ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেন

প্রস্তাবিত ‘ঢাকা জাদুঘরে’ রূপান্তর : একটি প্রদর্শনী প্রতিপাদ্য ও রূপরেখা

প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০১৯, ১৬:১৩

আমিরুজ্জামান পলাশ

রোজ গার্ডেনের ধারাবাহিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য
পুরান ঢাকার টিকাটুলিতে এই ঐতিহাসিক বাড়িটি অবস্থিত। ‘১৯৩০ সালের প্রথম দিকে জমিদার ঋষিকেশ এই অট্টালিকাটি নির্মাণ করেন এবং বাড়ির চারপাশে ফুলবাগান ও অন্যান্য গাছ গাছালিতে দৃষ্টিনন্দিত পরিবেশ সৃষ্টি করেন। রোজ গার্ডেনের বহুবিচিত্র গোলাপের সুপ্রশস্ত উদ্যানে স্থাপিত বিচিত্র সকল মূর্তি ও অলংকরণের মাঝে ঝরনা ও দিঘির চিত্তাকর্ষক প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে নির্মিত সুবিশাল গম্বুজ, বর্ণময় অলংকৃত সারি সারি জানালা ও বৃহৎ স্ফটিকস্বচ্ছ ঝাড়বাতি সম্বলিত এই অট্টালিকাটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যকলার এক অনুপম নিদর্শন’ (বাংলাপিডিয়া)। ঋষিকেশ দাস ছিলেন ব্রিটিশ আমলে সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা একজন ধনী ব্যবসায়ী। তিনি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসায় খুবই সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্থ ছিলেন। তিনি উচ্চ বিত্তবান হয়েও তৎকালীন উচ্চ শ্রেণীয় সামাজিক ও ধর্মীয় প্রথা, রীতিনীতিতে অভ্যস্থ না হয়ে স্বীয় চিন্তাধারায় সাধারণভাবে চলাফেরা করতেন। ফলে ঢাকার সমাজের উচ্চ শ্রেণীয় খানদানি পরিবারগুলো তেমন পাত্তা দিত না ঋষিকেশ দাসকে (Rose Garden, Hamiduzzaman Khan,2006, p-9) । কথিত আছে যে তার অতিসাধারণ চলন-বলনের কারণে একবার তিনি জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর বাগানবাড়ি বলধা গার্ডেনের এক জলসায় গিয়ে বিব্রত ও অসম্মানিত বোধ করেন ও ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। এরপরই তিনি রোজ গার্ডেন প্যালেস তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি পুরান ঢাকার ঋষিকেশ দাস রোডে এই বাগানবাড়ি তৈরি করেন। ঋষিকেশ দাস কর্তৃক নির্মাণ এবং তৎপরবর্তী ধারাবাহিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে নিম্নে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হলো :
১৯৩০ সালে প্রায় ২২ বিঘা (৭ একর) জমির ওপর এ বাগানবাড়িটি নির্মাণ করেন ব্যবসায়ী হৃষিকেশ দাস। পশ্চিমমুখী এ দোতলা বাড়ির চারপাশে তিনি গোলাপ বাগানে সাজিয়ে তোলেন এবং এ বাড়ির নামকরণ করেন ‘রোজগার্ডেন’ (Rose Garden, Hamiduzzaman Khan,2006, p-9) । ১৯৩৬ সালে হৃষিকেশ দাস তার বন্ধু, বিত্তশালী ব্যবসায়ী, ‘প্রভিন্সিয়াল লাইব্রেরি’ নামক মুদ্রণ সংস্থার স্বত্বাধিকারী খান বাহাদুর কাজী আবদুর রশীদ-এর নিকট বাড়িটি বিক্রয় করেন। ফলে হৃষিকেশ দাসের নিকট থেকে ক্রয়সূত্রে খান বাহাদুর কাজী আবদুর রশীদ এ সম্পত্তির অধিকারী হন। ১৯৩৭ সালে কাজী আবদুর রশীদ সপরিবারে এ ভবনে বসবাস শুরু করেন এবং রোজ গার্ডেনের নতুন নামকরণ করেন ‘রশীদ মঞ্জিল’ (Rose Garden, Hamiduzzaman Khan, 2006, p-10) ।  
কাজী আবদুর রশীদ ছিলেন বিশিষ্ট প্রকাশনা ব্যবসায়ী। তিনি ১৯১৯ সালে ঢাকায় ‘প্রভিন্সিয়াল লাইব্রেরি’ নামে আধুনিক প্রকাশনা ও মুদ্রণ সংস্থা গড়ে তোলেন। ১৯৪৪ সালে খান বাহাদুর কাজী আবদুর রশীদের মৃত্যুর পর তার প্রথম স্ত্রীর গর্ভের দ্বিতীয় সন্তান কাজী আবদুর বাগিবের তত্ত্বাবধানে আসে রোজ গার্ডেন। রশীদের মৃত্যুর পর সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগাভাগি হওয়া (১৯৬৬ সাল) পর্যন্ত তার স্ত্রী, সন্তান ও পরিবার সকলে একত্রেই এ বাড়িতেই থাকতেন। তবে কাজী আবদুর বাগিব আলীগড় বিশ^বিদ্যালয় ও পরে ইংল্যান্ডের লিংকনস ইনে উচ্চ শিক্ষার্থে গমন করার পর থেকে তার বড় ভাই কাজী হুমায়ুন বশির-এর তত্ত্বাবধায়নে আসে রোজ গার্ডেন। তখন ভবনটি ‘হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি’ নামে পরিচিতি পায়। হুমায়ুন বশির সাহেব ১৯৫০-এর দশকে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি তখন ঢাকার একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদ ছিলেন এবং রোজ গার্ডেন তখন সামাজিক মিলন কেন্দ্রে পরিণত হয় (Rose Garden, Hamiduzzaman Khan, 2006, p-13) । ভারত বিভাগের (১৯৪৭) পর অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সভা এ ভবনে অনুষ্ঠিত হয় এবং বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এ ভবনে আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন এ বাড়িতেই ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠা হয় (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ২০১৫, পৃ-১১৯)। ১৯৬১ সালে ঢাকা থেকে নির্মিত ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্রটি ঢাকার রোজ গার্ডেনে চিত্র ধারণকৃত প্রথম চলচ্চিত্র।
১৯৭০ সালে হুমায়ুন সাহেব রোজ গার্ডেন বাড়িতে ‘বেঙ্গল স্টুডিও এন্ড মোশন পিকচার্স লি.’ নামক চলচিত্র নির্মাণ সংস্থাকে চলচ্চিত্র নির্মাণ কল্পে ভাড়া প্রদান করেন। ১৯৯৫ সালে কাজী আবদুর রকীব-এর মৃত্যুর পর রোজ গার্ডেনের মালিকানা পান স্ত্রী লায়লা রকীব (Rose Garden, Hamiduzzaman Khan,2006, p-18)

রোজ গার্ডেন সংরক্ষিত পুরাকীর্তি
The Antiquities Act-1968 এর আলোকে ১০ ধারা অনুযায়ী সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন নং-সা. ঐ. এ ১৬/৮৬/২৬১, তাং-২৫/১১/১৯৮৯ মোতাবেক প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয়।

রোজ গার্ডেন : অনন্য স্থাপত্যশৈলী
রোজ গার্ডেন ভবনটির মোট আয়তন ৭ হাজার বর্গফুট। উচ্চতায় ৪৫ ফুট। ৬টি সুদৃঢ় ও অলংকৃত থামের ওপর এই প্রসাদটি স্থাপিত। করিন্থীয়Ñ গ্রিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত মূল ভবনের দ্বিতীয় তলায় ৫টি কামরা আর একটি বড় নাচঘর আছে। নিচতলায় আছে ৮টি কামরা।
রোজ গার্ডেন ভবনের পশ্চিম ও উত্তর দিকের দেয়ালের মধ্যবর্তী অংশে দুটি মূল ফটক আছে। প্রবেশ ও বহির্গমনের জন্য স্থাপিত পশ্চিম দিকের ফটক দিয়ে প্রবেশ করলে প্রথমেই আছে একটি বিস্তীর্ণ খোলা প্রাঙ্গণ। সুদৃশ্য ফোয়ারা ও পাথরের ভাস্কর্য ইত্যাদি দ্বারা সজ্জিত রয়েছে প্রাঙ্গণটি। প্রাঙ্গণে বেদীর ওপর ওপর দ-ায়মান নারী ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছিল, সেগুলো বিদ্যমান রয়েছে। পূর্বাংশের মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে একটি আয়তকার পুকুর। পুকুরের পূর্ব ও পশ্চিম পাশের মাঝামাঝি একটি করে বাঁধানো পাকা ঘাট আছে। পশ্চিমমুখী দোতলা এই ইমারতটির দ্বিতীয় তলায় পরিবর্তিত নাম ‘রশিদ মঞ্জিল’ খোদিত রয়েছে। রশিদ মঞ্জিল খোদিত থাকলেও এটি রোজ গার্ডেন নামেই পরিচিত। ভবনের প্রবেশপথের সামনের চত্বরে ইট ও সিমেন্ট নির্মিত একটি সুন্দর ফোয়ারা রয়েছে। একটি সাত ধাপ বিশিষ্ট সিঁড়ি দিয়ে রশিদ মঞ্জিলের প্রথম তলায় যেতে হয়। এর সামনের দিকের মাঝামাঝি অংশের প্রতি কোঠার পাশাপাশি ৩টি খিলান দরজা আছে। ওপরের তলায় প্রতিটি খিলানের ওপর একটি করে পোডিয়াম আছে। লতাপাতার নকশা এবং বেলজিয়ামে তৈরি রঙিন কাচ দিয়ে শোভিত এ ভবনের সামনে আছে বাইরের দিকে উপবৃত্তাকার ঝুল বারান্দা। এর দুপাশে একটি করে করিন্থীয় পিলার আছে। পিলারগুলোর দুই পাশের অংশে প্রতি তলায় আছে একটি করে দরজা। ঔপনিবেশ আমলের শেষ দিকে ইউরোপীয় স্থাপত্যিক শিল্পশৈলীতে নির্মিত অনন্য সাধারণ ভবন এই ‘রোজ গার্ডেন’।

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি বাঙালিদের প্রত্যাশিত রাষ্ট্র ছিল না। বাঙালিদের স্বার্থ সুরক্ষায় ছাত্র-জনতা বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে স্বোচ্চার হতে থাকে। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দের প্রচেষ্টায় ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। শুরু হয় শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালের মার্চ মাস থেকেই মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠারলড়াই। পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র দুই বছরের মধ্যেই আওয়ামী লীগের যাত্রা শুরু হয় বাঙালিদের স্বার্থে সত্যিকার ও আপসহীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে। ১৯৪০-এর দশকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ নামে একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। এ প্রতিষ্ঠানটি অভ্যন্তরীণভাবে দ্বি-ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন সোহরাওয়ার্দী-হাশিম সাহেব এবং অন্য গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন খাজা সাহেব ও মওলানা আকরাম খাঁ। এ বিভক্তির মূলে ছিল- সোহরাওয়ার্দী-হাশিম গ্রুপ চাইতেন মধ্যবিত্তদের স্বার্থ রক্ষা করতে এবং অন্যদিকে খাজা গ্রুপ চাইতেন অভিজাত জমিদারদের স্বার্থ রক্ষা করতে। নিছক শ্রেণি স্বার্থে বিভক্ত এ গ্রুপিং তৎকালে জনগণ বনাম প্রাসাদ দ্বন্দ্ব হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো। সোহরাওয়ার্দী-হাশিম গ্রুপের সাথে বাংলার মধ্যবিত্ত ও ছাত্র-তরুণ শক্তি ও সমর্থন ছিল। তখন ঢাকায় ১৫০ মুগলটুলিতে পার্টি হাউস ছিল পূর্ব বাংলার তরুণ কর্মীদের প্রধান কেন্দ্র। অভিজাত খাজা গ্রুপের হেডকোয়ার্টার্স ঢাকার ‘আহসান মঞ্জিল’-এর বিপরীতে ‘১৫০ মুগলটুলির পার্টি হাউস’ গড়ে উঠেছিল জনগণের শক্তির কেন্দ্ররূপে (হারুন-অর-রশিদ, মূলধারার রাজনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৮-২০১৬, পৃ-১)।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শাসক গোষ্ঠী মুসলিম লীগকে কার্যত অভিজাতদের পকেট সংগঠন রূপে পরিচালনা করে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে শাসক গোষ্ঠী উপেক্ষা করে চলে। এ-রকম প্রেক্ষপটে শেখ মুজিব ভাষা, সংস্কৃতি এবং জনমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৪৯ থেকে ৫০ সালে ঢাকায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের জন্য শেখ মুজিব, শামসুল হক, মওলানা ভাসানী, ফজলুল হক ও আব্দুর রউফের বিরুদ্ধে একটা মামলা চলে। ওই মামলাটি লিয়াকত আলী খান ঢাকায় এলে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে একটা শোভাযাত্রা বের হয়। শোভাযাত্রাটিতে লাঠিচার্জ করা হয় ও শামসুল হককে গ্রেফতার করা হয় এবং কয়েকদিন পরে শেখ মুজিব ও মওলানা সাহেবকে গ্রেফতার করা হয়। মওলানা সাহেব ও শামসুল হককে মুক্তি দেওয়া হলেও শেখ মুজিবকে বিনা বিচারে নিরাপত্তা বন্দী করা হয়। পরবর্তীতে শেখ মুজিবকে তিন মাসের সশ্রম কারাদ- দেওয়া হয় আবার নিরাপত্তা বন্দীও রাখা হয় (শেখ মুজিবুর রহমান, কারাগারের রোজনামচা, ২০১৮, পৃ-৪০-৪১)। পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক এ-রকম প্রেক্ষাপটে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেমের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন বঙ্গীয় প্রদেশিক মুসলিম লীগের একাংশের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর কেএম দাস লেন রোডের রোজ গার্ডেন প্যালেসে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়।

স্বাধীনতা সংগ্রামী ও ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগের জন্মকথা
জাতির পিতা শেখ মুজিবের বয়ানে প্রেক্ষপট সম্বন্ধে বর্ণিত হলো : “টাঙ্গাইল উপনির্বাচনের শামসুল হক সাহেব জয় লাভ করার পর সরকারী দল সভায় ঘোষণা করলো, ‘যা কিছু হোক শামসুল হক সাহেবকে আইন সভায় বসতে দেওয়া হবে না।’ শামসুল হক সাহেব ইলেকশনে জয় লাভ করে ঢাকায় আসলে ঢাকার জনসাধারণ ও ছাত্রসমাজ তাঁকে বিরাট সম্বর্ধনা জানাল। বিরাট শোভাযাত্রা করে তাঁকে নিয়ে ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করল। আমরা জেলে বসে বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করলাম। শামসুল হক সাহেব ফিরে আসার পরেই পুরানা লীগ কর্মীরা এক কর্মী সম্মেলন ডাকল ঢাকায়Ñ ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করার জন্য। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন সে সভা আহ্বান করা হয়েছিল” (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ২০১৫, পৃ-১১৯)। আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তিনি পাকিস্তান সরকার বিরোধী মুসলিম লীগ বিরোধী নেতা কর্মীদের সাথে আগেই একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন। ফলে অভিজাত শ্রেণীর মুসলিম লীগ বিরোধী কর্মী সম্মেলন আহ্বানের যে প্রস্তুতি চলছিল, সেই কর্মী সম্মেলনটি মওলানা ভাসানীর নামেই আহ্বান করা হয়। কর্মী সম্মেলনের জন্য ঢাকা শহরের কোথাও হল বা জায়গা পাওয়া যায়নি। ফলে পুরাতন ঢাকার কেএম দাস লেনের কেএম বশির-এর প্রাইভেট বাড়ি ‘রোজ গার্ডেন’-এ (হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি নামে পরিচিত) ২৩ ও ২৪ জুন ১৯৪৯ তারিখে কর্মী সম্মেলনটি আহ্বান করা হয় (হারুন-অর-রশিদ, মূলধারার রাজনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৮-২০১৬, পৃ-৩)।
কর্মী সম্মেলনের জন্য খুব তোড়জোড় চলছিল। শেখ মুজিব জেলে বসেই সে খবর রাখছিলেন। ১৫০ নম্বর মুগলটুলিতে অফিস হয়েছে। শওকত মিয়া সকলের খাওয়া ও থাকার বন্দোবস্ত করত। আর একজন ঢাকার পুরানা লীগকর্মী ইয়ার মোহাম্মদ খান সহযোগিতা করছিলেন। শেখ মুজিব জেলের মধ্যে থেকে জানিয়ে দিলেন, ‘আর মুসলিম লীগের পিছনে ঘুরে লাভ নাই, এ প্রতিষ্ঠান এখন গণবিচ্ছিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। একি আর জণগণের প্রতিষ্ঠান বলা চলে না। তিনি জানালেন তিনি ছাত্র রাজনীতি আর করবেন না, তিনি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান করবেন এবং বিরোধী দল সৃষ্টি করতে না পারলে এ দেশে একনায়কত্ব চলবে (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ২০১৫, পৃ-১২০)।
যা হোক, আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রোজ গার্ডেনের কর্মী সম্মেলনে প্রায় ৩০০ প্রতিনিধি যোগ দেন। অনেক রাজনৈতিক নেতাও যোগ দিয়েছিলেন, যাঁদের মধ্যে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, খয়রাত হোসেন এমএলএ, বেগম আনোয়ারা খাতুন এমএলএ, আলী আহমেদ খান এমএলএ, আল্লামা রাগীব আহসান, হাবিবুর রহমান চৌধুরী ওরফে ধনু মিয়া প্রমুখ (হারুন-অর-রশিদ, মূলধারার রাজনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৮-২০১৬, পৃ-৩)।
সম্মেলনের প্রথম দিনে রোজ গার্ডেনেই ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি, শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (নিরাপত্তাবন্দি)-কে যুগ্ম সম্পাদক করে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠা হয় (Secret Documents of Intelligece Branch on Father of  The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Vol-1, 1948-1950; Edited by Sheikh Hasina, 2018,p-201) । আতাউর রহমান খানকে সহ-সভাপতি এবং ইয়ার মোহাম্মদ খানকে কোষাধ্যক্ষ করা হয়। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন (হারুন-অর-রশিদ, মূলধারার রাজনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৮-২০১৬, পৃ-৪)।
সকলে একমত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। এ সংগঠনের নামের সাথে ‘মুসলিম’ শব্দ যুক্ত হওয়া সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু মতামত হলো, “ আমি মনে করেছিলাম , পাকিস্তান হয়ে গেছে, সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নাই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু ম্যানিফেস্টো থাকবে। ভাবলাম, সময় এখনও আসে নাই। তাই যারা বাইরে আছেন তারা চিন্তাভাবনা করেই করেছেন (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ২০১৫, পৃ-১২১)।” শুরুর দিকে শওকত মিয়ার বাড়িই ছিল আওয়ামী লীগের অফিস (হারুন-অর-রশিদ, মূলধারার রাজনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৮-২০১৬, পৃ-৫)। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠনটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়; নাম রাখা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’। রোজ গার্ডেনে প্রতিষ্ঠিত সেদিনের আওয়ামী লীগের যাত্রা পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। অনেক কণ্টাকীর্ণ পথ অতিক্রম করে সংগ্রাম, গৌরব, সাফল্য আর ঐতিহ্যের এই আওয়ামী লীগ উপমহাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পেরেছে। কালানুক্রমিক সংগ্রাম, সাফল্য আর অর্জনের ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০১৯ সালে এসে আজ গৌরবের অভিযাত্রায় ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছে। ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ উদযাপন করবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী।

ঐতিহাসিক ভবন জাদুঘর (historic house museum) রূপান্তরের তাত্ত্বিক পর্যালোচনা
কোনো ঐতিহাসিক ভবনের মূল স্থাপত্যিক কাঠামো এবং ব্যবহারের উপলক্ষ্য ও তাৎপর্যকে অক্ষুণœ রেখে তার প্রতিফলন ঘটিয়ে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে জনসাধারণের জন্য প্রদর্শনের নিমিত্তে রূপান্তরিত জাদুঘরকে সাধারণত ঐতিহাসিক ভবন জাদুঘর (historic house museum) বলা হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক জাদুঘর কাউন্সিল  (ICOM) কর্তৃক ঐতিহাসিক ভবন জাদুঘর  (historic house museum) সম্পর্কে সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে, A historic house museum is a house that has been transformed into a museum. Historic furnishings may be displayed in a way that reflects their original placement and usage in a home. Historic house museums are held to a variety of standards, including those of the International Council of Museums. ঐতিহাসিক ভবন জাদুঘর কখনও কখনও স্মৃতি জাদুঘরেও রূপান্তরিত হয়। স্মৃতি জাদুঘর সাধারণত কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বের স্মরণে এবং সকল শোষিত মানুষের মর্যাদা রক্ষার্থে প্রচলিত ইতিহাস চর্চার বাইরে রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যা ও অতীত সম্পর্কে বিশ্লেষণমূলক, স্বাধীন চিন্তা-ভাবনাকে অনুপ্রাণিত করে। এ কারণে স্মৃতি জাদুঘরগুলো সমসাময়িক ইতিহাস জাদুঘরগুলোর অনন্য রূপ হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একে অপরকে সহযোগিতার জন্য বোঝার চেষ্টা করতে পারে। Memorial museums are usually created as part of a memorial complex maintained by the state. They are organized on sites where historical events took place or on the estate or in the home or apartment associated with a particular historical figure’s life and activities. Some museums arise from collections of objects memorial in nature (https://encyclopedia2.thefreedictionary.com/Memorial+Museums).
জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণা এবং আন্তর্জাতিক জাদুঘর কাউন্সিল (ICOM)-এর মূলনীতিগুলোর ওপর ভিত্তি করে International Committee of Memorial Museums (ICMEMO) ২০১২ সালে একটি সনদ ঘোষণা করে। সার্বজনীন মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার এবং সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের জন্য এ সনদ এবং সংস্থা ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা এবং এশিয়াতে অবস্থিত অনেক স্মৃতিস্তম্ভ ও স্মৃতি জাদুঘরগুলোর জন্য একটি ছাতা সংগঠন হিসেবে কাজ করে।
ঐতিহাসিক ভবনকে এবং সংস্কার-সংরক্ষণ ও জাদুঘরে রূপান্তরের ক্ষেত্রে ভেনিস সনদ অনুসরণ করার প্রয়োজন রয়েছে। International Council on Monuments and Sites (ICOMOS)  কর্তৃক ১৯৬৪ সালে গৃহীত আন্তর্জাতিক ভেনিস সনদে স্থাপত্যিক কাঠামো এবং ব্যবহারিক উপলক্ষ্য ও উপাদানের পরিবর্তন না করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ভেনিস সনদেও অনুচ্ছেদ ৬, ৯, ১২ ও ১৩ অনুসরণযোগ্য। ঐতিহাসিক ভবনকে সংস্কার-সংরক্ষণ ও জাদুঘরে রূপান্তরের ক্ষেত্রে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ হলো :open to the public and conserved in their original condition, have not been converted to accommodate collections put together from different sources, constitute a museum category of a special and varied kind.

ঐতিহাসিক ভবন জাদুঘর ও স্মৃতি জাদুঘরের মধ্যে একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সকল ঐতিহাসিক ভবন জাদুঘরই ‘স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর এক্ষেত্রে আদর্শ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচ্য। বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নিয়ন্ত্রণে ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর সড়কে জাতির পিতার বাসভবনকে ঐতিহাসিক ভবন হিসেবে গণ্য করে যথাÑ অবস্থায় বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের রূপান্তর করা হয়েছে এবং উক্ত ভবন সংলগ্ন সম্প্রসারিত একটি নতুন ভবন স্থাপন করে বঙ্গবন্ধুর পূর্ণাঙ্গ জীবন প্রণালি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ানুক্রমিক স্মৃতি স্মারক উপস্থাপনের মাধ্যমে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি সম্বলিত শিলাইদহ কুঠিবাড়িকে ঐতিহাসিক ভবন জাদুঘর হিসেবে কবিগুরুর স্মৃতি সম্বলিত জাদুঘরের রূপান্তর করা হয়েছে। আবার বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়নে ঢাকার নওয়াব বাড়ি খ্যাত আহসান মঞ্জিলকে জাদুঘরে রূপান্তরের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও বিশেষ ব্যক্তিত্বের মর্যাদাকে ভবনের সাথে সম্পর্কিত করে সমুন্নত রাখার প্রচেষ্টা রয়েছে। কিন্তু সকল ‘স্মৃতি জাদুঘর’ মাত্রই ঐতিহাসিক ভবন জাদুঘর নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে সাধারণত বিশেষ কোনো ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা বা প্রেক্ষিতের স্মৃতি সম্বলিত নিদর্শন ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত হয়ে একটি জাতীয় বা আঞ্চলিক পর্যায়ে ভিন্ন স্থানে নতুন ভবনে ‘স্মৃতি জাদুঘর’ স্থাপন করা হয়ে থাকে।

প্রস্তাবিত ঢাকা জাদুঘরের রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রদর্শনী প্রতিপাদ্যের একটি রূপরেখা
উপর্যুক্ত তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক উদাহরণের প্রেক্ষিত বিবেচনায় রেখে রোজ গার্ডেন ঐতিহাসিক ভবনের মূল স্থাপত্যিক কাঠামো এবং ব্যবহারের উপলক্ষ্য ও তাৎপর্যকে যতদূর সম্ভব অক্ষুণœ রেখে প্রস্তাবিত ঢাকা জাদুঘরের রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রদর্শনী প্রতিপাদ্যের একটি রূপরেখা উপস্থাপনের অবকাশ পাওয়া যায়। মূল প্রবেশ মুখের দেয়ালে পোড়ামাটির ফলকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন চিত্রাবলী উপস্থাপন করা যেতে পারে। সম্মুখের মাঠের দক্ষিণ দিকের দেয়ালে পোড়ামাটির ফলকে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃবৃন্দের প্রতিকৃতি ও রোজ গার্ডেনের মাঠে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাকালীন সভার চিত্র (আলোকচিত্র পাওয়া গেলে সে অনুয়ায়ী অথবা শিল্পীর দৃষ্টিতে)। রোজ গার্ডেনের মূল ভবন এবং ভবন সংলগ্ন সম্প্রসারিত অংশকে দুটি অংশে বিভক্ত করে ঢাকার ঐতিহ্য-সংস্কৃতিকে সময়ানুক্রমিক প্রদর্শনীর পরিকলাপনা করা যেতে পারে।
ষ প্রথম অংশ : রোজ গার্ডেনের মূল ভবন : ব্যবহারিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতকে যতদূর সম্ভব অক্ষুণœ রেখে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত, ভবনে ব্যবহার্য নিদর্শন, সংগৃহীত আলোকচিত্র, সংবাদচিত্র, পেইনটিং ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নিদর্শনাদি প্রদর্শন। নিচতলার হল রুমটি বৈঠকখানার আদলে বিন্যস্ত রেখে দেওয়াল প্যানেলগুলোতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সভা ও কার্যক্রমের আলোকচিত্র ব্যবহার করা যায়। অনুরূপভাবে নিচতলা ও দ্বিতীয় তলার অন্যান্য কক্ষতেও আদি প্রেক্ষিতকে অক্ষুণœ রেখে প্যানেলগুলোতে আলোকচিত্র উপস্থাপন করা যেতে পারে। নিচতলার হল রুম সংলগ্ন উত্তর দিকের দ্বিতীয় রুমে সময়ানুক্রম ঠিক রেখে রোজ গার্ডেন থেকে রশিদ মঞ্জিলে রূপান্তরের তথ্যাদি, বেঙ্গল স্টুডিও প্রতিষ্ঠার তথ্যাদি এবং এ ভবনকে ঘিরে হারানো দিন চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের আলোকচিত্র বা নিদর্শন প্রদর্শন করা যায়। এছাড়াও নিচতলার হল রুম সংলগ্ন উত্তর দিকের দ্বিতীয় রুমে ‘শিল্পীর দৃষ্টিতে রোজ গার্ডেন’ শিরোনামে একটি গ্যালারি স্থাপনের মাধ্যমে শিল্পী হামিদুজ্জামান খান-এর দৃষ্টিতে রোজ গার্ডেনের আলোকচিত্রাবলী প্রদর্শন করা যেতে পারে।
ষ দ্বিতীয় অংশ : ভবন সংলগ্ন সম্প্রসারিত অংশ : ভবন সংলগ্ন পেছনের দিকে সম্প্রসারিত যে নতুন স্থাপনা রয়েছে, ওই নতুন স্থাপনার অংশটুকু অপসারণ করে জাদুঘরের আদলে একতলা প্রদর্শনী গ্যালারি প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। তবে প্রতিস্থাপিত সম্প্রসারিত গ্যালারি স্থাপনাটি কোনোক্রমেই একতলার অধিক ভবন করা যাবে না। সম্প্রসারিত অংশে উচ্চ ভবন নির্মিত হলে মূল স্থাপনার তাৎপর্য ও অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য ক্ষুণœ হবে। এ অংশে ঢাকার প্রাচীন ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকে সংগৃহীত বিভিন্ন নিদর্শনাদির (প্রাচীন মানচিত্র, সংগৃহীত আলোকচিত্র, সংবাদচিত্র, পেইনটিং, প্রস্তরলিপি, ভাস্কর্য, পোড়ামাটির ফলক, মুদ্রা, ঢাকার বৈচিত্র্যপূর্ণ নিত্য ব্যবহার্য ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নিদর্শনাদি) কালানুক্রমিক বিভাজনের মাধ্যমে ধারাবাহিক প্রদর্শন। সম্প্রসারিত অংশের গ্যালারিতে ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে নিন্মোক্ত ৫টি জোনে ভাগ করে কালানুক্রম সাজানো যেতে পারে :
ক. প্রাক মুসলিম যুগ জোন; খ. সুলতানী যুগ জোন; গ. মোগল যুগ জোন; ঘ, ঔপনিবেশিক যুগ জোন এবং ঙ. স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আওয়ামী লীগ জোন।
সম্প্রসারিত অংশের প্রস্তাবিত গ্যালারিতে ‘প্রাক মুসলিম যুগ জোনে’ ঢাকার ভৌগোলিক পরিচয়, নগর জীবনের সন্ধান, ঐতিহাসিক ঢাকায় রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থান ও সাংস্কৃতিক অবস্থান, প্রাচীন ঢাকার সন্ধানে এবং সাভারের রাজা হরিশ চন্দ্র প্রাসাদ ঢিবিতে প্রতœতাত্ত্বিক খননে প্রাপ্ত আনুমানিক খ্রিষ্টাব্দ পঞ্চম শতকের নিদর্শন যথা : মুদ্রা, বৌদ্ধ মূর্তি ও অন্যান্য প্রতœবস্তু উপস্থাপন করা যেতে পারে।
প্রস্তাবিত গ্যালারিতে ‘সুলতানী যুগ জোনে’ একটি প্রাচীন প্রশাসনিক কেন্দ্র, সুলতানি যুগে ঢাকা, ইকলিম মুবারকাবাদের রাজধানীসহ নারিন্দার বিবি বিনত মসজিদের সংগৃহীত শিলালিপি বা আলোকচিত্র ও অন্যান্য প্রতœবস্তু উপস্থাপন করা যেতে পারে।
প্রস্তাবিত ‘মোগল যুগ জোনে’ বারোভুঁইয়াদের যুগে ঢাকা, মোগল ঢাকার গঠন পর্ব, মোগল অধিকারে পরাধীন ঢাকা, ঢাকায় ইসলাম খান চিশতি, জমে উঠতে থাকে বাংলা সুবার রাজধানী, মোগল ঢাকার ১০০ বছর, মোগল পর্বে ঢাকার সমৃদ্ধি, ঢাকার মোগল পুরাকীর্তিসমূহের চিত্রাবলী ও প্রতœবস্তু উপস্থাপন করা যেতে পারে।
প্রস্তাবিত ‘ঔপনিবেশিক যুগ জোনে’ ঔপনিবেশিক যুগে ঢাকা, ঢাকার নবাব, ঢাকার পঞ্চায়েত ব্যবস্থা, পাকিস্তান আমলে ঢাকার পুরাকীর্তি ও ঐতিহ্য সম্পর্কিত নিদর্শনাদি প্রদর্শন করা যেতে পারে।
উপরে বর্ণিত যুগ বিভাজনের আওতায় বিভিন্ন উপজোন তৈরি করে কালানুক্রম নির্ধারণ নিন্মোক্ত বিষয়গুলোর সাথে সম্পর্কিত নিদর্শনাদি, আলোকচিত্র, মানচিত্র বা বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ করে উপস্থাপন করা যেতে পারে :
‘ঢাকা’ নামের উৎস খোঁজা, ‘ডবাক’ থেকে ‘ঢাকা’ এবং অনন্য, দোলাই নদী থেকে ধোলাই খাল, আদি সূত্রাপুর, ঢাকায় মুসা খাঁন স্মৃতি, সুবাদার কাশিম খান চিশতির স্মৃতি নিদর্শন, সুবাদারদের ঢাকায় আগমন, পর্তুগিজ আগমন, ঢাকায় শিয়া বসতি, ঢাকায় ইমামবাড়া ও তাজিয়া মিছিল, কীর্তিতে উজ্জ্বল শায়েস্তা খান, ঢাকার বাণিজ্যে মাড়োয়ারি, মোগল ঢাকায় হাতি নিয়ে যত কথা, মিয়া সাহেব ময়দান থেকে আন্টা ঘরের ময়দান, ঢাকায় সিপাহি বিদ্রোহ, ঢাকায় মাহে রমজান, ঢাকায় ঈদ উৎসব, পুরান ঢাকার বিয়ে অনুষ্ঠান, ঢাকার কাটরা, মোগল জলদুর্গ, লালবাগ দুর্গ হাম্মাম, জিঞ্জিরা দুর্গ, মোগল স্থাপত্যের অনন্য উদাহরণ (হাজী খাজা শাহবাজ মসজিদ ও সমাধি, পরীবিবির সমাধি সৌধ লালবাগ শাহী মসজিদ, সাত গম্বুজ মসজিদ, চক মসজিদ), ঢাকেশ^রী মন্দির, রমনা কালীমন্দির, নিমতলী দেউড়ি, ঢাকার আর্মেনীয় গির্জা, আহসান মঞ্জিল, ঢাকায় ছাপাখানা, মুসলমানি পুঁথি পট্টি, উনিশ শতকে ঢাকার সাহিত্যপত্র, ঢাকায় রেলব্যবস্থা, ঢাকার নৌ যোগাযোগ, ঢাকায় বিজলি বাতি, পানীয় জলের পুরনো উৎস, ঘোড়দৌড় প্রথা চালু ও বিলুপ্তি, ঢাকায় নাট্যমঞ্চ ও মঞ্চায়ন, স্মৃতিময় রূপলাল হাউস, বুড়িগঙ্গা নদী ও বাকল্যান্ড বাঁধ, বঙ্গভঙ্গ ও কার্জন হল, মিটফোর্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, ঢাকা মেডিকেল স্কুল, ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠা, ইডেন মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা, ঢাকায় কবি মধুসূদন দত্ত, ঢাকায় রবীন্দ্রনাথ, ঢাকায় কবি নজরুল (এ কে এম শাহনাওয়াজ, ঢাকা : ইতিহাস ও ঐতিহ্য, ২০১৮)।
প্রস্তাবিত ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আওয়ামী লীগ জোনে’ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট, ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত, রোজ গার্ডেনে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার সংগ্রামে, ঐতিহ্যে, স্বদেশ নির্মাণ ও উন্নয়নে আওয়ামী লীগের ভূমিকা, রোজ গার্ডেন থেকে ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, ১৫০ মোগলটুলি, বিউটি বোর্ডিং, ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং ৭ মার্চ, ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২, ঢাকার গেরিলা অপারেশন নিয়ে সংবাদ ভাষ্য, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ ও বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়সহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর নিদর্শনাদি, আলোকচিত্র, মানচিত্র বা বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ করে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

উপসংহার
রোজ গার্ডেনের স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য অনন্য ও মাস্টারপিস। মোগল স্থাপত্য, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক, লোকজ ও ইউরোপীয় স্থাপত্যের চমৎকার সম্মিলনে গড়ে উঠেছে রোজ গার্ডেনের স্থাপত্য। এ স্থাপনাটি আওয়ামী লীগের জন্মেও সাক্ষী হিসেবে যেমন ইতিহাসের অংশ তেমনি স্থাপত্যশৈলী হিসেবেও রোজ গার্ডেনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অধিক। সংগত কারণেই ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে মুজিব বর্ষে এবং ২০২১ সালে মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দলের জন্ম ভবনকে ঘিরে উপর্যুক্ত প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় রোজ গার্ডেনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাবিত ‘ঢাকা জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি।

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

 

পুরনো সংখ্যা
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ আগস্ট ২০১৯

  • ০৮ আগস্ট ২০১৯