দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্র পণ্ডিত

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০১৭, ১৫:৪৯ | আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৬:৩৫

অনলাইন ডেস্ক

দেবাহুতি চক্রবর্তী :

বিশেষণের পর বিশেষণ সাজিয়ে ও দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্র প-িতের পরিচয় আমার পক্ষে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। যদিও সাংবাদিক হিসেবেই তিনি বেশি পরিচিতি এবং প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। এবং নিঃসন্দেহে সংবাদকর্মী হিসেবে তার দক্ষতা, তীক্ষèতা, সততা, নির্ভীকতা, বিশ্লেষণধর্মিতা, সমাজ ও রাজনৈতিক সচেতনতা সর্বোপরি নিজ ভাষা ও নিজ দেশের প্রতি ভালোবাসা যে কোনো সময়ের যে কোনো মানুষের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১২৮৮ বঙ্গাব্দ (ইং ১৮৮১) ১৩ বৈশাখ বীরভূমে মামা বাড়িতে দাদাঠাকুরের জন্ম। ৮৭ বছর পর সেই ১৩ বৈশাখ, ১৩৭৫ বঙ্গাব্দ (ইং ১৯৬৮) তিনি মারা যান। এই দীর্ঘ জীবনে তিনি ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন ভারতবর্ষ এবং দেশবিভাগ পরবর্তী স্বাধীন ভারতবর্ষকে নিবিড়ভাবে দেখেছেন। এবং তার স্বভাবসুলভ ব্যঙ্গ (ঝধঃরৎব) এবং হাস্যরস (ঐঁসড়ঁৎ)-এর মাঝ দিয়ে সংবাদ এবং সম্পাদকীয়র নীরস তথ্যসমূহ অত্যন্ত সরসভাবে পরিবেশন করেছেন। অথচ তাতে বিষয়ের গুরুত্ব এতটুকুও কমেনি। বরং সমাজ ও রাজনীতির বিভিন্ন অসংগতি, অন্যায়, কূট-কাচাল ও জটিলতাকে তার লেখার মাঝ দিয়ে সাধারণ মানুষ অতি সহজে উপলব্ধি করতে পেরেছে। আর এখানে অবশ্যই তিনি স্বতন্ত্র ধারার পথিকৃৎ। ব্যতিক্রমী পথিকৃৎ।
মুশীর্দাবাদ জেলার জঙ্গীপুর ইউনিয়নের দফরপুর গ্রামে পৈত্রিক ভিটাই শরৎচন্দ্র প-িতের স্থায়ী নিবাস। ১২৫ ঘর অশিক্ষিত চাষি পরিবারের মাঝে একমাত্র শিক্ষিত পরিবার। গ্রামের হিন্দু মুসলিম সবার কাছে সম্পর্কভেদে কাকাঠাকুর, বাবাঠাকুর, দাদাঠাকুর। শেষ অবধি সব সম্পর্কই এক সম্বোধনে গিয়ে ঠেকে। দাদাঠাকুরই হয়ে ওঠে একমাত্র পরিচয়। শরৎচন্দ্র প-িত নামটা প্রায় চাপা পড়ে যায়। শহর কলকাতা ও তাকে দাদাঠাকুর হিসেবেই পরবর্তীতে আপন করে নেয়। দাদাঠাকুরের গ্রামের মানুষজন অধিকাংশই দীন দরিদ্র। দাদাঠাকুর নিজেও সাধারণ দরিদ্র পরিবারের সন্তান। বাবা হরলাল প-িত আর মা তারাসুন্দরী শৈশবেই মারা যান। পাঁচ বছরের শিশু শরৎচন্দ্র কাকা রসিকলালের অপত্য স্নেহ আর কঠিন অনুশাসনে লালিত-পালিত হন। রসিকলাল প-িত গ্রামের পাঠশালার এক সাধারণ শিক্ষক। দাদাঠাকুর শিক্ষা জীবন শুধু নয়, আত্মশক্তিতে পরিপূর্ণ আদর্শনিষ্ঠা চলার শিক্ষা কাকার কাছ থেকেই পান। জীবনভর দাদাঠাকুর শুধু সেই শিক্ষাকে অনুশীলন ও পরিচর্যা করে যান। এবং কোনো দাক্ষিণ্য গ্রহণ না করার শপথ আজীবন রক্ষা করে যান।
‘হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছ মহান’ এ যে শুধু কথার কথা নয়, দারিদ্র্য যে জীবনের অলঙ্কার আর অহঙ্কার হয়ে উঠতে পারে দাদাঠাকুরের জীবন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার প্রতি তার মেধা এবং একাগ্রতার জোরে প্রায় বিনা খরচেই স্কুল জীবন পাড়ি দিয়ে দাদাঠাকুর কলেজে ভর্তি হন। ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি অসাধারণ রসিকতাপূর্ণ ব্যতিক্রমী চরিত্রের জোরে সকলের প্রিয় পাত্র ছিলেন। সময়ে সময়ে সেই তীক্ষè রসবোধ বিপজ্জনকও হয়ে ওঠে। একবার এক পরিদর্শকের আগমন উপলক্ষে স্কুলে যথেষ্ট ভূরিভোজের ব্যবস্থাসহ সাজসাজ রব পড়ে যায়। শিক্ষককে শুনিয়ে শুনিয়ে দাদাঠাকুর সহপাঠীদের উদ্দেশে বলতে থাকেন, ‘জানিস আজ ইস্কুলের শ্রাদ্ধ।’ শিক্ষক তাদের বুঝানোর জন্য উত্তর দেন যে ওই এলাকায় একমাত্র সরকারি (অরফবফ) প্রতিষ্ঠান এই স্কুলটি। কিছু না বুঝার ভান করে দাদাঠাকুর পুনরায় বলতে থাকেন যে, তিনি ও তো তাই সবাইকে বুঝাতে চেষ্টা করছেন যে এটি অ-ফবধফ ঝপযড়ড়ষ আর তাই শ্রাদ্ধের আয়োজন। পরের পর্বটি যা হবার তাই হয়েছে। শিক্ষকের বেত্রাঘাত মেনে নিয়ে নীরব হন তিনি। কাকার নির্দেশে ছাত্রাবস্থায় দাদাঠাকুর ১১ বছরের প্রভাবতী দেবীকে বিয়ে করেন। কিছুদিন পরেই কাকার মৃত্যু অর্থনৈতিক দুরাবস্থা বাড়িয়ে তোলে। সংসার বাড়তে থাকে। চেষ্টা করলে ভালো চাকরি পাওয়া হয়তো তার পক্ষে অসম্ভব ছিল না। কিন্তু এখানেও কাকার নির্দেশ আর নিজের মনের তাগিদে চাকরি নয়, স¦াধীনভাবে জীবিকা নির্বাহের উপায় খুঁজতে থাকেন। এবং অজপাড়াগাঁয়ে নিজ বাড়িতে নড়বড়ে একটা মেশিন জোগাড় করে ছাপাখানার ব্যবসা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। আর সেই যে শুরু বাকি জীবনের জন্য এই ছাপাখানার পেশা এবং নেশা এক হয়ে যায়। প্রথম দিকে খাজনার দাখিলা, বিভিন্ন নিমন্ত্রণের চিঠি, প্রশ্নপত্র এসব দিয়েই ‘প-িত প্রেস’-এর যাত্রা আরম্ভ হয়। সাংবাদিক হিসেবে জীবন শুরু করেন স্থানীয় দৈনিক ‘জঙ্গীপুর সংবাদ’ প্রকাশের মাঝ দিয়ে। ছাপাখানার তিনি একাই মুদ্রক, প্রকাশক, প্রোপাইটার, কম্পোজিটার অন্যদিকে সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে একাই সাংবাদিক-সম্পাদক-কলামিস্ট-হকার। তবে ছাপাখানায় সহযোগী আর একজন ছিলেন যা না বললেই নয়। প্রেসম্যান না বলে দাদাঠাকুর যাকে প্রেস উওম্যান বলতেন। তিনি আর কেউ নন সহধর্মিণী প্রভাবতী দেবী। সন্তান-সংসার সামলিয়ে স্বামীর সাথে এই যৌথ কর্মউদ্যোগ সে যুগের প্রেক্ষাপটে অবশ্যই বিরল দৃষ্টান্ত।
অল্প সময়ের মধ্যেই দাদাঠাকুরের প্রেস আর পত্রিকা এলাকায় বহুল পরিচিতি লাভ করে। পত্রিকায় জঙ্গীপুর গ্রামের ভালো-মন্দর প্রায় সকল তথ্যদির সাথে সমাজ ও দেশের নানা অসংগতি, অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে তার সুতীক্ষè বিশ্লেষণ পক্ষ-বিপক্ষ সকলের নজর কাড়ে। ভয়ে ও হিংসা-বিদ্বেষে প্রভাবশালী মহল বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে তার পত্রিকার তথা দাদাঠাকুরের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। দাদাঠাকুরের প্রবল ব্যক্তিত্ব, তীক্ষè মেধা ও মনন এবং অপরিসীম সাহসিকতার সামনে বাধার দেওয়ালগুলো বারবার ধসে পড়ে। অপ্রতিরোধ্য গতি নিয়ে আরও সামনে এগোনোই তার লক্ষ্য হয়ে ওঠে। প্রতিটি পদক্ষেপেই অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করা ছিল আর একটি বড় কাজ। নিজেই বলেছেন, ছেলেবেলায় কালাজ্বর হয়েছিল। অহঃরসড়হবু ওহলবপঃরড়হ দিয়ে কালাজ্বর সারলো। কিন্তু অহঃর-গড়হবু (দারিদ্র্য) ব্যাধিগ্রস্ত হলাম।
কিন্তু এই ব্যাধির সাথে হাসিমুখে তিনি আজীবন ঘর করে যান। মাথা নত করেন নি কারও কাছে। পত্রিকার ভালো প্রচার ও প্রসারের জন্য আগের নড়বড়ে মেশিন যথেষ্ট ছিল না। ভালো মেশিনের দরকার। কলকাতায় এসে খোঁজ পেলেন এক ইংরেজ সাহেবের। তিনি নানা ধরনের প্রেসমেশিন বিক্রি করতেন। প্রথম দর্শনেই দাদাঠাকুরের পোশাক তাকে বিস্মিত করে এবং তা নিয়ে প্রকাশ্য কটাক্ষ করেন। পোশাক বলতে হাঁটুর ওপর খাটো ধুতি, গায়ে একটা চাদর ও খালি পা। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষাÑ গ্রাম-শহর সর্বত্রই এই এক পোশাকে দাদাঠাকুর আজীবন চলাফেরা করতে অভ্যস্ত। নিজে তাই কোনোরকম বিব্রত না হয়েই বুঝিয়ে দেন কোর্ট-প্যান্ট যেমন ইংরেজের জাতীয় পোশাক, এই খাটো ধুতি চাদর ও তার নিজেস্ব জাতীয় পোশাক। এ তার দীনতা নয়, গৌরব। দাদাঠাকুরের তেজোদ্দীপ্ত উত্তর এবং ব্যতিক্রমী হুঁকো টানার স্টাইলে মুগ্ধ হন সেই ইংরেজ ব্যবসায়ী। তৎকালীন সবচেয়ে উন্নত মেশিনটি কিস্তিতে কেনার সুযোগ দেন। দাদাঠাকুর অনুগ্রহ নিতে রাজি হন নাই। নিজেস্ব অর্থ সামর্থ্যরে মধ্যে মেশিন কিনে গ্রামে ফেরেন। লালগোলার মহারাজ একবার পত্রিকার সুষ্ঠু প্রকাশনার জন্য ২৫ হাজার টাকার চেক অনুদান হিসেবে দিতে যান। বিনয়ের সাথে তিনি সেই চেক ও প্রত্যাখ্যান করেন। অথচ যারপরনাই কষ্ট করে পত্রিকা প্রকাশ করে যান। জীবনের কোনো পর্যায়েই বাড়তি টাকা রাখার জন্য তার ‘আয়রন চেস্ট’-এর দরকার হয়নি। নিজের কোমরে কাপড়ের গিঁটায় তার ব্যাংক ছিল সদা চলমান। তার বক্তব্য ছিল চেষ্ট (বক্ষ) যাদের আয়রনের মতো অনুভূতিহীন তারাই আয়রন চেস্টে রাখার টাকা সঞ্চয় করতে পারে। সত্যিই গভীর অনুভূতিপ্রবণ মানুষ ছিলেন দাদাঠাকুর নিজে। সমাজের সকল রকম দুর্বল মানুষের তিনি ছিলেন আশা-ভরসার স্থল। অন্যদিকে বিত্তবান, ক্ষমতাশালী, ভ-, প্রতারকদের কাছে তিনি এক মূর্তিমান ত্রাস। শুধু নিজের প্রখর বুদ্ধিমত্তা, আত্মসম্মানে ভরপুর, সৎ ও সাহসিকতাপূর্ণ সাংবাদিকতাই ছিল তার অস্ত্র আর সম্বল। সমাজের অন্যায়-অবিচার ভণ্ডামি ও অসংগতিকে হাস্য-কৌতুকে পরিপূর্ণ সহজ ভাষায় তিনি সবসময় আঘাত করে গেছেন। তার লেখনীর সাথে কবি ঈশ্বর গুপ্তর অনেক মিল পাওয়া যায়। শব্দর সাথে শব্দ নিয়ে দুজনেরই খেলা করার প্রতিভা সহজাত। বাংলা কাব্য সাহিত্যে দাদাঠাকুরের গান-কবিতা-অন্যান্য রচনা এবং সর্বাপেক্ষা আলোচিত ‘বোতল পুরাণ’ স্বতন্ত্র কোনো অবস্থান পাওয়ার যোগ্য কী যোগ্য না তা বিতর্কের বিষয় হতে পারে। কিন্তু নিছক কাব্য বা সাহিত্য রচনার জন্য কখনও কলম ধরেন নি। যা লিখেছেন যেভাবে লিখেছেন সবটার ভিতরেই সংবাদকর্মীর চোখ আর মন সবসময় প্রধান হয়ে উঠেছে। নিজের কর্মদক্ষতা এবং লেখনীর পর প্রচণ্ড আস্থা নিয়েই দৈনিক জঙ্গীপুর সংবাদ-এর পাশাপাশি সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বিদূষক’ প্রকাশ করেন। বিদূষক কে তিনি নিয়ে আসেন শহর কলকাতায়। ১৩২৯ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত প্রথম সংখ্যা পরিবর্তে ব্যবহার করেন ‘প্রথম বর্ষ’। এডিটর শব্দর ক্ষেত্রে ইংরেজিতে ব্যবহার করেন অরফ-বধঃবৎ। প্রচ্ছদ ও নিজেই তৈরি করেন। আর তা যেন নিজেরই ব্যঙ্গাত্মক প্রতিচ্ছবি। ছবিতে দেখা যায় এক ব্রাহ্মণ প-িত যার কপালে লেখা ‘দুঃখ’ বুকে লেখা ‘দুরাশা’ উদরে লেখা ‘উদররে তুঁহু বড়ি দুশমন’। পত্রিকা পরিচিতিতে লেখেন ‘ধামাধরা উদারপন্থীদের মুখপত্র’ পত্রিকা প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে লেখেন “জন্ম আমার জঘণ্যস্থান পল্লীগ্রামের জঙ্গঁলে/দেশের মঙ্গঁল যেমন তেমন নিজের পেটের মঙ্গঁলে/আজ রাত্রিরে ভরে রাখি, খালি আবার কাল তা/পেটের জ্বালায় ‘বিদূষক’ চলে এলেন কলকাতা/”
কলকাতার পথে পথে, রেলস্টেশনে খালি পায়ে গান গেয়ে গেয়ে এই পত্রিকা আর মদ্যপানের অভিনব বিরোধিতায় রচিত ‘বোতল পুরাণ’ নিজেই হকারদের মতো বিক্রি করতেন। ‘বোতল পুরাণ’-এর প্রচ্ছদ ও ছিল অভিনব। মদের বোতলের আকৃতিতে কালো কাগজে প্রচ্ছদ তৈরি আর ভিতরে লাল কালিতে লেখা কবিতা। পুরাণ কাহিনি থেকে দেব-দেবীর চরিত্র নিয়ে অনায়াস হাস্যরসে লেখা এই ‘বোতল পুরাণ’ দাদাঠাকুরের এক অনবদ্য সৃষ্টি। পৌরাণিক দেবদেবীসহ বিভিন্ন চরিত্রের অসংগতিকে মদ্যপানের প্রভাব হিসেবেই তিনি বর্ণনা করেন। এই বর্ণনা কোনো সনাতন ধর্মাবলম্বীর পক্ষে তখনই করা সম্ভব যখন তিনি নিজে পৌরাণিক কাহিনির মাহাত্ম্য বর্ণনা ক্ষেত্রে নির্মোহ থাকতে পারেন। যা হোক এই ‘বিদূষক’ আর ‘বোতল পুরাণ’-এর সুবাদেই পল্লীগ্রাম ছেড়ে শহর কলকাতায় দাদাঠকুরকে এনে দেয় বিশাল পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা। আর সেই সূত্রে বৃহত্তর বাংলায় ও তিনি পরিচিতি এবং প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। একে একে সান্নিধ্য লাভ করেন গান্ধী, নেহেরু, জিন্নাহ, সুভাষচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জগদীশ বসু, শরৎচন্দ্র, আশুতোষ প্রমুখ রাজনৈতিক, সাহিত্যিক বিজ্ঞানী ও সামাজিক জীবনের অসংখ্য প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গের সাথে। ইংরেজ লাট সাহেব ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিভিন্ন আসরে ও তিনি আমন্ত্রিত হতেন। অবস্থা বুঝে সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন বা করেন নি। সেই আমলে দাদাঠাকুরের ব্যক্তি জীবন নিয়ে নানাবিধ সরস কথাবার্তা আর গল্প লোকের মুখ মুখে ছড়িয়ে যায়। কিন্তু বাঙালির দুর্ভাগ্য, তার যৎসামান্যই পরবর্তী প্রজন্মর জন্য সংকলিত হয়েছে। শোনা যায় কোনো এক আসরে কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দাদাঠাকুরের সাথে প্রথম পরিচয়পর্বে কৌতুকে বলেন, আপনিই কী তা হলে ‘বিদূষক’ শরৎচন্দ্র? মৃদু হেসে প্রতি উত্তর আপনি বুঝি সেই ‘চরিত্রহীন’ শরৎচন্দ্র? এই শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়েরই এক জন্মবার্ষিকী আসরে দাদাঠাকুরের বক্তব্য শুরু হয় এভাবে যে, “সবাই বড় বলে মানলেও তিনি ছোট, নিতান্তই ছোট।” আয়োজকরা আঁতকে ওঠেন। শ্রোতারা নড়েচড়ে বসে। ব্যাপারটা কী? কী বলতে চান দাদাঠাকুর? সবার মানসিক অবস্থা বুঝে নির্লিপ্তপ্রায় ভঙ্গিতে দাদাঠাকুর পুরাণ কাহিনির অবতারণা করেন। বৈকুণ্ঠে নারদ আর নারায়ণের মধ্যে কে বড় কে ছোট নিয়ে একবার জোর বিতর্ক শুরু হয়। উপসংহার টেনে নারদকেই বড় আসনে বসিয়ে নারায়ণের বক্তব্য “সবচেয়ে ছোট আমি আর তুমি সবচেয়ে বড়। এই জল-স্থল-অন্তরীক্ষ সবার আমি স্রষ্টা। কিন্তু তুমি আমার চেয়ে বড় কারণ তোমার হৃদয়ে সেই আমার স্থান। আধার থেকে আধেয় বড় হতে পারে না। ভক্তের হৃদয়ে আমার আসন। সেখানে আমি ছোট বৈ কি!” বলাবাহুল্য কথাসাহিত্যক শরৎচন্দ্র ও সেদিন ভক্ত শরৎচন্দ্র (প-িত)-এর কাছে ছোট হওয়া স্বীকার করে নেন। বাকচাতুর্য এবং পারিপাট্যে দাদাঠাকুরের জুড়ি মেলা ভার। তৎকালীন সময়ের এক ধনাঢ্য সাংবাদিক হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষের বাড়ির পোষা কুকুর একবার দাদাঠাকুরের পায়ে কামড় দেয়। ক্ষতস্থানের যথাযথ পরিচর্যাদি সেরে সাংবাদিক বন্ধুটি দাদাঠাকুরকে ঠাট্টার ছলে প্রভু বুঝাতে চান যে তার কুকুর কোনো ভদ্রলোককে স্পর্শ করে না। “কী আর করা! কায়েতের কুকুরতো, বামুনের পা পেলে ছাড়ে না” দাদাঠাকুরের উত্তর। পরিস্থিতি অনুযায়ী শব্দ আর বাক্যবাণ যেন সাজানোই থাকত তার মুখে। একবার নাটোরের মহারাজ জগদীন্দ্রনাথ রায়ের বাড়িতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে সামনের পুকুরে যেয়ে দাদাঠাকুর হাত মুখ ধুয়ে আসেন। অথচ পাশেই রাজভৃত্য রূপার গাড়–তে জল-সাবান-তোয়ালে নিয়ে দাঁড়িয়ে। মহারাজ বিষয়টি লক্ষ্য করে বন্ধুর সাথে রসিকতা করে বলেন, ‘কী আর করা? পল্লীগ্রামের স্বভাবতো পালটে যায় নি।’ কথাটি লুফে নেন দাদাঠাকুর। নিজের স্বভাব প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি আবার কম দামি জিনিস ব্যবহার করতে পারি না।’ বিস্মিত হন মহারাজ। দাদাঠাকুর সহজ ব্যাখ্যায় বুঝিয়ে বলেন যে রাজকোষের জমা-খরচের খাতায় এই রূপার গাড়–-সাবান-তোয়ালের খরচের হিসাবের থেকে পুকুর কাটার খরচের হিসাব নিশ্চয়ই অনেক বেশি লেখা আছে। অর্থাৎ মূল্যের বিপরীতে পুকুর নিশ্চয়ই বেশি দামি। জীবনের এই ছোটখাটো বিষয়গুলো নিয়ে হাস্যরসিকতার আড়ালে দাদাঠাকুরের আত্মাভিমান আত্মমর্যাদাবোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিজ মেধা, পরিশ্রম এবং প্রতিভার জোরেই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ওপরতলার লোকজনের সাথে তার যথেষ্ট ওঠাবসা ছিল। কিন্তু নিজের অবস্থান থেকে কখনই তিনি বিচ্যূত হননি। এবং সেক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি কারও সাথেই তিনি আপসে যাননি। কলকাতায় লাট সাহেবের এক সান্ধ্য মজলিশে দাদাঠাকুর গায়ক ও কথক হিসেবে আমন্ত্রিত হন। তিনি যথারীতি খালি পায়ে খাটো ধুতি আর চাদর জড়িয়ে প্রবেশদ্বারে গেলে ইংরেজ অভ্যর্থনাকারী এই পোশাকে প্রাথমিকভাবে তাকে ঢুকতে বাধা দেয়। পরবর্তীতে দাদাঠাকুরের পরিচয় জেনে লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী হয়। সামনের সারিতে পার্শ্ববর্তী স্বদেশী এক ধনাঢ্য বাবু দাদাঠাকুরের বেশভূষায় রীতিমতো অস্বস্তিতে পড়ে। কিছুটা সময় ছটফট করে জিজ্ঞেস করেই বসে যে এই অর্ধনগ্ন অবস্থায় ভরা শীত মৌসুমে দাদাঠাকুরের ঠা-া লাগছে কি না? দাদাঠাকুর ধুতির খোঁটে নিত্যদিনের সঞ্চয় সিকি আধুলিগুলো হাত দিয়ে বাজিয়ে উত্তর দেন ‘টাকার গরম সাথে আছে না?’ বেগতিক বুঝে বাবুমশাই কথা না বাড়িয়ে অন্যত্র সরে বসে। অনুষ্ঠানে তার কথকতা, কবিতা, গান উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে। আসর ভেঙে ফেরার সময় পথরোধ করে লাট বাহাদুরের কর্মচারী। প্রস্তাব দেন দাদাঠাকুর চাইলে লাটসাহেব একটা সার্টিফিকেট দিতে প্রস্তুত। সার্টিফিকেটের মর্ম কী না বুঝার ভান করে দাদাঠাকুর ইংরেজ কর্মচারীকে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকেন, এই সার্টিফিকেট দিয়ে খেলাপি ঋণ মওকুফ হবে কিনা, মুদির দোকানে বিনামূল্যে চাল ভালো পাওয়া যাবে কি না, চুরি-ডাকাতি করলে মামলা থেকে বেকসুর খালাস পাওয়া যাবে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর স্বভাবতই নেতিবাচক হওয়ায় দাদাঠাকুর বিনীতভাবে উত্তর দেন ‘আপনার সাহেবকে বলুন তা হলে তার সার্টিফিকেটের আমার কোনো দরকার নেই।’ সেই আমল আর এই আমলই হোক ক্ষমতাধরদের একটা আশীষবাণীর জন্য যখন অনেকেই নগ্নভাবে লালায়িত তখন পরাধীন দেশের একজন নেটিভ বাঙালির মনের সাহস এবং তেজ কতটা থাকলে এই প্রত্যাখ্যান সম্ভব তা অনুমান করা দুঃসাধ্য বিষয় নয়। সব রকমের যশ আর লোভ লোলুপতারে জীবনভর হাসিমুখে প্রত্যাখ্যান করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ এই দাদাঠাকুর। কোন এক ইংরেজ সাহেব তার অফিসের বাঙালি কেরানির কান মলে দেওয়ার প্রেক্ষিতে দাদাঠাকুর তার পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখেন “বাঙালীর সমাজে ঐরূপ ব্যবহার ভয়ানক বেয়াদবী ও অসভ্যতা ও বিশেষ অসম্মানজনক বলিয়া জানি। এই সংবাদটি যদি সত্য হয় এবং শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের কান মলিয়া দেওয়া আলাপকালীন সভ্যতার একটি অঙ্গ হয় তাহা হইলে কেরানী ভায়ার ও তাহার সম্মানের জন্য তদুপযোগী সভ্যতা প্রদর্শন করা উচিত ছিল নাকি?” নিজের দেশ নিজের জাতির স্বার্থ ও সম্মানবোধ তার মধ্যে এতটাই প্রবল ছিল যে ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট কথা বলতে তিনি কখনোই পিছপা হননি। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন বাধাগ্রস্ত করতে ইংরেজের অত্যাচার শাসন ও শোষণের কথা সর্বজনবিদিত। স্বদেশী আন্দোলনে ধৃতদের ইংরেজ সরকার দিনের পর দিন বিনা বিচারে আটক রাখে। বাংলা ১৩২১ সনে এমন একটি ঘটনার প্রতিবাদে দাদাঠাকুর নিজের পত্রিকায় লেখেন “তাঁহারা যাহাদের অপরাধী বলিয়া ধৃত করিয়াছেন, যাহাদের বিরুদ্ধে প্রমাণাদি হস্তগত করিয়া ফেলিয়াছেন, তাহাদের আদালতে ছাড়িয়া দিতে আপত্তি কেন?”  “গভর্নমেন্ট স্পষ্ট করিয়া বলুন তাঁহারা কোনটা ঠিক মনে করেন, আদালত অসত্য না তাঁহাদের করগত প্রমানাদি অসত্য? আমরা বিশেষ করিয়া ভারত ভাগ্যবিধাতা লর্ড রিডিংকে এই প্রশ্ন করিতেছি।” শুধু প্রশ্নই নয়। ইংরেজ শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিতে ও তার বাধে নাই। একই নিবন্ধে স্পষ্ট করেই লেখেন “রাজনৈতিক আন্দোলনকে অচল ও শক্তিহীন করিবার উদ্দেশ্য বা জনমতের কণ্ঠরোধ করিবার জন্য গভর্নমেন্ট আর ও বহুবার দমননীতি প্রয়োগ করিয়াছেন, এখন ও করিতেছেন, আশা করা যায় যে ভবিষ্যতেও তাঁহারা তাহাই করিবেন। নির্যাতনের ফল কখন শুভ হইতে পারে না। অত্যাচার মানুষকে শুধু বলি কেন, প্রাণবিশিষ্ট কোন জীবকেই শান্ত করিতে পারে না।” প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশের সেনাবহর বৃদ্ধির প্রয়োজন মিটাতে দলে দলে ভারতীয় নাগরিকদের তালিকাভুক্ত করা হয়। শুধু লোকবল নয়, এলাকায় এলাকায় মিত্র শক্তির নামে সরাসরি অর্থসংগ্রহের আয়োজন করা হয়। দাদাঠাকুরের নিজ এলাকায় এমন এক সমাবেশে বিভাগীয় ইংরেজ কমিশনারের উপস্থিতিতে বক্তৃতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন ‘এই যুদ্ধে জয়ী হবে জার্মানি’। উপস্থিত সাধারণের ভয়ে হৃৎকম্পন শুরু। ইংরেজ কর্মকর্তার প্রতিক্রিয়া শুরুর আগেই ব্যাখ্যা দিলেন দাদাঠাকুর। ভারতীয়রা ইংরেজ সৈন্যদলের শক্তি বাড়াতে লোকবল দিয়ে যাচ্ছে এখন অর্থ ও দেবে। লোকবল আর অর্থবলই জয়ের সোপান। তাই বলা ‘যার গধহ এবং যার গড়হু’ সেই জিতবে। কথাগুলো রসিকতা মনে করে অনেকেই হাঁফ ছেড়ে রক্ষা  পায় কিন্তু এর সাথে পরাধীন দেশের নাগরিকের শ্লেষটা ও কম জড়িয়ে নেই।
দাদাঠাকুর সরাসরি রাজনীতি করেন নাই। কিন্তু সম্পূর্ণ রাজনীতিমনষ্ক এই ব্যক্তি অসহযোগিতা আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন, বিলাতি পণ্য বর্জন আন্দোলন ইত্যাদিসহ স্বদেশী আন্দোলনের সকল দিক সম্পর্কে অত্যন্ত সজাগ ছিলেন। স্বদেশী আন্দোলনের সাথে জড়িত তরুণ-তরুণীদের আশ্রয় ও সহায়তা দিতে কার্পণ্য করেন নি কখনোই। বাইরের উদাসীন জীবনযাত্রা ও সদাব্যস্ত কর্মকাণ্ডের জোরে ব্রিটিশ রাজের সন্দেহ তালিকায় তার নাম তেমনভাবে উঠে আসেনি। কিন্তু আগাগোড়া তিনি একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক মানুষ। দেশের দুঃখ-দারিদ্র্য ও দৈন্যদশা তাকে সবসময় পীড়িত করে। অবিভক্ত বাংলার দুর্ভিক্ষ ও মহামারীপীড়িত হতদরিদ্র হিন্দু মুসলমানের জীবনকে তিনি কাছ থেকে দেখেন এবং অনুভব করেন। ইংরেজ শাসন-শোষণকে এক্ষেত্রে তিনি বড় দায়ী হিসেবে মনে করেন। সেই সাথে সমাজে জাতপাতের সমস্যা, পণপ্রথা, বাল্যবিয়ে বড় অভিশাপ হিসেবে চিহ্নিত করেন। সেই আমলেই তার চিন্তা ছিল নারী সমাজের উন্নতির জন্য সরাসরি অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে নারীকে স্বাবলম্বী করা দরকার। ১৩৩৪ সনে ‘কন্যাদায়ের প্রতিকার’ শীর্ষক এক সম্পাদকীয়তে লেখেন “নিজের পাপের ফল আমরা ভোগ করিতেছি, নারী নির্যাতনে তাঁহাদিগকে দাবিয়া রাখার ফলে যে হলাহল উঠিয়াছে তাহার জ্বালায় আজ আমরা জর্জরিত সেই হলাহল কন্যাদায়। এই বিষের জ্বালা হইতে পরিত্রাণ পাইবার জন্য কত দাওয়াইর ব্যবস্থা না করিতেছি, কিন্তু রোগের নিদান অনুযায়ী ঔষধ না হইলে রোগ সারিবে কেন!”
ব্যবস্থাপত্র হিসেবেই দেশীয় শিল্পকর্ম মাধ্যমে মেয়েদের স্বাবলম্বী করার দরকার মর্মে চিন্তা করেন এবং বিভিন্ন লেখায় তা প্রকাশ করেন। বাল্যবিয়ের ফলে তার মতে ‘দেশ আজ বামন জাতিতে পরিণত হচ্ছে’ বাল্যবিয়েকে বারবার তিনি মেয়েদের স্বাস্থ্যর প্রতি হুমকির ও বিধবার সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ বলে মনে করেন। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে নারীকেই প্রতিবাদী হয়ে উঠতে হবে, এও তিনি বিশ্বাস করে লেখেন? “বাংলাদেশে সম্প্রতি নারীর উপর অত্যাচারের যে ভীষণ ও বীভৎস সংবাদ আসিতেছে তাহা পাঠ করিয়া লজ্জায় ও ঘৃণায় শিহরিয়া উঠিতেছি। পরপদদলিত জাতি যাহারা নিজের মানুষ বলিয়া পরিচয় দিবার কোন অবস্থা নাই, জীবনে যাহার কোন গৌরব নাই সে কেমনভাবে দুর্বলের উপর অত্যাচার করিতে পারে তাহারই জ্বলন্ত অমানুষিক দৃষ্টান্ত দেখাইতেছে।”
“বাংলার নারী শক্তিকে আজ সব দিক হইতেই সজাগ থাকিতে হইবে” সামাজিক নানাবিধ সমস্যা বিচারে বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়েদের নিজেদের ভিতর আলাপ-পরিচয় অপেক্ষাকৃত ভালো বলে ও তিনি মন্তব্য করেন। এক সাধারণ ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হিসেবে প্রায় শতবর্ষ আগে সমাজ থেকে তিনি কতটা এগিয়ে তা সহজেই অনুমেয়। দুর্ভিক্ষ মহামারী পীড়িত বাংলায় বারে বারে তার চোখে পড়েছে হিন্দুর শবদেহ সৎকার ও মুসলমানের গোর দেওয়ার মানুষ নেই। সেখানে দাঁড়িয়ে এবং এক পশ্চাদপদ সমাজের বাস্তবতায় নজরুলের মতোই তার মনে হয়েছে ‘ক্ষুধাতুর শিশু চায়না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত একটু নুন’ তাই তিনি লেখেন “দেখি দেশ স্বাধীনতা চাহিতেছে, স্বরাজই একমাত্র কাম্য বলিয়া নির্দেশ করিতেছে অথচ দেশ কি খাইয়া স্বরাজ সাধনা করিবে! দেশে ভাইয়ে ভাইয়ে মিল নাই, হিন্দু ও মুসলমানে মিল নাই। সব ছত্রভঙ্গ। সব আত্মসর্বস্ব” দেশের স্বরাজ সাধকদের উদ্দেশে বারবার বলেন “শিখরকে যদি উত্তুঙ্গঁ ও অত্যুজ্বল দেখিতে চাও, তাহা হইলে নি¤œস্তরটিকে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুন্দর কর।” এই পল্লীজীবনই তোমাদিগের বিরাট জাতীয় জীবনের ভিত্তি। অনেক রাজনৈতিক নেতার কথায় এর কাজে দ্বিচারিতা-মিথ্যাচার তিনি প্রত্যক্ষ করেন এবং তার বিরুদ্ধে লেখেন।  “আমাদের তথাকথিত নেতারা বিকাল বেলা তিন টাকা দামের খদ্দর পরিধান করিয়া বক্তৃতামঞ্চে ও জাগরণের অভিনয় করিতেছে, সারা রাত্রি হাজার টাকা মূল্যের ফ্রেঞ্চ সিল্কের প্রস্তুত শয্যায় শুইয়া সুখের স্বপ্ন দেখিতেছে”
“নিজের মালিকানাধীন সম্পাদিত পত্র-পত্রিকায় শুধু নিবন্ধ হিসেবেই নয় ছড়া কবিতা গানে ও নানাভাবে তিনি একই চিত্র তুলে ধরেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্যারোডিতে লেখেন “আজি কে তোমার বিধুর মুরতি/হেরিনু শারদ প্রভাতে/হে মাত বঙ্গঁ মলিন অঙ্গঁ/ভরি গেছে খানা ডোবাতে/পারে না বহিতে লোকে জ্বরভার/পেটে পেটে পিলে ধরে নাকো আর/দিবসে শিয়াল গাহিছে খেয়াল/বিজন পল্লী সভাতে/একপাশে তুমি কাঁদিছ জননী/শরৎকালের প্রভাতে।”
দেশের প্রকৃত চিত্র যখন হতাশাজনক তখন একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতা তাকে পুঁজি করেই মুনাফা অর্জনে উদগ্রীব। ‘তোমাদের দূর হতে প্রণাম করি’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে দূর্গাস্তোত্রের ভঙ্গীতে তিনি সেইসব স্বদেশী নেতাদের বিরুদ্ধে লেখেন, “তোমরা হর্তাকর্তা দেশীয় অপগ-ের, তোমরা কর্তা স্ব-স্ব গৃহিণীর, তোমরা বিধাতা আশ্রিতগণের। অতএব আমরা তোমাদের প্রণাম করি। তোমরা অসৎকে সেবা দিবার ব্যবস্থা কর, সুতরাং তোমরা সৎ। তোমরা রাজনৈতিক সমরের পাঁয়তাড়াতে চিৎ। তোমরা স্ব-স্ব ধামাধরা পরগাছা কুলের আনন্দ। অতএব হে সচিচদানন্দ আমরা তোমাদের প্রণাম করি। তোমরা ব্রম্মা, কারণ বহু লীগ, পার্টি, এসোসিয়েশন সৃষ্টি করিয়াছ। তোমরা বিষ্ণু কারণ চাঁদারূপে কমলা তোমাদের কৃপা করেন। তোমরা শিব, কারণ তোমাদের নন্দী, ভৃঙ্গী, ষণ্ডাদি আছে, অতএব দূর হতে প্রণাম করি।” “তোমরা অগ্নি কারণ ব্যাকরণ দুষ্টভাষা ও পরের ছেলের মাথা। অবলীলাক্রমে হজম কর। অতএব হে লীলাময় আমাদের প্রণাম লহ।”
ইংরেজরা তাদের নিজস্ব স্বার্থে পরাধীন ভারতবর্ষের মিউনিসিপ্যালিটি সমূহ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গঠন করেন। সেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় ধরনের ভোটের ব্যবস্থা হয়। অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাবে অযোগ্য ব্যক্তিরা ভোটের রাজনীতিতে জয়ী হয়। নির্বাচন পূর্ব প্রতিশ্রুতি কেউ মনে রাখে না। এবং গরিব মানুষের পর করবৃদ্ধি, অর্থ আত্মসাৎ আত্মীয়-পরিজনের সুবিধাদি প্রদান এসব নানা অপকর্মের মধ্যে স্বায়ত্তশাসন শব্দটার মানে দাঁড়ায়। “শাসনটা যখন আয়ত্ব তখন নিজের সুবিধা যাহাতে হয়, তাহাই করিতে হইবে। এই যেন স্বায়ত্ত শাসনের মর্ম দাঁড়িয়েছে।”
সাধারণ ভোটার আর ভোটপ্রার্থীদের সস্পর্ক মধ্যে শুভঙ্করের ফাঁকি সম্পর্কে বলেন, “আমি নিশি দিন তোমায় ভালোবাসি তুমি অবসর মত বাসিও।” কায়েমি স্বার্থবাজদের বিরুদ্ধে সাধারণ নিরক্ষর মুদির দোকানদারকে নাম স্বাক্ষর শিখিয়ে ভোটে দাঁড় করান, এবং অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার খেলায় মিউনিসিপ্যালিটির কাউন্সিলার পদে জয়ী হতে ও সহায়তা করেন। পল্লীগ্রামের পলি মাটিতে গড়া এই মানুষটি অন্তরে ছিলেন যেমন নরম, বাইরে তেমনি বজ্রকঠিন। কাজ আর কাজ। কাজই ছিল তার সাধনা, আরাধনা এবং দেবতা। আর সেই বিশাল কর্মযজ্ঞের মূলে ছিল সাধারণ মানুষ। এলাকার সাধারণের যে কোন দুর্যোগে বিপদে তিনি ছিলেন ‘বরাভয়’। ক্ষমতালোভীদের বরাবর তিনি ঘৃণা করে আসেন। মিউনিসিপ্যালিটির সভ্য নির্বাচন নিয়ে ছড়া করে ও বলেছেন “কেহ ভাবে সভ্য হলে মান পাবে বৃদ্ধি/কেহ ভাবে দেশে মোর প্রভুত্ব বাড়িবে/কেহ সভ্য পদপ্রার্থী অর্থ পাব বলি/কেহ ভাবে করব ফাঁপর দালালী/লোক হিতে স্বার্থত্যাগ করেন কেবল/হেন মহাজন কিন্তু অতীব বিরল।” সমাজে ক্রম বৃদ্ধিমান অর্থলোলুপ গোষ্ঠীর ইন্ধনকে ব্যঙ্গঁ করে, “টাকার উনপঞ্চাশৎনাম শীর্ষক এক পাঁচালী”-তে লেখেন, টাকা নাম পয়সা নাম বড়ই মধুর/যে জন ভজেনা টাকা সে হয় ফতুর/টাকা উপায়ের তরে সংসারে আইনু/অভাবে পড়িয়া শেষে ভ্যাবাচাকা হৈনু/নজরসেলামী রাখে জমিদার ধনী/গোমস্তা রাখিল নাম নিকাসি পাটনী/ভৃত্যগন নাম রাখে ইনাম বখসিস/নোট নামে প্রকাশিল কারেন্সী অফিস/ভোগ ও মানসা নাম দেবতা মন্দিরে/সিন্নী নাম রাখিলেন মুসলমান পীরে/দালাল সকলে নাম রাখিল দালালী/বলি নামে অভিহিত করিল মা কালি/তীর্থের স্থানে ও তব বাঁধা আছে রেট/জগন্নাথে আটকা আর বৃন্দাবনে ভেট/ভোরে উঠে এই নাম যে করে বর্ণন/অবশ্য হইবে তার দারিদ্র মোচন।”
এই সমাজ শুধু অর্থেও ভিখারী নয় ছলেবলে কৌশলে যশের ভিখারী ও বটে। তাই তিনি লেখেন “গ্রন্থকার সমালোচনার ভিখারী। নেতা প্রশংসার ভিখারী। দেশভক্ত চাঁদার ভিখারী, সমস্ত দেশ অধিকারের ভিখারী। ব্রাহ্মণ প-িত বৈভবের ভিখারী, নিন্দুক পরগ্লানির ভিখারী, সংস্কারক পুঁজরক্তর ভিখারী” এমন অসংখ্য ভিখারীরা গৃহস্থ অর্থাৎ  সাধারণের ভালো-মন্দ ন্যূনতম কিছুটা বিচার বিবেচনা করে। “কিন্তু রাজনীতির ভিখারীরা এ ধর্ম মানেন না। রাজদ্বারের ভিক্ষায় শৌচ অশৌচের বিচার নাই। কেবল দেহি দেহি রব।” ইহারা এমন তুখোড় ভিক্ষুক যে বলিতেছে “আমরা দেড়শো বছরের অন্ধ, দুশো বছরের খোঁড়া, তিনশো বছরের কুষ্ঠ বলিয়া জাঁক করিয়া ভিক্ষা দাবী করিতেছে।” আর এই রাজনৈতিক ব্যক্তিরা সত্যিই অন্ধ। সমাজের স্বার্থ, সাধারণের স্বার্থ তারা দেখেন না। নিজেদের স্বার্থর দলাদলি নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। তাদের উদ্দেশ্যেই লেখা “আমার মাথা উঁচু করে দাও হে তোমার অসমাজের উপরে” (শীর্ষক সম্পাদকীয়)  “আমাদের দেশের যাবতীয় বারোয়ারি বৈঠকেই এই স্বার্থ ও মানের পালার আরম্ভ হইয়া থাকে। আপন আপন জেদ বজায় রাখিতে গিয়া ভীষণ দলাদলির সৃষ্টি করেন। সব সভাতেই দক্ষ যজ্ঞ হইয়া থাকে। প্রত্যেক দলেই এক একজন কর্তা হইয়া পালের গোদা হন। আর বাচ্চা নেতাগুলো এক এক কর্তার দোহারি করেন। রাতারাতি প্রতিষ্ঠা অর্জনের চেষ্টা ঠিক নয়। তাই বলেন “যা ধীরে বড় হয়, তা স্থায়ী বৃক্ষে পরিণত হয়। কিন্তু বাঁশ তিন মাসের মধ্যে আসমান ছুঁতে চাইলে ও তার স্থায়িত্ব মাত্র তিন-চার বছরের।” দাদাঠাকুরের আক্রমণের আর একটি বড় বিষয় ছিল প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা। ইংরেজ সৃষ্ট আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় গুণ তরুণ প্রজন্মকে কেরানি সমাজে পরিণত করা। আইসিএস পরীক্ষককে তিনি ওহফরধহ ঈৎরসরহধষ ঝবৎারপব হিসেবে আখ্যা দেন। আত্মসম্মান জাগ্রত করে এই দাসানুদাসে পরিণত হওয়া থেকে তিনি জাতিকে রক্ষার জন্য সারাজীবন জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। নিজ এলাকায় দেখেছেন “মন্ডলজী মূর্খ হইলে ও প-িত। আর লেখাপড়া জানা লোকেরা কেহ কেহ তাহার অধীনে আদায়করী হইতে পারিলেই কৃতার্থ। এই তো পাড়াগাঁয়ের দোষ” শহরে এসেও কথিত শিক্ষিতদের সেই একই চেহারা প্রত্যক্ষ করে দাদাঠাকুর লেখেন “এখানেও স্বরস্বতীর বরপুত্রগণ মা লক্ষ¥ীর বরপুত্র ধনকুবেরগণের শ্রী চরনের ছুঁচো।” এখন বুঝিলাম পাড়াগাঁও যেমন সহর ও তেমনি। অতি দুঃখে লেখাটা শেষ করেন এইভাবে যে “এক ভস্ম আর ছার/দোষ গুণ দিব কার/আমি মলে ফুরায় জঞ্জাল।”
শুধুমাত্র চাকুরিজীবী তৈরি করার জন্য এই শিক্ষাব্যবস্থাকে দাদাঠাকুর সবসময় বিরোধিতা করেন। তিনি ব্যক্তি জীবনে শিক্ষাকে মনুষ্যত্ব বিকাশের সহায়ক বলে মানেন। কোনো কাজই তার কাছে ছোট নয়। ব্যক্তি জীবনে নিজে যখন কিংবদন্তি পর্যায়ে তখনও তিনি পথে পথে পত্রিকার ও অন্যান্য লেখার হকারি করেন। তার প্রখর ব্যক্তিত্বের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছে সবাই। তার জীবন যখন মধ্য গগনে তখন ঐতিহাসিক দেশভাগ সম্পূর্ণ হয়। ’৪৭-পরবর্তী ভারতের নাগরিক হিসেবে আরও অনেকগুলো বছর তিনি বেঁচে থাকেন। দেশভাগ অনেকের মতোই তার কাছে নির্মম হয়েই ধরা দেয়। “বিশ্বজননী দিলা দরশন নিঃস্ব জননী রূপে” শুধু তাই নয় তিনি দেখেন “স্বাধীনতা লাভের মাসুল স্বরূপ পৈত্রিক যথাসর্বস্ব ফেলিয়া স্ত্রী পুত্র কন্যার সহিত রিক্তহস্তে দেশান্তরে কলোনির নামক বস্তির মধ্যে কুটিরে মাথা লুকাইতে বাধ্য হইয়াছে এমন অসংখ্য নর-নারী।” এ বাস্তবতা প্রতিনিয়তই তার কাছে যন্ত্রণা হয়ে ওঠে। আর এই স্বাধীনতা ও তার কাছে অনেকটাই ক্ষমতার হাতবদল হিসেবে ধরা দেয়। শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক বিষয়ে কথিত স্বাধীনতার বছর পাঁচ পরে লেখেন  “আমাদের ভারত বর্তমান স্বাধীনতা লাভের পর ইহাকে ভারতের রামায়নোক্ত রামচন্দ্রের রামরাজ্যে পরিণত করার কথা নেতৃবৃন্দের মুখে শোনা গিয়েছিল। রামচন্দ্র প্রজারঞ্জনের জন্য স্বীয় ধর্মপতœী অপাপবিদ্ধা জানকীকে ও নির্বাসন দ-ে দ-িত করিয়াছিলেন। আজকাল যে রাজ্যে প্রজাগণ সুখসম্পদ ভোগ করে তাহাকে রামরাজ্যের সহিত তুলনা করা হয়।” এই বিদ্রƒপাত্মক বক্তব্যের সাথে যোগ করেন  “অত্যাচারী শাসকের সম্বন্ধে মুখে এক ভাব মনে অন্য ভাব লইয়া জনসাধারণ আইনকে বাঁচাইয়া শাসনতন্ত্র ধ্বংস করিবার চেষ্টা করে, কোনো অত্যাচারী শাসক এ যাবৎ প্রজার অহিত করিয়া বেশিদিন স্থায়ী হইতে পারে নাই। যাহাদের ত্যাগী মনে করিতাম তাহাদের মধ্যে তস্কর দেখিয়া অবাক হইয়াছি। শতকরা ৮০ জন যে দেশে নিরক্ষর সে দেশে ভোটে জয়লাভ জয় নহে। কংগ্রেস নির্বাচনে জয়ী হইলে আমাদের শান্তি নির্বাসিত হওয়া যেমন পরীক্ষিত। ক্ষুধানল নির্বাপিত না হওয়া ও তেমনই পরিক্ষীত।” এই স্বাধীনতা নিয়ে অন্যত্র দাদাঠাকুর আরও স্পষ্ট লেখেন “ভারতে আজ গণতন্ত্র না ধনতন্ত্র কোন তন্ত্র প্রচলিত তাহা বুঝিয়া আগামী নির্বাচনে অধিকাংশ ভারতবাসী যদি স্বাধীনতার চেহারা বদলাইয়া দিতে পারে তবেই বলিব দেশে স্বাধীনতা আসিয়াছে। নচেত যাহা আজ আসিয়াছে তাহা সাধহীনতা অর্থাৎ দেশ যে সাধ করিয়াছিল সে সাধ পূর্ণ হয় নাই। যে স্বাদ পাইবার জন্য দেশ আগ্রহী ছিল সে স্বাদ পায় নাই। দেশ পাইয়াছে স্বাদহীনতা। স্ব মানে কুকুর আজ এক মুঠো অন্নের জন্য, একখানি বস্ত্রের জন্য লোককে কুকুরের মতো হীন ব্যক্তির দ্বারস্থ হইতে হইতেছে। অতএব আসিয়াছে স্বাদহীনতা আমরা সত্যকার স¦াধীনতা এখনও পাই নাই। স্বাদহীনতা, সাধহীনতা, স্বাধীনতাহীনতা ঘুচিয়া যে দিন আসিবে সে দিন উৎসব করিব।”
স্বাধীনতার সেই আকাক্সিক্ষত উৎসবের দিন দাদাঠাকুরের জীবনে আসে নাই। ব্রিটিশ আমলেও তার মনন, তার কলম যেভাবে চলেছে, কংগ্রেস শাসিত ভারতবর্ষে ও সেই কলম থামেনি। অসহযোগ আন্দোলনের সময় গান্ধীর নেতৃত্বকে অনেকক্ষেত্রেই তিনি প্রশংসা করেন। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মনে হয়েছে গান্ধীর অহিংস নীতি সব সময়ই সমর্পিত। ‘সমর্পণ ও সমরপণ’  শব্দ দুটির উচ্চারণগত পার্থক্য কম আর অর্থগত পার্থক্য বেশি। আর সেই পার্থক্যে “লড়কে লেঙ্গেঁ পাকিস্তান-জিন্নার ‘সমরপণ’, আর গান্ধীর ‘সর্মপণ’-এর মধ্যে ব্রিটিশের সুকৌশলী দেশভাগ।” সেখানেও “স্বাধীনতা লাভে জিন্না সাহেব পাকিস্তানের শাসনকার্য স্বহস্তে গ্রহণ করিলেন আর উদার কংগ্রেস ইংরেজ শাসক লর্ড মাউন্টব্যাটেনের হস্তেই শাসনভার সমর্পণ করিলো।”
কংগ্রেস ক্ষমতার জন্য দেখেওনি যে ভারতভাগ এমনভাবে হলো যাতে কলহ বেঁধেই থাকে। এই আক্ষেপ তিনি বয়ে ফেরেন আমৃত্যু। ক্ষমতায় এসে ও কংগ্রেস শাসকদের চেহারা পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের সর্বত্রই পরাধীন দেশের মতোই মনে হয়েছে তার কাছে। শাসনের নামে বিনা বিচারে আটকে রাখা, মিছিলে নিরীহ নারী-শিশুর ওপরে গুলি চালানো এসবের তিনি তীব্র নিন্দা করেন। ‘থিসিসের ডাক্তার ও থাইসিসের ডাক্তার’ শীর্ষক নিবন্ধে পশ্চিমবঙ্গের দুই কংগ্রেসী মুখ্যমন্ত্রী ডা. প্রফুল্ল ঘোষ এবং ড. বিধান রায়ের তিনি কঠিন সমালোচনা করেন। এবং স্বভাবসিদ্ধ ব্যঙ্গরসে লেখেন “তবুও ভারতীয় সাংস্কৃতিক গায়ে একটুও আঁচড় না লাগে ডা. রায়ের পুলিশ তেমনি অহিংসভাবে গুলি চালায়।” ‘যদি’ শীর্ষক এক নিবন্ধে লেখেন, ‘যদি’ শব্দটি খুব সংশয়পূর্ণ। আমাদের পাঠদ্দশায় একজন শিক্ষক বলিতেন দেখ বাপু, দুই পয়সা বা একআনা হইলে নদী পার হওয়া যায়। কিন্তু যদি পার হওয়া খুব কঠিন। ঞযবৎব রং হড়ঃযরহম ংড় ংঃরভভ ধং রভভ আমরা ও এই ‘যদি’ অবলম্বন করিয়া গত সাত বৎসর কষ্টকে কষ্ট বলিয়া মনে স্থান দেই নাই। ‘যদি’ আবার সরকার ভালো সরকার হয়। ‘যদি’ কাঁকর মিশানো চাল ডাল ভালো করিয়া দেন। ‘যদি’ আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে।”
গভীর দেশপ্রেমের সাথে দাদাঠাকুর ছিলেন আপাদমস্তক বাঙালি। ’৪৭-এর আগ থেকেই তিনি লক্ষ করেন বাঙালি ছেলেরা শুধুমাত্র লেখাপড়া শিখে কেরানিগিরি শিখছে। শিল্পর উৎকর্ষ বা ব্যবসায় তাদের মন নেই। সেক্ষেত্রে ক্রমশই বাজার দখল করছে অবাঙালিরা। বাংলা বিতাড়িত হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে। ১ বৈশাখ ১৩৬১-এর নববর্ষ আবাহনে তিনি লেখেন “আজ বাঙলা মায়ের বিরাশি বৎসরের বৃদ্ধ সন্তান জনাব ফজলুল হক বাঙালী পীড়ক মোসলেম লীগ দলকে বিতাড়িত করিয়া বাংলার পূর্বাকাশে নূতন ভানুর কিরণ বিকীরণের শুভ সুযোগ আনিয়া দিয়াছেন। কবি অতুলপ্রসাদের আমরি বাংলা ভাষা গানের সার্থকতা সম্পাদনের শুভ সংকল্প গ্রহণ করিতে আরম্ভ করিয়াছেন এই বৃদ্ধ বাঙালী সন্তান সদলবলে। পশ্চিমবঙ্গ যদি সত্য সত্যই বাঙালীর এবং বাংলা ভাষার দুর্গতি দূর করিবার জন্য পূর্ববঙ্গের অনুকরণে সফল হইবার আন্তরিক প্রয়াস পায় তবে গত বৎসরকে আমরা সানন্দে বিদায় অভিনন্দন জ্ঞাপন করিয়া নববর্ষকে আন্তরিক আবাহন করিতেছি।”
দাদাঠাকুরের এই বক্তব্য কতটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন তা সহজেই বুঝা যায়। সংবাদকর্মী হিসেবে দাদাঠাকুরের কর্মজীবনের শুরু। শেষ অবধি আগাগোড়া তিনি একজন সৎ বলিষ্ঠ ও নীরেট সাংবাদিক। তার জীবনাবধি যা কিছু লেখা তা সংবাদ পরিবেশনার এবং সম্পাদকের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই। শুরু আর শেষের মধ্যে পার্থক্য একটাই ক্রমশ তিনি তার নিজ ভুবনে আরও পরিণত হয়েছেন। ক্রমশ তিনি নিজেকে নিজে ছাড়িয়ে গেছেন। জীবনের প্রথম থেকেই সংবাদপত্র শিল্পের নানাবিধ সমস্যাকে কাছ থেকে দেখেন। তাই শুধু সংবাদ পরিবেশন এবং বিশ্লেষণেই সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন সময় এই জগতের সমস্যার স্বরূপ উন্মোচনের চেষ্টা করেন। ‘কাগজের বাজার, মুদ্রাযন্ত্রর দুরাবস্থা’ নিয়ে অর্ধশত বছর আগে জঙ্গীপুর সংবাদে লেখেন কাগজ সরবরাহ ঠিকমতো না হলে সংবাদপত্র চালানো কঠিন। সেক্ষেত্রে তিনি দেশীয় পদ্ধতিতে কাগজ শিল্প উন্নয়নের পর জোর দেন। সংবাদপত্রর কন্ঠরোধ করার চেষ্টা শুধু বিদেশি শাসকই নয়, দেশীয় শাসকরা ও সমতালে করেন। সেক্ষেত্রেও লেখেন “কর্তারা নিজেরাই বলিতেছেন যে কংগ্রেস এবং কংগ্রেস সরকার দুর্নীতিতে দূষিত হইয়াছে কিন্তু কাগজওয়ালারা এদের কেলেঙ্কারীর কথা যাহাতে প্রকাশ করিতে না পারে এই সাধারণ নির্বাচনের পূর্বে তেমন আইন তৈরী করিয়া ছাপাখানার গুলিকে ও সায়েস্তা করার ব্যবস্থা করা হইতেছে।” নেহেরুর ভগ্নী কৃষ্ণা হাতীসিং একবার কলকাতার সাংবাদিকদের সাথে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। প্রথম যৌবনের নির্ভীকতা নিয়েই ৭২ বছর বয়সী দাদাঠাকুর ‘বাংলার সাংবাদিকদের বরাত’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে উপসংহারে লেখেন “শ্রীমতি হাতিসিং যাঁহাদের উপর কটূক্তি করিয়াছেন তাঁহারা সংবাদপত্র মালিকদের মাহিনা করা লোক। নামে ঊফরঃড়ৎ হইলেও তাঁহাদের অরফ-ঊধঃবৎ বলিলেই যেন ঠিক হয়। মালিকরা মারও খান না। গালাগালি ও খান না। তাঁহারা এসবের জন্য এই বেচারীদের ভাড়া করিয়া রাখিয়াছেন। মালিকদের বেয়ারাদের ও বেঞ্চে বসাইবার সুযোগ শ্রীমতি কখনও পাইবেন না। উহাদের কেউ বা গচ কাহারো ছেলে গখঅ যাহা উপমন্ত্রী শ্রীমতির নাগালের বাইরে। তাঁহারা শ্রীমতীর গালাগালিকে গলাগলি বলিয়া গ্রহণ করেন।” শ্রীমতীর অগ্রজের কংগ্রেসের ভাষণ লিখিয়া লইবার জন্য যাঁহাদের গতপূর্ব রবিবার অপমান করিলেন তাঁহারাই যাইতে বাধ্য হইবে এর কয়েক মাস পর আবার লেখেন “সরকার সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করার ব্যবস্থা বেশ পাকা করিয়াছেন।” লক্ষ্মীমন্ত সংবাদপত্রগুলো সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনার দিক বড় একটা যায় না। তাহারা সরকারের মোটা মোটা বিজ্ঞাপন পাইয়া প্রায়ই ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’। অবস্থায় কায়দা করিয়া চলে। যারা সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা করে তাদের আর্থিক দশাটাও তেমন নয়। ইহাদের বিরুদ্ধেই আইনের প্রয়োজন হইয়াছে। “ইংরেজদের মতলব ছিল অবাধ শোষণকার্য, তবু ও যেন তাহাদের চক্ষুলজ্জা ছিল, দেশীয় শাসকদের সেটুকু ও নাই। মন্ত্রী বা সরকারি কর্মচারীদের অবাধ ঘুষ দুর্নীতির কেচ্ছাকাহিনী যাতে প্রকাশ না হয় সেজন্য কংগ্রেস সরকারের এমন আইন দরকার যে আইনে এক কলম বিরোধী লেখার জন্য সম্পাদককে জীবনভর ঠেলা সামলাতে হয়।” গণতন্ত্রের দফা ঠা-া করার এই অমোঘ অস্ত্র মাথার ওপর খাড়া থাকা সত্ত্বেও সত্তরোর্ধ্ব দাদাঠাকুর এতটুকু বিচলিত হননি। জীবনের শেষ পর্যন্ত আদর্শ রক্ষায় তিনি অনমনীয় ভূমিকা রেখে যান।
কিন্তু তার প্রতিভাবলে নীরস সাংবাদিকতাকে সরস উপস্থাপনার মাধ্যমে মানুষকে তিনি সবসময় আকৃষ্ট করেন। অতিবড় শত্রুও কিছুটা সময় থমকে যায়। দাদাঠাকুরের সময়ে উচ্চবিত্ত শ্রেণির মদ্যপানের উন্মত্ততা ছিল অতি মাত্রায়। এর পরিণাম সাধারণে বুঝানোর সামাজিক দায়িত্ব হিসাবে রচনা করেন ‘বোতল পুরান’। বাংলা হিন্দিতে গান গেয়ে গেয়ে এই বই বিক্রির সময় একদিন সন্দেহবসত হকার হান্টিংয়ে বেড়ানো ইংরেজ সার্জেন্ট তার পথরোধ করে। সাথে সাথেই এই বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে স্বকণ্ঠে ইংরেজিতে গান গেয়ে তাদের মুগ্ধ করেন। ইংরেজ পুলিশ অগত্যা অনেকগুলো কপি কিনে নেয়। যে কোনো সময়, যে কোনো অবস্থাতে তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা আর সরস রসিকতা দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার দাদাঠাকুরের অসাধারণ ক্ষমতা বিস্ময়কর।
নিত্যদিনের সংবাদ পরিবেশনের মাঝেই দাদাঠাকুরের তীক্ষè সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিশ্লেষণ আজকের সময়কেও অনেকক্ষেত্রেই ধারণ করে। সমকাল থেকে কালোত্তীর্ণ এই আগাগোড়া সংবাদসেবী মানুষটি আস্তিক না নাস্তিক এ নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে। দেবদেবীর পূজা বা পৌরাণিক কাহিনি নিয়ে হাস্যরসের অবতারণায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। শুধু তাই নয়, দাদাঠাকুরের ছেলের গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় স্ত্রী প্রভাবতী দেবী একটা কলা, একটা শশা, এক পোয়া চাউল মন্দিরে মানত দিয়ে ছেলের সুস্থতার প্রার্থনা করেন। দাদাঠাকুর এ কথা জানতে পেরে স্ত্রীকে বলেন, গরিবের সংসারে অহেতুক ঘাটতি করে লাভ কী? মা ভবানীর যদি কিছু করার ক্ষমতাই থাকে তবে নিজ পুত্র গণেশের শুঁড় আর মদখোর স্বামী শিবের পরিবর্তনই তো আগে করার কথা ছিল। আচারসর্বস্ব ধর্মে তার কোনো আস্থা ছিল না। এমনকি নিজের জন্য ঈশ্বরের কাছে দেহি-দেহি মন্ত্রর বিভিন্ন সময় তিনি কটাক্ষ করেন। কোনো এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘ভগবানের কাছে কী চাইবো?’ আমার জন্মের পূর্বেই আমার মাতৃস্তনে দুধ পাঠিয়ে দিয়েছেন, শিশুকে মাতৃস্তন চুষে দুধ পান করতে শিখিয়েছেন। এই তো যথেষ্ট আর কিছু সত্যিই তার চাওয়া ছিল না। যা কিছু পাওয়ার তা অর্জন করেন কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে, নিজের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও আত্ম-মর্যাদাবোধ দিয়ে। জাগতিক সুখ দুঃখের ঊর্ধ্বে নিজেকে উন্নীত করেন অন্তরের কঠিন সাধনায়। প্রিয় পুত্রের চিতা জ্বালিয়ে দাহ শেষ না করেই পরদিনের নির্ধারিত কাজের জন্য টেবিলে কাগজ-কলম নিয়ে বসেন। কাছের মানুষজনের সংশয় ছিল দাদাঠাকুর সত্যিই কাঁদতে জানে কি না? তারাই অবাক হয়ে দেখেছে দাদাঠাকুরের নীরব অশ্রুজল স্বদেশী আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে মৃত তরুণ প্রাণের জন্য। যদি ও দাদাঠাকুর একে কান্না বলে স্বীকার করেন নি। “এ আমার কান্না নয়। এ আমার আনন্দাশ্রু। আমাদের ছেলেরা দেশের জন্য জীবন দিতে শিখেছে।”
দাদাঠাকুর নিজেও সারাজীবন উৎসর্গ করেছেন, দেশ আর দেশের সাধারণ মানুষের জন্য। ১৯৬২-তে তিনি রাষ্ট্রপতির স্বর্ণকমল পুরস্কার পেয়েছেন। তখনকার সময়ে দাদাঠাকুরই প্রথম ব্যক্তি জীবন্ত কিংবদন্তি হিসেবে যাকে নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দাদাঠাকুর’ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পায়। এই চলচ্চিত্রে নামভূমিকায় অভিনয় করেন শক্তিমান অভিনেতা ছবি বিশ্বাস। এবং যা তার জীবনের অভিনীত শেষ ছবি। ছবি বিশ্বাস এবং নাট্যরূপ প্রণেতা নৃপেন্দ্রনাথ উভয়েই দাদাঠাকুরের আগে মারা যান। শুধু মুখে মুখে ছড়িয়ে যায় অসাধারণ সংলাপ “বিদূষক যখন কাঁদে, তখন স্বয়ং ঈশ্বর কাঁদেনা।” শেষের কয় বছর দাদাঠাকুর নানাভাবে অসুস্থ থাকেন। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে বিদায়ও নেন।
দাদাঠাকুরের যোগ্য সম্মান ভারত রাষ্ট্র দেয়নি। তার অমূল্য রচনা সম্ভার, তার সম্পর্কিত তথ্যাদি তেমনভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়নি, অবহেলায় হারিয়ে গেছে অনেক অমূল্য সম্পদ। দাদাঠাকুরের আগে এই বাংলায় কুমারখালিতে সাংবাদিক ও সাহিত্যিক হিসেবে আর এক অসাধারণ প্রতিভার কথা আমরা জানি। তিনি এর কেউ নন কাঙাল হরিনাথ। দাদঠাকুরের জন্মমৃত্যু ওপার বাংলায়। কিন্তু সঠিক বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে তিনি অবিচ্ছেদ্য অংশ। শাসক আর শোষকের বিরুদ্ধে তার গান “চারদিক হতে ধনিক বণিক/শোষণকারীর জাত/দুই হাত টানছে মোদের/রাঁধাখানার ভাত/কোলের খোকা মরছে কোলে/নাই আমাদের হাত” তার জন্মস্থান ও সময় দিয়ে তাকে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি নিজে ছিলেন সবার জন্য। সবার মাঝেই তার স্থান, তার প্রাণ। অথচ কতটা আত্মপ্রত্যয়, আত্মঅহঙ্কার থাকলে বলা সম্ভব “I first person singular number, always capital, naver takes help of another alphabet”
আমাদের জন্য এই উক্তি কঠিন মনে হতে পারে। সত্যিই অন্য কোনো বর্ণমালার সাহায্য ছাড়াই যিনি একক, অথচ বর্ণিল। মনে হয় তাকে না জানাটা আমাদের জন্য বিশেষত বাঙালির জন্য সংবাদজগতের সাথে যারা জড়িত তাদের জন্য লজ্জার এবং ক্ষতির।

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ২৭ আগস্ট ২০১৭

  • ১৩ আগস্ট ২০১৭

  • ০৬ আগস্ট ২০১৭

  • ৩০ জুলাই ২০১৭