অভ্যুত্থানে জড়িত ছিল সিআইএ

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০১৭, ১২:১০

অনলাইন ডেস্ক

লরেন্স লিফশুলজ

[১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার ঘটনা কি শুধু একদল উচ্ছৃঙ্খল সেনাসদস্যের ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও সামরিক উন্মত্ততার উদাহরণ? নাকি এর পেছনে আরও গভীর ষড়যন্ত্র ছিল? প্রখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ প্রায় তিন দশক ধরে এ বিষয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান করেছেন। অনুসন্ধনে অভ্যুত্থানকারী সেনাবাহিনীর ক্ষুদ্র অংশের সঙ্গে খন্দকার মোশতাক ও ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের একাংশের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে। এই যোগাযোগের বিষয়টি লিফশুলজকে জানিয়েছিলেন ‘অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য’ সূত্রে। গত ৩০ বছর ধরে সূত্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে গেলেও কখনও তার নাম বলেন নি তিনি ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারির ‘ডিপ ব্রোটের’ মতো কৌতূহল ছিল এই সূত্রের নাম নিয়ে। এবার সেটি প্রকাশ করলেন লিফশুলজ। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত ইউক্রেন বোস্টার ছিলেন তার সূত্র। ষড়যন্ত্র ও ১৫ আগস্টের হত্যাকা-কে কখনোই মেনে নিতে পারেনি বোস্টার। ৭ জলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তেমন গুরুত্ব না থাকলেও তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের রোষানল থেকে রক্ষা পায়নি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ। কিসিঞ্জার কখনও ভুলতে পারেন নি তার পরামর্শ বা নির্দেশ উপেক্ষা করে দেশটির জন্ম হয়েছে। আর তারই পরিণতি ১৫ আগস্ট। বিভীষিকাময় সে ঘটনাবলির নেপথ্য কাহিনি অনুসন্ধানে লরেন্স লিফশুলজ মার্কিন সূত্রগুলো এবং মোশতাক ও অন্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন। গত ৩০ বছর এ বিষয়ে অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তিনি নতুন করে লিখেছেন সেই কাহিনি। তিন কিস্তির এই প্রতিবেদনটি দৈনিক প্রথম আলো থেকে সংগৃহীত। তারিখ ১৫ আগস্ট ২০০৫ সাল।]

১. বাংলাদেশের ১৫ই আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থানের ৩০তম বার্ষিকী মার্কিন লেখক উইলিয়াম ফকনারের কথা আবার মনে করিয়ে দিল, “অতীতের মৃত্যু নেই। এমনকি অতীত কখনো অতীত হয় না।” আমাদের মতো যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭০-এর দশকের প্রত্যক্ষদর্শী, আমরা স্মরণ করতে পারি ঐ দিনগুলো, যা একটি যুগের মাইলফলক। এসব ঘটনা যে পথ নির্দেশ করেছিল সে পথ ধরে আমরা গন্তব্যে চলেছি, অনেকেই সে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি।”
২. ৩০ বছর পরও ১৫ই আগস্টের সহিংস সেই রাতের ঘটনাবলি আজও বাংলাদেশে জীবন্ত। ১৯৭১ সালের মার্চের কালরাত্রির মাত্র চার বছর পরের ঘটনা। ’৭১-এর মার্চেই পাকিস্তানি সৈন্যরা জাতীয়   নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়ার পরিবর্তে দেশের মানুষের উপর ট্যাংক চালিয়ে দিয়েছিল। অথচ এ ফলাফল মেনে নিতে বাঙালিরা সম্মত হয়েছিল। আর স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছোট্ট একটি অংশ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নোংরা ধারা অনুসরণ করে অভ্যুত্থান ঘটায়।
৩. একটি সামরিক অভ্যুত্থানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশের অনেক মানুষের কাছে স্বাধীনতার প্রতীক শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন। অভ্যুত্থানকারীরা খুনের নেশায় উন্মত্ত হয়ে গিয়েছিল। মুজিব এবং তার পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়, হত্যা করা হয় তার স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, তাদের স্ত্রী সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে। এমন কি হত্যা করা হয় শিশুপুত্র শেখ রাসেলকে, যার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। ঐ রাতে সেনাবাহিনীর দলটি ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সারা শহরে দাপিয়ে বেড়ায় মুজিবের আত্মীয়-স্বজনদের হত্যার উদ্দেশ্যে। নিহত হন মুজিবের ভাই শেখ আবু নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা কর্নেল জামিল।
৪. এক গর্ভবতী নারী আরজু তার স্বামী শেখ ফজলুল হক মনিকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন, এ অপরাধে তাকেও হত্যা করা হয়। মনি ছিলেন শেখ মুজিবের ভাগ্নে। মুজিবের দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ঐ সময় দেশের বাইরে ছিলেন। শেখ হাসিনা পরে দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। তাকেও মাত্র এক বছর আগেও প্রকাশ্যে দিবালোকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। এ হামলা আবার প্রমাণ করে ফকনারের সেই বাক্য, “অতীত আসলে নয়। এটা খুবই বর্তমান।”
৫. ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্টের ঘটনায় জড়িতদের উত্তরসূরিরাই বর্তমান বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রয়াত জেনারেল জিয়াউর রহমানের স্ত্রী, যিনি ঐ সময় সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান ছিলেন এবং পর্দার অন্তরালে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যা পরবর্তীতে অভ্যুত্থান ও অন্যান্য ঘটনা ঘটায়।
৬. ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে ঐ রাতে রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা অভ্যুত্থান বিষয়ে ঘটতে থাকা ঘটনাগুলোর উপর নজর রাখতে শুরু করেন। কিন্তু দূতাবাসে তখন একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি ঘটনাগুলো জানতেন এবং তিনি অস্থির ছিলেন। কিছু বিষয় তিনি কাউকে বলতে পারতেন না। অভ্যুত্থানের কয়েক মাস আগেই এমনটা ঘটবে বলে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন এবং তা ঠেকাতে সর্বোচ্চ প্রয়াস চালিয়েছিলেন।
৭. অভ্যুত্থানের তিন বছর পর ওয়াশিংটনে আমি এই লোকের সঙ্গে দেখা করি। তিনি আমার খবরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠেন। আমি এ আশায় থাকি যে, তিনি আমাকে এ ব্যাপারে যেসব তথ্য দেবেন তা একদিন অস্বস্তিকর সত্য হয়ে বেরিয়ে আসবে এবং যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের জবাবদিহি করতে হবে। ৩০ বছরের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো আমি তার পরিচয় জানতে পারি। এতগুলো বছর তার সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকার পরও তার পরিচয় প্রকাশ না করার ব্যাপারে অত্যন্ত আস্থার সঙ্গে সংযম পালন করেছি, যা থেকে আমি এখন মুক্ত। ধৈর্য ধরুন, কেন এবং কীভাবে আমি এ ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম, তা বলব।
৮. যেসব বিদেশি সাংবাদিক এ অভ্যুত্থানের ঘটনা কভার করেছিলেন, আমি ছিলাম তাদের একজন। তবে এদের মধ্যে একমাত্র আমি, যে সাংবাদিক হিসেবে বাংলাদেশে বাস করে একটি বড় পত্রিকার জন্য এ বিষয়ে প্রতিবেদন পাঠাই। ১৯৭৪ সালে আমি ছিলাম ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউর ঢাকা সংবাদদাতা। পরের বছর আমি নয়াদিল্লি চলে যাই, আমাকে ঐ পত্রিকার দক্ষিণ এশীয় প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। মুজিবের নৃশংস হত্যা আমাকে বিষয়টি অনুসন্ধানে আকর্ষিত করে। এ ঘটনা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমাকে প্রভাবিত করে। আর এমন ঘটনা ঘটবে তা আমি কখনও ধারণা করতে পারিনি।
৯. আমার অচিরাচরিত সূত্রটি মার্কিন দূতাবাসের কাজ করতেন। ঐ রাতে তিনিই তার সততা ও দায়বদ্ধতার গুণে বিষয়টির গভীরে যেতে আমাকে উৎসাহিত করেন। ঐ সময়কার সরকার আমলাতন্ত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যদের থেকে আলাদা। অভ্যুত্থানে ব্যাপক হত্যাকা- নিয়ে তিনি অত্যন্ত হতাশ ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সচেতন ব্যক্তি এবং এমন কিছু জানতেন যা অন্যরা জানতেন না। এ জানাটাই তার বিবেক দংশনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমারটাও ছিল ঐ ধরনের নৈতিক দায়িত্ববোধের ব্যাপার, যা তার সঙ্গে একাধিকবার মুখোমুখি করেছিল। একজন তরুণ রিপোর্টারের জন্য যা ছিল খুবই স্মরণীয় ঘটনা।
১০. মুজিবের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পর এ বিষয়ে ক্ষমতাসীনদের সরকারিভাবে প্রচারিত কাহিনী এবং ঐ সময় সরকারের তল্পিবাহক সংবাদপত্রগুলোর প্রতিবেদন আমাকে বিপাকে ফেলে দেয়। এই দুই পক্ষের বক্তব্য এক ছিল না। অধিকন্তু দুই কাহিনীর মধ্যকার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসতে থাকে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র ও পূর্ববর্তী ঘটনাবলি।
১১. এ ঘটনা সম্পর্কে বলা হয়, ছয়জন জুনিয়র অফিসারের নেতৃত্বে ৩০০ সেনা একবারে নিজেদের সিদ্ধান্তে শেখ মুজিবকে ক্ষমতাচ্যুত করে। মুজিব ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কিছু অফিসারের ব্যক্তিগত ঈর্ষা এবং ঐ সময়ে ব্যাপক দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষের হতাশার বহিঃপ্রকাশ ছিল ঐ অভ্যুত্থান, ছিল একতরফা চিন্তার ফসল, এক বছর বা তার চেয়ে বেশি সময়ের কোনো পরিকল্পনা এটা ছিল না।
১২. যেদিন ভোরে মুজিব এবং তার পরিবারকে হত্যা করা হয়, ঐ সকালেই তরুণ অফিসাররা পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে খোন্দকার মোশতাক আহমদের নাম ঘোষণা করে। আওয়ামী লীগে মোশতাককে ডানপন্থি মুক্তির প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুজিবের পতনে তার ব্যক্তিগত ভূমিকা সম্পর্কে মোশতাক মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন। অভ্যুত্থানে তিনি তার সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটাই করেন নি। জনসমক্ষে আলোচনায় এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন এলে তিনি সহজভাবে তা এড়িয়ে গেছেন। আসলে তিনি তার সরকারকে স্থিতিশীল করতে সর্বতোভাবে চেষ্টা চালিয়েছিলেন।
১৩. অভ্যুত্থানের তিন মাসের মধ্যে মোশতাককেও ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর দুর্নীতির অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর পুরান ঢাকার বাসভবনে এক সাক্ষাৎকারে মোশতাক এ অভ্যুত্থানের ব্যাপারে তার আগাম ধারণা অথবা অভ্যুত্থানকারীদের সঙ্গে কোনো বৈঠকের কথা অস্বীকার করেন। আর অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত জুনিয়র অফিসারদের এ ঘটনার চার মাসের মধ্যেই দেশের বাইরে যেতে বাধ্য করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে অস্থিরতার সুযোগে তাদের বাইরে পাঠানো হয়। এরপর বেরিয়ে আসে ভিন্ন কাহিনী।
১৪. অভ্যুত্থানের ব্যাপারে তাদের পৃষ্ঠপোষক ও মিত্রদের কাজে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে এই জুনিয়র অফিসারদের অধিকাংশ ব্যাংকক এবং অন্যত্র সাংবাদিকদের কাছে সাক্ষাৎকার দিয়ে মুখ খুলতে শুরু করে। অভ্যুত্থানের আগে মোশতাক ও তার সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি তারা নিশ্চিত করে। তখন এ কাহিনী বেরিয়ে আসে যে, মুজিবকে হত্যা ও ক্ষমতাচ্যুত করার এক বছর আগে থেকেই মোশতাক ও তার রাজনৈতিক মিত্ররা বেশ কয়েক দফা গোপন বৈঠক পরিকল্পনা করেছিল।
১৫. অভ্যুত্থানের কয়েক মাস পর মার্কিন দূতাবাসের একজন মধ্যমসারির কর্মকর্তা আমাকে বলেন, আগস্টের ঘটনা নিয়ে মার্কিন দূতাবাসের মধ্যেই চাপা উত্তেজনা ছিল। তিনি বলেন, ঐ সময় দূতাবাসে এ রকম খবর ছড়িয়ে পড়ে যে সিআইএ’র স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরি কোনো না কোনোভাবে অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত। এ নিয়ে চেরি ও মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজেন বোস্টারের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। তিনি বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছিলাম এমন একটা কিছু ঘটছে যা ঘটা উচিত নয়।’ তিনি আমাকে বিষয়ের আরও গভীরে যেতে আহ্বান জানান।
১৬. যুক্তরাষ্ট্র কেন এ অভ্যুত্থানে জড়াবে তা আমার মাথায় আসছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের দুটো কমিটি সিআইএ’র গোপন বেআইনি কর্মকা- তদন্ত করার জন্য তৈরি হচ্ছিল। তখন ওয়াশিংটনে চলছিল সিআইএ’র হাতে বিদেশি নেতাদের খুন হওয়ার ঘটনার তথাকথিত চার্চ ও পাইক কমিটির শুনানি। এ শুনানি যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক ও গোয়েন্দাদের মধ্যে বড় মাপের আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি করে মার্কিন পত্র-পত্রিকাগুলো খোলাখুলি লিখতে শুরু করে চিলিসহ বিশে^র নানা প্রান্তে অবৈধ গোপন তৎপরতা চালানোর দায়ে ঊর্ধ্বতন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কারাদ-ও হতে পারে।
১৭. গ্রীষ্মকালে মার্কিন নাগরিকরা মনগোজ, কয়েনটেলপ্রো, এএমল্যাশ, জাতীয় শব্দ সংক্ষেপের সঙ্গে প্রথমবারের মতো পরিচিত হতে শুরু করে এবং কঙ্গোয় লুমুম্বা, কিউবায় কাস্ত্রো এবং চিলিতে আলেন্দেকে হত্যার ষড়যন্ত্রের বিশদ বিবরণ তারা পেয়ে যায়। আসলে মার্কিন ক্ষমতার অদৃশ্য হাত বিশ্বের সর্বত্র পৌঁছে গিয়েছিল। হিমশৈলের চূড়াটি প্রথমবারের মতো মার্কিনীদের চোখে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। আর এসব কিছু ঘটছিল ওয়াশিংটন থেকে বহুদূরে ভাপসা ও গুমোটপূর্ণ এক পরিবেশে, যেমনটা দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষাকালে দেখা যায়।
১৮. শেখ মুজিবের মর্মান্তিক মৃত্যু সম্পর্কে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘এর নেপথ্যে অবশ্যই বিদেশি শক্তির হাত রয়েছে।’ স্বাভাবিকভাবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছুু বলেন নি। ভারতে জরুরি অবস্থার দিনগুলোতে তার সমর্থক মস্কোপন্থি সিপিআই’র বক্তব্য ছিল আরও স্পষ্ট। দলটি বলে এ অভ্যুত্থানের পেছনে রয়েছে সিআইএ। তবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকায় আমি একে অপপ্রচার বলে নাকচ করে দিই।
১৯. তাহলে কীভাবে অভ্যুত্থানটি হলো? অভ্যুত্থানের কুশীলবরা নিজেদের আড়াল করতে কীভাবে নানা গোলকধাধা তৈরি করে তাতে বিচরণ করে এবং শেষ পর্যন্ত ১৫ আগস্টের ঘটনা ঘটতে সক্ষম হয় সে বিষয়ে আমার তখনও অনেক কিছুই অজানা ছিল। অভ্যুত্থানের পর প্রায় তিন বছর আমি ইংল্যান্ডে ছিলাম। আমি ওয়াশিংটনে গিয়ে আমার এক সহকর্মী নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত দ্য ন্যাশন সাময়িকীর সম্পাদক কাই বার্ডের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিই। কাই একজন খ্যাতিমান মার্কিন লেখক।
২০. কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস শীর্ষক একটি গবেষণার সূত্র ধরে কাই বার্ড কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতে পেয়ে যান। কার্নেগি মার্কিন নীতি ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণার উদ্দেশ্যে একটি প্রকল্প হাতে নেন। প্রকল্পের প্রধান ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিসিঞ্জারের সাবেক সহকর্মী রজার মরিস। কিন্তু অস্পষ্ট এক পরিবেশে প্রকল্পটি পরিত্যক্ত হয়। মরিস পরে বলেন, প্রকল্পটিকে বাদ দেয়ার জন্য কিসিঞ্জার নিজে চাপ দিয়েছিলেন। তারপরও কিছু ফাইল ছিল যেগুলো সত্যিকারের জহুরির কাছে সোনার খনির মতোই মূল্যবান। এসব ফাইলে মূলত পেন্টাগন, সিআইএ এবং পররাষ্ট্র দফতরের দেড়শ মার্কিন কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎকার ছিল।
২১. ওয়াশিংটন সফরের সময় আমি ইউজেন বোস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। ’৭৫-এর অভ্যুত্থানের সময় ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারী বোস্টার তখন ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সদর দফতরে কর্মরত। ঢাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বোস্টারের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। একবার নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল ময়নিহার সংক্ষিপ্ত সফরে বাংলাদেশে গিয়ে আমাকে দেখা করতে বললে আমি বোস্টারের বাড়িতে যাই। ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত আমার একটি লেখা নিয়ে আলোচনা করতে ময়নিহান আমাকে ডেকেছিলেন। লেখাটিতে তার সম্পর্কে কিছুটা সমালোচনা ছিল। করমর্দনের পর লাউঞ্জের এক কোনার টেবিলে আমরা বসলাম। রাষ্ট্রদূত বোস্টার তার বাসভবনে আপ্যায়নের ফাঁকে তিনজনের মধ্যে একটি ছোটখাটো বৈঠকের আয়োজন করেন।
অবশ্য ’৭৫-এর অভ্যুত্থানের পর আমি বোস্টারের সঙ্গে আর সাক্ষাৎ করিনি। তাকে দেখার জন্য আমি প্রস্তুতও ছিলাম না। আমি চেয়েছিলাম তাকে যেসব প্রশ্ন আমি করব সেগুলো আমার স্পষ্ট হওয়ার পরই যেন আমাদের দেখা হয়।
২২. ওয়াশিংটনে পৌঁছে আমি বোস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখলাম তিনিও সাক্ষাতের ব্যাপারে খুব আগ্রহী। বাংলাদেশ বিষয়ক আমার সব লেখা তিনি বছরের পর বছর ধরে পড়ে গেছেন। বৈঠকের দিনক্ষণ ঠিক হলো। কাই বার্ড ও আমি পররাষ্ট্র দফতরে বোস্টারের সঙ্গে দেখা করলাম। করমর্দনের পরপরই লাউঞ্জের কোনার একটি টেবিল দখল করলাম আমরা। এ টেবিল ঘিরেই সারা সকাল আমাদের মধ্যে গুরুগম্ভীর আলোচনা হলো। আমি বোস্টারকে বললাম, আমি জানার চেষ্টা করছি কীভাবে সেদিন অভ্যুত্থানটির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আমি তাকে এও বললাম, আমার কাছে এ বিষয়ে তথ্য রয়েছে যে, ১৯৭১ সালেই মোশতাকের সঙ্গে কলকাতায় মার্কিন কর্মকর্তাদের যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং এর জের ধরে তাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় তাকে ‘গৃহবন্দি’ করে।
২৩. কলকাতায় মোশতাক ছিলেন যোগযোগের মধ্যমণি। কিসিঞ্জার আওয়ামী লীগ সরকারের একটি নির্বাসিত অংশের মধ্যে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করেছিলেন, যাতে তাদের দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো যায়। তবে শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগকে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে দেশ শাসন করতে দেয়া হবে। এ ধরনের কোনো প্রতিশ্রুতি পাকিস্তানিরা দেয়নি। পূর্ব পাকিস্তানে, যা তখন বিশে^ ‘বাংলাদেশ’ নামে পরিচিতি পেয়ে গেছে, যখন যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে শেখ মুজিব তখন পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দী।
২৪. মোশতাক প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারে তার ঊর্ধ্বতন সহকর্মীদের অগোচরেই মার্কিনীদের মাধ্যমে এ মধ্যস্থতার প্রক্রিয়া চালান। বিষয়টি জানাজানি হলে মোশতাকের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে বিশ^াসঘাতকতার অভিযোগ ওঠে এবং তাকে গৃহবন্দি করা হয়। আমি এসব খবর জানতে পারি কলকাতায় মোশতাকের একজন প্রধান সহকর্মীর মাধ্যমে। এ সহকর্মীটি মোশতাকের ঐ মধ্যস্থতা পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন। এ বিষয়টি কলকাতার তৎকালীন কনসাল জেনারেল হার্ব গর্ডনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে নিশ্চিত হয়েছিলাম।
২৫. পররাষ্ট্র দফতর সে দিনের বৈঠকে আমি বোস্টারকে বলেছিলাম, এ বিষয়টি খুবই কৌতূহলোদ্দীপক যে, চার বছর পর শেখ মুজিব খুন হলে মোশতাক একজন ‘কিং’ হিসেবে আবির্ভূত হলেন। এ কথা বলে কাই বার্ড ও আমি বুঝতে চাইলাম যুক্তরাষ্ট্র ও মোশতাক গ্রুপের মধ্যকার ১৯৭১ সালের সম্পর্কটির নবায়ন হয়েছিল, নাকি ঘটনাটি ছিল নিছকই কাকতালীয়। একপর্যায়ে আমরা আসল প্রশ্নটি করলাম, যে মহলটি শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা ও তা সংঘটিত করে তার সঙ্গে মার্কিন দূতাবাসের কি আগে থেকে কোনো ধরনের যোগাযোগ ছিল? আমরা ভেবেছিলাম বোস্টার যথারীতি  কূটনৈতিকসুলভ জবাব দেবেন, যা আমাদের কোনো কাজেই লাগবে না।
২৬. বোস্টার আমাদের চোখে চোখ রাখলেন এবং এমন কিছু তথ্য দিলেন, যা শুনব বলে আমরা আশাও করিনি। আমার মনে হলো বোস্টার একটি বোমা ফাটালেন। পরে বিষয়টি আমরা এভাবে লিখলাম : “নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন দূতাবাসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, ১৯৭৪ সালের শেষ দিকে কিছু লোক শেখ মুজিবুর কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে। দূতাবাস সূত্রমতে, ১৯৭৪-এর নভেম্বর থেকে ১৯৭৫-এর জানুয়ারির মধ্যে দূতাবাস কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের কয়েক দফা বৈঠক হয়। ঊর্ধ্বতন ওই দূতাবাস কর্মকর্তা আরও জানান, ’৭৫-এর জানুয়ারিতে দূতাবাসের মধ্যে আমরা একটি সমঝোতায় আসি যে, আমরা এ বিষয়টি থেকে এবং এসব লোক থেকে দূরে থাকব। তবে জানুয়ারি থেকে আগস্টের (’৭৫) মধ্যে এ লোকগুলোর কেউ দূতাবাসে এসেছিল কি না তা আমি বলতে পারছি না। ঐ সময়ের আগে তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল।”
২৭. আমাদের প্রতিবেদনের এ বিশেষ বিবৃতির উৎস ছিলেন ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারী এই ইউজেন ডেভিস বোস্টার। বোস্টার সেদিন আমাদের আরও অনেক কথাই বলেছিলেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, ১৯৭৪-এর নভেম্বর থেকে ১৯৭৫-এর জানুয়ারি মাসের মধ্যে দূতাবাস কর্মকর্তাদের সঙ্গে যে লোকগুলো বৈঠক করে তারা আসলে মোশতাক গ্রুপেরই লোক। বোস্টার আরও বলেন, ’৭৫-এর জানুয়ারিতে তিনি দূতাবাসের সবার প্রতি কঠোর নির্দেশ জারি করেন কেউ যেন আর ভবিষ্যতে এই গ্রুপ কিংবা অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রকারী আর কোনো গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখে। এ নির্দেশ সিআইএ স্টেশনে চিফ ফিলিপ চেরি এবং তার সব স্টাফের জন্যও প্রযোজ্য ছিল।
২৮. বোস্টারের ধারণা, সম্ভবত রাষ্ট্রদূত হিসেবে তার কর্তৃত্বের পাশ কাটিয়ে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে। ঠিক যে লোকগুলোর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তারাই অভ্যুত্থানের দিক দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয় এবং ক্ষমতা গ্রহণের ঘোষণা দেয়। এ যোগসূত্র থেকে বোস্টার মনে করেন, এটি একটি সরল কাকতালীয় ঘটনা নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। আমরা বোস্টারকে প্রশ্ন করেছিলাম, তার অগোচরে ফিলিপ চেরি কিংবা সিআইএ স্টাফরা শেখ মুজিবকে অপসারণের ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছিলেন কি না। বোস্টার বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাইরে গিয়ে তাত্ত্বিকভাবে আমি প্রশ্নটির জবাব দিতে চাই। আমি বলব, না স্টেশন চিফ এ ধরনের কোনো কাজ করেন নি, তবে একজন আমেরিকান হিসেবে আরেকজন আমেরিকানকে বলব, যোগাযোগটা ছিল। আসলে অনেক ফাঁকফোকর ছিল। স্টেশন চিফের দায়িত্ব হচ্ছে তার সব কর্মকাণ্ড বা যোগাযোগের ব্যাপারে আমাদের অবহিত রাখা। রাষ্ট্রদূতের অনুমোদনবহির্ভূত কোনো যোগাযোগ চেরি বাইরের কারও সঙ্গে রাখেন নিÑ এ গ্যারান্টি আমি দিতে পারি না। এখানে আমরা একমত হই যে বোস্টার ‘রাষ্ট্রদূত’ বলতে নিজেকেই বুঝিয়েছেন। বোস্টার নিশ্চিত ছিলেন যে, ঐ যোগাযোগ অব্যাহত ছিল এবং অভ্যুত্থানটি যারা করেছে, তারা ভেবেছিল মুজিব চলে গেলেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের গ্রহণ করবে। অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে আমরা জানব তারা কারা ছিল, তবে তারা সফল হলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বীকৃতি দেবে।
২৯. সেটা ছিল একটা ব্যতিক্রমী মুহূর্ত। মার্কিন রাষ্ট্রদূত দুই মার্কিন সাংবাদিকের কাছে অভিযোগ করলেন, তার সুস্পষ্ট নির্দেশের বাইরে গিয়ে তার সিআইএ স্টেশন প্রধান অভ্যুত্থানে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে।
৩০. একই সঙ্গে আমরা এটাও ভাবছিলাম, ওয়াশিংটন ও ল্যাংলেতে কার এমন কর্তৃত্ব ছিল যিনি ‘সবুজ সংকেত’ দিয়েছিলেন এবং রাষ্ট্রদূতের নির্দেশনা বাতিল করেছিলেন। এক বছর আগে রিচার্ড নিক্সনের পদত্যাগ এবং জেরাল্ড ফোর্ড দুর্বল মার্কিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর ওয়াশিংটনে ‘পররাষ্ট্রনীতির কা-ারি’ বলতে একজনই ছিলেন এবং তিনি হেনরি কিসিঞ্জার। কিন্তু ছোট ছোট দেশকে শক্তিধর রাষ্ট্রের অনুগত করার জন্য হেনরি কিসিঞ্জার কি এ ধরনের অভ্যুত্থানকে বিবেচনায় রাখবেন?
৩১. কিসিঞ্জার বাংলাদেশ থেকে এত দূরে থেকে কীভাবে সামরিক অভ্যুত্থান পরিকল্পনার অস্পষ্ট দিক সম্পর্কে অবগত হতেন, সে বিষয়টিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে সংশয়ে ছিলাম। কিসিঞ্জারের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সাবেক সহযোগী রজার মরিসের সাক্ষাৎকার নেয়ার পরও আমার মধ্যে আরও কিছু সময় এ সংশয় ছিল। তিনি সেই রজার মরিস, যিনি তার সাবেক নিয়োগকর্তা সম্পর্কে সমালোচনামুখর একটি জীবনী লিখেছিলেন। জীবনী গ্রন্থটির নাম ছিল ‘আনসার্টেন গ্রেটনেস : হেনরি কিসিঞ্জার অ্যান্ড আমেরিকান ফরেন পলিসি’।
৩২. ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ও হেনরি কিসিঞ্জার সম্পর্কে কথা বলার জন্য মরিসের সঙ্গে বসেছিলাম। তার সঙ্গে কেউ একমত হন বা না-ই হন তার মন্তব্যগুলো ছিল সুনির্দিষ্টভাবে অকাট্য। মরিসের পর্যবেক্ষণ এবার তুলে ধরা যাকÑ
৩৩. ১৯৭৫ সালের গোড়ার দিকে আমি আমার বইয়ের জন্য একজনের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম, যিনি তখন কিসিঞ্জারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সবচেয়ে সিনিয়র আস্থাভাজন ছিলেন। আমার সঙ্গে তার ভালোই জানাশোনা ছিল। কিসিঞ্জারের নীতির সমালোচনা করে নয়, বরং গুরুত্বের সঙ্গেই তিনি বললেন, কিসিঞ্জার যুগে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির তিনটি প্রতিশোধের ঘটনা ঘটেছে। কিসিঞ্জারের বিদেশি শত্রুর তালিকায় সবচেয়ে ঘৃণিত তিন ব্যক্তি ছিলেন চিলির আলেন্দে, ভিয়েতনামের থিউ এবং বাংলাদেশের শেখ মুজিব। এটা বন্ধু বা শত্রু অথবা প্রতিপক্ষের বিষয় ছিল না। আসলে এই লোকগুলো নানাভাবে বাধা হয়ে উঠেছিল। আলেন্দের বিষয়টি পরিষ্কার। স্বাভাবিকভাবে তিনি থিউর কথা ভেবেছিলেন; কারণ বর্তমানের রেকর্ড ঘেঁটে দেখা যায়, উত্তর ভিয়েতনামের সঙ্গে কোনো সমঝোতার জন্য থিউ প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছিলেন। সায়গনে গিয়ে বোমা মেরে কিংবা অন্য কোনোভাবে থিউকে সমঝোতায় সম্মত করাতে কিসিঞ্জার চেয়েছিলেন।
৩৪. মুজিব তাদের এই দলভুক্ত নন। তা সত্ত্বেও কিসিঞ্জার সেই সময় (১৯৭১) অনুভব করেছিলেন যে, তার চীনানীতি, যার উপর অনেক কিছুই নির্ভর করছিল, সেটিকে ক্ষতি করার মতো বিপর্যয়কর অবস্থা বিরাজ করছিল পূর্ব পাকিস্তানে। ভিয়েতনাম আলোচনার অনেক কিছুই তখন বাকি ছিল। অথচ এখানকার পরিস্থিতি হয়ে উঠেছিল বিরক্তিকর। কিসিঞ্জারের মনে হচ্ছিল, এখানে একজন রাজনীতিক যথাযথ আচরণ করছিলেন না। বোঝাপড়ার পরিবর্তে তার লোকজন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তবে বিষয়টা এমন নয় যে, তা হেনরি কিসিঞ্জার অথবা তার বিশ^ পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেবে। তা সত্ত্বেও এটি কিসিঞ্জারের কূটনীতির ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে দাঁড়ায় এবং এক পর্যায়ে তা প্রতিশোধের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়।
৩৫. মরিস বলতে লাগলেন, কেউ কেউ মনে করেন হেনরি কিসিঞ্জার উনিশ শতকের একজন গতানুগতিক কূটনীতিক। কারণ তার আদর্শিক গুরু, অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব এবং নায়করা সব উনিশ শতকের। তাহলে কেউ মনে করতে পারেন, তার নীতি হবে এমন, ‘স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই, আছে শুধু স্থায়ী স্বার্থ।’ এ নীতির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে শেখ মুজিবকে স্বাগত জানাতে পারত, তার সরকারকে কাছে টেনে রাখতে পারত। কিন্তু আমি যেমন বলেছি, কিসিঞ্জার ছিলেন প্রতিশোধপরায়ণ লোক এবং ভাবতেন যে মুজিব আমাদের লোক নয়। যদি তিনি আমাদের লোক না হয়ে থাকেন, তাহলে স্থায়ী স্বার্থ বলেও কিছু নেই। এখন যেটা করতে হবে তা হলো, আমাদের লোকজনকে ক্ষমতায় বসাতে হবে এবং তাদের উৎখাত করতে হবে। ঐ সময়ের মার্কিনীদের নথিপত্রে লজ্জা-শরম বা দ্বিধা-সংকোচের কোনো উপাদান কেউ খুঁজে পাবে না। বাংলাদেশের বিষয়টি তত বড় নয়, এ নিয়ে কোনো শোরগোলের ব্যাপার নেই এবং সেখানে কিছু ঘটানো খুবই সহজ।
৩৬. আমি মরিচের তত্ত্বের বিষয়ে এখনও সংশয়ে আছি। ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে কাই বার্ড ও আমি হেনরি কিসিঞ্জারকে লেখা এক চিঠিতে ১৯৭১ সালে খন্দকার মোশতাক গোষ্ঠীর সঙ্গে গোপন যোগাযোগের বিষয়ে সাতটি প্রশ্ন করেছিলাম। আমরা জানতে চেয়েছিলাম, ১৯৭৪-৭৫ সালে অভ্যুত্থানের আগের মাসগুলোর মার্কিন দূতাবাস কর্মকর্তাদের সঙ্গে মোশতাক গোষ্ঠীর যোগাযোগের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি অবগত ছিলেন কি না। ১৯৭৪ সালে মোশতাক গোষ্ঠীর সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ ও অভ্যুত্থানের সময় কিসিঞ্জার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। মোশতাক ও তার অভ্যুত্থান পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ রাখতে রাষ্ট্রদূত বোস্টারের নির্দেশ সম্পর্কে কিসিঞ্জারের অবহিত থাকার কথা। কারণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার সুবাদে সব ধরনের চিঠিপত্র দেখা ও পড়ার সুযোগ তার ছিল।
পরের মাসে কিসিঞ্জার জবাবে আমাদের বিরুদ্ধে ‘বিস্ময়কর চিঠি’র অভিযোগ তুলে বললেন, আমাদের প্রেস ডেডলাইন অনুযায়ী উত্তর দেয়ার জন্য তাকে যথেষ্ট সময় দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘দোষারোপ আর অস্পষ্ট ধারণার মিশ্রণে লেখা আপনাদের অস্বাভাবিক চিঠিটির কোনো জবাব আমি দিতে পারি না। শুধু এটাই বলতে পারি, বিষয়বস্তুর দিক থেকে এটি সত্য থেকে অনেক দূরে। আমি আপনাদের তথ্য সরবরাহকারীর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছি। কিসিঞ্জারের এ জবাবের পর আমরা জুনে আবার লিখলাম, ভবিষ্যতে এ বিষয়ে একটা নিবন্ধ লিখব। সেক্ষেত্রে প্রেস ডেডলাইন নিয়ে তার মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। আমাদের ধৈর্য আছে। তার কাছে শুধু প্রশ্নগুলোর উত্তর চাই।
৩৭. জুন মাসের চিঠিতে আমরা কিসিঞ্জারকে বললাম, আপনি প্রশ্নগুলোকে ‘সত্য থেকে অনেক দূরে’ বললেও আমরা তা মনে করি না। বরং সত্য জানার জন্যই প্রশ্নগুলো তৈরি করা হয়েছে। যথার্থ সত্য জানার জন্য আমাদের অন্য কোনো পদ্ধতি জানা নেই। কোনো বিষয় বা ঘটনা, নাম অথবা ঘটনাক্রমের সঙ্গে আপনি একমত নন, সেটাই বরং আমরা জানতে চাই। ১৯৭১ সালের যোগাযোগ ও ১৯৭৪ সালের যোগাযোগ সম্পর্কে আপনার মনোভাব কি? আমাদের মতে, বিস্মিত হওয়াটা চিঠির কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব হলো না। ২৬ বছর পর কিসিঞ্জার এখনও চিঠির জবাব তৈরি করতে পারেনি। এর মধ্যে কত ‘প্রেস ডেডলাইন’ এসেছে আর গেছে!
৩৮. আমাদের মূল চিঠিতে আমি কিসিঞ্জারকে এ কথা লিখতে ভুলে গেছি যে, ১৯৭৬ সালে পুরান ঢাকার বাসায় খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে চা খেতে খেতে সাক্ষাতের সময় তাকেও এই প্রশ্ন করেছিলাম এ সাক্ষাৎটি হয়েছিল মুজিব হত্যাকা- এবং জিয়াউর রহমান তাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার পর। প্রশ্ন শুনে মোশতাক দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠলেন, আমি তাকে এ ধরনের প্রশ্ন করতে পারি না। তিনি আমাকে বললেন, এসব প্রশ্ন বিষয়ে মোশতাকের বক্তব্য শুনে কিসিঞ্জার বিস্মিত হতেন। যে কোনোভাবেই হোক আমার মনে হচ্ছিল, আমাদের প্রশ্নের যে উত্তর তারা দেবে তাতে বেশ পার্থক্য থাকবে।
৩৯. পররাষ্ট্র দফতরে আমরা ইউজেন বোস্টারের সাক্ষাৎকার নেয়ার পর নিজস্ব কারণেই তিনি এ সময় প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কিছু বলতে চান নি। সম্ভবত এ কারণে যে, এসব ঘটনায় নাটের গুরু কিসিঞ্জারের যোগসূত্র পরিষ্কার হচ্ছিল না। পরবর্তী কয়েক বছর আমি রাষ্ট্রদূত বোস্টারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি। এ বিষয়ে নানা অগ্রগতি ও নতুন নতুন মোড় সম্পর্কে লেখা বিভিন্ন নিবন্ধ ও চিঠি পাঠিয়েছি।
৪০. ঢাকায় ১৯৭৫ সালের ঘটনাবলির বিষয়ে কংগ্রেসীয় তদন্তের জন্য আমার প্রচেষ্টা সম্পর্কে বোস্টার জানতেন। আমরা জানতাম, মার্কিন রাজনীতিতে বাংলাদেশ চিলি, ভিয়েতনাম কিংবা ইরান নয়। কয়েক বছর আগে ওয়াশিংটনে থাকাকালে আমি তার সঙ্গে দেখা করেছিলাম। ঐ সময় আমি তাকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম, তিনি যা জানেন তা প্রকাশ করাই শ্রেয়। তিনি আমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেন না, বরং তার মনোভাব এমন ছিল যে ‘আমার বেঁচে থাকতে নয়।’ এ কথার মাধ্যমে আমি বুঝলাম, তার মৃত্যুর পরই আমি সূত্র হিসেবে তার নাম ব্যবহার করতে পারব।
৪১. চলতি বছর আমি ভার্জিনিয়ায় তার সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা করেছিলাম। গত মাসের (জুলাই) তৃতীয় সপ্তাহে তার সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। অভ্যুত্থানের ৩০তম বার্ষিকী সামনে রেখে তার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করার জন্য তাকে রাজি করাব, কিন্তু তা আর হলো না। ইউজেন বোস্টার গত ৭ জুলাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন। আমি আবারও মাত্র দুই সপ্তাহের জন্য তার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হারালাম।
৪২. সিআইএ’র স্টেশন-প্রধান যেসব ঘটনা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন এবং যেগুলোর সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে খুব কমই ‘অন দ্য রেকর্ড’ সাক্ষাৎকার রয়েছে। সেটা ছিল এক অস্বাভাবিক সময় এবং বর্তমানে এটা ধারণাতীত যে একজন প্রতিবেদক এবং একজন সিআইএ কর্মকর্তা এ রকম একটি বিষয় নিয়ে মুক্ত ও খোলামেলা আলোচনা করতে পারেন। ফিলিপ চেরি ১৯৭৫ সালের আগস্টে ঢাকায় সিআইএ’র স্টেশন প্রধান ছিলেন। ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে তার সঙ্গে অভ্যুত্থান বিষয়ে আমার কথা হয়, তখন তিনি নাইজেরিয়ার সাবেক রাজধানী লাগোসে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র থেকে আমরা অভ্যুত্থানে জড়িত থাকার বিষয়ে যে অভিযোগ পেয়েছিলাম, সে সম্পর্কে আমি তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম। আমরা টেলিফোনে প্রায় ২০ মিনিট কথা বলি।
৪৩. মুজিব সরকারকে উৎখাতের পরিকল্পনাকারী কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে তিনি অথবা তার দফতরের কেউ যোগাযোগ রেখেছিলেন বলে সে অভিযোগ ওঠে, তা তিনি পুরোপুরি অস্বীকার করেন। চেরি আমাকে বলেন, ‘বাংলাদেশীরা নিজেরাই এটি করেছে।’ বাইরের সরকারগুলোর সম্পৃক্ততার করণে যে কোনো অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়, এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা খুবই ভুল বলে তিনি মন্তব্য করেন। চেরি বলেন, জনগণ নিজেরাই সব সময় অধিকাংশ অভ্যুত্থান সংঘটিত করে।
৪৪. যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মোশতাকের নেটওয়ার্কের গোপন যোগাযোগের আগের ইতিহাস সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে চেরি বলেন, রাজনীতিবিদরা প্রায়ই দূতাবাসগুলোয় যান এবং সম্ভবত তাদের সেখানে যোগাযোগ থাকে। তারা ভাবেন, তাদের এ ধরনের যোগাযোগ আছে। কিন্তু কোনো দূতাবাস অভ্যুত্থানে সম্পৃক্ত থেকে তাদের সহযোগিতা করবে, এটা খুবই অচিন্তনীয় ব্যাপার। চেরি দাবি করে, তিনি মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজেন বোস্টারের পুরোপুরি তত্ত্বাবধানে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা জানতাম, মুজিব বিপদের মধ্যে আছেন। আমরা এ-ও জানতাম, সেখানে যা-ই হোক, আমাদের কিছু যায়-আসে না। কে মুজিবকে ক্ষমতাচ্যুত করল বা কী কারণে মুজিব ক্ষমতাচ্যুত হলেন, সেটাও আমাদের বিবেচনার বিষয় নয়। আরও জানতাম, এ ঘটনার জন্য আমাদের দায়ী করা হবে। তাই ভীষণ পরিষ্কার থাকার জন্য আমরা অতিরিক্ত সতর্ক ছিলাম। রাষ্ট্রদূত বোস্টারের নির্দেশনা মেনে চলার বিষয়টি আমরা নিশ্চিত করেছিলাম। সব ধরনের যোগাযোগ আমরা বন্ধ করেছিলাম। আমরা পুরোপুরি রাষ্ট্রদূত বোস্টারের নির্দেশনা অনুসরণ করেছিলাম।
৪৫. যদিও বোস্টার নিজেই এই মত প্রকাশ করেছিলেন যে ১৯৭৫-এর প্রথম দিকে তিনি যে ধরনের নির্দেশনা দিয়েছিলেন, সিআইএ’র স্টেশন প্রধান সে অনুযায়ী এ ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করেন নি। এটা সম্পূর্ণ বোস্টারের নিজের মতামত। যখন আমি চেরিকে জিজ্ঞেস করি, দূতাবাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা কেন এ ধরনের অভিযোগ করেন তখন চেরি বারবার দাবি করেন, এ ধরনের অভিযোগ ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’। নিজের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, ‘সেখানে সম্ভবত কেউ ছিলেন, যিনি কারও কারও ব্যাপারে ঈর্ষান্বিত ছিলেন। এ কারণে এখন তিনি এ ধরনের বিবৃতি দিচ্ছেন, কিন্তু আমি আপনাকে সাক্ষী রেখেই এ বিষয়ে তার সঙ্গে মোকাবিলা করা এবং আলোচনার সুযোগ নিতে আগ্রহী।’
৪৬. ফিলিপ চেরি অবশ্য এ ধরনের সুযোগ পাননি। রাষ্ট্রদূত বোস্টার যখন আমাদের সঙ্গে কথা বলতেন, তখন তিনি উদ্ধৃত হতে বা অন দ্য রেকর্ড, চিহ্নিত হতে অনিচ্ছুক ছিলেন। আমার ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রে তখন যে ধরনের পরিবেশ বিরাজ করছিল, রাষ্ট্রদূত সে পরিস্থিতিতে একটি তদন্ত আশা করেছিলেন। অবশ্যই এ ধরনের তদন্তের নিশ্চয়তা ছিল না, কেবল সম্ভাবনা ছিল। চার্চ এবং পাইক কমিটির প্রতিবেদনের কারণে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রে একটা মনোভাব তৈরি হচ্ছিল। যদি কংগ্রেসের কোনো তদন্ত হতো, এটা আমার বিশ^াস যে রাষ্ট্রদূত বোস্টার এ বিষয়ে এগিয়ে আসতেন এবং শপথ নিয়ে সাক্ষ্য দিতেন।
৪৭. ১৯৭৮ সালে সাক্ষাৎকারে চেরির বক্তব্যের সঙ্গে ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের বক্তব্যে মিল পাওয়া যায়নি। পররাষ্ট্র দফতর কংগ্রেসম্যান, স্টিফেন সোলার্জের কাছে স্বীকার করে, ১৯৭৪ সালের নভেম্বর এবং ১৯৭৫-এর জানুয়ারির মধ্যে অবশ্যই বৈঠক হয়েছিল। আর ঠিক এ বিষয়টি কয়েক বছর আগেই দূতাবাসে আমাদের প্রধান সূত্র (ইউজেন বোস্টার) সঠিকভাবেই এ তথ্য জানিয়েছিলেন। সোলার্জের বক্তব্যকে নাকচ করে যে, ‘কোনো বাংলাদেশি আমাদের অফিসে আসেন নি এবং অভ্যুত্থান বা অন্য কোনো বিষয়ে পরিকল্পনা সম্পর্কে আমাদের কিছু বলেন নি।’
৪৮. প্রথমেই দুটি সম্ভাব্য বিকল্পের একটি চিন্তায় আসে। জানুয়ারির পরেও মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে হয় মোশতাক গোষ্ঠীর লোকজন যোগাযোগ অব্যাহত ছিল যেটা বোস্টার বিশ^াস করতেন; অথবা চেরির দাবিমতে, এ যোগাযোগ ছিল না। যদিও এখানে তৃতীয় একটি সম্ভাবনা থেকে যায়। চেরি যদি সত্য বলে থাকেন, যা এখনও অস্পষ্ট রয়ে গেছে, এটা সম্ভব যে মোশতাকের সহযোগীরা ওয়াশিংটনের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি স্বাধীন যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। আর এটা করা হয়েছিল দূতাবাস বা সিআইএ’র চ্যানেলকে পাশ কাটিয়ে।
৪৯. এভাবে সম্ভবত চেরি রাষ্ট্রদূত বোস্টারের নির্দেশ অনুসরণ করেছিলেন। আর পূর্ব চ্যানেলের বাইরেও যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। এটা সম্ভব যে মোশতাকের সহযোগীদের কেউ বাংলাদেশ থেকে বাইরে যুক্তরাষ্ট্র অথবা অন্য কোথায় গিয়ে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠক করেন। পেন্টাগনের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার অ্যাটাসে বা কর্মকর্তাদের দ্বারা এটি সম্ভব। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাদের গভীর ঐতিহাসিক যোগাযোগ রয়েছে। এরাও অভ্যুত্থান পরিকল্পনা তদারকি করে থাকতে পারে।
৫০. এই পরস্পরবিরোধী দাবিগুলো আধাবিচারিক ক্ষমতাসম্পন্ন কংগ্রেসনাল তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হতে পারত। বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের বিষয়ে কংগ্রেসম্যান স্টিফেন সোলার্জ এবং তার সহযোগী স্ট্যানলি রোথের চেষ্টা সত্ত্বেও কোনো তদন্ত পর্যন্ত হয়নি।
৫১. বাংলাদেশ থেকে পাওয়া আরও কিছু প্রামাণিক তথ্যে জানা গেছে, মার্কিন কর্মকর্তারা অভ্যুত্থান পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে যোগযোগ রাখতেন এবং অভ্যুত্থান ঘটানোর আগ পর্যন্ত এ পরিকল্পনার উপর নজর রাখতেন। অভ্যুত্থান পরিকল্পনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও এ বিষয়ে সরাসরি অবগত ছিলেন, এমন এক নির্ভরযোগ্য সূত্রের সঙ্গে আমি ১৯৯৭ সালে সাক্ষাৎ করি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এ কর্মকর্তা আগস্টের অভ্যুত্থান পরিকল্পনার ভেতরে থেকে নিখুঁতভাবে এ কাজ করেছেন এবং ধাপে ধাপে এ পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়েছেন। ১৯৭৫ সালেও ঐ ব্যক্তির সঙ্গে অল্প সময়ের জন্য আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং আবার দেখা করব বলে আশা করেছিলাম।
৫২. আমাদের মধ্যে সে সাক্ষাৎ হয়েছে ঠিকই, তবে এর মধ্যে কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়। তিনিই মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আমার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অনুরোধ জানান। তার নিজের প্রয়োজনেই আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। মধ্যস্থতাকারী যাতে আমি বিশ^াস করতাম, তার মাধ্যমে দীর্ঘ কথাবার্তার পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে রওনা হলাম এবং একটি ইউরোপীয় দেশের রাজধানীতে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। তিনিও অন্য এক মহাদেশ থেকে এসেছিলেন। আমরা পাঁচ ঘণ্টা ধরে কথা বললাম।
৫৩. তার সঙ্গে অনেক বিষয়েই কথা হয়েছে। অভ্যুত্থানের ছয় মাসেরও আগে থেকে মোশতাক ও জেনারেল জিয়াউর রহমান উভয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং মেজরদের সঙ্গে তাদের আলোচনার ব্যাপারে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জানা হলো। মেজর রশিদ আলাদাভাবে জিয়া ও মোশতাকের সঙ্গে যেসব বৈঠক করতেন, তেমন অনেক বৈঠকেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত ছিলেন। ১৯৭৬ সালের আগস্টে মেজর রশিদ একটি ব্রিটিশ টেলিভিশনকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। দ্য সানডে টাইমসের সাংবাদিক এন্থনি মাসকারেনহাসের নেয়া সে সাক্ষাৎকারে জেনারেল জিয়ার সঙ্গে ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের বিবরণ দেন রশিদ। অভ্যুত্থানের পাঁচ মাস আগের ঐ বৈঠকে অভ্যুত্থান পরিকল্পনার বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল বলে রশিদ জানান। অভ্যুত্থানের পাঁচ মাস আগে সে বৈঠক হয়েছিল। আমার এই সূত্র সে বৈঠকে উপস্থিত ছিল এবং দাবি করেন, এটা অভ্যুত্থান পরিকল্পনা বিষয়ে প্রথম বৈঠক ছিল না।
৫৪. সে সময় সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান জেনারেল জিয়া প্রস্তাবিত অভ্যুত্থান পরিকল্পনার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে এ ব্যাপারে সামরিক তৎপরতার নেতৃত্ব দিতে অনাগ্রহ দেখান। রশিদ জেনারেল জিয়াকে বলেন, জুনিয়র কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে একটি পরিকল্পনা তৈরি করে ফেলেছে, এরা শুধু তার সমর্থন আর নেতৃত্ব চায়। জিয়া কিছুটা সময় নিলেন। মাসকারেনহাসকে দেয়া মেজর রশিদের সাক্ষাৎকারের তথ্য এবং আমার সেই সূত্রমতে, জিয়া রশিদকে বলেছিলেন, একজন সিনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে তিনি এতে সরাসরি জড়িত হতে চান না। তবে জুনিয়র কর্মকর্তারা যদি প্রস্তুতি নিয়েই ফেলে, তা হলে তাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত।
৫৫. আমার তথ্যদাতার মতে, মেজররা শেষ পর্যন্ত আশা করেছিলেন যে জিয়াই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেবেন। যদিও তারা মোশতাকের সঙ্গে সারাক্ষণ সতর্ক যোগাযোগ রেখেছিলেন, কিন্তু তারা চাইছিলেন এমন একটা ভালো উপায়, যা মোশতাককে নতুন সরকারের প্রধান করবে না। মেজরদের দিক থেকে সবচেয়ে ভালো উপায়টি ছিল অভ্যুত্থানের পর কর্তৃত্বকারী হিসেবে একটি সামরিক কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা। বস্তুতপক্ষে মেজর রশিদই তার গোষ্ঠীর জন্য উপায়গুলো নির্ধারণের জন্য দায়িত্বে ছিলেন। তাদের আশা ছিল, জিয়াই এ ধরনের কাউন্সিলের নেতৃত্ব দেবেন। তবে সম্ভবত জুনিয়র কর্মকর্তারা জিয়ার নেতৃত্বে সিনিয়র কর্মকর্তাদের অভ্যুত্থান আশা করছিলেন। জেনারেল জিয়ার নিরপেক্ষতা অথবা নীরব সমর্থন নিশ্চিত হলে জুনিয়র কর্মকর্তারা শঙ্কামুক্ত থাকতে পারেন যে, সংকটের মুহূর্তে জিয়া তার বাহিনীকে তাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেবেন না।
৫৬. আমার গুরুত্বপূর্ণ সেই সূত্র একটি চমকে দেয়া তথ্য জানিয়ে বললেন, জিয়া ও মোশতাকের সঙ্গে আলাদা দুটি বৈঠকে তিনি উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মেজর রশিদ নিজেই প্রশ্ন তুললেন, পরিকল্পিত অভ্যুত্থানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব কী হবে? ঐ সামরিক কর্মকর্তা জানালেন, জিয়া ও মোশতাক উভয়েই আলাদাভাবে আমাদের বললেন, তারা এ বিষয়ে মার্কিনীদের মনোভাব জেনেছেন। দুইজনের উত্তরই একই রকম ছিল। তারা বললেন, এটা (মুজিবকে সরানো) মার্কিনীদের জন্য কোনো সমস্যা নয়। আমি তখন অনুভব করলাম, মার্কিনীদের সঙ্গে জিয়া ও মোশতাকের আলাদা যোগাযোগের চ্যানেল রয়েছে। পরে আর এ বিষয়ে কথা হয়নি।
৫৭. মেজররা শেষ পর্যন্ত আশা করেছিলেন, অভ্যুত্থানের পরপরই যে সামরিক কাউন্সিল গঠিত হবে, জিয়া তার নেতৃত্ব দেবেন। এমনকি ১৫ই আগস্টও তাদের বিশ^াস ছিল, এখনও সে সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এই সূত্র জানান, যখন শেখ মুজিব ও তার অন্য আত্মীয়দের বাড়িতে পুরুষদের পাশাপাশি নৃশংসভাবে নারী-শিশু গণহত্যা ঘটে গেল, তখনই জেনারেল জিয়া ছায়ার আড়ালে পিছিয়ে যান।
৫৮. সূত্রমতে রশিদ নিজেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মর্মাহত হয়েছিলেন। পরবর্তী কয়েক বছর তার মধ্যে এ বিশ্বাস জন্মেছিল যে অভ্যুত্থান পরিকল্পনার মধ্যেও আরও একটা ‘লুকানো পরিকল্পনা’ ছিল যেটা সম্পর্কে তিনি জানতেন না বা এর উপর তার নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তা সত্ত্বেও দুই জুনিয়র সেনা কর্মকর্তা রশিদ ও ফারুক জনসমক্ষে হত্যাকাণ্ডের দায় অস্বীকার করেন নি। বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখেও তারা তাদের অনুগত এ ছোট সেনাদলের কাজের দায় নিয়েছেন।
৫৯. এই সূত্র দাবি করেছেন, কিছু হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ১৫ আগস্ট দিনটির জন্যই করা হয়েছিল। কথা ছিল কমপক্ষে চারজন আওয়ামী লীগ নেতাকে তাদের বাসভবন থেকে তুলে সুনির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে হত্যা করা হবে। এ পরিকল্পনায় শেখ মুজিবকে হত্যা করার বিষয়টিও ছিল। তবে সূত্র দাবি করেন, এরপরও অভ্যুত্থান সংগঠক কর্মকর্তাদের এমন কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না যে তারা পরিবারগুলোর উপর গুলি চালাবে। এই ধরনের অন্যান্য পরিস্থিতির মতো সেদিনও অনাকাক্সিক্ষত বর্বরতা ঘটে যায়।
৬০. অভ্যুত্থানের পর পরস্পরবিরোধী যে ধারণা জন্মেছিল, তা নিয়ে খুব কম বিশ্লেষণ হয়েছে। অভ্যুত্থানের দুই বছর আগে থেকে দেশের বামপন্থি দল, যেমনÑ জাসদ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী), সর্বহারা পার্টির মতো গোপন দলগুলো মুজিব শাসনের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করেছে। কিন্তু বামপন্থিদের ‘বিপ্লব’ যেমনটি আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তা শেখ মুজিবের পতন ঘটায় নি বরং ষড়যন্ত্রটা করেছিল ডানপন্থিদের একটি সংকীর্ণ গোষ্ঠী।
৬১. কট্টরপন্থি জাতীয়বাদী শক্তিগুলো যে চ্যালেঞ্জ গড়ে তুলেছিল এবং এগিয়ে নিয়েছিল, আগস্টের ঘটনা তাতে আরও গতিসঞ্চার করে। এ অভ্যুত্থানটি ঘটিয়েছিল মুজিবের নিজের দল, তার মন্ত্রিসভা, তার সচিবালয়, তার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং জাতীয় সেনাবাহিনীর ডানপন্থি অংশ যারা মনে করছিল তাদের স্বার্থে বামপন্থি চ্যালেঞ্জ মোকবিলায় মুজিবের নেতৃত্ব আর সক্ষম নয়।

সেনাবাহিনী ও গণবাহিনীর ৩ জন
প্রাক্তন সদস্যের সাংবাদিক সম্মেলন

সেনাবাহিনীর তিনজন সাবেক সদস্য বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট তারিখের সামরিক অভ্যুত্থান এবং সপরিবারে শেখ মুজিব হত্যার ব্যাপারে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল এবং বর্তমান ডেমোক্রেটিক লীগে যোগদানকারী আওয়ামী লীগের তৎকালীন গ্রুপ দায়ী। ২১শে মে ১৯৮১-তে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই তথ্য প্রকাশকারী সেনাবাহিনীর তিনজন সাবেক কর্মচারীর পরিচয় হচ্ছে সাবেক নায়েক সুবেদার মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন, সহ-সভাপতি বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা (সাবেক গণবাহিনী) দফতর সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রাম পরিষদ সদস্য জেলা জাসদ কমিটি, বগুড়া; সাবেক নায়েক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (আসাদ) সদস্য বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সাবেক সভাপতি সরিষাবাড়ী থানা জাসদ, জামালপুর। গতকাল হতে তারা জাসদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কোচ্ছেদের কথা ঘোষণা করেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে সাবেক নায়েক সুবেদার মো. জালাল উদ্দিন একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এতে বলা হয় যে, ১৯৭৫ সালে গুলশানের এক বাড়িতে শেখ হত্যার প্রস্তাব করা হয়েছিল। উক্ত নীল নকশা মোতাবেকই তিনি সপরিবারে নিহত হন।
এই প্রেক্ষিতে প্রশ্ন রাখা হয় যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট অভ্যুত্থান এবং সপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার জন্য জাসদ নেতৃবৃন্দ দায়ী কি না? উত্তরে জনাব জালাল উদ্দিন বলেন যে, বর্তমান ডেমোক্রেটিক লীগের কিছু নেতা যারা তৎকালে আওয়ামী লীগে ছিলেন ওরা এবং সেনাবাহিনীর কয়েকজন অফিসারের সঙ্গে জাসদ গুলশানের এক বাড়িতে উক্ত নীল নকশা প্রণয়ন করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে জাসদকে পিছনে ফেলে বাদবাকিরা প্রথম অভ্যুত্থান সংঘটিত করে। জনাব জালাল উদ্দিন এক প্রশ্নের জবাবে বলেন যে, ৭ই নভেম্বর অভ্যুত্থানের দিন সেনাবাহিনীর পোশাক পরিহিত অবস্থায় তিনি একটি বাহিনীর সহিত ঢাকায় ৫টি থানায় অস্ত্রোদ্ধারের জন্য গিয়েছিলেন। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি সাংবাদিকদের জানান যে, ১৯৮০ সালের জুন মাস হতে বিভিন্ন কারণে তার মোট ৬ বৎসর জেল হয়েছিল। সাংবাদিক সম্মেলনে পঠিত বক্তব্য হুবহু নি¤েœ প্রদত্ত হলোÑ

প্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা,
আমাদের আমন্ত্রণে আপনারা মেহেরবানী করে উপস্থিত হয়েছেন, সে জন্য প্রথমেই আমাদের সশ্রদ্ধ ধন্যবাদ গ্রহণ করুন।
আপনারা জানেন আমরা ছিলাম তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য। ১৯৭১-এর আমরাও জীবনকে বাজি রেখে লড়াই করেছিলাম। বিজয়ের পর স্বভাবতঃই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়-দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের হাতে ছেড়ে দিয়ে আমরা ফিরে গিয়েছিলাম ব্যারাকে।
আর ঠিক এমনি সময়ে ঝড়ের মতো আবির্ভূত হলো জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ। এই দলের নামের সঙ্গে হিটলারের ন্যাশন্যাল সোস্যালিস্ট পার্টির নামের হুবহু মিল। জাসদ নেতাদের ভারতীয় সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জেনারেল সুজন সিং উবান কর্তৃক বিশেষ ট্রেনিং দান, ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার বোহরার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ইত্যাদি সব কিছুকে ছাপিয়ে যে মুহূর্তে আমাদের নজর এল জাসদের তারুণ্য, সমাজতন্ত্রের বক্তব্য ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দুঃসাহস। স্বভাবতঃই আমরা এদের সঙ্গে ক্রমশঃ জড়িয়ে গেলাম।
১৯৭৪ সালের ১৭ই মার্চ জাসদ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৪৭টি থানা ঘেরাও ও অস্ত্র লুটের কর্মসূচি গ্রহণ করে। জনাব সিরাজুল আলম খান তার কিছু সংখ্যক বিশ^স্ত কর্মীকে ডেকে নিয়ে বলেন যে, আন্দোলনকে গণতান্ত্রিক পর্যায়ে থেকে বিপ্লবী পর্যায়ে রূপান্তর করার জন্য চাই জাম্প বা উল্লম্ফন। তারই নির্দেশ মোতাবেক সেদিন জাসদের কিছু সংখ্যক কর্মী মিছিলে হাত বোমা ফাটিয়ে এবং পুলিশের প্রতি গুলিবর্ষণ করে পুলিশকে বেপোরোয়া গুলিবর্ষণে বাধ্য করে। থানা লুটের ৩৭টি কর্মসূচির মধ্যে খুলনায় একটি কর্মসূচি সফল হয়। ফলশ্রুতিতে দেশব্যাপী জাসদ কর্মীদের উপর নেমে আসে বেপরোয়া নির্যাতন। আর এই পরিস্থিতিতেই ১৯৭৪ সালের জুন মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করা হয় বিপ্লবী গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। বীরোত্তম কর্নেল তাহের হলেন সৈনিক সংস্থার প্রধান। জাসদের তরফ থেকে যোগাযোগের দায়িত্বে থাকলেন হাসানুল হক ইনু। ক্যান্টনমেন্টে গোপনে গঠিত করা হতে লাগলো বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ইউনিট।
১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাসে জাসদ আবার দেশব্যাপী এক হরতাল আহ্বান করে এবং সরকারের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার কর্মসূচি দেয়। হরতালের পূর্বদিন জাসদের অন্যতম কর্মী প্রকৌশলী বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র সাহা বোমা বানাতে গিয়ে মারা যান। তার নামানুসারে এই বোমার নাম রাখে নিখিল বোমা।
১৯৭৫ সনের জানুয়ারি মাসে শেখ মুজিব বাকশাল গঠন করেন এবং অন্যান্য সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এমতাবস্থায় হীনবল ও উপায়ন্তরহীন জাসদ নেতৃত্ব শেখ মুজিবের কাছে বাকশালে যোগদানের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেশ করেন। কিন্তু ক্ষমতার মদে মত্ত শেখ মুজিব তখন এই প্রস্তাবকে আমলে দেননি।
ফলে ক্ষিপ্ত হয়ে জাসদ নেতৃত্ব সেনাবাহিনীর কিছু বিক্ষুব্ধ তরুণ অফিসারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। তাদের সঙ্গে মিলে গড়ে তোলা হয় বিপ্লবী ফোরাম। এই ফোরামের ঘন ঘন বৈঠক বসতে থাকে এখানে সেখানে। গুলশানের এক বাড়িতে বসে নির্ধারিত হয় অভ্যুত্থানের নীল নকশা। সেই বৈঠকেই জাসদের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করার প্রস্তাব প্রদান করা হয়।
যুক্তি হিসেবে বলা হয় যে, শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হয়েছেন এই সংবাদে সারা দেশব্যাপী বাকশালীদের মনোবল ও প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেবে, অন্যথায় অভ্যুত্থানের ফলাফলকে দলে রাখা মুস্কিল হবে। দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর সকলেই এ ব্যাপারে একমত হন। অনেকের ধারণা জাসদ কোন বিদেশী শক্তির নির্দেশেই এই প্রস্তাব উত্থাপন করে।
এই নীল নকশা মোতাবেকই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হন। জাসদ নেতারা বিশেষত গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা নেতারা প্রকাশ্যে সেনাবাহিনীর জিপে করে ঘুরে বেড়াতে থাকেন। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে কুরিয়ারদের পাঠিয়ে দেয়া হয়। নির্দেশ দেয়া হয়, এই অভ্যুত্থান জাসদের স্বপক্ষে অভ্যুত্থান এবং এখনকার বিপ্লবী দায়িত্ব হলো বিভিন্ন ফাঁড়ি ও ট্রেজারিসমূহ থেকে যতটা সম্ভব অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করা। এই নির্দেশ অনুযায়ী মোহাম্মদপুর ফাঁড়ি ও নারায়ণগঞ্জের একটি ফাঁড়ি প্রকাশ্য লুট করা হয় এবং লুণ্ঠিত অস্ত্রশস্ত্র তোলা হয় পিটার কাস্টার্সের এলিফেন্ট রোডস্থ বাসভবনে। পরবর্তীকালে পিটার কাস্টার্স এই অস্ত্রশস্ত্র-সহই গ্রেফতার হয়। ভারত থেকে ২৪ ঘণ্টার নোটিশে বহিষ্কৃত পিটার কাস্টার্সের সঙ্গে জাসদের কি সস্পর্ক ছিল তা জাসদ নেতারা কখনোই পরিষ্কার করে বলেনি। তবে জেলখানায় পিটার কাস্টার্স প্রকাশ্যেই বলে বেড়াতো যে, সে জাসদকে চল্লিশ লক্ষ টাকা দিয়েছে। জাসদের কেউই এর কোনো প্রতিবাদ করতো না। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে ১৫ই আগস্টের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশব্যাপী তিনটি ফাঁড়ি লুট করা সম্ভবপর হয়।
স্বভাবতঃই জাসদ খন্দকার মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে কোনো শব্দই উচ্চারণ করেনি। কিন্তু কিছুদিন অতিবাহিত হবার পর জাসদ দেখল তাদের লাভ নেই। তখন তারা পুনরায় তৎপর হয়ে উঠে।
১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর খন্দকার মোশতাক সরকারের পতন ঘটে এবং ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ ক্ষমতায় আসেন। এতে বাকশালী মহলে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। তারা রাস্তায় রাস্তায় মিছিল বের করে বিজয়োৎসব করতে থাকে। ভারতীয় বেতার থেকেও প্রকাশ করা হতে থাকে বিপুল আনন্দধ্বনী। এমতাবস্থায় দেশপ্রেমিক প্রতিটি নাগরিক এবং সিপাহীই প্রমাদ গুনতে থাকে। এই পটভূমিতে ৭ই নভেম্বর সংগঠিত হয় দেশপ্রেমিক সিপাহী জনতার মহান বিপ্লব। পাদ প্রদীপের সামনে চলে আসেন জেনারেল জিয়া। ক্ষমতা লোলুপ জাসদ দাবী করে যে এই বিপ্লবে নাকি তাদেরই নেতৃত্ব ছিল। কিন্তু আমরা যারা এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলাম তারা জানি যে বিপ্লবের সাফল্যের পর সিপাহীদের তরফ থেকেই জেনারেল জিয়ার কাছে ১২ দফা দাবী পেশ করা হয়, কিন্তু জাসদের সঙ্গে তার কোনো প্রকার চুক্তি বা অঙ্গীকারই ছিল না। জেনারেল জিয়া এই ১২ দফা দাবীর কতিপয় দাবী সঙ্গে সঙ্গে পূরণ করেন এবং ধাপে ধাপে পূরণ করা হবে বলে আশ^াস প্রদান করেন।
১২ই নভেম্বর জাসদ সিপাহী জনতার মহান বিপ্লবের ফলে অধিষ্ঠিত সরকারকে উৎখাত করার বক্তব্য দেয়। ১৬ই নভেম্বর জলিল-রবের ব্যক্তিগত নামে প্রচারপত্র বিলি করা হয় এবং নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে অধিষ্ঠিত সরকারকে উৎখাত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
ক্যান্টনমেন্টে বিলি করা হয় প্রচারপত্র। মেজর জিয়া উদ্দিনকে বেশ কিছু সংখ্যক সিপাহী ও অস্ত্রশস্ত্রসহ পাঠিয়ে দেয়া হয় সুন্দরবন, প্রত্যেক ইউনিটে নির্দেশ দেয়া হয় চূড়ান্ত প্রস্তুতির, কিন্তু চক্রান্ত সরকারের গোচরীভূত হয়ে যায়। ফলে ২২শে নভেম্বর জলিল, রব, হাসানুল হক ইনু গ্রেফতার হন। ২৪শে নভেম্বর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের একটি হল থেকে সিপাহী ও অন্যান্যদের সঙ্গে পরিকল্পনারত অবস্থায় গ্রেফতার হন কর্নেল তাহের। পরিকল্পনা ভেঙে যাওয়ায় কর্মীদের কাছে মুখ রক্ষার উদ্দেশ্যে এবং জনগণের মধ্যে জাসদ ভারতীয় দালাল বলে যে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল তার কবল থেকে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে জনাব সিরাজুল আলম খানের ব্যক্তিগত নির্দেশে ২৬শে নভেম্বর ভারতীয় হাই কমিশনের উপর ব্যর্থ হামলা চালানো হয়।
ব্যর্থ অভ্যুত্থানের নায়কদের যে স্বাভাবিক পরিণতি সর্বদেশে সর্বকালে ঘটে থাকে কর্নেল তাহেরের ব্যাপারেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই তারিখে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি হয়। বস্তুত স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী কর্নেল তাহেরের জাসদ নেতৃত্বের দ্বারা সম্পূর্ণরূপে ব্যবহৃত হয়েছিলেন। কর্নেল তাহেরের অনুসারীদের সান্ত¡না দেয়ার উদ্দেশ্যে জাসদ ৩০শে জুলাই দেশব্যাপী এক হরতাল আহ্বান করে। ফাঁসির ৯ দিন পর আহূত এই হরতাল সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়।
কর্নেল তাহেরের ফাঁসি ও মেজর জিয়া উদ্দিনসহ অন্যান্য নেতাদের গ্রেফতারের পরিপ্রেক্ষিতে বাইরের আন্দোলনে কিছুটা ভাটা দেখা দেয়। কিন্তু জনাব সিরাজুল আলম খান, মেজর জলিল, জনাব এবিএম শাহজান, জনাব হাসানুল হক ইনু প্রমুখ স্ব-স্ব চ্যানেলে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়াস চালিয়ে যেতে থাকেন। এই চক্রান্তের ফলশ্রুতিতেই জাসদ ১৯৭৭ সালের ২রা অক্টোবর এর ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া ১৯৮০ সালে ১৭ই জুনের মধ্যে ব্যর্থ অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়। তাদের যোগসাজশে আজও তারা চক্রান্ত ও অভ্যুত্থানের প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে।
জাসদ ১৯৭৪ সালের তাদের থিসিসে চীনের কম্যুনিস্ট পার্টিকে সঠিক পার্টি বলে অভিহিত করে এবং জনৈক কাদের সাহেবকে লন্ডন পাঠিয়ে তার মাধ্যমে চীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। কিন্তু চীন এ ব্যাপারে তেমন কোনো উৎসাহই প্রদর্শন করে না।
জাসদ মনে করে যে জনগণ প্রধান ফ্যাক্টর নয়। এ দেশে ক্ষমতা দখল করতে হলে চাই সেনাবাহিনীর একটি অংশ ও বিদেশী মদদ। তাই চীন যখন উৎসাহ দেখালো না তখন তারা থিসিস পরিবর্তন না করেই রাশিয়ার কৃপা ভিক্ষার জন্য হন্যে হয়ে উঠে। জনাব আ. স. ম. আবদুর রব পশ্চিম জার্মানি গিয়ে নানাভাবে রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এবং একপর্যায়ে রাশিয়া থেকে ঘুরেও আসেন। জাসদ এ কথাও বুঝতে পারেন যে সিপিবি বাকশালকে ডিঙ্গিয়ে রাশিয়া জাসদকে কখনোই কোলে নিয়ে বসবে না। সুতরাং বাকশালের মনোরঞ্জন অপরিহার্য। তাই যে জাসদ ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়ও বাকশালকে এক নম্বর শত্রু বলে অভিহিত করেছিল, ১৯৭৯ সালে বাস্তব অবস্থা একই থাকা সত্ত্বেও জাসদ সেই বাকশালের সঙ্গেই মিত্রতার তত্ত্ব দিয়ে বসে এবং কার্যত বাকশালের লেজুড়বৃত্তি শুরু করে। উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৮০ সালে বাকশালীরা জাসদের অফিস পুনরায় ভস্মীভূত করে দিলেও এবং তাদের কর্মীদের বেধড়ক পিটিয়ে দিলেও বাকশালরা নারাজ হতে পারে এই ভয়ে জাসদ বাকশালীদের গায়ে একটি টোকা দেয়া থেকে পর্যন্ত বিরত থাকে। আর ভারতের সঙ্গে এক গোপন রহস্যময় যোগাযোগ সর্বদাই রক্ষা করে এসেছেন জাসদের রহস্যপ্রিয় নেতা জনাব সিরাজুল আলম খান। তিনি দুই-এক মাস অন্তর অন্তরই অকস্মাৎ দিল্লী চলে যেতেন। জাসদের কর্মীদের যখন হন্যে হয়ে খুঁজছে, জাসদের সমর্থকদের পরিবার-পরিজন পর্যন্ত যখন বেপরোয়া নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তখন জনাব সিরাজুল আলম খান প্রকাশ্যে পাসপোর্টের মাধ্যমেই দিল্লী কোলকাতা চলে যেতো এবং কেউ তাকে ধরার কোনো চেষ্টাই করতো না।
এই প্রসঙ্গে জনাব মোমিনুল হায়দার চৌধুরী ওরফে হায়দার সাহেবের কথাটি বলে রাখা দরকার। ভারতের সোশ্যলিস্ট ইউনিট সেন্টার (এসইউসি)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হায়দার সাহেব ১৯৭২ সালেই এসইউসি-এর একটি বাংলাদেশী সংস্করণ গঠন করার দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশে আসেন এবং বিভিন্ন মহলে ঘোরাফেরার পর জাসদকে কাজের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন। তিনি প্রথম থেকেই বছরের অর্ধেক সময় ভারতে এবং অর্ধেক সময় বাংলাদেশে বসবাস করতেন শোনা যায়। তার ভারতীয় ও বাংলাদেশী উভয় প্রকারের পাসপোর্ট রয়েছে। জনাব সিরাজুল আলম খান এই ভদ্রলোকের সঙ্গেও বেশ ক’বার ভারতে গমনাগমন করেন।
দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার পর জনাব হায়দার জাসদের মধ্যে তার কিছু অনুসারী সৃষ্টি করতে সমর্থ হন এবং সিরাজুল আলম খানের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের কোন্দলের কোন ফয়সালা না হওয়ায় তার উচ্চভিলাষী তরুণ অনুসারীদের দিয়ে বাসদ গঠন করান। জনাব খান যেমন জাসদের নেপথ্য গুরু জনাব হায়দারও তেমনি বাসদের নেপথ্য গুরু। উচ্চভিলাষী অথচ অস্থির চিত্ত নেতৃত্বের দ্বারা পরিচালিত জাসদ কোনো কর্মসূচিতেই লেগে থাকতো না বরং সর্বদাই চক্রান্তের পথ খুঁজে বেড়াতো। তাদের এই নৈরাজ্যবাদী উচ্চাভিলাষের বেদীমূলেই প্রাণ দিয়েছিল কর্নেল তাহের, কর্পোরাল আলতাফ, সিদ্দিক মাস্টার, আবুল কালাম আজাদ, হাদী মন্টু, মফিজ, হেলাল, রোকন, মীর মোস্তফাসহ শত শত রাজনৈতিক কর্মী ও সিপাহী। বিরান হয়ে গিয়েছিল অসংখ্য পরিবার আর কতজন যে ফ্যাসিবাদী নির্যাতনের শিকার হয়েছিল তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কিন্তু জাসদ নেতৃত্ব এদের প্রতি কোনো দায়-দায়িত্ব কোনোদিন স্বীকার করেনি।
কথা ও কাজের মধ্যেও জাসদ নেতৃত্বের কোনোদিন কোনো মিল ছিল না। তারা মুখে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলতো, কিন্তু কার্যত নেতারা বিলাসবহুলতার মধ্যে দিয়ে জীবনকে উপভোগ করতেন। সাধারণ কর্মীরা যে না খেয়ে থাকতো তাদের যে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক দুর্দশা, সেদিকে নজর দেয়ার ফুরসত মিলতো না জাসদ নেতাদের।

মার্কিন সিনেটে তথ্য প্রকাশ বাংলাদেশের পাঁচজন সাংবাদিক সিআইএ’র এজেন্ট
আজকাল বাংলাদেশে বিদেশি এজেন্ট, বিদেশি অনুপ্রেরণা প্রভৃতি বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে। কারা এই বিদেশি এজেন্ট? কারা বিদেশি অনুপ্রেরণা ও অর্থ পেয়ে স্বদেশের স্বার্থবিরোধী কাজে লিপ্ত আছে?
সম্প্রতি (১৯৭৮ সালে প্রকাশিত সংবাদ ও প্রচারপত্রে এটা বলা হয়েছিল Ñলেখক) বিদেশি এজেন্টদের একটি তালিকা পাওয়া গেছে। এই তালিকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এজেন্টদের সাথে বাংলাদেশের পাঁচজন এজেন্টের নাম রয়েছে। এরা হলেন বাংলাদেশে টাইমস ও সাপ্তাহিক হলিডে-র প্রাক্তন সম্পাদক এবং সদ্য পদত্যাগকারী মন্ত্রী জনাব এনায়েত উল্লাহ খান, দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদকম-লীর সভাপতি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ও সম্পাদক জনাব আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসস-র প্রাক্তন জেনারেল ম্যানেজার জনাব আমানউল্লাহ এবং দৈনিক বাংলা ও দৈনিক বার্তার প্রাক্তন সম্পাদক জনাব নূরুল ইসলাম পাটোয়ারী।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের সিলেক্ট কমিটি ৮৪টি দেশের সংবাদপত্র, পত্রিকা, বেতার, টেলিভিশন প্রভৃতি প্রচার মাধ্যমে সিআইএ’র নিয়মিত বেতনভোগী ৮৮৭ জন এজেন্টের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এই তালিকায় বাংলাদেশের উপরোক্ত পাঁচজন সাংবাদিকের নাম রয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র ঘৃণ্য কীর্তিকলাপ আজ আর কারও অজানা নয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে চক্রান্ত চালানো, রাজনৈতিক গোলযোগ সৃষ্টি, সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানো, নির্বাচিত গণতান্ত্রিক ও দেশপ্রেমিক সরকারগুলোকে উৎখাত এবং স্বাধীনতা ও মুক্তি আন্দোলনের জনপ্রিয় নেতাদের হত্যা, এসবই সিআইএ’র কীর্তি। কঙ্গোর স্বাধীনতা আন্দোলনের মহান নেতা প্যাট্রিস লুমুম্মা, চিলির প্রগতিশীল জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট সালভাদোর আলেন্দে প্রমুখ বিশ^বরেণ্য নেতাদের হত্যার পেছনে ছিল সিআইএ। আলেন্দকে হত্যার কথা তো সিআইএ স্বীকার করেছে।
সিআইএ’র ঘৃণ্য কীর্তিকলাপের কিছু কিছু ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় খোদ মার্কিন জনগণও এই সংস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলছেন। তাই মার্কিন সরকার সিআইএ’র কার্যকলাপ সম্পর্কে কিছু কিছু তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনুরূপ একটি তথ্যই হলো সিলেক্ট কমিটি প্রকাশিত উপরোক্ত তালিকা।
সিলেক্ট কমিটির ঐ রিপোর্টে বলা হয়েছে যে সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত এই এজেন্টরা সিআইএ-কে খবর সরবরাহ করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের অনুকূলে সুকৌশল প্রচারণা দ্বারা নিজ নিজ দেশের জনমতকে প্রভাবিত করে এবং সংবাদপত্র, বেতার, টেলিভিশন ও পুস্তক প্রকাশনা প্রভৃতি সংস্থায় সিআইএ’র অনুপ্রবেশের সুযোগ করে দেয়।
পাকিস্তান আমলেও বহু চক্রান্ত, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, সামরিক অভ্যুত্থানে সিআইএ সক্রিয় ছিল। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোরতর বিরোধিতা করে। স্বাধীনতার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দেশে সিআইএ’র চক্রান্তের জাল আরও বিস্তার করেছে। এ দেশে সিআইএ এজেন্টদের মধ্যে মাত্র পাঁচজন সাংবাদিকের নাম প্রকাশিত হয়েছে। এদের মধ্যে কেউ ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের’ প্রবক্তা, আবার কেউবা পিকিংপন্থি বামপন্থী ‘বিপ্লবের’ মুখোশ পরে রয়েছে। বাংলাদেশে সরকার কি এই পাঁচজন এজেন্ট সম্পর্কে অবহিত নন? সরকার যখন ‘বিদেশের টাকা’ ‘বিদেশের অনুপ্রেরণা’ সম্পর্কে প্রতিদিন লম্বা চওড়া বক্তৃতা দিচ্ছেন তখন এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন?
সরকার অবিলম্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের সিলেক্ট কমিটির ঐ রিপোর্ট জনগণের জ্ঞাতার্থে এ দেশে প্রকাশ করুন। দেশবাসী এই এজেন্টদের চিনে রাখুন এবং এদের দেশের স্বার্থবিরোধী চক্রান্তমূলক কার্যকলাপ সম্পর্কে সদা সজাগ থাকুন।

* [ডিসেম্বর, ১৯৭৮। ভূপেশ গুপ্ত কর্তৃক উত্থাপিত ভারতীয় লোকসভায় শীতকালীন অধিবেশনের প্রসিডিংস দ্রষ্টব্য] 

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

 
পুরনো সংখ্যা
  • ২৫ জুলাই ২০১৯

  • ১১ জুলাই ২০১৯

  • ২৭ জুন ২০১৯

  • ২০ জুন ২০১৯