-১২ সালে কিছুটা কমে আসে। কারণ এই সময়কালে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল। সড়ক ব্যবস্থাপনা এক বিশাল বিষয়। উন্নত ব্যবস্থাপনা দিয়ে অনেক কিছু করা সম্ভব। ১৯৩৪ সালে যুক্তরাজ্যে ২৪ হাজার যানবাহনের বিপরীতে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন ৭ হাজার ৩০০ জন। ২০১৪ সালে ৩ কোটি ৫০ লাখ যানবাহনের বিপরীতে মারা যান ১ হাজার ৭০০ জন। ওখানে সড়ক ব্যবহারীর সংখ্যা বেশি অথচ সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা কম। এর কারণ, তারা এই সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এজন্য তারা জনসচেতনতামূলক, জনস্বাস্থ্যমূলক, শিক্ষামূলকÑ সর্বোপরি সুশাসনগত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
বলা হয়, কোনো একটা শহরে কম করে ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকতে হবে। আর আমাদের রাজধানী ঢাকায় আছে ৮ শতাংশের মতো রাস্তা। যানজট এখানে নিত্যসঙ্গী। রাত-দিনের কোনো তফাৎ নেই। গুলশান থেকে মতিঝিলে একবার এসে ফিরে যেতে দিন শেষ। এমনকি এখন মফঃস্বল শহরগুলোতে যানজট দেখা যায়। এখানে বেশ কয়েকটি কারণ আছেÑ ১. দেশের জনসংখ্যার আধিক্য ২. অপরিকল্পিত মোটরযান ৩. ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থাপনা ৪. অপরিকল্পিত নগরায়ণ। অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে মানুষের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। ক্রমে তা বাড়ছেই। সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক ব্যবস্থাপনা ৪টি ‘ই’-এর ওপর নির্ভর করে। সেগুলো হলোÑ ইঞ্জিনিয়ারিং, এডুকেশন, এনফোর্সমেন্ট, এনভায়রনমেন্ট। এ কথা বলার অবকাশ রাখে না ব্যবস্থাপনা, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এরকম বিশ্বের ৮০টি দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমে এসেছে। একইভাবে আরও ৮০টি দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে। সেগুলোর অধিকাংশই উন্নয়নশীল দেশ। হয়তো অনেক কারণে বিশেষত আর্থিক ঘাটতির কারণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে না পারায় সেসব সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে। এর একটা শিক্ষা হলো, উন্নত ৮০টি দেশের মতো আমরাও চাইলে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে পারব। সরকার বিভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। দেশে ২০৯টি দুর্ঘটনাপ্রবণ ব্লাক স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এ থেকে এটা প্রমাণিত, এসব সড়ক তৈরির সময়ই ডিজাইন কিংবা সার্বিক নিরাপত্তায় গলদ ছিল। এখন আগের সড়কসহ নতুন সড়কের রোড অ্যাসেসমেন্ট প্রোগ্রাম হাতে নিতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক রোড অ্যাসেসমেন্ট প্রোগ্রাম নামে একটি সংস্থাও গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক তারা অ্যাসেসমেন্ট করেছে। তাদের অ্যাসেসমেন্ট খুবই হাইটেক। একটি কম্পিউটারাইজড ভেহিকেলে ক্যামেরা সংযোজনের মাধ্যমে এ অ্যাসেসমেন্ট করা হয়। সেটিতে জিপিএসও থাকে। সেসবের মাধ্যমে রাস্তার বাঁকগুলো বিজ্ঞানসম্মত কি না, আন্তঃসংযোগগুলো ঠিক কি না ইত্যাদি মূল্যায়ন করা হয়। এই অ্যাসেসমেন্টে ওই সড়কে যেসব খুঁত পাওয়া গেছে, সেগুলো ঠিক করতে হবে। বলা হচ্ছে, ওই খুঁতগুলো সমাধান করা মোটেও ব্যয়সাপেক্ষ নয়। চাইলেই এটা করা যাবে। সুতরাং, আমাদের এসবের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

তিন
ভারতের সাবেক নির্বাচন কমিশনার টিএন শেষণের ‘অধঃপতিত ভারত’ গ্রন্থ থেকে জানতে পারি, জুন ১৯৬২-তে তিনি মাদ্রাজ রাজ্যে ডিরেক্টর অব ট্রান্সপোর্ট হন। তার অধীনে ছিল ২ হাজারটি বাস, তার ৯০ শতাংশ মাদ্রাজ শহরে। কর্মীর সংখ্যা ছিল ২৫,০০০। ইউনিয়ন ছিল নানা বর্ণেরÑ কংগ্রেস, ডিএমকে, কমিউনিস্ট। আদর্শ নিয়োগকর্তা হওয়ার জন্য তাকে কাজ করতে হয়েছিল। গাড়ির ইঞ্জিন কী করে খুলে তার বিভিন্ন অংশ আলাদা আলাদা করতে হয়, আবার কী করে সেসব জোড়া লাগাতে হয়, তা তিনি শিখে নিয়েছিলেন। বাসে একটা পুরো শিফট কাজ করেছেন, ড্রাইভার হিসেবেও, কন্ডাক্টর হিসেবেও। যা করতে চাইতেন, কমিউনিস্ট ইউনিয়নের সেটি পছন্দ হতো না এবং যথারীতি ধর্মঘট। ধর্মঘটের দিন তিনি প্রধান বাস ডিপোয় গিয়ে দেখলেন, ৪০ শতাংশের মতো কর্মী ধর্মঘটে যোগ দিয়েছিলেন। কিছু কাজে এসেছিলেন, জনাকয়েক আশপাশে ঘোরাঘুরি করছিলেন অপরাধীর ভাব নিয়ে, যেন বুঝতে পারছিলেন না কী করবেন। ধর্মঘট ভাঙবার জন্য প্রথম বাসটি টিএন শেষণই চালিয়েছিলেন। বাসের সব জানালা তারের জালে ঢাকা ছিল; কিন্তু ডিপো থেকে আমরা বেরোচ্ছি, গাড়ির ওপর একঝাঁক পাথর এসে পড়লেও পরে আরও ৩০টির বেশি বাস বেরিয়ে পড়েছিল ডিপো থেকে। ধর্মঘট পালিত হয়নি। রাষ্ট্র যখন নিয়োগকর্তা, তাকে আদর্শ নিয়োগকর্তা হওয়ার জন্য যা কিছু দরকার করতে হবে। শ্রমজীবীদের প্রতি তার আচরণ যেন হয় সম্পূর্ণ পক্ষপাতহীন। এমন কতকগুলো বিষয় আছে যা নিয়ে কোনো আপস চলে না।

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ২৭ আগস্ট ২০১৭

  • ১৩ আগস্ট ২০১৭

  • ০৬ আগস্ট ২০১৭

  • ৩০ জুলাই ২০১৭