তারাশঙ্করের স্বর্ণ-কলমে নারীর আত্মমর্যাদাবোধ

প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ১৩:২৩

এমিলি জামান

 

নিবন্ধে শুরুর আঁচড় টানার পর্বে নমস্য সাহিত্যশিল্পী তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে দু-চার কথা না বললে রসজ্ঞ পাঠকের প্রত্যাশা-পূরণে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়ে যাবে। অগণন তারকা-খচিত প্রভাদীপ্ত বাংলা সাহিত্যের বিপুলায়তন আকাশ-পানে তাকিয়ে যারা নেত্রযুগল মুগ্ধতার মায়া-অজ্ঞনে প্রলিপ্ত করেন, তাদের সবার কাছেই তারাশঙ্কর সুপরিচিত দ্যুতিময় এক তারকা। তিনি যে অন্যতম তারকা-সাহিত্যশিল্পী, এ নিয়ে যেমন সন্দেহের অবকাশ নেই, তেমন সন্দেহের অবকাশ এ নিয়েও নেই যে, প্রজ্ঞাদীপ্ত তারাশঙ্করের সৃষ্টিসম্ভার ধ্রুপদী আঙ্গিকের। বাংলা গদ্য-সাহিত্য যে-কজন গুণীর স্বর্ণকলম-বিহারে ঐশ^র্যম-িত হয়েছে, তারাশঙ্কর-বন্দ্যোপাধ্যায় তাদেরই একজন। কালোত্তীর্ণ এই সাহিত্যস্রষ্টার জন্ম বাংলা ১৩০৫ সনের ৮ শ্রাবণ (ইংরেজি ১৩ জুলাই ১৮৯৮)। তিনি পশ্চিম বাংলার বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে এক ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারে জন্মেছিলেন। তার বাবা হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মা প্রভাবতী দেবী। তারাশঙ্কর সাত্ত্বিক-প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। উল্লেখ করলে অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে নাম, যশ, খ্যাতি, অর্থ ইত্যাদির পিছু-ধাওয়া করে তারাশঙ্কর তার মূল্যবান সময়ের অপচয় ঘটান নি। কিন্তু, প্রাজ্ঞ ঈশ^র স্বয়ং তাকে ঢেলে দিয়েছেন। বম্বে-টকিজের চিত্রনাট্যকার হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েও নিরাসক্ত তারাশঙ্কর সেই আমন্ত্রণ বিনীতভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বলেছিলেন- “আমার দ্বারা বোধহয় সিনেমার সেবাটা হয়ে উঠবে না।” তবে, প্রকৃতিগতভাবে সাত্ত্বিক হলেও তার বস্তুজ্ঞান ও বিষয়বোধের ঘাটতি ছিল না। হৃদয়বান তারাশঙ্কর ধারালো দৃষ্টি এবং সজাগ ও সবল স্নায়ুর অধিকারী ছিলেন। হৃদয় আর মস্তিষ্ক দুইয়ের স্বর্ণ-সহযোগিতায় তার কলম তরতরিয়ে এগিয়ে গেছে আর আমরা উপহার পেয়েছি তার বর্ণময় সৃষ্টিসম্ভার। ‘কবি’র তারাশঙ্কর ‘অভিযান’-এ ভিন্নরূপে দৃষ্ট হন। ‘পঞ্চপুত্তলী’ পড়তে গিয়ে যে তারাশঙ্করকে পাই, ‘বিচারক’-এ তিনি দেখা দেন আরেক বেশভূষায়। ‘সপ্তপদী’র তারাশঙ্কর আর ‘ডাক হরকরা’র তারাশঙ্কর বিষয়বস্তুর ভিন্নতায় সুদক্ষ জীবনশিল্পীরূপে চিহ্নিত হন। ‘রাইকমল’-এর তারাশঙ্কর আর ‘ধাত্রীদেবতা’র তারাশঙ্কর পাঠকের দপ্তরে পৌঁছে দেন দুই পৃথক স্বাদের সাহিত্যবার্তা। তারাশঙ্কর-প্রসঙ্গে যেটা অবশ্য-উল্লেখ্য সেটা হচ্ছে তিনি না লিখলে বাংলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনের অনেকটাই আমাদের অজ্ঞাত থেকে যেত। লোকসাহিত্যের মৌলিক ধারার সঙ্গে অন্তরঙ্গতা তৈরি করে এবং বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক-কৌশল অনুসরণ করে তার নিজস্ব প্রতিভার সঙ্গে দেশজ ঐতিহ্যের মিলন ঘটিয়েছেন তারাশঙ্কর। আর, এটাই তাকে বাংলা সাহিত্যের ভা-ারে মৌলিকতা-ঋদ্ধ নান্দনিক উপহার দিতে সহযোগিতা করেছে। তারাশঙ্কর তার সাহিত্য-চিত্রের পটভূমি হিসেবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বেছে নিয়েছে তার স্ব-ভূমি। পশ্চিম বাংলার বীরভূম, বর্ধমান ও বাঁকুড়ার বিচিত্র ভূ-প্রকৃতি এবং উল্লিখিত অঞ্চলসমূহের সংগ্রামী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বরূপ তারাশঙ্করের রচনায় আকর্ষক বৈশিষ্ট্যে ফ্রেমবন্দি হয়েছে। যা হোক, এবার নিবন্ধের শিরোনামের যথার্থতা তুলে ধরতে চেষ্টা করছি এবং এটা করতে গিয়ে ঠাকুরঘরের (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকর্ম থেকে) দ্বারে দাঁড়িয়ে কিঞ্চিৎ প্রসাদ ভিক্ষা চেয়ে নিচ্ছি।
হে সুন্দরী
মুক্ত করো অসম্মান, তব অপ্রকাশ আভরণ।
... ... ... ... ... ... ...
হে বন্দিনী, বন্ধনেরে কোর না কৃত্রিম আভরণ।
... ... ... ... ... ... ...
ভোগীর বাড়াতে গর্ব খর্ব করিয়ো না আপনারে
খ-িত জীবন লয়ে আচ্ছন্ন চিত্তের অন্ধকারে।
[রবীন্দ্রনাথের ‘বীথিকার’ কবিতা ‘অপ্রকাশ’ থেকে উদ্ধৃত]

নারীকে কবিগুরু আলোকিত জীবনের সাধনার প্রয়োজনে সবরকমের প্রতিকূলতা জয় করে বেরিয়ে আসতে আহ্বান জানিয়েছেন। কবিগুরুর আহ্বান তারাশঙ্করেও প্রতিধ্বনিত হয়েছে এ-কথা জোর দিয়ে বলা যায়। প্রযুক্তির সোনার পাতে মোড়া অত্যুন্নত ডিজিটাল বর্তমানের সাহিত্যশিল্পী তারাশঙ্কর নন। আর, এ-কারণেই তার গল্প/উপন্যাস/নাটকের নায়িকারা ফ্যাশন-দুরুস্তু পোশাকে সজ্জ্বিত হয়ে ঝা-া উঁচিয়ে রাজপথে উচ্চ কণ্ঠে সেøাগান দিয়ে বেড়াচ্ছে, এ-জাতীয় দৃষ্টান্ত দেখানো যাবে না। প্রগতি-পিপাসু জনতা-অধ্যুষিত নগর-জীবনও তারাশঙ্করের সৃষ্টিসম্ভারে স্বল্পই প্রতিবিম্বিত হয়েছে। তিনি যান্ত্রিক সভ্যতার প্রলেপমুক্ত সমাজের সো-কলড্ পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর চারিত্র্য-চিত্রণ ও জীবন-চিত্র তুলে ধরার কাজেই আজীবন ব্যাপৃত ছিলেন বললে, খুব একটা ভুল বলা হবে না। তার দু-চারটি ভিন্ন আঙ্গিকের সাহিত্যকর্মকে (যেমন- মহানগরী, আরোগ্য-নিকেতন, বিচারক এবং আরও গুটিকয় সাহিত্যকর্ম) ব্যতিক্রম ধরে নিয়ে বলা যায় যে তিনি এক বিশেষ শ্রেণি-কাঠামোভুক্ত লেখক। তার ‘রসকলি’র মঞ্জরী, ‘বসন্ত রাগ’-এর লল্লা, ‘রূপসী বিহঙ্গিনী’র সুচন্দ্রা, ‘রাইকমল’-এর কমলিনী বোষ্টমী কেউই মহাবিদ্যালয় ও বিশ^বিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারিণী আধুনিক নারী না। এদের মা-বাবারাও ঝলমলে কর্পোরেট-ব্যক্তিত্ব নন। কিন্তু, আত্মমর্যাদাবোধ আর আত্মিক আভিজাত্য যে একমাত্র বইপড়া বিদ্যা আর প্রাতিষ্ঠানিক সনদমুখী শিক্ষার স্বর্ণফসল না, এ সত্য ব্যক্তিমানস-পরিব্রাজক তারাশঙ্কর অসংখ্যবার তার সৃষ্টিসম্ভারে তুলে ধরেছেন। তারাশঙ্কর-নির্মিত কমলিনী বোষ্টমী তার প্রিয়তম রঞ্জনের অবহেলায় বেদনা-জর্জরিত হয়ে কাঁদতে বসে না। সে কাঁদতে বসে সময়ের ধর্মে হারিয়ে যাওয়া তার বাহ্যিক সৌন্দর্যের স্মৃতি স্মরণ করে। সূক্ষ্মদর্শী তারাশঙ্করের ভাষায়- ‘তাহার কাঁদিতে ইচ্ছা করিল রঞ্জনের অবহেলার জন্য নয়, তাহার রূপের জন্য কাঁদিতে ইচ্ছা হইল।’ এই সূক্ষ্ম আত্মসচেতনতা (যা আত্মমর্যাদাবোধের শেকড়) কমলিনী বোষ্টমী শেকস্পিয়ের-মিলটন বা মার্কস-এঙ্গেলস পড়ে অর্জন করেনি। ঠেলে গুঁতিয়ে কারও স্নায়ুর গভীরে আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে তোলা যায় না। ওটা মূলত সহজাত বোধ (ওহহধঃব ংবহংরঃরারঃু)। তারাশঙ্করের অন্যতম সৃজন ‘রূপসী বিহঙ্গিনী’র সুচন্দ্রার স্নায়ু দৈহিক-পবিত্রতা নিয়ে ত্রস্ত-ব্যস্ত না থাকলেও তাকে একজন পুরুষ আরেক পুরুষের কাছে নগদ অর্থমূল্যে বিক্রি করে দেবে, এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। সমাজের চিনির প্রলেপে ঢাকা এক অহংকারী ধর্মগুরুর গলা কেটে সে নির্দ্বিধায় আপন প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতাই আত্মমর্যাদাবোধের জ¦লজ¦লে সূচক (ওহফরপধঃড়ৎ) বলে বিশ^াস করেন আজকের সুসভ্য জনগোষ্ঠী। দু-চারজন সো-কল্ড সাহিত্য সমালোচকও এর ব্যতিক্রম নন। তারা বাংলা সাহিত্যের কতিপয় মর্যাদাময়ী নারী-চরিত্রের যথেচ্ছা নেতিবাচক সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। যেমন- রবীন্দ্রনাথের ‘স্ত্রীর পত্র’র মৃণালের শেষ আশ্রয় কেন মীরা বাঈয়ের ভক্তিরসের ভজন (?), কেন সে কোনো একটা মানসম্পন্ন চাকরি জোগাড় করে আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন কারার বদলে সাত্ত্বিক ও তাত্ত্বিক প্রতিবাদে সময় ক্ষেপণ করলো (?) ইত্যাদি। আসলে ধনতান্ত্রিক সভ্যতার যাঁতাকলে পিষ্ঠ হতে হতে আমরা আত্মমর্যাদাবোধের প্রমিত সংজ্ঞাবিস্মৃত হতে বসেছি। আত্মমর্যাদাবোধের সহজ-সরল অর্থ হচ্ছে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা। না, প্রজ্ঞাদীপ্ত তারাশঙ্করের আত্মসমীক্ষণে আত্মনির্মিত নায়িকাদের একজনকেও অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে দেখা যায় না। পরিস্থিতির চাপে কখনও কখনও দুমড়ে-মুচড়ে গেলেও সময়ের ব্যাপ্ত পরিসরে তাদের ভেতর-বা’র আলোর ঝরনাধারায় ধুয়ে-মুছে গেছে। ‘রূপসী বিহঙ্গিনী’র সুচন্দ্রা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠার পরও অনুধাবন করেছে যে তার আত্মমর্যাদা ক্ষুণœ হচ্ছে। নিজের প্রাণরক্ষার স্বার্থে সুচন্দ্রা অসত্য-উচ্চারণের অসততা কোনোভাবেই অবলম্বন করতে পারেনি। ‘সপ্তপদী’র রীণা ব্রাউন প্রেমের প্রত্যাশিত পরিণতি বিবাহিত জীবনের কামনায় লুব্ধ হয়ে প্রিয়তম কৃষ্ণেন্দুকে স্বধর্মচ্যুত করতে চায়নি। অন্তর্বেদনায় জর্জরিত হয়ে পরোক্ষ আত্মপীড়ন বেছে নিয়েছে রীণা। রীণার অন্তর্দহন কৃষ্ণেন্দুর অন্তর্গহনে পৌঁছে গেছে এবং তাদের প্রেম লৌকিক থেকে অলৌকিক মাত্রায় উন্নীত হয়েছে। উচ্চাঙ্গের প্রেম যে শুধুই কাছে টানে না, দূরেও ঠেলে দেয় এটা বুঝিয়ে দিয়ে রীণা ব্রাউন তার আত্মমর্যাদাবোধ ও আত্মিক অভিজাত্যের স্বর্ণস্বাক্ষর এঁকে দিয়েছে ‘সপ্তপদী’র অবয়বে। আর, উজ্জ্বল এক কোহিনূরের দিব্যদ্যুতি ছড়িয়ে দিয়েছে তারাশঙ্করের ‘সপ্তপদী’। ‘বসন্তরাগ’-এর রঙ্গনাথনও শবর-বালিকা লল্লার আত্মত্যাগের চন্দ্রপ্রভার পাশে তার আক্ষেপের দ্বিধা-জরজর তারার অনতি উজ্জ্বল প্রভাটুকুই শুধু ছড়াতে পেরেছেন। রঙ্গনাথনের ক্ষেত্রে ঠরপঃড়ৎু ড়ভ ংড়ঁষ ড়াবৎ নড়ফু (ভিক্টরি অব সৌল ওভার বডি) ঘটেনি বললে ভুল হবে। কিন্তু, লল্লার ক্ষেত্রে ঘটেছে এর বর্ণাঢ্য উদযাপন। শবর-বালিকার কৈশোর-কৃচ্ছ্রসাধন, মধ্য-যৌবনের রঙ্গনাথনের অনুতাপ-গৌরবকে নিঃসন্দেহে ছাপিয়ে গেছে। ঔদার্যময়ী লল্লা যে-মুহূর্তে তার নিজ-হাতে ফিরিয়ে দেওয়া মালা অসীম মমতায় আবার তুলে নিয়ে ফিরে গেল, সে-মুহূর্তে রঙ্গনাথন দ্বিতীয়বার লল্লার কাছে পরাজিত হলেন। তবে, এ পরাজয়ের মøানতা ‘বসন্তরাগ’-এর ঝংকারে নিষ্প্রভতার বদলে বর্ণময় বিভা ছড়িয়ে দিয়েছে। ‘প্রত্যাখ্যান’-এর গীতাও সুকুমারের উইল গ্রহণ না করে বুঝিয়ে দিয়েছে যে তার প্রেম বৈষয়িক স্বার্থের কণ্টক-জর্জরিত স্থূল প্রেম ছিল না। ‘রসকলি’র মঞ্জরীও ‘তীর্থের বেশ ছেড়ে কুকুরের বেশ’ ধরেনি। সে জমিদারের নর্ম-সহচরী হয়ে তার দৈহিক ও আত্মিক পবিত্রতা ক্ষুণœ করেনি। পুলিন-গোপিনীর দাম্পত্য-জীবনে ধুসর ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে থাকতেও চায়নি। জয় হয়েছে মর্যাদাময়ী মঞ্জরীর, আর সেই সঙ্গে সফল হয়েছে রসজ্ঞ কথাশিল্পী তারাশঙ্করের সাহিত্যিক প্রয়াস। আবার ফিরে আসছি ‘রাইকমল’-এর কমলিনী বোষ্টমী-প্রসঙ্গে (আলোচ্য উপন্যাসের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। রঞ্জনের নব-পরিণীতার সঙ্গে কমলিনী পতি-ভাগাভাগির কুশ্রী খেলায় মেতে উঠে কুরুচির পরিচয় দেয়নি। কমলিনী তার আত্মমর্যাদাবোধের সদর্প-স্বাক্ষর এঁকে রেখে গেছে ‘রাইকমল’-এর ক্যানভাসে। নমস্য তারাশঙ্করের ভাষায়- ‘সব সারিয়া গাছতলার ঘর ভাঙিয়া আবার সে পথ চলে’। ভেবে বিস্মিত হতে হয় যে নিরক্ষর কমলিনী তো প্রাজ্ঞ রবার্ট ফ্রস্টের কাব্য-সমুদ্রে স্নান করতে পারেনি। তাহলে কীভাবে সে তার ষষ্ঠ চেতনায় ধারণ করল এত বড় গভীর জীবন-দর্শন (!), যা বলে দেয়- ‘গধহু সরষবং ঃড় মড় নবভড়ৎব বি ংষববঢ়’ (মেনি মাইলস্ টু গৌ বিফোর উই সিøপ)। ঘরকে তুচ্ছ করে পথকে সঙ্গী করার দুঃসাহস কি আত্মমর্যাদাবোধের অন্যতম স্বাক্ষর না? আজকের আধুনিক নগর-কন্যাদের দু-চারজন যদি এ-জাতীয় দুঃসাহস দেখাতে পারতেন, ‘উইমেন লিব’ (ডড়সবহ-ষরনবৎঃু) নামক উত্তপ্ত শব্দবন্ধটি তাহলে সত্যিকার অর্থে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠত। উল্লিখিত শব্দবন্ধের যে জয়ঢাক এ-যুগে ঘণ্টায় ঘণ্টায় পেটানো হয়, তা যেন ‘যত গর্জে তত বর্ষে না’ প্রবাদ-বাক্যের অর্থময়তাই তুলে ধরে। আসলে প্রদীপের তলার অন্ধকারটা আমরা যেন দেখেও দেখতে চাই না। সুসভ্য গণতান্ত্রিক ইংল্যান্ডেও নারীর ভোটাধিকার স্বীকৃতি পায় মাত্র ১৯১৮ সাল থেকে। পক্ষান্তরে, তারাশঙ্করের ‘রাইকমল’-এ কমলিনীর চিত্তজাগরণ আর আসক্তি-মুক্তির যে কাহিনি নির্মিত হয়েছে, তা যেন পরোক্ষে বৃহত্তর অর্থে নারীর মানস-মুক্তির পূর্ব-সংকেত উপহার দেয় আমাদের। মানস-মুক্তিই আত্মোপলব্ধি, আর মানস-মুক্তিই আত্মমর্যাদাবোধ, যা নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করার সাহস জোগায়- ‘মনুষ্যজন্ম বহুভাগ্যে ঘটেছে। সাধ করে কি মরতে পারি? না, মরতে আছে?’ জীবন-উপাসক তারাশঙ্কর দেখিয়েছেন যে আশাবাদী মানুষ বিশ^াস খুঁজে পায় তার সত্তার গভীরে। বাস্তবের অবস্থা ও ব্যবস্থার সঙ্গে লাগাতার ঠোকাঠুকির পর কোনো এক মুহূর্তে তার বিশ^াসের সত্যতা প্রমাণিত হয়। মানবতাবাদী রুশ সাহিত্যশিল্পী টলস্টয়ের পথে তারাশঙ্করও হেঁটেছেন। টলস্টয়ের মতো করে তিনিও বুঝিয়ে দিয়েছেন যে কোনো মহৎ উপলব্ধির স্তরে মানুষ যদি না-ই পৌঁছাতে পারে, তাহলে জীবনের ঘাটে ঘাটে বৃথাই ঘুরে মরবে সে। জীবনের অদৃশ্য পরতে লুকিয়ে থাকা কোনো দিব্য-শক্তি মানস-সংগ্রামী ধৈর্যশীলদের অবশ্যই প্রশান্তির সুশীতল ছায়াতলে পৌঁছে দিতে পারে। তারাশঙ্করের মঞ্জরী, সুচন্দ্রা, গীতা, রীণা ব্রাউন, কমলিনী সকলেই তাদের ঘটনাবহুল জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বৃহত্তর উপলব্ধির স্তরে উন্নীত হয়েছে। তারা আর নারীরূপে দৃষ্ট হয়নি, দৃষ্ট হয়েছে মর্যাদাদীপ্ত মানুষরূপে।
জয়তু তারাশঙ্কর! জয়তু বাংলা-সাহিত্য! জয়তু বঙ্গজননী!

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৭ অক্টোবর ২০১৯

  • ৩ অক্টোবর ২০১৯

  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯