সমুদ্র বাণিজ্য রক্ষায় নৌবাহিনী

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৯, ১১:০৮

মিল্টন বিশ্বাস

 

বাংলাদেশের নৌ-ইতিহাসের বয়স মাত্র ৪৫ বছর। তবে ভারতীয় উপমহাদেশে সমুদ্র বাণিজ্য এবং নৌবাহিনী গঠনের ইতিহাস ৫ হাজার বছরের প্রাচীন। সেই ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের সমুদ্র বন্দরের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এদিক থেকে আমরাও প্রাচীন নৌ-ইতিহাসের উত্তরসূরি। বাংলাদেশ অন্য অনেক দেশের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে কেবল সমুদ্র বন্দরের জন্যই নয়, সমুদ্রের জন্যও। বাংলাদেশের দক্ষিণ দিক সমুদ্রে উন্মুক্ত এবং এরই দুই প্রান্তে আছে দুটো সমুদ্রবন্দর। উন্মুক্ত সমুদ্র আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও পরিবহনের জন্য অনেক সুবিধাজনক। আর এই বঙ্গোপসাগরে বিপুল তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ আছে বলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের যে সমৃদ্ধি তা এই বন্দর সুবিধা না থাকলে সম্ভব হতো না। উল্লেখ্য, প্রাচীনকালের কয়েক শতাব্দীকাল ধরে সমুদ্রপথে ভারতের সঙ্গে অন্যান্য দেশের বাণিজ্য চলে। এমনকি অন্যান্য দেশের ওপর ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও প্রধান ভূমিকাটি গ্রহণ করেছিল সমুদ্রপথগুলোই। মৌর্য, সাতবাহন, চোল, বিজয়নগর, কলিঙ্গ, মারাঠা ও মুঘলদের শক্তিশালী নৌবাহিনীর অস্তিত্ব ছিল। চোলদের সমুদ্র বাণিজ্য ও সমুদ্রাভিযানের পরিধি প্রশস্ত হয়েছিল চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত। ২৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ ভারতের গুজরাট উপকূলের ম্যানগ্রোল বন্দরের কাছে সিন্ধু সভ্যতার লোথালে দেশের প্রথম টাইডাল ডকটি গড়ে উঠেছিল। ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে রচিত ঋগে¦দে বরুণকে সমুদ্রপথ সম্পর্কে অবগত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই গ্রন্থে নৌ-অভিযানেরও বর্ণনা রয়েছে। ‘প্লব’ নামে জাহাজের একপ্রকার পাশর্^পক্ষের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা ঝড়ের মধ্যে জাহাজকে স্থির রাখতে সাহায্য করত। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে মৎস্য যন্ত্র নামে এক প্রকার কম্পাসের ব্যবহারও প্রচলিত ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনে দেশের প্রথম সুসংহত নৌবাহিনী গড়ে ওঠে। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রী কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ গ্রন্থের একটি অধ্যায়ে নৌ-অধ্যক্ষ-এর অধীন একটি পূর্ণাঙ্গ বিভাগের বর্ণনা পাওয়া যায়। এই গ্রন্থে নৌ ‘দ্বীপান্তরগমনম্’ শব্দটি এবং বৌধায়ন ধর্মসূত্র নামক বৌদ্ধগ্রন্থে ‘সমুদ্রসাম্যনম’ শব্দটি থেকে সে-যুগে নৌ-অভিযানের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে মারাঠা ও কেরল নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ ঘটে। এই দুই বাহিনী ছিল সে-যুগের শ্রেষ্ঠ নৌশক্তি। একাধিকবার ইউরোপীয় নৌবাহিনীকেও পরাজিত করেছিল এরা (কোলাচেলের যুদ্ধ)। মারাঠাদের নৌপ্রদর্শনী হয়েছিল রতœগিরি দুর্গে। এখানে পাল ও কালবাট জাহাজ দুটিও অংশগ্রহণ করে। সামুথিরির মারাঠা নৌ-সেনানায়ক কাহ্নোজি আংড়ে ও কুঞ্জলি মারাক্কার ছিলেন সে-যুগের দুই শ্রেষ্ঠ নৌযোদ্ধা।
১৮৫৭-১৯৪৭ সময় পর্ব ছিল ব্রিটিশ ভারতীয় নৌবাহিনীর যুগ। ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী ব্রিটিশ ভারতীয় নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠা করে। ১৯২৮ সালে রয়্যাল ইন্ডিয়ান মেরিনে ইঞ্জিনিয়ার অফিসার হিসেবে যোগ দেন সাব-লেফটানেন্ট ডি এন মুখার্জি। তিনিই প্রথম ভারতীয় যাকে কমিশন অনুমোদন করা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় নৌবাহিনীর নাবিকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ব্রিটিশ ভারতীয় নৌবিদ্রোহ নামে পরিচিত এই বিদ্রোহ সারা ভারতে ব্যপ্ত হয়। ৭৮টি জাহাজ, ২০টি বন্দর প্রতিষ্ঠান ও ২০ হাজার নাবিক এই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতীয় নৌবাহিনীর নতুন নামকরণ হয় ‘ভারতীয় নৌবাহিনী’। এর জাহাজগুলো ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ বা ইন্ডিয়ান ন্যাভাল শিপস (আইএনএস) নামে পরিচিত হয়।
১৯৪৭ সাল থেকে পূর্ববাংলার চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দর এবং  আভ্যন্তরীণ নৌপথকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানি নৌবাহিনীর যাত্রা শুরু হলেও সেই আলোচনা এখানে বাদ দেওয়া হলো। বরং এ নিবন্ধে স্বাধীন বাংলাদেশে নৌবাণিজ্য রক্ষায় নৌবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আলোকপাত করা হচ্ছে। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বে¡ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রচেষ্টায় ভারত থেকে সংগৃহীত ‘পদ্মা ও পলাশ’ নামে দুটি পেট্রোল ক্রাফট নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কার্যক্রম শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে ঈসা খানকে প্রথম ‘নেভাল এনসাইন’ দিয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় জলসীমার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্ব পালনের জন্য ২০১৬ সালে নৌবাহিনী স্বাধীনতা পদক পেয়েছে।

২.
‘শান্তিতে সংগ্রামে সমুদ্রে দুর্জয়’ এই মহিমান্বিত বাণীর ধারক-বাহক নৌবাহিনীকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও শক্তিশালী দেখতে চান। ইতোমধ্যে নৌবহরে যুক্ত হয়েছে আরও নতুন ৩টি যুদ্ধজাহাজ। প্রথমবারের মতো এসেছে দুটি অত্যাধুনিক সাবমেরিন। এছাড়া সরকারের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় হাতে নেওয়া হয়েছে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ কার্যক্রম। নৌবাহিনীকে আরও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে চীনে নতুন দুটি করভেট নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এজন্য ২০১৬ মালের ২০ মার্চ নতুন ৩টি যুদ্ধজাহাজ কমিশনিংয়ের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বিশাল সমুদ্র সম্পদ রক্ষা করবে নৌবাহিনী। তার মতে, ভৌগোলিক অবস্থানগত ও কৌশলগত কারণে বাংলাদেশের জলসীমা ও তার সম্পদ রক্ষায় নৌবাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তা বিধান নৌবাহিনীর একটি অন্যতম কাজ। কারণ আমাদের রয়েছে ৭১০ কিমি উপকূল এলাকা, যেখানে প্রায় ৩ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহের জন্য সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। বহির্বিশে^র সাথে দেশের বাণিজ্যের ৯০ ভাগেরও বেশি সমুদ্রপথেই পরিচালিত হয়ে থাকে। আমাদের জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমুদ্র এলাকার উন্নয়ন ও নিরাপত্তা বিধান করা অপরিহার্য।
অর্থাৎ মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে বিরোধ মীমাংসার পর বঙ্গোপসাগরে সুবিশাল অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে সমুদ্র নিরাপত্তার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এই এলাকায় অবাধে মাছ শিকার ও অন্যান্য সম্পদ আহরণ করা যাচ্ছে। ওশানগ্রাফি ও ব্লু ইকোনমির ওপর কাজ শুরু হয়েছে। সাগরে আমাদের এখন ৬০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য। ২ হাজার ৬০০ বিদেশি জাহাজ আসে বন্দরে সেখানে আমাদের জাহাজ মাত্র ৭০। এজন্য কোস্টাল শিপিং চালু হয়েছে। সমুদ্রকে ঘিরে কর্মসংস্থানের বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সমুদ্রের সম্পদ লুণ্ঠনে অন্যরা শ্যেনদৃষ্টি ফেলছে, জলদস্যুরা টার্গেট নিয়ে আছে। প্রয়োজন একটি বহুবিধ ক্ষমতাসম্পন্ন ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনীর। একদিকে তার থাকবে ভাসমান যুদ্ধজাহাজের বড় নৌবহর, অন্যদিকে থাকবে গভীর সমুদ্রের তলদেশে সাবমেরিনের ক্লাস্টার। আরও থাকবে নৌ অভিযানকে অন্তরঙ্গভাবে সহযোগিতা দিতে নিজস্ব দূর পর্যবেক্ষণ শক্তিসম্পন্ন বহুমাত্রিক দক্ষতার বিমানের সারি। প্রয়োজনে বিমানবাহী জাহাজ সংযোজিত হবে। এমন একটি যুগোপযোগী শক্তিশালী আধুনিক সর্বমাত্রার নৌবাহিনীর প্রয়োজন ভূকৌশলগত অবস্থানের কারণে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। অবশ্য সমুদ্র বাণিজ্য রক্ষার পূর্ণ দায়িত্ব এখন নৌবাহিনীর ওপর। যদিও বাংলাদেশ নৌবাহিনী উপকূলীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন দূর সমুদ্রের চ্যালেঞ্জ তাদের সামনে। আর এজন্যই সকল মহল থেকে এর আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে।
বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষা ও দুর্যোগ মোকাবেলায় নৌবাহিনীর দায়িত্ব অনেক। দেশের বিশাল জলসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি সমুদ্রে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রোধ, গভীর সমুদ্রে উদ্ধার তৎপরতা বৃদ্ধি, মৎস্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ব্লকসমূহে অধিকতর নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি সার্বিকভাবে দেশের ব্লু ইকোনমির উন্নয়নে এ বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছে। ক্রমাগত সম্পদ আহরণের ফলে বিশে^র স্থলভাগের সম্পদ আজ সীমিত। তাই সারাবিশ^ এখন নতুন সম্পদের খোঁজে রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ব্লু ইকোনমির মাধ্যমে সমুদ্র সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির ৯৫ শতাংশ সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবদান ৯২ শতাংশ। দেশের সমুদ্র বন্দর কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নির্মিত হচ্ছে পায়রা সমুদ্র বন্দর। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নে রাবনাবাদ চ্যানেলের তীরে এটির নির্মাণকাজ চলছে। প্রতি বছর দেশের বন্দরের ব্যবহার ১২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জরুরি হয়ে উঠেছে নতুন একটি বন্দরের। তাছাড়া, বর্তমান দুটি বন্দরে যে আকারের জাহাজ আসতে পারে, তার চাইতে বৃহত্তর দৈর্ঘ্য ও বেশি গভীরতার জাহাজ সরাসরি পায়রা বন্দরের জেটিতে আসতে পারলে সামগ্রিকভাবে লাভবান হতে পারবে দেশের শিল্প, বাণিজ্য এবং অর্থনীতি। ২০১৩ সালে কাজ শুরু হওয়া পায়রা বন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে ট্রানজিট ও অর্থনৈতিক করিডর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প-কারখানা, নৌবাহিনীর ঘাঁটিসহ অবকাঠামোগত আরও অনেক সুযোগ-সুবিধা। পর্যটন ও কর্মসংস্থানেরও বিরাট ক্ষেত্র তৈরি হবে। উপরন্তু মহেশখালিতে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মিত হলে আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকা- যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি দায়িত্ব বাড়বে নৌবাহিনীর।

৩.
সমুদ্র বাণিজ্যের গতিপথ নিশ্চিত করার জন্য দরকার চোরাচালান রোধ, রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য বিদেশিদের অনুপ্রবেশ বন্ধকরণ, জলদস্যুতা ও অন্যান্য অপরাধ দমন করা। তেমনি বন্দরকে রক্ষা করা দরকার। আর এসব কাজ নৌবাহিনীকে করতে হচ্ছে। নৌবাহিনীর হস্তক্ষেপে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দর দুর্নীতিমুক্ত হয়ে আমদানি-রপ্তানির প্রক্রিয়া গতিশীল হয়েছে। নৌবাহিনীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় নদী ড্রেজিংকরণের মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো আজ মংলা বন্দরে নিরাপদে ভিড়তে পারছে এবং দুর্বৃত্তদের কবলমুক্ত হয়ে স্বাভাবিক মাল খালাস প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা এবং জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশ নৌবাহিনী সাফল্য দেখিয়েছে। নৌবাহিনী এবং বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় মিয়ানমার ও ভারতের সাথে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা সমুদ্র সীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। বাংলাদেশের জলসীমার পরিধি বিস্তৃতি লাভ করায় নৌসদস্যদের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। আগেই বলা হয়েছে, গড়ে উঠেছে ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনী। যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন জাহাজ, অত্যাধুনিক এয়ার ক্রাফট। এছাড়া নতুন ঘাঁটি ও সংস্থা তৈরি, নতুন নতুন স্থাপনা প্রস্তুতকরণ, নৌসদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত ও বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কলেবর আরও বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলছে। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার এই বাহিনীর জন্য ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ প্রণয়ন করে। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে স্থলপথে, আকাশপথে ও সমুদ্রপথে একই সাথে কার্যকরভাবে অপারেশন পরিচালনার দক্ষতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে একটি ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনী রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০১২ সালে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ নামে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রভূত উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়। এ উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনী বিশে^র অন্যতম একটি দক্ষ ও শক্তিশালী নৌবাহিনীতে রূপান্তরিত হবে। উক্ত ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর প্রথম ধাপ ২০১২-১৫ সম্পন্ন হয়েছে। এ ধাপে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুটি ফ্রিগেট, চীন থেকে দুটি করভেট জাহাজ ও দেশীয়ভাবে খুলনা শিপইয়ার্ড থেকে তৈরিকৃত যুদ্ধ জাহাজসহ ২০টি যুদ্ধ জাহাজ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে অত্যাধুনিক নৌবহর, সাবমেরিন, ডেস্ট্রয়ার, অত্যাধুনিক ফ্রিগেট শিপ, করভেট শিপ, মাইন সুইপার, পেট্রোল ক্রাফট, অয়েল ট্যাংকার, নেভাল এভিয়েশন, গবেষণা ও জরিপ জাহাজ এবং এক দল দক্ষ ও অকুতোভয় নৌ সদস্যদের নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী রূপে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে বাংলাদেশের জলসীমার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে নিজেদের তথা বাংলাদেশকে সম্ভাব্য দুর্যোগ থেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশ জলসীমা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাওয়ায় সমুদ্র বাণিজ্য নির্বিঘœ এবং দুষ্কৃতিকারীদের হীন চেষ্টা প্রতিরোধ করতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সকল জাহাজ, ঘাঁটি ও স্থাপনায় বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হচ্ছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার ক্ষেত্রে প্রত্যেক নৌ সদস্যকে তাদের নিজ নিজ স্থান থেকে আরও সচেতন থাকা জরুরি। এজন্য বিশ^ায়নের যুগে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের উত্থান ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের রণসামর্থ্যরে বিষয়সমূহ বিবেচনা করে দেশের নৌবাহিনীকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজানের অভিযানে নেভি শিল্ডের অংশগ্রহণ ও জঙ্গি নির্মূলের কথা কারও ভুলে যাওয়ার কথা নয়। অবশ্য নৌবাণিজ্য রক্ষায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিজ্ঞান এবং তার প্রয়োগে পারদর্শী হতে হবে। কারণ একবিংশ শতাব্দীতে উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে একটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসমৃদ্ধ বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা আবশ্যক। সমুদ্র বাণিজ্যের সাফল্যের আরও একটি দিক হচ্ছে নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়া। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর খুলনা শিপইয়ার্ড নতুন নতুন যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণের মাধ্যমে সাফল্যের অনন্য নজির স্থাপন করে চলেছে। আশা করা যায়, ভবিষ্যতে আরও বড় বড় ও আধুনিক যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ করার মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে সমৃদ্ধ করবে।
আবার আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দিক থেকেও নৌবাহিনী এগিয়ে আছে। বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনী প্রধানদের সফর, স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশসমূহের সমুদ্রবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর সাথে বিশেষ বিশেষ সামুদ্রিক মহড়ায় অংশগ্রহণ, বন্ধুপ্রতিম দেশে নৌবাহিনী জাহাজসমূহের শুভেচ্ছা সফরসহ আন্তঃযোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সামুদ্রিক মহড়া, শুভেচ্ছা সফর এবং আন্তঃযোগাযোগ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর দক্ষতা ও রণকৌশল সমৃদ্ধ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতার মাধ্যমে স্পেশাল ওয়ারফেয়ার ডাইভিং অ্যান্ড স্যালভেজ (সোয়াডস) প্রতিষ্ঠা এর অনন্য নিদর্শন। এই সুসম্পর্ক ও কার্যকলাপসমূহ আরও জোরদার করাসহ প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে হবে। মাতৃভূমির জলসীমার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দূরদর্শিতাপূর্ণ পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে পথ চলতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের এক্সক্লুসিভ ইকোনোমিক জোন প্রায় ১,১১,৬৩২ বর্গকিলোমিটার। এই সমুদ্রসীমা অগাধ প্রাকৃতিক সম্পদের ভা-ার। এই সীমার আওতায় প্রচুর পরিমাণে মাছ, সমুদ্রজাত উদ্ভিদ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, যা আমাদের দেশের বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার সম্পূর্ণ চাহিদা মেটাতে সক্ষম। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন এই সম্পদের সুষ্ঠু সংরক্ষণ ও ব্যবহার। বাংলাদেশ নৌবাহিনী এজন্যই কাজ করছে। এছাড়াও সাঙ্গু উপকূলীয় গ্যাসফিল্ডের ওপর ভিত্তি করে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে সামুদ্রিক অঞ্চলে আমাদের গ্যাস আহরণের কিংবা খনিজ তেল প্রাপ্তির সম্ভাবনা খুবই বেশি, যা আমাদের জলসীমার গুরুত্ব আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত দেশীয় জেলেদের সহযোগিতা এবং সন্ত্রাসীদের হাত থেকে বিদেশি জাহাজগুলোকে নিরাপদে বন্দরে পৌঁছানো এবং সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের স্থাপনা ও পাইপ লাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নৌ সদস্যরা দেশের দুর্জয় কান্ডারীর ভূমিকা পালন করছে। মৎস্য আহরণ বাজারজাতকরণসহ সমুদ্র সম্পদ বিশেষ করে আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখ লোকের জীবিকা নির্ভরশীল। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রথমবারের মতো জাটকাবিরোধী কর্মসূচি ‘অপারেশন জাটকা’ অভিযান শুরু করে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর টহল জাহাজ প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ অবৈধ কারেন্ট জাল আটক ও ধ্বংস করে মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বিশাল সমুদ্রে অবৈধ অস্ত্র ও মালামাল বহনকারী জাহাজ ও নৌকা এবং সন্ত্রাসীদের আটক করার জন্য কুতুবদিয়া চ্যানেল ও মহেশখালীতে নৌবাহিনীর জাহাজ ও নৌসদস্যরা নির্ঘুম প্রহরীর ভূমিকা পালন করছে। বিশাল সমুদ্র সীমানা রক্ষা, নৌপথে মানব পাচার রোধ ও অবৈধ মৎস্য আহরণ রোধ করতে প্রতিনিয়ত ৫টি থেকে ৭টি নৌবাহিনী জাহাজ টহলে রয়েছে। বিদেশ থেকে মাদকদ্রব্য ও ইয়াবা বাংলাদেশে প্রবেশ রোধ করে বাংলাদেশ নৌবাহিনী এদেশের যুবশক্তিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করছে। দেশের সমুদ্রে অন্যদেশের মাছ ধরার ট্রলার আটক করে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অকুতোভয় নাবিকরা নিজের জানমাল বাজি রেখে বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। উপকূলীয় এলাকা সন্দ্বীপ ও সেন্টমার্টিনের প্রবাল দ্বীপসমূহ, কুতুবদিয়া, মহেশখালি, কক্সবাজারে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়মিত অপারেশনের ফলে হাজার হাজার মানুষকে নিরাপত্তা প্রদান করে যাচ্ছে।

৪.
সমুদ্র বাণিজ্য রক্ষায় নৌবাহিনীর অবদানের কথা বলতে গেলে সমুদ্র বিজয়ের প্রসঙ্গ এসে যায়। কারণ সেখানেও নৌবাহিনীর অবদান রয়েছে। ২০১২ এবং ২০১৪ সাল ছিল আমাদের সমুদ্র বিজয়ের উৎসবের বছর। বাংলাদেশ ১৪ ডিসেম্বর ২০০৯ সালে মিয়ানমারের বিপক্ষে জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত সমুদ্র আইনবিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল এবং ভারতের বিপক্ষে নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত সালিশি ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করে। ট্রাইব্যুনালের ২১ জন এবং বাংলাদেশের নিযুক্ত টমাস মেনেশ ও মিয়ানমারের নিযুক্ত বার্নাড অক্সম্যানের সমন্বয়ে সর্বমোট ২৩ জন বিচারক মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ মীমাংসার মামলার রায় প্রদান করেন। সে অনুযায়ী ২০১০ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ দাবি পেশ করে। একই বছরের ১ ডিসেম্বর পাল্টা দাবি পেশ করে মিয়ানমার। ২০১১ সালের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ জবাব দেয় এবং ওই বছরের ১ জুলাই তার প্রতিবাদ করে মিয়ানমার। পরে দাবি-পাল্টা দাবির পর ২০১১ সালের ৮ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে মৌখিক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। তাতে বাংলাদেশের সে-সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি যুক্তি উপস্থাপন করেন। আর মিয়ানমারের এজেন্ট ছিলেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল ড. তুন শিন। বাংলাদেশের ডেপুটি এজেন্ট ছিলেন অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম। যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অবশেষে ১৪ মার্চ ২০১২ বাংলাদেশ-মিয়ানমার মামলায় আন্তর্জাতিক আদালত বাংলাদেশের যৌক্তিক ন্যায্যতাভিত্তিক দাবির পক্ষে ঐতিহাসিক রায় দেয়। এর ফলে আমরা পেয়েছি জলসীমা, তেমনি এই রায়ের সঙ্গে সঙ্গে মহীসোপানে বাংলাদেশের অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের সেই চূড়ান্ত রায়ের বিপক্ষে আর কোনো আদালতে আপিলও করা যাবে না। এই রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি জলসীমা পেয়েছে। বাংলাদেশ সেন্টমার্টিন দ্বীপের জন্য ১২ নটিক্যাল মাইল রাষ্ট্রাধীন সমুদ্র এলাকা, ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল সীমানা এবং মহীসোপানে অধিকার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বাংলাদেশের অনুকূলে এ রায় প্রদানে বাংলাদেশ নৌবাহিনী হাইড্রোগ্রাফিক ডিপার্টমেন্টের তত্ত্বাবধানে সাইড স্ক্যান সোনারের মাধ্যমে সমুদ্রের তলদেশে যে কোনো ডুবন্ত জাহাজ ও সাবমেরিন শনাক্তকরণ এবং ইউএইচএফ স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে ডিজিপিএস দ্বারা গভীর সমুদ্র এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান সঠিকভাবে নিরূপণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পুনরায় ২০১৪ সালের ৮ জুলাই আমাদের জাতীয় জীবন পুনরায় আনন্দে উথলে উঠল। সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারতের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পন্ন হওয়ার রায় পঠিত হলো বাংলাদেশ নামক গৌরবান্বিত ভূখন্ডে। এই রায়ের ফলে দীর্ঘদিনের বিরোধের শান্তিপূর্ণ ও আইনি সমাধান হয়েছে, নিশ্চিত হয়েছে দুই দেশের নতুন সমুদ্রসীমা। রায়টি বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের পর ভারতের সঙ্গেও নিশ্চিত হলো ন্যায্য অধিকার, জয় হলো বন্ধুত্বের। ওই দিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের (পিসিএ) রায়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিরোধপূর্ণ সমুদ্র সীমানার আনুমানিক ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটারের অধিকার পেয়েছে বাংলাদেশ। এই বিজয় ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বের বিজয়। এই রায় উভয় রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এখন থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইলে বাংলাদেশের প্রবেশ সংরক্ষিত থাকবে। এতে আমাদের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ এতে লাভবান হবে। সমুদ্রসীমা নিয়ে রায়ে এককভাবে কোনো দেশ বিজয়ী হয়নি। উভয় দেশ সমতার ভিত্তিতে জয়ী হয়েছে। তবে কৌশলগত দিক দিয়ে রায়ের আগেই জয়ী হয়েছিল বাংলাদেশ। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বাইরে আন্তর্জাতিক কোনো আদালতে ভারতকে নিতে পেরেছে আমাদের দেশ। বাংলাদেশ ভারতকে নেদারল্যান্ডসের হেগে স্থায়ী সালিশি আদালতে (পার্মান্যান্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন, সংক্ষেপে পিসিএ) নিতে পেরেছে বলে জয় এসেছে আনন্দময় হয়ে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধ ছিল বঙ্গোপসাগরের ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে। এ বিরোধের মূল বিষয় হলো দুদেশের জলসীমা শুরু হবে কোথা থেকে তা নির্ধারণ করা। এছাড়া ভূমিরেখার মূলবিন্দু থেকে সমুদ্রে রেখা টানার পদ্ধতি নিয়েও জটিলতা ছিল। ভারতের যুক্তি হলো, সমদূরত্বের (ইকুইডিসট্যান্স) ভিত্তিতে রেখা টানতে হবে। বাংলাদেশ এর বিরোধিতা করে ন্যায্যতার (ইকুইটি) ভিত্তিতে রেখা টানার পক্ষে অবস্থান নেয়। বাংলাদেশের উপকূলীয় রেখা অবতল আকৃতির হওয়ায় বাংলাদেশ ন্যায্যতার ভিত্তিতে বিষয়টি নির্ধারণে যুক্তি উপস্থাপন করে। এর আগে মিয়ানমারের সঙ্গে মামলায় ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভারতের সঙ্গেও একই ভিত্তিতে বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের বড় অংশ বাংলাদেশের ভাগে পাওয়া গেছে। নেদারল্যান্ডসের রাজধানী হেগে অবস্থিত স্থায়ী সালিশি আদালতের কার্যবিধি অনুযায়ী ২০১৩ সালের ৯ থেকে ১৮ ডিসেম্বর সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পক্ষে বাংলাদেশ ও ভারত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। শুনানি শেষে আদালতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, কার্যবিধির ১৫ ধারা অনুযায়ী, ছয় মাস পর এ দুই নিকট প্রতিবেশীর সমুদ্রসীমা নির্ধারণের রায় দেওয়া হবে। সেই রায় ৮ জুলাই প্রকাশিত হয়েছে।
এ রায় শেখ হাসিনা সরকারের অবশ্যই একটা বড় সাফল্য। এর আগে বাংলাদেশ পেয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার নটিক্যাল মাইল আর তারপর পাওয়া গেছে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটারের অধিকার। আমাদের সামুদ্রিক সীমানা বৃদ্ধি পাওয়ায় এদেশ সমৃদ্ধির সোপানে উঠতে পারবে সহজেই। তাছাড়া বিশ^ উষ্ণায়নের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সংকট মোকাবেলা ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য সমুদ্রভিত্তিক গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য দরকার জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সমুদ্রোপকূল বনায়নের কর্মসূচিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। এই রায়ের ফলে প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের বিষয়টি সুরাহা হওয়ায় বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের টেরিটোরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে পেরেছে।
মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নৌবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বঙ্গোপসাগরের মহীসোপানে বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠার জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। বঙ্গোপসাগরে আমাদের যে ন্যায়সংগত অধিকার ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে মামলার নিষ্পত্তির মাধ্যমে যে এলাকায় আমাদের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো সেসব এলাকায় সব ধরনের জৈব, খনিজ, সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ ও আহরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলের ব্যবস্থা করা এবং এই সমুদ্র অঞ্চলের নিরাপত্তাবিধানের লক্ষ্যে গৃহীত সব উদ্যোগ অব্যাহত রাখা বর্তমান সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। সমুদ্রসীমা নির্ধারণের মধ্য দিয়ে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে মৈত্রীর বন্ধন আরও দৃঢ় হয়েছে এবং নৌবাহিনীর সঙ্গে ওই দুই দেশের সম্পর্ক অধিকতর উন্নত হয়েছে।

৫.
এটা সত্য যে, কোনো দেশের সমুদ্রসীমা কখনোই ঝুঁকিমুক্ত নয়, এদিক থেকে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা শত্রুমুক্ত রাখতে এবং সমুদ্র বাণিজ্যকে রক্ষার জন্য আমাদের নৌবাহিনীকে সদা সচেষ্ট থাকতে হচ্ছে। কারণ তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে আমাদের সমুদ্রসীমা রক্ষা এবং অপরিসীম সমুদ্র সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণ করা। আর বঙ্গোপসাগরের সম্পদরাজির যথাযথ সংরক্ষণ আমাদের নিজেদের উন্নয়নের স্বার্থেই প্রয়োজন। গোটা বিশ্বের মানুষ আজ পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। একটি সমুদ্র উপকূলীয় দেশ হিসেবে আমাদের দেশের জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান হার সমুদ্র নির্ভরতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। সমুদ্র থেকে প্রাপ্ত সকল খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে লক্ষণীয় ভূমিকা পালন করতে পারে। আর এসব সম্পদের মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশের জনগণের খাদ্যের নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারি।
এদেশের বিশাল সমুদ্রাঞ্চলে রয়েছে মৎস্য, গ্যাস ও অন্যান্য খনিজ সম্পদসহ অনাবিষ্কৃত মূল্যবান সম্পদ। এসব সম্পদ রক্ষা, আহরণ ও সমুদ্র এলাকার সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী, আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য নৌবাহিনী গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। বিশাল সমুদ্র নৌবাহিনীর কর্মক্ষেত্র। লোকচক্ষুর অন্তরালে উত্তাল সমুদ্রে দিবারাত্রি কঠোর পরিশ্রম ও কর্তব্যনিষ্ঠার যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তারা স্থাপন করেছেন দেশবাসী তা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। উপরন্তু নৌবাহিনীর সদস্যরা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের তৎপরতা সকলের প্রশংসা অর্জন করেছে। কেবল সমুদ্র বাণিজ্য রক্ষায় নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশ নৌবাহিনী এখন অনেক বেশি কার্যকর, শক্তিশালী এবং গতিশীল বাহিনী হিসেবে পরিচিত।

লেখক : অধ্যাপক  এবং পরিচালক জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৭ অক্টোবর ২০১৯

  • ৩ অক্টোবর ২০১৯

  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯