জাতিসংঘে সৃজনশীল বাংলাদেশের উজ্জ্বল উপস্থিতি

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৭, ১৪:৪৭

অনলাইন ডেস্ক

ড. আতিউর রহমান

২০৫০ সাল নাগাদ এই পৃথিবীতে আরো দুই বিলিয়ন জনসংখ্যা যুক্ত হবে। ৭০ শতাংশ মানুষ তখন নগরে বাস করবে। নদ-নদী, সমুদ্র, পাহাড়, স্থলভূমি সর্বত্রই এই বাড়তি জনসংখ্যার চাপ বাড়বে। শুধু পরিবেশের অবনতির কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা অনেকাংশে বাড়বে। পুরনো অবকাঠামো তদ্দিনে প্রায় অচল হয়ে যাবে। নতুন করে টেকসই অবকাঠামো গড়তে আগামী ১৫ বছরের মধ্যেই ৯০ ট্রিলিয়ন ডলারের মতো বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে
দেশে বাংলাদেশ নিয়ে যত নেতিবাচক প্রচারণা শুনতে ও দেখতে পাই বিদেশে আন্তর্জাতিক ফোরামে ঠিক তার বিপরীতটাই শুনতে ও দেখতে পাই। তাহলে স্বদেশের অর্জনগুলো কি আমরা দেশের মানুষের কাছে ঠিকমত তুলে ধরতে পারছি না? নাকি বিপুল এই জনসংখ্যার দেশে আশেপাশে ঘটে যাওয়া নিত্যদিনের অসংগতি, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে আমাদের ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা ‘আরেক বাংলাদেশে’র সাফল্যের বিষয়গুলো আমাদের ঝাপসা চোখে ধরা পড়ছে না? বিদেশি পর্যবেক্ষকরা খোলা চোখে যা দেখতে পাচ্ছেন আমরা কেন তা দেখতে পাচ্ছি না?
সমকালীন বাংলাদেশের বিপরীত এই প্রতিচ্ছবি আসলেই এক বড় খটকা। তাহলে কি একথাটিই সত্যি যে, শুধু ভালো কাজ করাই যথেষ্ট নয়, জনগণও যেন মনে করেন কাজটি আসলেই ভালো?সে কারণেই কি ‘পারসেপশন’-এর এই বৈপরীত্য? এ প্রশ্নের উত্তর খুব সহজে দেওয়া মুশকিল। তবে বিদেশি বিশ্লেষকদের চোখে বিশ্ব পরিসরে সমসাময়িক বাংলাদেশের উজ্জ্বল উপস্থিতির বেশকিছু কারণ লিপিবদ্ধ করা যায়। সবচেয়ে প্রথমেই যে কথাটি বিদেশিরা বলেন, তাহলো বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশের ম্যাক্রো অর্থনীতি শুধু যে স্থিতিশীল ও বাড়ন্ত তাই নয়, এর সুফল সমাজের নিচের তলার মানুষের কাছেও পৌঁছতে পারছে। তাই দশক জুড়েই বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ছয় শতাংশের বেশি এবং একই সঙ্গে দারিদ্র্যের হারও (বিশেষ করে অতি দারিদ্র্যের হার) দ্রুত কমছে। আমাদের প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান সঞ্চারী। প্রবৃদ্ধির বাড়ন্ত ‘কেক’ আমরা সকলেই ভাগ করেই খাচ্ছি। কমছে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার। বাড়ছে জীবনের গড় আয়ুস্কাল। আয়-বৈষম্য অনেকটাই স্থিতিশীল। ভোগ-বৈষম্য কমতির দিকে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ধীরে হলেও বাড়ছে। সামাজিক অশান্তি কমছে। মানুষ খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজে পাচ্ছে। সৃজনশীল উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়ছে। খুব শিগগিরই ‘ফোরজি’ মোবাইল প্রযুক্তির যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। এর ফলে ‘মোবাইল ফার্স্ট’ সম্পর্কিত ব্যবসা-বাণিজ্য, সার্ভিস, জন-প্রশাসন সেবার ব্যাপক প্রসার ঘটবে। গতিও বাড়বে। সরকারের সার্বিক অর্থনৈতিক নীতি কৌশল গরিব-হিতৈষী। মুদ্রানীতিও বিনিয়োগ এবং উদ্যোক্তা-বান্ধব। তাই ক্ষুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যাও। স্থানীয় বাজারের আকার যেমন বাড়ছে, রপ্তানিও তেমনি বাড়ছে। বাড়ছে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। রেমিটেন্স খানিকটা কমলেও সমাজ ও অর্থনীতিতে তার প্রভাব এখনো ব্যাপক। এসবই শুধু আমার কথা নয়। সম্প্রতি ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে’র এক প্রতিবেদনেও এসব কথার প্রতিফলন ঘটেছে। বাংলাদেশকে ‘নয়া উদীয়মান ব্যাঘ্র’ বলে স্বাগত জানিয়েছে এই প্রতিবেদন। আর মার্কিন লেখক ও ব্রায়েনের বইয়ের প্রচ্ছদে সাতজন সফল নারী নেত্রীর একজন হিসেবে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্থান করে নিয়েছেন। তিনি গণতন্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে যেসব অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সংগ্রাম করেছেন সেসব এই বইতে স্থান পেয়েছে। জি-২০সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে এখন অহরহই তাঁর ডাক পড়ছে। তাঁর উপস্থিতি মানেই বাংলাদেশের সরব উপস্থিতি।
এমনি এক প্রেক্ষাপটে আমি সম্প্রতি জাতিসংঘে বাংলাদেশের যে উজ্জ্বল উপস্থিতি দেখে এলাম সেই কথাগুলো পাঠকদের জানাতে চাই। গত মাসের ১২ থেকে ১৫ তারিখ আমি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পিটার টমসনের আমন্ত্রণে নিউইয়র্ক গিয়েছিলাম। প্রথম তিনদিন নিউইয়র্কের অদূরে টেরিটাউনে রকফেলার ব্রাদার্স ফান্ডের চমৎকার পোকান্টিকো সেন্টারে এক রিট্রিটে অংশগ্রহণ করি। টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়ন প্রক্রিয়া জোরদার করার লক্ষ্যে আয়োজিত এই রিট্রিটে জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা ছাড়াও  সরকারি, বেসরকারি, একাডেমিক ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। বারো তারিখ অপরাহ্নে আলোচনার সূত্রপাত করলেন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির নির্বাহী সচিব ডেনমার্কের প্রতিনিধি টমাস ত্রিশ্চেনসন। তিনি সাবেক মহাসচিব বানকি মুনেরও কয়েক বছরের নির্বাহী সচিব ছিলেন। অভিজ্ঞ এই কূটনীতিক শুরু করলেন বেশকিছু ভালো খবর দিয়ে। ২০১৬ সালে ১৩০ বিলিয়ন ডলারের সবুজ বন্ড বিক্রি হয়েছে। দু’বছর আগে এর পরিমাণ ছিল শূন্যের কাছাকাছি। তিনি আরো জানালেন, গোল্ডম্যান স্যাক্স আরো দেড়শ বিলিয়ন ডলারের সবুজ বন্ড বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছে। সমুদ্র সম্পর্কিত নীল অর্থনীতির প্রসারেও বন্ড ছাড়ার প্রস্তুতি চলছে। প্যারিসে জলবায়ু চুক্তি এবং বিশ্ব টেকসই লক্ষ্যমাত্রা চুক্তির কারণেই যে পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য অবকাঠামো বিনিয়োগে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলোর এই আগ্রহ বাড়ছে সে কথা বলতেও তিনি ভুললেন না। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই পৃথিবীকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে বাঁচানোর জন্য এই বিনিয়োগের পরিমাণ যে খুবই সামান্য সে কথাও তুলে ধরলেন এই রিট্রিটর অন্যতম আয়োজক জন হপিকন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আর্ভিং মিন্টজার। তিনি বললেন, ২০৫০ সাল নাগাদ এই পৃথিবীতে আরো দুই বিলিয়ন জনসংখ্যা যুক্ত হবে। ৭০ শতাংশ মানুষ তখন নগরে বাস করবে। নদ-নদী, সমুদ্র, পাহাড়, স্থলভূমি সর্বত্রই এই বাড়তি জনসংখ্যার চাপ বাড়বে। শুধু পরিবেশের অবনতির কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা অনেকাংশে বাড়বে। পুরনো অবকাঠামো তদ্দিনে প্রায় অচল হয়ে যাবে। নতুন করে টেকসই অবকাঠামো গড়তে আগামী ১৫ বছরের মধ্যেই ৯০ ট্রিলিয়ন ডলারের মতো বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। প্রতি বছর চার-পাঁচ ট্রিলিয়ন বিনিয়োগ বৃদ্ধির দরকার হবে। আর এই বিপুল পরিমাণের বিনিয়োগ সরকারগুলো একা করে উঠতে পারবে না। তাই ব্যক্তিখাতকে এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু একমাত্র চীন ছাড়া অন্যান্য দেশে ব্যক্তিখাত অবকাঠামো উন্নয়নে, বিশেষ করে রিনিউয়েবল জ্বালানি খাতে খুব বেশি বিনিয়োগ লক্ষ করা যাচ্ছে না। কেন ব্যক্তিখাত এখনো সেভাবে সাড়া দিচ্ছে না? এ প্রশ্নের উত্তরে আন্তর্জাতিক মার্কিন এক ব্যাংকের উর্ধ্বতন নির্বাহী আমল-লী আমীন জানালেন যে, ব্যক্তিখাত অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের আগে ঝুঁকিসমূহ ভালোভাবে বুঝতে চায়। বিনিয়োগের পর লাভ কেমন হবে তাও জানতে চায়। ঝুঁকি কমানোর জন্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেমন সহায়তা করবে তাও জানতে চায়। পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগের পরিমাণ কী হারে বাড়বে সে অংকটাও কষতে চায়। সরকার কতোটা সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারবে তাও জানতে চায়। আলাদা আলাদা নয় পুরো অবকাঠামো খাতকে সম্মিলিতভাবে তারা দেখতে চায়। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকার, বিনিয়োগকারী সংস্থা ও পরামর্শক সংস্থার মধ্যে আরো গভীর আন্তঃসংযোগ দেখতে আগ্রহী তারা। এই প্রক্রিয়া পিপিপি বা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ সম্পর্র্কিত নীতিমালা ও প্রণোদনা কেমন সে দিকটিও তাদের নজরে থাকবে। টেকসই অবকাঠামো খাত জাতীয় উন্নয়ন নীতি কৌশলে কতোটা খাপ খাওয়াতে পারবে তাও তাদের নজরে থাকবে। সুতরাং ব্যক্তিখাতকে পেতে হলে সরকারি খাতকে আরো সুদূর প্রসারী ও জলবায়ু সংবেদনশীল অবকাঠামো গড়ার প্রত্যয়ী হতে হবে। ভারতের ইয়েস ব্যাংকের প্রতিনিধি নমিতা বিকাশ  এ জন্য ‘ব্লেন্ডেড ফিনান্স’ বা ব্যক্তি ও সরকারি খাতের সংমিশ্রিত অর্থায়নের ওপর জোর দেন। অংশীদারিত্বমূলক কার্যক্রমের দিকে নজর দিতে বললেন। অর্থায়নের খরচের একাংশ সরকারের ভর্তুকি হিসেবে দেবার কথা বললেন। জলবায়ু সংবেদনশীল কৃষি, জ্বালানি খাতের অবকাঠামো গড়ার সময় এই প্রণোদনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি জানালেন। তাঁর ব্যাংক সামাজিক দায়িত্ববোধের অংশ হিসেবে এমন ধারার অর্থায়নে অংশ নিচ্ছে বলে জানালেন। এই পর্যায়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন বাংলাদেশ যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান শিকার এবং তা সত্ত্বেও তার সীমিত সম্পদকে পরিবেশসম্মত উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে সে কথা বেশ স্পষ্ট করেই তুলে ধরলেন। তাছাড়া তিনি এও জানালেন যে, কানাডা ও ক্যারিবীয় স্থায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে তিনি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নে কী করা দরকার সে বিষয়ে নিয়মিত নিবিড় পর্যালোচনায় অংশগ্রহণ করছেন। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর নেতা হিসেবে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সরব উপস্থিতির কথা শুনে বেশ খুশিই হলাম। বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি একজন অতিরিক্ত সচিবও টেকসই উন্নয়নে বাংলাদেশের অঙ্গিকারের কথা তুলে ধরলেন।
এই পর্যায়ে আমি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টেকসই অর্থায়নে যেসব সৃজনশীল উদ্যোগ নিয়েছে সেগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। বললাম, শুরুতেই ব্যাংকগুলোকে সবুজ অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বোঝাবার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিবেশ ও সামাজিক ঝুঁকি বিষয়ক নীতিমালার অধীনে আনার উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগকারীদের পরিবেশ ও সামাজিক ঝুঁকি বিচারে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হয়। এছাড়া, প্রায় ৫০টির মতো পরিবেশসম্মত খাতে সবুজ অর্থায়নের (যা মূলত সস্তায় পুনঃঅর্থায়ন) সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। একই সঙ্গে বস্ত্র ও চামড়াখাতে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে সস্তায় বিদেশি মুদ্রায় ঋণ প্রদানের জন্য ব্যাংকগুলোকে পুনঃঅর্থায়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সবুজ রূপান্তর নামের এই কর্মসূচির অধীনে দুশো মিলিয়ন ডলার পরিমাণ অর্থ নিজস্ব উৎস থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক সংস্থান করেছে। এর বাইরে, ব্যাংকগুলোকে সামাজিক দায়বোধে উদ্বুদ্ধ করে সামাজিক অবকাঠামো (যেমন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ভবন, ল্যাবরেটরি, হাসপাতাল দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র) স্থাপনের জন্য উৎসাহিত করে চলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ সরকার নিজেও তার বাজেটা থেকে প্রতিবছর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোচনের উদ্দেশ্যে বরাদ্দ দিয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি নিরসন তহবিল তৈরি করেছে বাংলাদেশ। রানা প্লাজা বিপর্যয়ের পরপরই জাইকার সহযোগিতা নিয়ে মাঝারি মাপের গার্মেন্টস কারখানাকে সামাজিক ও পরিবেশসম্মতভাবে সংস্কারের জন্য নয়া কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।  বিশ্বব্যাংক, জাইকা ও এডিবির সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক সোলার বিদ্যুতের প্রসার, সবুজ ইটভাটা নির্মাণসহ নানামুখী সবুজ অর্থায়ন কাজে নিজেদের যুক্ত রেখেছে। বাজেটেও সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সনাতনী জ্বালানি উৎপাদনে স্বল্প ও মধ্য মেয়াদী প্রকল্পেও অর্থায়ন করছে বাংলাদেশের আর্থিক খাত। তাছাড়া, বাংলাদেশ সরকার একশ’টি সুপরিকল্পিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে যাতে দেশি-বিদেশি ব্যক্তিখাত অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করতে পারে। অবকাঠামো বিনিয়োগে আঞ্চলিক সহযোগিতার সুযোগও সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ।
ভারতের বিদ্যুৎ বাংলাদেশে আনার জন্য সমন্বিত গ্রিড ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে দুই দেশ। আশা করা যায় নেপাল ও ভুটানও একসময় এই গ্রিডে যুক্ত হবে। মোটরযান চলাচলের জন্য যৌথভাবে আঞ্চলিক সড়ক উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করছে বাংলাদেশ এবং এই উপ-অঞ্চলের দেশগুলো। আঞ্চলিক নৌপথে একাধিক দেশের নৌপরিবহনের সুবিধের জন্যে অবকাঠামো গড়ে তুলছে বাংলাদেশ ও তার প্রতিবেশীরা। সাগরের সম্পদ আহরণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়তে মনোযোগী হয়েছে বাংলাদেশ। তবে আগামীদিনের অবকাঠামো মানেই ডিজিটাল অবকাঠামো। জনপ্রশাসন, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, সাধারণ ব্যাংকিং কর্মকা- পরিচালনার জন্য প্রয়োজন বিরাট আকারের ডাটা সেন্টার। দরকার হবে ডাটা পুনরুদ্ধার কেন্দ্রের। সফটওয়্যার পার্ক ও ডিজিটাল অবকাঠামো। এই নয়া জমানার নয়া ধাঁচের অবকাঠামো গড়ার দিকে বাংলাদেশ সরকার বড়মাপের উদ্যোগ নিয়েছে। আগামীদিনের অবকাঠামো যে পরিবর্তনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর সে বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বেশ পরিষ্কার। খোলামনে নয়া বাস্তবতা মোকাবিলা করতে আমরা প্রস্তুুত।
বাংলাদেশের এসব উদ্ভাবনীমূলক উদ্যোগের কথা শুনে জাতিসংঘের এই তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের অংশগ্রহণকারীরা অবাক বিস্ময়ে আমাদের কথা শুনেছেন। তারাই প্রস্তাব করেন যে এসব সাফল্যের কথা যেন জাতিসংঘ ডকুমেন্ট করে এবং অন্য দেশের প্রতিনিধিদের জানানোর ব্যবস্থা করে। সে কারণেই, অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতায় জাতিসংঘে কানাডীয় স্থায়ী প্রতিনিধি মার্ক-আঁন্ধ্রে আমার কাছে জানতে চাইলেন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ (এসডিজি) বাস্তবায়নে অর্থায়ন ও অন্যান্য সৃজনশীল উদ্যোগ নিয়ে আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন চলাকালে কানাডা ও বাংলাদেশের দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি বিশেষ সভার আয়োজন করলে কেমন হয়? আমি বললাম, ‘খুবই ভালো হয়। দু’দেশের মাঝে যে গভীর সম্পর্ক বিরাজ করছে এবং দুই প্রধানমন্ত্রীর জনবান্ধব, পরিবেশবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এই সভা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে।’ দেখা যাক তিনি এ নিয়ে কী করেন। জাতিসংঘের বেশ ক’টি সংস্থা থেকে পুরস্কৃত আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিঃসন্দেহে এমন সমাবেশে চোখে পড়ার মতো আলো ছড়াবেন।
একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও যে উন্নয়নমুখী ভূমিকা রাখতে পারে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নানামুখী তৎপরতা থেকে শেখার আছে বলে অনেক অংশগ্রহণকারীই তাদের আলোচনায় উল্লেখ করেন। আমি এর প্রতিউত্তরে জানিয়েছি যে এরপর যেন টেকসই উন্নয়নের অর্থায়ন বিষয়ক আলোচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের ডাকা হয় এবং সরকারের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকেও এই আন্দোলনে যুক্ত করা হয়। আমি আরো বলেছি যে জাতিসংঘের নৈতিক অভিভাবকত্বের সুনাম রয়েছে। তাই সকল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এবং অনুরূপ অন্য রেগুলেটরদের (যেমন- বীমা, শেয়ারমার্কেট বিষয়ক) একসাথে ডেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক সবুজ অর্থায়নের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার সুযোগ করে দিতে পারে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের ‘কনভেনিং’ ক্ষমতাবলেই প্রতিষ্ঠানটি একাজ করতে পারে। আরেকটি বিষয়ে আমি কথা বলেছি। বাংলাদেশের মতো অনেক উন্নয়নশীল দেশের ‘সভারিন রেটিং’ বিনিয়োগ গ্রেডের চেয়ে নিচে হয়ে থাকে। তাদের রেটিং উন্নত করার জন্য বিশ্বব্যাংকের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ‘মিগা’ বাড়তি গ্যারান্টি দিতে পারে। আর সেটা পাওয়া গেলে এসব দেশের ব্যক্তিখাত যেকোনো আন্তর্জাতিক উৎস থেকে প্রয়োজনীয় ঋণ নিতে পারে। সরকারি খাতও এর সুবিধে নিতে পারে। বিশেষ করে এডিবি, আইডিবি, এআইআইবি ব্যক্তিখাতের জন্য অবকাঠামো ঋণের সুবিধে দিতে পারে। আর সে কারণে সরকার ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং রেটিং এজেন্সিগুলোর মাঝে আরো গভীর সংযোগ স্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে। আমরা বাংলাদেশে এমন উদ্যোগের সুফল পেয়েছি। এর ফলে জ্বালানি খাতের উন্নয়নের জন্য ব্যক্তিখাত বড় অংকের ঋণ নিতে সক্ষম হয়েছে।
জাতিসংঘের এই সভায় সবুজ অর্থায়নে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভূমিকার খানিকটা তুলে ধরতে পেরে নাগরিক হিসেবে নিজেকে ভাগ্যবানই মনে হচ্ছিল। এই সভায় আমি আরো বলেছি যে এশিয়াই হবে আগামী দিনের বিশ্ব প্রবৃদ্ধির প্রাণকেন্দ্র। আর বিপুল জনসম্পদের বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের অর্থায়ন প্রয়োজন হবে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ দশটির মতো মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বিদেশি অর্থও এসবে বিনিয়োজিত হচ্ছে। ব্যক্তিখাতও অংশ নিচ্ছে। তাই টেকসই অবকাঠামোর অর্থায়নে বাংলাদেশের অর্ভিজ্ঞতা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হবে বলে আমার মনে হয়। এই সভা শেষ হবার পরেরদিন আরেকবার সুযোগ পেয়েছিলাম বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন মোবাইল ব্যাংকিং-এর ইতিবাচক ভূমিকা বিষয়ে কিছু বলার জন্য। জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ১৫ জুন মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন অফিসে এ বিষয়ে একটি বক্তৃতা দেবার সুযোগ হয়েছিল।
এই বক্তৃতার শুরুতেই বলেছিলাম- “স্বাধীন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন তার মধ্যে শুরু থেকেই অন্তর্ভুক্তির ধারণাটি প্রোথিত রয়েছে।” কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন এইচডিআরও-এর সভাপতি ড. সেলিম জাহান এবং অংশ নেন ঐ কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। ইউএনডিপির অন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতিনিধিরাও এই কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন। এ সময় আমার এই বক্তব্য লাইভ স্ট্রিমিং-এর মাধ্যমে ইউএনডিপি কার্যালয়ের সকল বিভাগে এবং বিশ্বের সকল দেশে ইউএনডিপির স্থানীয় কার্যালয়গুলোতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। ঐ অনুষ্ঠানে আমি আরো বলেছিলাম যে, স্বাধীনতার পর সত্তরের দশকে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল খুবই প্রতিকূল রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক বাস্তবতার মধ্যে। এরপরও আজকের বাংলাদেশ মানব উন্নয়নের সূচকগুলোতে অগ্রগতি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বিবেচনায় সারাবিশ্বের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। একেবারে শুরু থেকেই নিজস্ব চিন্তা-ভাবনার জায়গা থেকে আর্থিক সেবা, কৃষি ও স্বাস্থ্যখাতে বাংলাদেশে যে সমস্ত সৃজনশীল উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে সেগুলোই দীর্ঘ মেয়াদে সার্বিক উন্নয়নের ভিত্তি রচনা করেছে। এখানে উদ্যোক্তাদের বিকাশের জন্য যথেষ্ট সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাপকভিত্তিক প্রণোদনা দেয়া হয়েছে এবং এর ফলে তারা দেশের উন্নয়ন যাত্রাকে আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে এবং বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখে চলেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক বিগত কয়েকবছর যাবৎ দেশের আর্থিক খাতে সৃজনশীল এবং ক্ষমতায়নের উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করে আসছে। এক্ষেত্রে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, নারী উদ্যোক্তা, গ্রিন ফাইন্যান্স এবং সিএসআর-এর দিকে বিশেষ মনোযোগ দেয়া হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ায় ‘করার মাধ্যমে শেখা’র কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সকল স্টেকহোল্ডারের সাথে মতবিনিময়ের মাধ্যমে ব্যাংক ও ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থার মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্বের উপর জোর দেয়া হয়েছে। এভাবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি প্রসারে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ব্যাংকভিত্তিক মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর নেতৃত্বের কারণে মাত্র পাঁচ ছয় বছরের মধ্যেই এক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য এসেছে। বর্তমানে ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করছেন এবং প্রায় দশ লাখ এজেন্টের মাধ্যমে এ সেবা দেয়া হচ্ছে। এদের ফলস্বরূপ কার্যত দেশের সকল স্তরের মানুষের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়েছে, এর মধ্যে সাধারণত যাদেরকে আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসা কঠিন মনে করা হয় তারাও রয়েছেন। এজেন্ট ব্যাংকিং এরকম আরেকটি ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর সৃজনশীল আর্থিক সেবা। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নিয়মিত কর্মঘণ্টার বাইরেও স্বল্পআয়ের মানুষদের বিশেষত গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য সহজে ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। বেশ কিছু কারণে বাংলাদেশে মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের দ্রুত প্রসার ঘটেছে। এগুলো হলো- এদেশের অর্থনীতি প্রধানত নগদ আদান-প্রদান নির্ভর, দেশের অভ্যন্তরে বিপুল পরিমাণ অর্থ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পাঠানো হয়ে থাকে। বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়ন ঘটছে। সর্বোপরি, এখানে ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবার বাজার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথাযথ নিয়ন্ত্রণের আওতায় রয়েছে। তবে এ কথা মানতেই হবে এখনো সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন: ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ আদান-প্রদানের প্রক্রিয়াকে শতভাগ নিরাপদ করে তুলতে হবে, বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদানকারীদের মধ্যে সমন্বয়করণ, সেবা প্রদানের সাথে যুক্ত সরকারি-বেসরকারি পক্ষগুলোর মধ্যে লভ্যাংশ ভাগাভাগির প্রশ্নে ঐকমত্যে পৌঁছা ইত্যাদি। আগামীদিনে মোবাইল ফোনে ফোর-জি প্রযুক্তির প্রসার ঘটলে আর্থিক খাতসহ অন্য সেবাখাতগুলোও প্রধানত মোবাইল ফোননির্ভর হয়ে উঠবে। কাজেই আর্থিক খাতের ডিজিটাল রূপান্তরকে একটি প্রধান অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, যাতে করে ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে আর্থিক গণতান্ত্রিকীকরণের প্রক্রিয়াটি অব্যাহত থাকে। এ কথা অনস্বীকার্য যে আগামী বছরগুলোতে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের প্রসারের ফলে অন্য সেবাখাতগুলোরও পরিবর্তন অব্যাহত থাকবে।
সভাপতির বক্তব্যে ড. সেলিম জাহান আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং সহকর্মীদের বিশ্বের যেখানেই এ ধরনের প্রশংসনীয় উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে তার সুফলগুলো লিপিবদ্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এসডিজির মূল চেতনা হলো- “কাউকে পেছনে না ফেলে এগুনো”। আর এই চেতনার জায়গা থেকেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার সফল উদ্যোগগুলোকে সকলের সামনে তুলে ধরা দরকার। জাতিসংঘের আরেকটি দপ্তরে এমনভাবে বাংলাদেশকে আলোকিত করার সুযোগ পেয়ে ফের নিজেকে গর্বিত একজন বলে মনে হয়েছিল।
লেখক : উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।
ই-মেইল: dratiur@gmail.com

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ আগস্ট ২০১৯

  • ০৮ আগস্ট ২০১৯