বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০১৭, ১২:৫৪

অনলাইন ডেস্ক

সৈয়দ শামসুল হক

আশা করিনি, এত ভোরে তিনি_ শেখ হাসিনা_ নেমে আসবেন মিন্টো রোডের লাল বাড়িটির দোতলা থেকে নিচে, আমাদের যাত্রা শুরুতে বিদায় শুভেচ্ছা জানাতে। তারিখটি ১৯৯৩ সালের ১৭ মার্চ, বুধবার_জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন।
আমরা তিনজন_ আমি আর বেলাল চৌধুরী ও রবিউল হুসাইন সড়ক পথে যাচ্ছি টুঙ্গিপাড়ায়_ বঙ্গবন্ধুর জন্মগ্রামে, এই প্রথমবারের মতো, বাংলার কবিদের পক্ষ থেকে তার সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে।
১৭ বছর আগের একটি দিনের কথা মনে পড়ে। আমি তখন লন্ডনে থাকি। ১৯৭৬ সালে ঢাকায় এসে প্রথমেই গিয়েছিলাম বনানী গোরস্তানে। সেখানে বঙ্গবন্ধু-পতœী বেগম ফজিলাতুন্নেছা, তার তিন পুত্র, দুই পুত্রবধূসহ আরও অনেকের লাশ ঘাতকেরা দাফন করেছিল। তখন পর্যন্ত প্রকৃত সংখ্যা জানি না, এখনও ওই গণকবরের মাথায় ফলকে লেখা নাম-তালিকাটি সম্পূর্ণ নয়। আমার এক বন্ধু, এখনকার খুব নামকরা সাংবাদিক তিনি, তার গাড়ি ব্যবহার করছিলাম ঢাকায় এসে। তিনি নিজে তো আমার সঙ্গে বনানী গোরস্তানে যেতে রাজি হলেনই না, গাড়িটিও দিলেন না।
ভোরবেলা। স্কুটারে করে যাই বনানী গোরস্তানে। পাশেই বাহিনীর একটা আপিস। গোরস্তানের গেটে দেখি সশস্ত্র পাহারাদার ঘোরাফেরা করছে। ভাবেনি আমি কার কবর জিয়ারত করতে এসেছি। যেমনটা শুনেছিলাম, গোরস্তানে ঢুকেই বাঁ হাতে পড়বে তাদের কবর_ খুঁজে পেতে এতটুকু কষ্ট হলো না। স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম। এখনকার মতো দেয়াল ঘেরা নয়, নামফলক নেই, কবরও আলাদা করে দেখানো নয়, একঢালা স্তূপ স্তূপ মাটি, অযতের ঘাস, বুনো ফুল দু-একটা । যখন ওই দীর্ঘ গণকবরের কাছে গিয়ে দাঁড়াই, যে বাক্যটি আমার করোটির ভেতরে পলকপাত মাত্র রচিত হয়ে যায় : চোখ ভিজে আসে, চোখ ভিজে যায়, চোখ ভেসে যায়/ মানুষেরই চোখ কেবল দেখতে পায়;_ বাক্যটি বীজের মতো কাজ করে আমার ভেতরে, কয়েক বছরের ব্যবধানে ওই বাক্য দিয়ে শুরু করি আমার কথাকাব্য ‘অন্তর্গত’; ওই রচনায় আমি মুক্তিযুদ্ধের একটি অনুভব আঁকতে চেয়েছি যে, শেষ পর্যন্ত তবে এইই_দেশপ্রেমিক হয় নিহত এবং হত্যাকারীর জন্যেই তবে আজ এই রাষ্ট্র?!
মনে পড়ে, বেগম মুজিবসহ সবার জন্যে_ যারা এখানে এই বনানী গোরস্তানে শায়িত আর যিনি টুঙ্গিপাড়ায়_ প্রার্থনা শেষে ফিরে দাঁড়াই, দেখি আমাকে ঘিরে ধরেছে দুজন বন্দুকধারী। আমাকে ওরা নিয়ে যায় ওদের অফিসারের কাছে জিগ্যেসাবাদের জন্যে। কে আমি? ঠিকানা কী? কেন কবর জিয়ারত করতে এসেছি? তখন বিবিসিতে কাজ করতাম। সে পরিচয় দিতেই আমাকে বলা হলো, এ সম্পর্কে কোনো রিপোর্ট করতে এসেছি কি না? না, এ আমার ব্যক্তিগত সফর; বঙ্গবন্ধুর পতœী ও সন্তানেরা আর সকলের সঙ্গে যেখানে ঘুমিয়ে আছেন, সে জায়গাটিকে আমি পবিত্র মনে করি। আর রিপোর্ট করবার কথা বলছেন? রিপোর্ট তো ইতিহাস করবে। ইতিহাসের চেয়ে বড় রিপোর্টার কে আছে?
কীভাবে ওরা আমাকে ছেড়ে দেয়। তারপর ১৯৭৯ সালে দেশে ফিরে এলাম। এত কিছু হলো। বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রস্বপ্নের কথা এত বলছি। এখন সমুখে বাংলা নতুন শতাব্দী আসছে, তার উৎসবের জন্যে স্লোগান রচনা করেছিÑ হে মহানায়ক, তোমার স্বপ্নকে বয়ে নিয়ে যাব আগামী শতাব্দীতে; অথচ আজ পর্যন্ত টুঙ্গিপাড়ায় তার শেষ বিশ্রামের ছবিটি দেখে আসিনি। কয়েকদিন আগে শেখ হাসিনাকে বলেছিলাম, ‘আমি যেতে চাই।’
‘বেশ তো। যাবেন।’ পর মুহূর্তেই তিনি যোগ করলেন, ‘আর ক’দিন পরেই তো তার জন্মদিন, সেদিন যান।’ হেসে সাবধান করে দিলেন, ‘পথ কিন্তু লম্বা। যেতেও বেশ কষ্ট।’
‘কষ্ট? সে কী কথা! বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারতে যাব, কষ্ট যতই হোক।’
আমার সঙ্গে সেদিন ছিলেন বেলাল চৌধুরী। তিনিও বললেন, ‘আমিও যেতে চাই। রবিউলও বলছিল যাবে।’
রবিউল মানে রবিউল হুসাইন্ন_ কবি ও স্থপতি।
‘আচ্ছা।’ ছোট্ট করে শেখ হাসিনা বললেন। তারপর একটু ভেবে বললেন, ‘যাবেন কী করে? দেখি, গাড়ির ব্যবস্থা করা যায় কি না।’ সিদ্ধান্ত দিলেন, ‘ভোরে যদি ঢাকা থেকে রওনা হন, আরিচা দিয়ে না গিয়ে সেখানে যানজট হয় মাঝে মাঝেই, যদি মাওয়া সড়ক দিয়ে যান, তা হলে বিকেলের মধ্যেই পৌঁছে যেতে পারবেন। ইফতারের আগেই মিলাদ দোয়া হয়ে যেতে পারবে। রাতে টুঙ্গিপাড়ায় থেকে যেতে পারেন। নইলে খেয়ে-দেয়ে রাতেই রওনা দিলে ভোরে ঢাকায় ফিরে আসতে পারবেন।’
আমি বললাম, ‘রাতে না হয় না-ই থাকলাম। ঢাকায় কাজ আছে যে!’ কাজ মানে, তখন চলছে বাংলা ১৩৯৯ সন, বৎসরের শেষ প্রান্তে আমরা এসে পড়েছি, আর কয়েক সপ্তাহের ভেতরেই পহেলা বৈশাখ, ১৪০০ সন। আমাদের প্রস্তুতি চলছে বাংলা নতুন শতাব্দীকে স্বাগত করে নেবার। এ শুধু নতুন একটি শতাব্দীকে বরণ করে নেয়া নয়, এই উৎসবের ভেতর দিয়ে বাংলার রাষ্ট্রস্বপ্ন আর শত্রুদের কালো আলখাল্লায় আচ্ছাদিত বাংলাদেশের ইতিহাস_ বিশেষ করে সাম্প্রতিক ইতিহাসকে উন্মোচিত করে, দিনের ও মনের আলোয় ফিরে আনবার মতো জাতির এই মুহূর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করবার স্বপ্ন দেখছি আমরা। এই স্বপ্ন নিয়েই গঠিত হয়েছে নতুন শতাব্দীকে বরণ করে নেবার জাতীয় পর্ষদ; আহ্বায়ক বেগম সুফিয়া কামাল, যুগ্ম আহ্বায়ক শামসুর রাহমান আর আমি, সদস্য সচিব ওবায়দুল কাদের।
হাতে সময় নেই, সমুখে এত বড় মাপের কাজ। টুঙ্গিপাড়া থেকে সে রাতেই ফিরে আসবার কথা ঠিক হলো। শেখ হাসিনা বললেন, ‘পারলে আমি নিজেই আপনাদের সঙ্গে যেতাম, কিন্তু ঢাকায় থাকতে হবে ওই দিন। বরং আমার দুজন সহকর্মী আপনাদের সঙ্গে থাকবেন। জিল্লুর রহমান সাহেব যাবেন। আর ওবায়দুল কাদের।’ শেখ হাসিনা তখন জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা। আর মিন্টো রোডের ওই বাড়িটি তার সরকারি বাসভবন। সেখানেই তার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সংসার। বাংলা নতুন শতাব্দী বরণের কাজে কয়েকবার গিয়েছি বাড়িটিতে। ঠিক হলো, ওখানে আমরা সবাই ভোরে এসে মিলিত হব।
যাত্রার দিন ভোরে মিন্টো রোডে পৌঁছে দেখি, আমাদের ভেতরে বিলম্ব করবার ব্যাপারে যাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভয়, সেই বেলালই আগে এসে গেছেন। নীল জিনসের শার্ট পরা, কাঁধে একটা ব্যাগ। বাগানে ফুলের গাছগুলোর ভেতর দিয়ে হাঁটছেন আর কোনো একটা ফুল পছন্দ হলেই হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই রবিউল এসে গেলেন, হাতে তার তামাকের পাইপ, গলায় শাদা স্কার্ফ। হাত-পা ঝাড়া মানুষ। হাসতে হাসতে বললেন, ‘দেরি করে ফেললাম না-কি ও?’
‘আমরা তো এসে গেছি। এবার ওরা এলেই হয়।’
মানে জিল্লুর ভাই আর কাদের।
রবিউল বললেন, ‘রোজার দিন তো। সেহেরি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন, তাই উঠতে হয়তো ওদের দেরি হচ্ছে।’
এর মধ্যে বাড়ির লোক একজন এসে জিগ্যেস করে গেল, ‘নেত্রীকে খবর দেব?’
‘না, না। দরকার কী? আমরা এখানে এসেছি একটা কমন জায়গা থেকে রওনা হব বলে। এত ভোরে ওকে ডিস্টার্ব করবেন না।’
বাগানে পায়চারি করছি আমরা তিনজন। বাগানে থরে থরে ফুটে আছে লাল ও হলুদ ফুল। আমাদের বাহন একটি জিপ ও মাইক্রোবাস বাগানের এক পাশে গাছের তলায় একেবারে প্রস্তুত।
হঠাৎ ফিরে দেখি, শেখ হাসিনা। গাড়ি বারান্দায়। পরনে হালকা সবুজ পাড় সাদা শাড়ি। পায়ে দু’ফিতের সাধারণ স্যান্ডেল। চোখে-মুখে রাতজাগা একটা ছবি। মার্চ মাস শেষ হয়ে আসছে, তবু মাঝে মাঝেই শীত এসে এখনও হালকা হানা দেয়। সেদিন হঠাৎ কুয়াশা পড়েছিল ভোরে। আমি যখন বাড়ি থেকে বেরোই, তখন তো সড়কের ওপর কুয়াশার বল গড়াচ্ছিল। রমজানের ভোরে ঘুমিয়ে আছে সমস্ত শহর। ফুটপাথে ঘুমিয়ে আছে মানুষেরা। শিশিরে পথের পিচ ভিজে আছে। পৃথিবীর সমস্ত বর্জ্য ও আবর্জনার ওপরে প্রকৃতি যেন তার নির্মল ধৌত করবার কাজটি সারারাত নীরবে করে গেছে_ যেন বাকিটুকু আমাদের জন্যে রেখে দিয়ে। শেখ হাসিনাকে দেখে আমরা তার কাছে গেলাম। কাছে যেতেই গভীর স্মিত হয়ে উঠলেন তিনি, সঙ্গে সঙ্গে যেন একটি অরুণ আলো এসে পড়ল। ভোরের সেই কুয়াশার ভেতরে বঙ্গবন্ধু কন্যাকে দেখে মনে হলো একটি প্রতীক_ জাতির জীবনে পঁচাত্তরের পর দীর্ঘ কুয়াশার কথা আমার মনে পড়ে গেল, যা ভেদ করে অরুণ প্রথম আলোটির সম্পাতের স্বপ্ন আমরা দেখছি, এই সেই আলো পড়েছে তার মুখে।
তিনি বললেন, ‘আপনারা এসে গেছেন? সেহেরির পর একটু ঘুমোতে যাব ভাবছি। মনে পড়ল, আপনারা যে আসছেন। কোরআন পড়তে পড়তে উঠে এলাম।’ জানালেন, ‘জিল্লুর সাহেব ফোন করেছিলেন, রওনা হয়ে গেছেন। কাদেরও একটু পরেই এসে পড়বে। আপনারা ভেতরে এসে বসুন।’ হাসলেন একটু, ‘আপনাদের মধ্যে রোজা কেউ না থাকলে নাশতা করে নিন।’
কিন্তু আমরা যাত্রার জন্যে অস্থির। টুঙ্গিপাড়ায় যাব। বঙ্গবন্ধু নেই জানি, মাটির সঙ্গে মিলে গেছে তার দেহ, কিন্তু তিনি মৃত্যুঞ্জয়। তিনি আছেন আমাদের কর্মদ্যোতনায়, স্বপ্নচারণায়। আমাদেরই জীবদ্দশায় তাকে দেখেছি কেউ কাছে থেকে কেউ দূরে থেকে। বাঙালির রাষ্ট্রস্বপ্ন_ ঘাতকদের বুলেটে যার দেহ থেকে ক্ষরিত রক্তে এখনও ভিজে আছে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি ইঞ্চি, তাকে বাংলার কবিদের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানাতে আমরা যাব, যে বাঙালি কবি অবিরাম মানুষ ও তার জীবন ও জন্মভূমির কথা বলেছেন_ ‘শুনহ মানুষ ভাই/ সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’, ‘এমন মানব জনম আর কি হবে?’, ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি/ তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী’, ‘আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি’, ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?/ কা-ারী বলো ডুবিতেছে আজ সন্তান মোর মার’_ চোখ ভিজে আসে, চোখ ভিজে যায়, এখন এই ভোরে, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে, নতুন শতাব্দীতে তার সাহস ও স্বপ্নের বার্তা পৌঁছে দেবার অঙ্গীকারে আবদ্ধ আমরা কবিরা যাব তার সমাধিতীর্থে, বাংলার মাটি থেকে উত্থিত এক সার্থকজনম যার তেমন সন্তানের জন্মগ্রামে, আমাদের কি বিলম্ব সয়?
ভেতরে যাব না দেখে, শেখ হাসিনাও দাঁড়িয়ে রইলেন আমাদের সঙ্গে মাঠের ওপর। টুকিটাকি কথা বলতে লাগলেন।
‘রাতেই যদি রওনা হন, টুঙ্গিপাড়াতেই ভাত খেয়ে নেবেন।’
‘আপনার বাড়িতেই তো?’ আমি জিগ্যেস করি।
ম্লান হাসলেন তিনি, ‘সেখানে তো এখন কেউ থাকে না। নির্মল নামে একটি ছেলে আছে, দেখাশোনা করে। আপনারা শেখ সেলিমের বাড়িতে খাবেন। আমাদের বাড়ির পাশে মসজিদ, তার পরেই দাদা-পরদাদাদের পুরনো ভাঙা বাড়ি দেখবেন, পরের বাড়িই আমার ফুপুর বাড়ি, তার ছেলে শেখ সেলিমের।’ বলেই হাসতে লাগলেন শেখ হাসিনা, ‘ভাই থাকতে বোনের চিন্তা কী? ভাইয়ের দায়িত্ব না? আপনারা মেহমান। ভাই খাওয়াবে আপনাদের। উনি এখন ঢাকায়। আমি ফোন করে দিচ্ছি।’
বেলাল রবিউলের সঙ্গে তার কথা চলছে শতাব্দী বরণ উৎসব নিয়ে। বেলালের ওপর দায়িত্ব সেমিনারগুলোর। রবিউল_ যিনি কবি এবং পেশায় স্থপতি_ দেখছেন সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানের মঞ্চ, তোরণ ইত্যাদির নির্মাণ ও সজ্জা-পরিকল্পনার দিক। আমি পাশে দাঁড়িয়ে শুনছি।
হঠাৎ আমার মনে পড়ে যায়, ’৮১-৮২ সালের কথা। তখন ধানমন্ডিতে এক স্কুলের ছাত্র ছিল শেখ হাসিনার দুই সন্তান। প্রায়ই তিনি তাদের আনতে যেতেন স্কুল শেষে। স্কুলের বাইরে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে, কখনও গাড়িতে বসে অপেক্ষা করতেন। আমারও দুই সন্তান সেই স্কুলেরই ছাত্র ছিল। আমিও রোজ তাদের আনতে যেতাম। সন্তানদের জন্যে অপেক্ষমান শেখ হাসিনার সঙ্গে তখন মাঝে মাঝেই গল্প জমে উঠত_ কখনও তার বাবার কথা, কখনও মায়ের, কখনও দেশের, কখনও সাহিত্যের। বাংলা সাহিত্যের তো তিনি ছাত্রীই ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে। পরে বইও লিখেছেন কয়েকখানা।
মনে পড়ে যায়, এমনই একদিন দুপুর বেলায়_ সেদিন রোদটা ছিল বড্ড তাতানো, শেখ হাসিনা সন্তানদের অপেক্ষা করছেন সাদা মাইক্রোবাসের ভেতরে, গরমের জন্যে দরোজাটা হাট খোলা, আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে গল্প করছি। শেখ হাসিনা বললেন, ‘এবার একটু বৃষ্টি হলে মাটি বাঁচে। ফসলের জন্যে খুব চিন্তা হচ্ছে।’
সেই সূত্র ধরে কথায় কথায় আমি বলছি আরেক বৃষ্টির কথা, মুষলধারে সেই বৃষ্টি, সেই বৃষ্টির ভেতরে ’৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসা, বৃষ্টির ধারায় সিক্ত হয়ে ট্রাকের ওপর তার বসে থাকা, পথের দু-ধারে লক্ষ লক্ষ মানুষ, ভিজছে তারাও, আমিও ভিজছি মনিপুরীপাড়ার মুখে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ শেখ হাসিনা বললেন, ‘জানেন, এই মাটি আমার মা। এই মাটির স্বপ্ন আমার পিতা। এই মাটিতে আমি স্বর্গ রচনার স্বপ্ন দেখি।’_ অনেক পরে তার এই কথাটি আমি আমার ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’ উপন্যাসের একেবারে শেষ দিকে ব্যবহার করেছি। আজ ভোরে, বাগানে, বেলাল রবিউলের সঙ্গে শেখ হাসিনা যখন কথা বলছিলেন, আমি তার সেদিনের সেই কথাটির স্মরণ করে বলে উঠলাম, ‘দেখুন, আমরা রাজনীতি করি না, তাই বলে গভীর অর্থে রাজনীতির বাইরেও আমরা নই। রাজনীতির ক্ষেত্রে আপনি যা করছেন সে আপনার কাজ, আমরা আমাদের হাতে এবার এই শতাব্দী বরণ উৎসব থেকে শুরু করছি আমাদের লেখা ছাড়িয়ে মানুষের মধ্যে স্বপ্ন রচনার প্রত্যক্ষ কাজটি।’
ঠিক এই সময়ে রিকশা থেকে নামলেন ওবায়দুল কাদের, আর প্রায় একই সঙ্গে এসে গেলেন জিল্লুর রহমান তার গাড়িতে।
শেখ হাসিনা তাড়া দিলেন, ‘আর দেরি করবেন না। রওনা হোন। মাওয়ার রাস্তায় ৫-৬টা ফেরি। অনেক সময় লেগে যাবে।’
চমৎকার গৃহিণীর মতো শেখ হাসিনা গুছিয়ে দিলেন সব। যাত্রাপথের যা যা লাগতে পারে সব খোঁজ নিয়ে দেখলেন, এমনকি ফার্স্ট এইড দরকার হলে তারও ব্যবস্থা গাড়িতে আছে কি না জেনে নিলেন। হিসাব করে দিলেন কে কোন গাড়িতে উঠবেন। জিল্লুর ভাই আর আমি উঠে পড়লাম জিপে; বেলাল, রবিউল আর ওবায়দুল কাদের মাইক্রোবাসে।
শেখ হাসিনা হাত তুলে আমাদের বিদায় জানালেন। আমাদের যাত্রা শুরু হলো টুঙ্গিপাড়ার দিকে।
সড়কে নামতেই শব্দ আসে কানে_ ক্যাসেটে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চ একাত্তরের ভাষণ বাজছে কোথাও। জাতির ইতিহাস থেকে শেখ মুজিবুর রহমানটি ঘাতকদের হাতে মুছে ফেলবার ১৮ বছর চলছে, তবু এখনও মোছা কি গেছে? টেপ মুছে দিলেও তো বুকের ক্যাসেট প্লেয়ার বাজে এখনও বাংলায়। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম, মাটির কত কাছে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ঢাকা নগরী তো বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ বলেই আমার মনে হয়। ঢাকায় হাটখোলার মোড়ে প্রথম শুনলাম কোথাও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজছে। জুরাইনের কাছে আরেকবার শোনা গেল। কিন্তু ঢাকা থেকে বেরিয়ে, বুড়িগঙ্গার ওপর সেতু পার হয়ে ওপারে যেই গিয়ে পড়লাম, চারদিক থেকে, দূর-দুরান্ত থেকে ভেসে আসতে লাগল বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠ_‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বাজতে বাজতে টেপ ঘষে প্রায় আর কিছু বাকি নেই, তবু স্পষ্ট, তবু তীব্র, তবু গর্জমান। দু-ধারে সবুজ মাঠ, গ্রাম, বাড়িঘর, বাজার, মাথার ওপরে ঝকঝকে নীল আকাশ, সোনার মতো রোদ্দুর_ সমস্ত কিছু ভাসিয়ে নাচিয়ে কাঁপিয়ে বহে যাচ্ছে যেন রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ঝিলমের ওপর দিয়ে এই প্রভাতে এক বলাকা শ্রেণি। আমরা শুনছি ইতিহাসের তীব্র পাখসাট আমাদের চতুর্দিকে। এ এক আশ্চর্য কোরাস। একই কণ্ঠ, শত সহ দিক থেকে।
জিল্লুর ভাইয়ের গাড়িতে আমি। স্বভাবতই তিনি স্বল্পভাষী। বসে আছেন ড্রাইভারের পাশের আসনে। আমি পেছনে। আমার পেছনে আওয়ামী লীগের তরুণ কর্মী আক্কাস। সে আমাকে বারবার বলতে লাগল, ‘যতই ভিতরে যাইবেন, দেখবেন বঙ্গবন্ধুকে মানুষ এখনও ভোলে নাই।’
এ কথা শুনে জিল্লুর ভাই একবার শুধু পেছন ফিরে বললেন, ‘খালি মুখের কথা না। বঙ্গবন্ধুর জন্যে কাজ করো। কাজ চাই।’
তিরস্কারের মতো কথাটা শুনে আক্কাসের একটু মন খারাপ হয়ে গেল। ওর বাবা আমার বন্ধু ছিলেন। ছোট থেকেই দেখেছি ওকে। ওর হাতে একটা আলতো চাপড় দিয়ে আদর করলাম। সব ভুলে সে হাসতে লাগল। বাজারের ভেতর দিয়ে তখন যাচ্ছি। স্পিকারে বঙ্গবন্ধুর আহ্বান ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল’ শুনে আক্কাস হাসিখুশি হয়ে বলে উঠল, ‘হ, এখন দুর্গ গড়ারই টাইম আসছে আবার।’
আমাদের জিপ চতুর্দিকে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্বরের তাড়ায় যেন উড়ে চলল তার জন্মগ্রামের দিকে।
তারপর ছোট ফেরি, বড় ফেরি, আবার ছোট ফেরি, ১৩ শত নদীর দেশ বাংলাদেশের ৭টা নদী পেরিয়ে আমরা এসে গেলাম মধুমতির তীরে। অমৃতনাম এই নদীটির পাশ দিয়ে টুঙ্গিপাড়ার দিকে টানা সড়ক। মাইলের পর মাইল এমন নদীর পাশ দিয়ে সড়ক আমি আর কোথাও দেখিনি বাংলায়। নদী এই দেখা যায়, এই একটা ছোট্ট বাজারের আড়ালে পড়ে যায়, আবার রোদ ঝলসানো মুখ নিয়ে আমাদের সঙ্গে দৌড় দেয়, আবার একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে, হাসতে হাসতে বেরোয়_ মধুমতি আমাদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে চলে। গোপালগঞ্জের ভেতরে এসে যেতেই নদী একটু একটু করে দূরে সরে যেতে থাকে। বিকেলের ম্লান রোদে তাকে ভারী করুণ দেখায়। যেন আমাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর গ্রাম পর্যন্ত যেতে না পেরে ছায়া হয়ে আসছে তা বুক। কিন্তু তাতে কী! মধুমতির পানি সঙ্গে মিশেছে যে ছোট্ট নদী_ নাম তার বাগাইর, যেন একটা গাঁয়ের মেয়ে, হেলাফেলার ডাক নাম ওটি তার_সেই নদীটি তো বহে গেছে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির একেবারে পাশ দিয়েই, তার পানিতেই তো শিশু মুজিব, শেখ লুৎফর রহমানের খোকা, দুরন্ত একদিন ঝাঁপিয়েছে।
গোপালগঞ্জ পেরিয়ে খানিকদূর যাবার পর টুঙ্গিপাড়ার দিকে বাঁক নিই আমরা। মোড়ের কাছে এই প্রথম চোখে পড়ে ছোট্ট একটি নিশানা_ গাছের সঙ্গে পেরেক পোঁতা টিনের ওপর লেখা, কালোর ওপর সাদায়_ ‘জাতির জনকের মাজার এই দিকে।’
আমার বুকের ভেতরটা এই প্রথম তোলপাড় করে ওঠে। এত নিকটে! আর মাত্র কয়েক কিলোমিটার! তারপরেই সেই সমাধি, যেখানে ঘুমিয়ে আছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ এক বাঙালি।
বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অন্যায় শাসনের পাথর গুঁড়ো করে মাথা তুলে দাঁড়াবার জন্যে কত সংগ্রাম, কত বিদ্রোহ, কত যুদ্ধ আমরা দেখেছি। কিন্তু সেসবই ছিল আঞ্চলিক এবং অধিকাংশই রাজতান্ত্রিক। প্রকৃতিপূঞ্জ দ্বারা নির্বাচিত সেই রাজা গোপালের অনেক আগে থেকেই এসব। তারপর হোসেন শাহা, বারো ভুঁইয়া পেরিয়ে রংপুর, দিনাজপুর, সন্দ্বীপ, ময়মনসিংহ, ত্রিপুরা, পাবনা, যশোর, বারাসাত, নারকোলবেড়ে, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, আরও কত অঞ্চলে। কখনও কখনও কর্মশ্রেণিভিত্তিক ছিল সেই বিদ্রোহ_ নীলকর, নানকার, তেভাগা। এবং দেখেছি, সে সকলেরই করুণ অবসান ও পরাজয়। কিন্তু বাঙালির দীর্ঘ হাজার বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো ১৯৭১-এ আমরা দেখি একজন নেতাকে, পাই একটি রণমন্ত্র, করি একটি যুদ্ধ_ এবং সে যুদ্ধ ৫৬ হাজার বর্গমাইলের মতো বিশাল একটি এলাকাজুড়ে।
আবিষ্কার করি সেই যুদ্ধে শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে, গ্রাম ও শহর এক হয়ে সবাই বাঙালির রাষ্ট্রস্বপ্ন মেধায় ও মজ্জায় ধারণ করে লড়ছে।  আবিষ্কার করি, হাজার বছরের ইতিহাসে এমন বৃহৎ এলাকা ও জনসংখ্যা নিয়ে বাঙালি আর কখনও যুদ্ধ করেনি_ আর কখনোই এমন বিজয় তার আসেনি যেমন এসেছিল একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরে। সেই নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সেই রণমন্ত্র ‘জয় বাংলা’, সেই যুদ্ধ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। তাই তাকে বলি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ এক বাঙালি, বলি ‘হে মহানায়ক’, বলি ‘জাতির জনক’।
সেই তার সমাধির প্রায় কাছাকাছি আমরা।
কাঁচা রাস্তা। দু-ধারে ঘন গাছপালা নত হয়ে আছে সরু পথে। পাতা নাড়ছে। যেন আমাদের স্বাগত করছে বাঙালির ইতিহাস তীর্থে।
ছোট গ্রাম। ছোট ছোট বাড়িঘর। আঙিনা। ক্ষেত। নালা। নালার বুকে কালো ভিজে মাটি। যেন অশ্রুতে সজল হয়ে আমাদের আহ্বান করছে।
তারপর দূরে_ একটি দীর্ঘ গাছ_ গাছের গায়ে নিশানা_ আর দিক-নির্দেশনা নয়_ ঘোষণা_ ‘জাতির জনকের মাজার’।
চোখ ভিজে আসে। চোখ ভিজে যায়। চোখ ভেসে যায়। নীরবে আমরা নেমে আসি গাড়ি থেকে।
ওই। সবুজ একটি দীর্ঘ আয়তক্ষেত্র। সাধারণভাবে বাঁধানো। ছিলেন তিনি দীর্ঘদেহী, সমাধিও দীর্ঘ। সবুজ ঘন ঘাস। ঘাসে ঘাসে ছেয়ে আছে মাটি মায়ের উঁচু বুক। সেই বুকের তলে ঘুমিয়ে আছেন খোকা। শেখ মুজিব। বঙ্গবন্ধু। বাংলার ইতিহাসে।
গোপালগঞ্জ থেকে ছাত্ররা এসেছিল সকালে। তাদের ফুল পড়ে আছে সমাধির পায়ের কাছে। দূর বরিশাল থেকে ব্রজমোহন কলেজের ছেলেরা এসেছিল, তারা ফুল দিয়ে চলে গেছে।
চারদিক এখন নির্জন। এখন অপরাহ্ন। পাশেই মসজিদ থেকে কোরআন পাঠের স্বর। গ্রামবাসী এক দল মানুষ বসে আছে সমাধির সমুখে বাড়ির বাহির উঠোনে।
সকলেই প্রৌঢ়। কেউ কেউ জীর্ণ, বৃদ্ধ। নিঃশব্দ সকলে। এরা প্রত্যেকেই উপস্থিত ছিলেন পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পরদিন বঙ্গবন্ধুর লাশ যখন ঘাতকেরা হেলিকপ্টারে করে নিয়ে আসে এখানে মাটি দিতে, তারই বাহির আঙিনায়, পায়ে পায়ে চলবার পথটির পাশে।
এদের একজন ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে আমি গোসল দিয়েছি।’
‘আমি লাশ নামাই।’
‘আমি মোনাজাত করি।’
হা হা করে ক্রন্দনের রোল ওঠে। ওবায়দুল কাদের চোখ মুছতে মুছতে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না। কান্নায় ভেঙে পড়েন। জিল্লুর ভাই হাত তুলে সবাইকে শান্ত হতে বলেন। কিন্তু তিনি নিজেই হয়ে পড়েন সবচেয়ে বেশি অশান্ত। ঠা-া মানুষ বলে বাইরে থেকে ঠাহর করা যায় না ভেতরে তার কী চলছে।
আমরা_ আমি, বেলাল, রবিউল, বঙ্গবন্ধুরই বাড়ির সমুখের গাঁদা গাছ থেকে ফুল তুলে মুঠো ভরে আনি, রাখি তার সমাধিতে।
তার ফুল বিনা বাংলায় আর কোথায় ফুল আছে যে তাকে দিতে পারি? বেলাল ফুল দিয়েই মুখ ফিরে বলেন, ‘আমি চললাম।’
‘কোথায় যাচ্ছিস?’
‘যাই।’
বেলাল মোটেই দেখাতে চান না, তিনি কাঁদছেন। তিনি ছুটে চলে যান একটা রিকশা-ভ্যান ডেকে। আমি রবিউলকে বলি, ‘তুমি যাও। ওকে একা ছেড়ো না।’ আমি বঙ্গবন্ধুর সমাধির পাশে বসে থাকি।
এক সময়ে উঠে গিয়ে, কয়েক পা দূরে, বঙ্গবন্ধুর পিতামাতার কবরের কাছে দাঁড়াই। খোকার অদূরেই বাবা-মা ঘুমিয়ে আছেন; যেন খোকা এখন বড় হয়েছে তো, তাই বাবা-মায়ের পাশে শুতে আর নেই, একটু দূরে নিজের বিছানাটি করে নিয়েছে সে।
চোখ ভেসে যায়। মানুষের চোখ তো শুধু কাঁদবার জন্যে নয়, দেখবার জন্যেই তো আসলে। সবকিছু দেখবার। সবার সঙ্গে সব কিছু মিলিয়ে দেখবার জন্যে আমাদের এই দুটি চোখ।
নিঃশব্দ পায়ে পায়ে মানুষেরা আসে ভিড় করে। চঞ্চল বালক ও তরুণেরা ছুটে আসে। অভিজ্ঞতায় ধীর বয়স্করা আসেন। অনেকে আসেন। বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কিত আত্মীয়জনেরা আসেন। জিল্লুর ভাই তাদের সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। ওবায়দুল কাদের আর আমি বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ভেতরে যাই।
সেই ইজি চেয়ারখানা আছে। মানুষটি নেই। সেই দোতলায় বারান্দা আছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকবার মানুষটি নেই। বাংলা আছে বাংলাদেশেই, মায়ের সন্তানটি শুধু নেই।
একদিন দুগ্ধবতী গাভী যেখানে থাকত, ওলান থেকে ঝরতো অমৃত, সেখানে এখন পরিচ্ছন্ন মাটির মেঝে। তার ওপরে রাখা সাধারণ কাঠের একটি বাকসোÑ বঙ্গবন্ধুর কফিন। নির্মল ছেলেটি প্রতিদিন এই কফিনটি নিজ হাতে গামছা দিয়ে মুছে রাখে।
নির্মল ডালা তোলে কফিনের। হাহাকার করে ওঠে কফিনের ভেতরে শূন্যতা। ওখানে ও-কী? রক্তের শুকিয়ে যাওয়া দাগ? না, আমার চোখের ভুল?
চোখ তো এমন হয়ে আছে, স্পষ্ট করে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
এইখানে, এই কাঠের তক্তায় লেগেছিল বঙ্গবন্ধুর শেষ দেহস্পর্শ। নত হই আমি। করতল বিছিয়ে কফিনের ভেতরে তক্তাগুলো ছুঁয়ে দেখি। তারপর আর আমার কিছু মনে থাকে না। শুধু কাদেরের কণ্ঠস্বর, ‘হক ভাই। হক ভাই।’
তারপর আমি হাঁটতে থাকি। গ্রাম হাঁটি। পথ হাঁটি। মাটি এত সজল মনে হয় যেন কৃষকের ঘামে ভেজা পিঠ। গাছে গাছে এত পাখি, যেন তারা জানে না এ পৃথিবীতে ব্যাধও আছে। বাগাইর নদী। এত কলস্বরা। প্রান্তর এমন সুবাসিত, যেন মাতৃশরীরের ঘ্রাণ লাগা।
ফিরে এসে দেখি, বেলাল আর রবিউল ফিরে এসেছেন। তাদের কাছে গল্প শুনি। তারা দেখে এসেছেন থানার সমুখে হেলিপ্যাড_ যেখানে বঙ্গবন্ধুর লাশ নিয়ে ঘাতকেরা নেমেছিল; শুনি_ তারা শুনে এসেছেন_ লাশের পাশেই রাখা ছিল বঙ্গবন্ধুর চশমা, আর ছিল কিছু লাল পিঁপড়ে_ লোকেরা যারা দেখেছেন তারা বলেছেন, পিঁপড়ে নয়, যেন লাল রক্ত, কফিনের ভেতরে চলাচল করছে।
বেলাল বললেন, ‘সেই পুরাতন ইস্টিমার ঘাট দেখে এলাম। কল্পনায় দেখলাম, এই ঘাট থেকেই যুবক বঙ্গবন্ধু ইস্টিমারে উঠে কলকাতা যেতেন, বাবা পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন, চোখ মুছতেন। দাদি নাম রাখবার সময় বলেছিলেন, এমন নাম রাখলাম জগৎ মনে রাখবে।’
আমি কিছু শুনি, অনেকখানিই আমার কানে পশে না। আমার চোখ থেকে পানি ধারা শুকিয়ে গেলেও চোখ এখনও যেন অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি এই বর্তমানে। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির বারান্দায় আমি চুপ করে বসে থাকি। আমার চোখের সমুখেই বিশাল কবরটি। সেই কবরের নিচে মানুষটিকে, আমার সৌভাগ্য আমি চোখে দেখেছিলাম, সরাসরি কথা বলেছিলাম বার দুয়েক। মনের ভেতরে ফুঁপিয়ে ওঠে সব। আবছা দৃষ্টির ভেতরে অতীত কত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই সকালবেলাটি। ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসের শেষ দিক। শুধু কাছে থেকে চোখে দেখবার জন্য সময় চেয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু সময় দিয়েছিলেন ভোর ৬টায় দেখা হতে পারে। এখনও মনে পড়ে, স্পষ্ট মনে পড়ে_ ভোর বেলায় আমি গেছি, ধানমন্ডির বাড়িতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি, তিনি নেমে এলেন। খালি পা, পরনে লুঙ্গি আর গেঞ্জি। এসেই আমার কাঁধ ধরে বললেন, ‘আসেন এদিকে। কবিতা লেখেন শুনেছি। আসেন।’ বলতে বলতে তিনি পাশে ছোট্ট কামরাটিতে নিয়ে যান আমাকে। নিজে বসেন জলচৌকিতে, আমাকেও পাশে টেনে বসান।
‘কী? কিছু বলেন।’
‘জ্বী, কিছু না। আপনাকে শুধু দেখতে।’
হা হা করে হাসেন তিনি। ‘কী দেখবেন? আমাকে? প্রশ্ন করেন কিছু।’
আচমকা এ কথা শুনে আমার মাথায় আসে না, কী প্রশ্ন করতে পারি তাকে। হঠাৎ বলে বসি, ‘এই যে, ৬-দফার কথা বলেন, আমাকে একটু বুঝিয়ে দেবেন?’
কথাটা বলেই বুঝতে পারি, এত বড় মানুষটাকে এ রকম একটা শিশুসুলভ প্রশ্ন করে ওঠা ঠিক হলো না। আমি মাথা নিচু করে নিই।
বঙ্গবন্ধু কিন্তু খুব গুরুত্বের সঙ্গে প্রশ্নটি নেন। হাসতে হাসতে বলেন, ‘বলি ৬-দফা। আসলে আমার দফা ৩টা।’
আমি চমকে উঠি।
এরপর তিনি নিজের পায়ের আঙ্গুলগুলো একে একে ধরে বলতে থাকেন, ‘কত নিছ? কবে দিবা? কবে যাবা?_ এই তিন দফা।’ আমি যেন বিদ্যুতে স্পৃষ্ট হয়ে উঠি। স্বাধীনতাই তা হলে তার মূল দফা? আমি সাক্ষী, স্বাধীনতার কথা একাত্তরের ৭ই মার্চ নয়, আমি বঙ্গবন্ধুর মুখ থেকেই শুনেছি সত্তরের নভেম্বরে।
আর সেই আরেকবার দেখা। দ্বিতীয় এবং শেষ কথা বলা তার সঙ্গে। লন্ডনে। পঁচাত্তর সালের ৯ মে। তিনি ফিরে যাচ্ছেন জ্যামেইকা থেকে বাংলাদেশে। পথে লন্ডনে বিমানবন্দরে কয়েক ঘণ্টার জন্যে যাত্রাবিরতি। আমরা ২০ জন বাঙালি পাস পেয়েছি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার ও কথা বলবার জন্যে।
কী আশ্চর্য, আমার নাম মনে রেখেছেন তিনি! মাত্র একবার সাক্ষাৎ পরিচয়েই!
বললেন, ‘কী? এখানে কী করেন? দেশে আসবেন না?’
‘জ্বী, আসব।’
‘দেশের কথা লেখেন। বাংলার ইতিহাসে বড় সোনার সময় এখন। দেশে এসে লেখেন। কবিতা লিখতেন তো?
‘জ্বী। এখন নাটক লিখছি একটা। মুক্তিযুদ্ধের ওপর। পায়ের আওয়ার পাওয়া যায়।’
উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠলেন তিনি।
‘বাহ্, সুন্দর।’
স্মরণ করিয়ে দিলাম বঙ্গবন্ধুকে, যেন আমার কতদিনের পরিচিত তিনি, এতটুকু ভয়-ভীতি নেই ইতিহাসের এত বড় এক নায়কের সমুখে, বললাম, ‘আপনি আমাকে বলেছিলেন ৬-দফা না, আপনার দফা ৩টি। কত নিছ? কবে দিবা? কবে যাবা?’
পাশে বসেছিলেন আবু সাঈদ চৌধুরী। তার দিকে ফিরে বঙ্গবন্ধু বলে উঠলেন, ‘তবে শোনেন শামসুল হকের কাছে। একাত্তরে ওরা মিলিটারি দিয়ে আমার বাংলার ওপরে ঝাঁপায়া পড়ছিল বলে স্বাধীনতা ঘোষণা করি নাই। স্বাধীনতা আমার বরাবরের কথা ছিল।’
তারপর বিমানে উঠবার সময় যখন হলো, আমরা সারি দিয়ে দাঁড়ালাম, বঙ্গবন্ধু আমাদের প্রত্যেককে আলিঙ্গন করে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ পেছন ফিরে বললেন, ঠিক পিতার মতোই, ‘এই দুপুর  বেলায় কোথায় আবার পয়সা খরচা করে খাবেন? দ্যাখেন, ইংল্যান্ডের রাণী কত স্যান্ডুইচ দিছেন। টেবিলে সাজানো। সব খেয়ে যাবেন।’ তারপরই ‘জয় বাংলা’ বলে গাড়িতে গিয়ে উঠে বসলেন।
রাণীর লাউঞ্জে টেবিলের ওপর রুপোর বারকোশে থরে থরে সাজানো স্যান্ডুইচের ওপর আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়লাম।
তখনও কি ভাবতে পেরেছি, আর কয়েকটা মাস পরেই বঙ্গবন্ধু নিহত হবেন। সপরিবারে, এবং তার কয়েক মাস পরে জেলের ভেতরে নিহত হবেন তার চারজন প্রধান রাজনৈতিক সহযোগী?
এখন বঙ্গবন্ধুর সমাধির সমুখে বসে, আমি ভেতরে বড় বিচলিত হয়ে পড়ি একটি বিষয়ে। এ আমার কী হচ্ছে? যে মানুষটার সমুখে তার জীবদ্দশায় এত স্বচ্ছন্দে দাঁড়াতে পেরেছি, আজ তার সমাধির সমুখে কেন অঘোর এক বিহ্বলতার ভেতরে? কেন চোখ কিছুতেই হচ্ছে না স্বাভাবিক? মন কেন কেঁপে উঠছে বারবার?
তবে কি এই যে, জীবিত তার সমুখে আমি দাঁড়িয়েছিলাম যেন আমাদেরই মতো একটি মানুষের সমুখেÑ এত সহজভাবে তিনি উপস্থিত হতে পারতেন সামান্য একজন মানুষের কাছেও; মনে হতো তাকে আমাদেরই পরিবারের মান্য, প্রিয়, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অভিভাবক। আর এখন, তার মৃত্যুর পরে তিনি আর ব্যক্তি নন, ইতিহাস_ এক হিমালয়তুল্য ইতিহাস তিনি; তাই আমি এতখানি বিহ্বল, অবনত ও এতখানি কম্পিত।
ইতিহাসের সমুখে আমি দাঁড়িয়েছি_ আমার সৌভাগ্য হয়েছে দাঁড়াবার_ এমন প্রত্যক্ষ স্পষ্ট অনুভব করলাম বঙ্গবন্ধুর সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে।
কবিতা কখনও আমার কাছে আসে, কখনও আমাকেই যেতে হয় কবিতার কাছে। মহাকাব্যেই কেবল ধারণ করতে পারে এমন একটি ইতিহাসের সঙ্গে এই সাক্ষাৎ আমাকে কবিতার কাছে নিয়ে যায়। আমি সন্ধ্যার অন্ধকারে নির্মলকে বলি একটা লণ্ঠন দিতে। আলো পড়ে টেবিলে। আমি পকেট থেকে খাতা বের করে লিখতে শুরু করি কবিতা। ইতিহাসের সঙ্গে এই সাক্ষাৎকার আমাকে আজ এখানেই ধরে রাখতে হবে অক্ষরে। ‘বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে’ কবিতাটি আমি যখন শেষ করে উঠি তখন দেখি, কাছেই চুপ করে বসে আছেন ওবায়দুল কাদের। মুখ তুলে তাকাতেই তিনি বললেন, ‘চলুল, খাবেন। শেখ সেলিম সাহেবের বাড়িতে।’
লণ্ঠন হাতে অন্ধকার ভেঙে আমরা এগোতে লাগলাম। চারদিকের ঝাঁপিয়ে আসা অন্ধকারের ভেতরে জোনাকি জ্বলছে। ফিরে দেখলাম একদল জোনাকি বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে। যেন আকাশের নক্ষত্র সকল নেমে এসেছে তার বুকের ওপর। নক্ষত্রের চাদর পরে বঙ্গবন্ধু শুয়ে আছেন তার মাটিতে।

পুনশ্চ
১৫ই আগস্ট, ১৯৯৬। আজ ভোরে খবরের কাগজ খুলেই প্রথম পৃষ্ঠায় সংবাদটি দেখি, আমার বুকের ভেতরে রক্ত জমাট হয়ে যায়Ñ শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে টুঙ্গিপাড়া যাচ্ছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা অর্পণ করতে; হিমতুষার স্তম্ভিত আমার মনে পড়ে যায়, ঠিক এই রকমই হেলিকপ্টারে একদিন, সে যেন এক ইতিহাসপূর্বের কথা, ঘাতকের বুলেটে নিহত বঙ্গবন্ধুর লাশ টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে গিয়েছিল খুনিরা। আবার সেই একই যানে একই গন্তব্যে যাত্রা : কিন্তু আজ যাচ্ছেন তাঁরই কন্যা তাঁর সমাধিতে, জাতির পক্ষ থেকে তাঁকে সম্মান ও স্বীকৃতি জানাতে।
ইতিহাসের একটি ঘটনাঘোর আছে; এটি বোধহয় আবিষ্কৃত হয় একজন নাট্যকার বা ঔপন্যাসিকের চোখেই; টুঙ্গিপাড়ার থানার সমুখে মাঠে, সেই একই জায়গায় ১৯৭৫-এর মতোই অবতীর্ণ হয় হত্যাকারীদের হেলিকপ্টার, কিন্তু আজ এই হেলিপ্যাডে হত্যাকারীর বদলে জীবনদাত্রীর আগমন; শেখ হাসিনা যখন বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে গিয়ে দাঁড়ান, নমিত হয় আমাদের জাতীয় পতাকা, বিউগলে বেজে ওঠে শেষ বিদায়ের সুর, অশ্রুহর্ষিত হয়ে উঠি আমরা; আবার আমরা স্থাপিত হই ইতিহাসে, ফিরে আসে আমাদের রাষ্ট্রস্বপ্ন, রক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে আগামীর কর্তব্য গণনা করে। নিতান্ত সাধারণ একটি অনুষ্ঠান নয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার বঙ্গবন্ধুর সমাধি পবিত্র এই টুঙ্গিপাড়া আসা : এ আমাদের সুস্থতায় ও স্বপ্নে প্রত্যাবর্তন। 

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৭ অক্টোবর ২০১৯

  • ৩ অক্টোবর ২০১৯

  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯