রেলভ্রমণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৯, ১১:২০

অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য

 

[পূর্ব প্রকাশের পর]
একটা বছর পেরোতে না পেরোতেই আবার দেখি রবীন্দ্রনাথ কলকাতা ছেড়ে চলেছেন হাওড়া স্টেশন থেকে রাতের মেল ট্রেন ধরে পশ্চিম ভারতের পথে গাজিপুরে। ইতিপূর্বেই স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে গাজিপুরে এসেছেন। কবির ইচ্ছা, আপতত এখানেই তিনি বাস করবেন। মৃণালিনী ও মাধুরীলতা এখন গাজিপুরেই। কোনো প্রয়োজনে রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় এসেছিলেন; ফেরার সময় নদিদিকে গাজিপুরে সঙ্গে নিয়ে চলেছেন। দিদির প্রতি ভাইয়ের যেমন অগাধ ভালোবাসা, তেমনি নিত্য দিদির সস্নেহ বকুনি আর অনুযোগেও অনুজ রীতিমতো অভ্যস্ত। একদিকে তারা হলেন পাঁচ বছরের ছোট-বড় ভাই-বোন, আর একদিকে সেই দুইজনেই আবার সাহিত্যক্ষেত্রে দুই স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। একজন সম্পাদক একজন লেখক। তখন ভারতীর সম্পাদক নদিদি স্বর্ণকুমারী, আর তার অন্যতম প্রধান লেখক। তখন ভারতীয় সম্পাদক নদিদি স্বর্ণকুমারী, আর তার অন্যতম প্রধান লেখক ছোট ভাই রবীন্দ্রনাথ।
গাজিপুর বেনারসের কাছাকাছি। সেদিন সেখানে যেতে গেলে পাল্টাতে হতো দুটি ট্রেন; তার পরে স্টিমারে গঙ্গা পেরিয়ে তবে গাজিপুর।
তা গাজিপুরে চলেছেন ভ্রাতা-ভগিনীতে। সঙ্গে তাদের আর একজন সঙ্গী আছেন, তার যাত্রা অবশ্য কাশী পর্যন্ত।
রেলপথে হাওড়া থেকে গাজিপুর যাবার বিবরণ পাই স্বর্ণকুমারীর একটি লেখা থেকে। সে-লেখাও রেল এবং রবিকে ঘিরেই। পুরাতন ভারতী পত্রিকার পাতা থেকে কিছু প্রাসঙ্গিক অংশ উদ্ধৃত করি।
‘তিনজনে ত আমরা রাত্রে হাবড়ার মেল ট্রেনে উঠিলাম; একজন কাশীধামে শ^শুরালয়ে যাইবেন, আর আমরা দুই ভাইবোনে গাজিপুরের যাত্রী। রাত্রিটা ত ঘুমাইয়া কাটিল, পরদিন সকালটাও বাহিরের দৃশ্য দেখিতে দেখিতে বেশ একরকম আরামে কাটাইয়া দিলাম; বাকি রহিল কেবল ঘণ্টাকতকের মামলা। ভাবিলাম তাহা কাটাইতে আর কতক্ষণ! কিন্তু তাহার পরেই দেখিলাম দিন যায় তবু ক্ষণ যায় না! যতই বেলা বাড়িতে লাগিল- শ্রাবণের কাঠফাটা রৌদ্রে আমাদের প্রাণ পর্যন্ত যতই ফাটিয়া উঠিতে লাগিল- আর ততই ঐ কথার মর্ম বেশ ভালো করিয়া বুঝিতে লাগিলাম।
এই রৌদ্রে বেলা প্রায় দেড়টায় সময় আমাদের দিলদারনগরে নামিতে হইল, এখানে ট্রেন বদলাইয়া তাড়িঘাটের ট্রেনে উঠিতে হয়। খর রোদে ভাজা ভাজা হইয়া, তপ্ত বালি পায়ে ভাঙ্গিমা আমরা দিলদারনগরের অন্য পাশের গাড়িতে গিয়া উঠিলাম। উঠিয়া শুনিলাম এ ট্রেন আপাতত ছাড়িতেছে না- আধ ঘণ্টা বাদে ছাড়িবে। মনটা বড়ই দমিয়া গেল, বাড়ির কাছাকাছি আসিয়া আধ ঘণ্টা বাদে এইরূপে বন্দী হইয়া থাকিবার মানে-মোদ্দা বুঝিয়া পাইলাম না, বড়ই রাগ ধরিতে লাগিল, কিন্তু কাহার উপর- সেটা ঠিক বলিতে পারি না। সে-সময় গার্ড দু-একবার আমাদের সম্মুখ দিয়া যাতায়াত করিয়াছিল, দু-একজন অপরিচিত লোক দূর হইতে আমাদের গাড়ির দিকে চাহিয়া সেলাম করিয়াছিল, আর কুলিগুলা আমাদের জিনিসপত্র ট্রেনে তুলিয়া দিয়া দ্বিগুণ ভাড়া পাইয়াও বক্সিসের জন্য আবার ঘ্যান ঘ্যান করিতেছিল। ইহার মধ্যে কে যে আমার রাগের পাত্র তাহা স্থির করিতে না পারিয়া আমি অস্থির হইয়া পড়িলাম, কিন্তু যখন দেখিলাম চারিদিকের এই সকল মহামারী ব্যাপারের মধ্যেও আমার ভায়াটি কাপুরুষের মতো অবিচলিতভাবে বসিয়া আছেন, তখন সমস্ত রাগ তাহার উপর দিয়া পড়িল। তাহা হইতে কখনো যে ভারত উদ্ধার হইতে পারিবে না ইহা আমি দিব্য চক্ষে দেখিতে লাগিলাম। রাগে-দুঃখে আমার চোখ দিয়া জল পড়িল না, কিন্তু মুখখানা শুকাইয়া যে আধখানা হইয়া গিয়াছে, সম্মুখে আয়না না থাকাতেও তাহা বুঝিতে পারিলাম। কিন্তু ভ্রাতার এমনি মনুষ্য চরিত্র জ্ঞান- তিনি বুঝিলেন আর এক রকম। তিনি   ভাবিলেন পথশ্রমে আমি বড় অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছি, কথাবার্তায় আমাকে তিনি উত্তেজিত করিবার চেষ্টা করিলেন। ইহার জন্য তাহাকে বিশেষ প্রয়াস পাইতে হইল না, তিনি কথা আরম্ভ করিতেই আমাদের তর্ক উঠিল, আমরা দুজনে একত্র হইলে এরূপ না হইয়া বড় যায় না। তিনি আরম্ভ করিলেন “যদি চাও সুখ, আগে লও দুখ।” সবুরে মেওয়া ফলে, তাহা ভুলিলে দিদিমণি? আমি বলিলাম “যে সুখ চায় সে দুঃখ ভোগ করুক, আমি নির্বাণ মুক্তির ভিখারি।” ক্রমে ঠাট্টা হইতে গম্ভীর তর্ক উঠিল। সুখ দুঃখ মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য কি না, মঙ্গল অমঙ্গল অনন্য-সাপেক্ষ (ধনংড়ষঁঃব) কি না, এই সকল বিচারে আধ ঘণ্টা ছাড়া দেড় ঘণ্টা যে কোথা দিয়া চলিয়া গেল আমরা জানিতেও পারিলাম না। ট্রেন যখন একেবারে তাড়ি-ঘাটে আসিয়া থামিল, তখন আমাদের জ্ঞানোদয় হইল, কিন্তু আমাদের বিচার্য বিষয় সম্বন্ধে তখনো আমরা সমান অজ্ঞান রহিলাম।’
যৌবন-প্রারম্ভে রবীন্দ্রনাথ একবার রেলগাড়ির পরিবর্তে গরুর গাড়িতে চেপে গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে কলকাতা থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত যাবার একটা বড়সড় পরিকল্পনা ছকে ছিলেন। তার এই অভাবনীয় অদ্ভুত প্রস্তাব কেউই অনুমোদন করেননি। কিন্তু সরাসরি আপত্তি করলেন না একমাত্র তার পিতৃদেব দেবেন্দ্রনাথ। রবিকে সস্নেহে বলেছিলেন ‘এ তো খুব ভালো কথা; রেলগাড়িতে ভ্রমণকে কি ভ্রমণ বলে?’ পিতার কাছ থেকে কিছুমাত্র নিষেধ ও বাধা না পেয়েই গরুর গাড়িতে পুত্রের পেশোয়ার যাওয়ার উত্তেজনাটাই মাটি হয়ে গেল। সুতরাং গরুর গাড়ি নয়, রেলগাড়িই রবীন্দ্রের প্রধান ভ্রমণসঙ্গী হয়ে ওঠে বরাবরের জন্য। তবে নদিদির সঙ্গে রেলভ্রমণে তিনি কোনোদিনই খুব স্বস্তি পাননি। পদে পদে কাপুরুষ বলে গঞ্জনা আর কত সহ্য করা যায়! তার চেয়ে বোধহয় ওই গরুর গাড়িই ছিল ভালো।
রবীন্দ্রনাথের এবারের যাত্রা মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথের কাছে সোলাপুরের পথে। সেটা ১৮৮৯-এর ফেব্রুয়ারির গোড়ার দিক। সঙ্গে রয়েছে শিশুকন্যা মাধুরীলতা (বেলা)- বয়স দুই প্লাস, এবং একটি আয়া। এর মাত্র মাস দুই আগে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়েছে। স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর বয়স তখন সবে চৌদ্দ বছর আট মাস। তারই মধ্যে তাকে দিতে হয়েছে দুই সন্তানের জন্ম। প্রথম সন্তান মেয়ের বয়স দু-বছর তিন মাস, আর সদ্যেজাত পুত্রের বয়স তখন সবে দু-মাস কয়েক দিন। এই যে রবীন্দ্রনাথ তার দু-বছরের শিশুটিকে নিয়ে ট্রেনে করে সোলাপুরের পথে যাত্রা করেছেন- এর প্রধান কারণ মনে হয় স্ত্রীকে অদ্ভুত কিছু পরিমাণে বিশ্রাম দিয়ে মায়ের অর্ধেক দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেওয়া। বেলার এই একরত্তি বয়স হলে কী হবে- এর মধ্যে রেলে চড়ার অভিজ্ঞতা তার কম হল? এই দার্জিলিং, এই গাজিপুর, এখন আবার মাকে ছেড়ে বাবার সঙ্গে চলেছে ভারতের পশ্চিম প্রান্তে মেজজেঠুর বাড়িতে সোলাপুরে।
প্রায় মাস চারেক পশ্চিমে কাটিয়ে কবি আবার কলকাতার ট্রেন ধরলেন সঙ্গে কন্যা ও তার সেই আয়াটিকে নিয়ে।
ট্রেন ছাড়বার অল্প পরেই বেলি হাই তুলতে তুলতে আয়ার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। কবি তখন চলন্ত রেলগাড়িতে বসে সংসারের সুখ-দুঃখ নিয়ে চিন্তাস্রোতে মগ্ন হন। ঘুম আসে না। তখন ট্রেনের বাতায়নে বসে আপন মন ভৈরবী সুরে আলাপ শুরু করে দেন। সুগভীর এক গম্ভীর করুণ রাগিণীতে উতল হয়ে ওঠে চার দেওয়ালের কলকাতামুখী ছুটে চলা ঘরখানি।
‘কিন্তু গাড়ির এঞ্জিন এ-সকল বিষয়ে বড়-একটা চিন্তা করে না, সে লোহার রাস্তার উপর দিয়ে এক রোখে চলে যায়, কোন্ লোক কোথায় কী ভাবে যাচ্ছে সে-বিষয়ে তার খেয়াল করবার সময় নেই- সে কেবল গল্ গল্ করে জল খায়, হুস্ হুস্ করে ধোঁয়া ছাড়ে, গাঁ গাঁ করে চিৎকার করে এবং গড়্ গড়্ করে চলে যায়।’
কলকাতায় আসার পথে কল্যাণ স্টেশনে গাড়ি বদল করতে হয়। প্ল্যাটফর্মে বসেই অনেকটা সময় পরবর্তী গাড়ির অপেক্ষায় কাটাটে হল। ‘অবশেষে গাড়ির ঘণ্টা দিলে- দূর থেকে গাড়ির নিদ্রাহীন লালচক্ষু দেখা গেল; ধরনী র্থ র্থ করে কাঁপতে লাগল; স্টেশনের কর্তারা চটিজুতো, ঘুণ্টি-দেওয়া চাপকান এবং টিকির উপরে তক্মা-দেওয়া গোল টুপি নিয়ে নানা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল- বিপুল হাতল্যাণ্ঠন চারদিকে আলো নিক্ষেপ করতে লাগল; খানসামাবর্গ সচকিত হয়ে যে যার জিনিসপত্র আগলে দাঁড়ালে; বেলি ঘুমোতে লাগল; আমার বুক ধড়াস্ ধড়াস্ করতে লাগল।’ এই সময় সঙ্গে নদিদি থাকলে ভাইটিকে আর এক চোট ‘কাপুরুষ’ বলে গঞ্জনা শুনতে হতো। কিন্তু প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢুকলে শুধু কাপুুরুষ কেন, বহু মহাপুরুষকেও উদ্বেগ উৎকণ্ঠা উত্তেজনায় একান্ত অধীর অস্থির চঞ্চল হতে দেখা যায়। তার ওপর সঙ্গে যদি আড়াই বছরের শিশুকন্যা ও একটি আয়া ব্যতীত অপর কেউ না থাকে। ফলে সে-সময় সমস্ত দায়িত্ব ও তৎসহ টেনসন যে শতগুণ বেড়ে যায় তা তো বলাই বাহুল্য।
তার নির্দিষ্ট শ্রেণিকক্ষে ওঠার জন্য রবীন্দ্রনাথ দ্রুত সেই কামরার দিকে হন্হন্েিয় এগোলেন। আয়াকে বললেন- চটপট বেলিকে কোলে নিয়ে আমার সঙ্গে এসো। একদিকে রবীন্দ্রনাথও খালি কামরাটি ধরবার জন্য দ্রুত এগোচ্ছেন, আর একজোড়া মেমসাহেবও তাকে অতিক্রম করে অধিকতর দ্রুততায় সেই খালি কামরাটি দখল করতে উদ্যোগী। রবীন্দ্রনাথ মনে মনে বললেন- তুমি যতই আমাকে ফেলে দৌড়ও না কেন, ওই কামরায় আমি উঠবই। খালি কামরাটির সামনে মেমসাহেবও এসে দাঁড়িয়েছে, কবিও এসে পৌঁছেছেন। রবীন্দ্রনাথ গার্ডকে জিজ্ঞেস করলেন- এটা কি লেডিজ কম্পার্টমেন্ট? ভারতীয় যাত্রীর মুখে এ-কথা শুনে ইংরেজ রমণী বলেন- প্রয়োজন হলে এটা এখনই মেয়েদের জন্য রিজার্ভ করা যায়। গার্ড সে-কথার কোনো উত্তর না দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করলে- আপনি কোথায় যাবেন? এবং যখনই শুনল কলকাতায়, তখনই সসম্ভ্রমে রবীন্দ্রনাথকে বলল- You may get in sir! মেমটি তখনো সেই কামরায় ওঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তার স্বামীটি তাকে বারণ করলে। এমন সময় গার্ড রবীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করল তার লেডি কোথায়? রবীন্দ্রনাথ তখন কিঞ্চিৎ কৌতুক করেই বললেন- না আমার সঙ্গে কোনো লেডি নেই, সঙ্গে একটি maid servant রয়েছে। এ-কথা শুনে মেমসাহেব মুখ ফিরিয়ে হো হো করে হেসে উঠল। ‘এবং সাহেবকে বললে : His maid servant। অর্থাৎ ওই কালো লোকটা যাকে সধরফ maid servant বলছে সে সরমযঃ might be his wife. as well.’ এই সবের সঙ্গে ঝগড়া করার মানুষ রবীন্দ্রনাথ নন। তার উপরে আবার একটি মহিলার সঙ্গে!
রেলগাড়ি যে রবীন্দ্রনাথের সৃজনকর্মেও কতখানি সহায়তা করেছে তার অজস্র প্রমাণ আছে। তার এমন অনেক নাটক উপন্যাস কাব্য-কাহিনি রয়েছে, যার ভাবনার মূল বীজটি চলন্ত ট্রেনেই কবির মনে মধ্যে প্রথম অঙ্কুরিত হয়েছিল। আমরা তো রাতের রেলগাড়িতে রাজর্ষির জন্ম-ইতিহাস আগেই জেনেছি। এখন দেখব দিনের রেলগাড়িতে কেমন করে জন্ম নিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কাব্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা। যে চিত্রাঙ্গদা অর্জুনকে সম্বোধন করে বলেছিল-

‘কোথা গেল
প্রেমের মর্যাদা? কোথায় রহিল পড়ে
নারীর সম্মান? হায়, আমারে করিল
অতিক্রম আমার এ তুচ্ছ দেহখানা,
মৃত্যুহীন অন্তরের এই ছদ্মবেশ
ক্ষণস্থায়ী।’

সেটা ১২৯৬-এর চৈত্র (১৮৯০ মার্চ), অথবা তারও পূর্ববর্তী কোনো এক বসন্ত হতে পারে। কবি রেলগাড়িতে চলেছেন শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতার দিকে। রেললাইনের ধারে ধারে আগাছার জঙ্গল। হলদে বেগনি সাদা রঙের ফুল ফুটেছে অজস্র। দেখতে দেখতে কবির মনে এই ভাবনা এলো যে ‘আর কিছুকাল পরেই রৌদ্র হবে প্রখর, ফুলগুলি তার রঙের মরীচিকা নিয়ে যাবে মিলিয়ে- তখন পল্লীপ্রাঙ্গণে আম ধরবে গাছের ডালে, তরুপ্রকৃতি তার অন্তরের নিগূঢ় রসসঞ্চয়ের স্থায়ী পরিচয় দেবে আপনা অপ্রগল্ভ ফল-সম্ভারে। সেই সঙ্গে কেন জানি হঠাৎ আমার মনে হল সুন্দরী যুবতী যদি অনুভব করে যে সে তার যৌবনের মায়া দিয়ে প্রেমিকের হৃদয় ভুলিয়েছে, তা হলে সে তার সুরূপকেই আপনা সৌভাগ্যের মুখ্য অংশে ভাগ বসাবার অভিযোগে সতিন বলে ধিক্কার দিতে পারে। এ যেন তার বাইরের জিনিস, এ যেন ঋতুরাজ বসন্তের কাছ থেকে পাওয়া বর, ক্ষণিক মোহ-বিস্তারের দ্বারা জৈব উদ্দেশ্য সিদ্ধ করবার জন্যে।’ ছুটে চলা রেলগাড়িতে বসে তখনই এই ভাবনাটি একটি নাট্য-আকারে রূপ দেবার ইচ্ছে জেগেছিল কবির। বসন্ত শেষে বর্ষার প্রারম্ভেই দেখি চিত্রাঙ্গদা লিখতে শুরু করে দিয়েছেন। চিত্রাঙ্গদার প্রথম পরিচ্ছেদ অনঙ্গ-আশ্রম রচনায় কবি তখন নিমগ্ন।
কবি চলেছেন দ্বিতীয়বার বিলেতে। ১৮৯০-এর ৭ সেপ্টেম্বর, ১২৯৭ ভাদ্র ২৩। সকালে ইতালির ব্রিন্দিসি বন্দরে জাহাজ পৌঁছলে কবি ইউরোপের মাটিতে পা দিলেন। সেখান থেকে প্যারিসের পথে যাত্রা করলেন রেলপথে। সকাল সাড়ে এগারোটার সময় মেল ট্রেনে উঠলেন। ৮ সেপ্টেম্বর রাত্রে ট্রেন পাল্টে ভোর তিনটের সময় প্যারিস নামলেন।
এই রেলপথে যাবার সময় গাড়ির দু-ধারের প্রাকৃতিক দৃশ্য কবিকে মুগ্ধ করতে করতে চলে। দুপুরের খাওয়া গাড়িতেই সারা হয়েছে- ডাইনিংকারে। ট্রেনটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বর্ণনা : ‘একটা মস্ত গাড়ি- ডাইনে বাঁয়ে সারি-সারি কতকগুলো মক্মল-মোড়া জোড়া জোড়া মুখোমুখি ছোট ংবধঃং- মাথার উপরে শোবার বন্দোবস্তো লট্কানো, বোধ হয় রাত্তিরে টেনে নিয়ে বিছানা করে দেবে। গাড়িতেই খাবার সেলুন। একটা মাত্র নাবার ঘর আছে বোধ হয়- এত লোকে মিলে হাত মুখ ধোওয়া নাওয়া নিয়ে বোধ হয় কিঞ্চিৎ গোল বাধবে। যা হোক, ট্রেনে চড়ে বসে বেশ নিশ্চিন্ত বোধ হচ্ছে।’
এবারে জানলার পাশে নিজের আসনটিতে এসে বসেছেন আরাম করে। দুদিকের জানলা দিয়েই দু-পাশের দৃশ্যাবলি দেখা যাচ্ছে। কবি কী দেখছেন? দেখছেন চারদিকে শুধু আঙ্গুরের ক্ষেত আর ক্ষেত। বসে বসে আঙ্গুর খেতে খেতে ও দেখতে দেখতে চলেছেন। আঙ্গুরের থোলো কী চমৎকার দেখতে! যেমন দেখতে, তেমনি খেতে, তেমনি সুগন্ধ! রেলওয়ে স্টেশনে এক ইতালীয় যুবতীকে দেখে কবির মনে হয় এই সুন্দরীরা এখানকার আঙ্গুরের মতোই নিটোল সুগোল টস্টসে এবং যৌবনরসে একেবারে যেন পরিপূর্ণ। কিছু দূরে গিয়ে শুরু হয়ে গেল জলপাইয়ের বাগান। তারও পরে এসে গেল বামে চষা মাঠ আর দক্ষিণে সমুদ্র। এবং তারও পরে একদিকে কাননশ্রেণি ও অন্যদিকে পর্বতের মালা। দেখতে-দেখতে চলতে-চলতে কখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে এলো। রাত্রে আবার গাড়ির ভোজনালয়ে গিয়ে ডিনার খাওয়া। এই ডাইনিংকার প্রসঙ্গে কবির বর্ণনাটি উপভোগ্য।
‘রাত্রে আমরা গাড়ির ভোজনশালায় ডিনারে বসেছি, এমন সময় গাড়ি একটা স্টেশনে এসে দাঁড়াল। এক দল নরনারী প্ল্যাটফর্মে ভিড় করে বিশেষ কৌতূহলের সঙ্গে আমাদের ভোজ দেখতে লাগল। তারই মধ্যে গ্যাসের আলোকে দুটি-একটি সুন্দর মেয়ের মুখ দেখা যাচ্ছিল, তাতে করে ভোজনপাত্র থেকে আমাদের সহযাত্রিগণ তাদের প্রতি অনেক টুপি-রুমাল-আন্দোলন, অনেক চুম্বন-সংকেত-প্রেরণ, তারস্বরে অনেক উল্লাসধ্বনি-প্রয়োগ করলে; তারাও গ্রীবা আন্দোলনে, আমাদের প্রত্যভিবাদন করতে লাগল।’
কবি যে ট্রেনে প্যারিসে চলেছেন সেই ট্রেন সরাসরি প্যারিস যায় না- একটু পাশ কাটিয়ে যায়। তাই প্যারিসের একটা নিকটবর্তী স্টেশনে স্পেশাল ট্রেন প্রস্তুত রাখার জন্য টেলিগ্রাফ করা হয়েছিল।
আগেই বলেছি প্যারিসে পৌঁছবার জন্য গভীর রাত্তিরে ট্রেন পাল্টাতে হবে। তা রাত দুটোর সময় রেলের লোকই জাগিয়ে দিলে ভারতীয় যাত্রীকে- গাড়ি বদল করতে হবে। চটপট জিনিসপত্র বেঁধেছেঁদে ট্রেন থেকে নামা ও নতুন ট্রেনে ওঠা। বাইরে প্রচ- শীত। যে ট্রেনটিতে এবার উঠলেন সেটি স্পেশাল ট্রেন। তিনটি ভারতীয় আরোহীর জন্য এই বিশেষ রেলগাড়ির ব্যবস্থা। গাড়িটিতে রয়েছে সর্বসাকুল্যে একটি ইঞ্জিন, একটি ফার্স্ট ক্লাস কামরা ও একটি ব্রেকভ্যান। ভাবতে অবাক লাগে- প্যারিসের পথে একখানি রাতের রেলগাড়ি চলেছে, তাতে রয়েছে একটিমাত্রই যাত্রী-কামরা এবং সেই কামরায় চলেছেন তিন ভারতীয় আরোহী- মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ, বন্ধু লোকেন পালিত ও কবি স্বয়ং। এটি অল্প সময়ের পথ; রাত তিনটের সময় প্যারিসের জলশূন্য বিশাল স্টেশনে ট্রেন এসে পৌঁছে গেল। প্যারিস শহর তখনো রাজপথে দীপশ্রেণি জ¦ালিয়ে গভীর নিদ্রামগ্ন। ট্রেন থেকে নেমে একটা মোটর গাড়ি ভাড়া করে হোটেলে এসে ওঠা গেলেও প্রকৃত রেল-রঙ্গ শুরু হল হোটেলের ঘরে বসেই। সে এক চমকপ্রদ প্রমাদ-প্রহেলিকা।
এবার তবে সেই গল্পটাই শুরু করা যাক।
তখনো তো রাত শেষ হয়নি প্যারিস শহরে। পথের পোশাক-পরিচ্ছদ পরিবর্তন করে যখন কিঞ্চিৎ শয়নের উদ্যোগ চলছে, তখনই আবিষ্কার হল তিনজনের জিনিসপত্রের মধ্যে এসে গেছে অন্য কোনো রেলযাত্রীর একখানি ওভারকোট। সুতরাং যার ওভারকোট, এই প্রচ- শীতলতায় তার কী নিদারুণ করুণ অবস্থা! প্রাপ্ত ওভারকোটটির জন্য সাতসকালেই পুলিশের কাছে গিয়ে খবর দেওয়া হল। যে মানুষটার শীতবস্ত্র তার জন্য কবির অস্থিরতা কাটে না।
‘আমরা তিন জনেই পরস্পরের জিনিস চিনি নে; সুতরাং হাতের কাছে যে-কোনো অপরিচিত বস্তু পাওয়া যায় সেইটেই আমাদের কারও-না-কারও স্থির করে অসংশয়ে সংগ্রহ করে আনি। অবশেষে নিজের নিজের জিনিস পৃথক করে নেবার পর যখন দুটো-চারটে উদ্বৃত্ত সামগ্রী পাওয়া যায়, তখন তা আর পূর্বাধিরীকে ফিরিয়ে দেবার কোনো সুযোগ থাকে না। ওভারকোটটি রেলগাড়ি থেকে আনা হয়েছে; যার কোট সে বেচারা বিশ^স্তচিত্তে গভীর নিদ্রায় মগ্ন। গাড়ি এতক্ষণে সমুদ্রতীরস্থ ক্যালে নগরীর নিকটবর্তী হয়েছে। লোকটি কে এবং সমস্ত ব্রিটিশ রাজ্যের মধ্যে তার ঠিকানা কোথায় আমরা কিছুই জানি নে। মাঝের থেকে তার লম্বা কুর্তি এবং আমাদের পাপের ভার স্কন্ধের উপর বহন করে বেড়াচ্ছি- প্রায়শ্চিত্তের পথ বন্ধ।’
সকালে উঠে নতুন করে জামা-কাপড় পরতে যাওয়ার সময় দেখা গেল লোকেন পালিতের একটি পোর্টম্যান্টো নেই। অর্থাৎ জামা-কাপড়ের চামড়ার বাক্সটি সম্ভবত রেলেই ফেলে আসা হয়েছে। বিকেলে সত্যেন্দ্র ও রবীন্দ্রের ঘরে ফেরার পথে আর-এর ট্রেনবিভ্রাট।
‘আমরা দুই ভাই তো গাড়িতে চড়ে বেশ নিশ্চিন্তে বসে আছি; এমন সময় গাড়ি যখন হ্যামারস্মিথ নামক দূরবর্তী স্টেশনে গিয়ে থামল তখন আমাদের বিশ^স্ত চিত্তে ঈষৎ সংশয়ের সঞ্চার হল। একজনকে জিজ্ঞাসা করাতে সে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলে আমাদের গম্যস্থান যে-দিকে এ-গাড়ির গম্যস্থান সে-দিকে নয়। পুনর্বার তিন-চার স্টেশন ফিরে গিয়ে গাড়ি বদল করা আবশ্যক। তাই করা গেল।
এবং অবশেষে নির্দিষ্ট স্টেশনে এসে অবতরণ।
পরের যে-ওভারকোটটি স্বকৃত কর্মফলে বোঝার মতো দিনের পর দিন সযতেœ বহন করে কাটাতে হচ্ছিল, ন’দিন পর লন্ডনে বসে সেই ওভারকোট রহস্যের উন্মোচর ঘটল। সেই হারিয়ে যাওয়া শীতবস্ত্রের মালিক ইন্ডিয়া আপিস যোগে একখানি পত্র পাঠিয়েছেন। সুতরাং এতদিন পর ওভার কোটখানি যথাস্থানে ফেরত দেবার অবকাশ ঘটল।
ভদ্রলোকের চিটিটি পড়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়া : ‘আমরাই যে তার গাত্রবস্ত্রটি সংগ্রহ করে এনেছি সে বিষয়ে পত্রলেখক নিজের দৃঢ় বিশ^াস প্রকাশ করেছে; তার সঙ্গে ‘ভ্রমণক্রমে’ বলে একটা শব্দ যোগ করে দিয়েছিল, কিন্তু সেটা আমার মনে হল মৌখিক শিষ্টতা মাত্র। একটা সন্তোষের বিষয় এই, যার কম্বল [জাহাজে ভ্রমক্রমে] নিয়েছিলুম এটা তার নয়। ভ্রমক্রমে দুবার একজনের গরম কাপড় নিলে ভ্রম সপ্রমাণ করা কিছু কঠিন হতো।’ ওভারকোট নিয়ে রবীন্দ্রনাথের রসিকতাটুকুও উপভোগ্য।
রেলের লাইন রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসেও জাল বিস্তার করেছে। চোখের বালিতে এই রেলই অন্যভাবে এসেছে বিনোদিনীর জীবনে। উপন্যাসের পঁয়ত্রিশ পরিচ্ছদ। ‘মরণ পর্যন্ত মনে রাখিবার মতো আমাকে একটা কিচু দাও’ বলে আবেগে বিনোদিনী চোখ বুজে তার ওষ্ঠাধর বিহারীর কাছে এগিয়ে দেয়। উত্তরে ক্ষণিক বিহ্বল বিহারী ধীর ধীরে বিনোদিনীর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে অন্য চৌকিতে বসে এবং প্রায়রুদ্ধ কণ্ঠস্বর পরিষ্কার করে নিয়ে বলে ‘আজ রাত্রি একটার সময় একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন আছে!’
কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে অস্ফুটকণ্ঠে বিনোদিনী বলে ‘সেই ট্রেনেই যাইব।’ হ্যাঁ, মধ্যরাত্রির সেই প্যাসেঞ্জার ট্রেনেই বিহারী বিনোদিনীকে দেশে পৌঁছিয়ে দিয়ে আসে। শুধু রবীন্দ্রজীবনেই নয়, রবীন্দ্রসাহিত্যের মানচিত্রেও রেলপথ ও রেলগাড়ির একটা বড় ভূমিকা আছে।
নৌকাডুবিতেও রেলগাড়ির প্রসঙ্গ পাই। উপন্যাসের এক জায়গায় গোয়ালন্দ মেলের উল্লেখ আছে। রেলগাড়িকে যদিও তার নির্দিষ্ট রেলপথের উপর দিয়েই চলতে হয়, কিন্তু মানুষের জীবননাট্যে সে যে কত আকস্মিক বাঁক রচনা করে যায় তার পরিসংখ্যান কে রাখে!
কবির জীবননাট্যেও ইতিমধ্যে অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যু হয়েছে। পাঁচ সন্তানের জনক রবীন্দ্রনাথের তৃতীয় সন্তান রানী এখন নিদারুণ অসুস্থ, ক্ষয়রোগে আক্রান্ত এবং জীবনসংশয়। বয়স মাত্র বারো বছর তিন মাস। বিবাহ হয়েছে যখন বয়স সাড়ে দশ। ১৯০৩-এর মে মাসের গোড়ায় উদ্বিগ্ন পিতা কন্যাকে নিয়ে ডাক্তারের পরামর্শে বায়ু পরিবর্তনের জন্য হাজারিবাগ গিরিডি মধুপুর হয়ে আলমোড়ার উদ্দেশে চলেছেন। একে সঙ্গে অসুস্থ কন্যা, তাতে রেলপথে এবারের যাত্রা ছিল অতিশয় কষ্টদায়ক।
আলমোড়ায় পৌঁছে রেলযাত্রার দুর্ভোগের কথা বিস্তারিতভাবে লিখেছেন গিরিডি-নিবাসী এক ভদ্রলোককে।
‘সুদীর্ঘ পথে বিচিত্ররকমের দুঃখ ভোগ করা গেছে। প্রথমত মধুপুর স্টেশনে যখন পৌঁছিলাম স্টেশনমাস্টার আশ^াস দিলেন বম্বাইমেলের সঙ্গে আমাদের গাড়ি জুড়িতেও পারেন। অবশেষে টেলিগ্রাফ করিয়া জানিলেন এত অল্প সময়ের চেষ্টায় তাহা সম্ভবপর হইবে না।
মোগলসরাই যখন পৌঁছান গেল স্টেশনমাস্টার বলিলেন আমাদের গাড়ি মেলে যাইবে না, প্যাসেঞ্জারে জুড়িয়া দিবেন। আমি বলিলাম, কেন এমন শাস্তি? স্টেশনমাস্টার কহিলেন তিনি কোনো প্রকার টেলিগ্রাফ পান নাই। আপনার গিরিডি স্টেশনের বাঙালি প্রভু, হয়, কোনো কর্মের নয়, নয় তাহাকে কেহই আমল দেয় না- একে ত সেখানেই তিন দিন গাড়ির অপেক্ষায় বসিয়া রহিলাম, তাহার পরে পথে শুনিলাম কেহ কোনো প্রকার খবর পায় নাই। যে সময় বেরিলি পৌঁছিবার কথা তাহার বারো ঘণ্টা পরে পৌঁছিলাম। সেখানে একদিনও অপেক্ষা না করিয়া সেইদিনই কাঠগোদামে আসিতে হইল- সেখানে না পাইলাম থাকিবার জায়গা, না পাইলাম আলমোড়া যাত্রার কুলি- সেই দ্বিপ্রহর রৌদ্রে অনাহারে রেণুকাকে লইয়া এক্কায় চড়িয়া রাণীবাগ নামক এক জায়গায় ডাকবাংলায় গিয়া কোনোমতে অপরাহ্নে আহারাদি করা গেল। যাহা হউক, পথের সমস্ত কষ্ট বর্ণনা করিয়া কি হইবে?’
পথের কষ্ট যাই হোক, কবির আসল লক্ষ্য রেণুকার শরীর কেমন থাকে। অন্য একটি পত্রে কবি লিখেছেন : ‘আলমোড়ায় পৌঁছিলাম। অতি দুর্গম পথ। অনেক কষ্ট দিয়াছে। সৌভাগ্যক্রমে পথে রেণুকা ভালো ছিল।
আলমোড়া থেকে মাস চারেক পর অধিকতর অসুস্থ কন্যাকে নিয়ে কবি কলকাতায় ফিরে আসেন। এবারে রেলগাড়ি সংক্রান্ত বিভ্রাটে কবিকে চূড়ান্ত দুর্ভোগে পড়তে হয়। আলমোড়া থেকে স্ট্রেচারে করে যখন কন্যাকে নিয়ে পায়েচলা পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে কাঠগোদামে এসে পৌঁছিলেন তখন দেখা গেল নির্দিষ্ট ট্রেন তার আগেই নির্ধারিত সময়ে স্টেশন ছেড়ে চলে গেছে। সুতরাং পুনরায় চব্বিশ ঘণ্টার কঠিন প্রতীক্ষা। পাহাড় থেকে নেমে ভাদ্রের গরমে সমতলের কোনো স্টেশনে নির্ধারিত ট্রেন না পেয়ে পরের দিনের জন্য অপেক্ষা করে থাকা, সঙ্গে অসুস্থ কন্যাকে নিয়ে- সে যে কী নিদারুণ কষ্ট তা অনুমান করা যায়। পথশ্রমে রানী আরও পীড়িত, আরও কাতর। কবিও ত্রিশ-বত্রিশ মাইল স্ট্রেচারবাহীদের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়িপথে হাঁটতে হাঁটতে স্বাভাবিকভাবেই নিরতিশয় পরিশ্রান্ত, ক্লান্ত। সেই ক্লান্তি আরও তীব্র হয়ে ওঠে নির্ধারিত ট্রেন ধরতে না পারার জন্য। হায়, একালের মতো সেকালেও রেলগাড়িরা যদি দু-পাঁচ ঘণ্টা লেট্ করে আসত তাহলে কন্যাকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কাঠগোদাম স্টেশনে রাতভর এত কষ্ট সহ্য করতে হতো না। ইংরেজ স্ত্রী-পুরুষ সমস্ত বাংলো দখল করে রেখেছে আগে থেকেই। অনেক সন্ধানে স্টেশনের কাছে এক ধর্মশালায় আশ্রয় পাওয়া গেল। নিচে কাঠের গোদাম, ওপরে মাথা-গোঁজার মতো ছোট্ট একফালি মোকাম। মেয়ের রোগশয্যার পাশে বসে রাত জেগে প্রহর গুনলেন রবীন্দ্রনাথ।
পরের দিন ট্রেন এলো। কন্যাকে নিয়ে ট্রেনে উঠলেন কবি। এবারের যাত্রায় নতুন আর এক বিপদ ঘটে গেল। কোনো এক বড় স্টেশনে কবি নেমেছেন কন্যার দুধের সন্ধানে। গত দুদিন ধরে বেচার রানীর ওপর দিয়ে কম ধক্কল যাচ্ছে! হঠাৎ মনে পড়ল মানিব্যাগটা তো কামরার আসনেই ফেলে এসেছেন। সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এলেন। কিন্তু এসে দেখলেন সেখানে পার্সটা নেই, অদৃশ্য হয়ে গেছে। একই সঙ্গে রাগে ও অসহায়তায় কবি ক্ষুব্ধ ও বিহ্বল হয়ে পড়লেন। এদিকে সঙ্গে গুরুতর অসুস্থ রোগিণী। গাড়ির ঘণ্টা বাজল। ট্রেন ছেড়ে দিল। অশান্ত মন চলন্ত ট্রেনের মধ্যে আরও অস্থির হয়ে ওঠে। তার ‘হঠাৎ মনে হল- আচ্ছা বোকা তো আমি। এরকম করে মনের শান্তি নষ্ট করে লাভ কি, তার চেয়ে মনে করলেই তো পারি টাকাটা যে নিয়েছে সে চুরি করেনি, আমি নিজে ইচ্ছাপূর্বক তাকে ওটা দান করলুম।’ মুহূর্তে এই ভাবনা তার মনের মাঝে শান্তি ফিরিয়ে আনল।
অনেক বছর পরে বড় মেয়ে মাধুরীলতার মৃত্যুর কয়েক দিন আগে রবীন্দ্রনাথ পলাতকা কাব্যের ‘ফাঁকি’ কবিতাটি লিখেছিলেন। বত্রিশ বছর বয়সে মাধুরী বা বেলা ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। অনেকেই মনে করেছেন রোগশয্যায় শায়িতা পলাতকা-বেলার রুদ্ধমনের কথাই ফাঁকি কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু আমার মনে হয় এই কবিতার তাৎক্ষণিক কবির লোকান্তরিতা কন্যা রেণুকার করুণ-মধুর অমলিন স্মৃতি। রেণুকা-রানু-রেনু বা রিনুই কি ফাঁকি কবিতার বিনু নয়? রোগাক্রান্ত শীর্ণকায়া বিনু ডাক্তারের নির্দেশে হাওয়াবদলে চলেছে। ‘এই সুযোগে বিনু এবার চাপল প্রথম রেলের গাড়ি, বিয়ের পরে ছাড়ল প্রথম শ^শুরবাড়ি।’ আলমোড়ায় রানুর সঙ্গে ছিল বাবা, কবিতায় বিনুর সঙ্গে রয়েছে তার বর। শ^শুরবাড়ির গ-ি পেরিয়ে ছুটন্ত রেলগাড়ির কামরায় বরবধূর যেন ‘নতুন করে শুভদৃষ্টি হল।’ ওদিকে ঠাকুরবাড়ির রীতি অনুসারে বিয়ের এক বছর দু’মাস পরে রানী ঋতুমতী হলে তার ‘দ্বিতীয় বিবাহ’ বা ‘ফুলশয্যা’ হয় তার বরের সঙ্গে। বাস্তবে রানীকে গাড়ি ধরতে হয়েছিল আলমোড়া থেকে কাঠগোদামে এসে; কবিতায় বিনুর অবস্থান কাঠগোদামের স্থলে বিলাসপুরে।

‘বিলাসপুরের ইস্টেশনে বদল হবে গাড়ি;
তাড়াতাড়ি
নামতে হল। ছ-ঘণ্টা কাল থামতে হবে যাত্রিশালায়,
মনে হল এ এক বিষম বালাই।
বিনু বললে, “কেন, এ তো বেশ।”
তার মানে আজ নেই যে খুশির শেষ।
পথের বাঁশি পায়ে পায়ে তারে যে আজ করেছে চঞ্চলা,-
আনন্দে তাই এক হল তার পৌঁছনো আর চলা।
যাত্রিশালার দুয়ার খুলে আমায় বলে,
দেখো, দেখো, এক্কাগাড়ি কেমন চলে।’

কাঠগোদামে রানী-বৃত্তান্তেও এক্কাগাড়ির প্রসঙ্গ আমরা পেয়েছি- বাস্তবের ঘটনায় রানী কাঠগোদাম থেকে ট্রেন ধরে ১৯০৩-এর ২৪ আগস্ট, এবং তার মৃত্যু হয় এর মাত্র কয়েকটি দিন পরেই, সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখে। কবিতাতেও দেখি রোগে শীর্ণ অস্থি-জরজর পীড়িত বিনুরও শেষ পর্যন্ত ওই মৃত্যু ঘটল- ‘জীবন-দেউল আঁধার করে নিবল হঠাৎ আলো।’ বিনুরও সে-আলো নিভেছিল তার ওই বিলাসপুরের রেলযাত্রার ক’দিন পরেই। তাই আমাদের মনে হয় পলাতকার বিখ্যাত ‘ফাঁকি’ কবিতাটির রচনার মূলে রয়েছে কাঠগোদাম রেলস্টেশন ও পলাতকা-মধ্যমা কন্যা রেণুকার   বিষাদ-করুণ স্মৃতি।
এবার কবি বিলাত চলেছেন পুত্র ও পুত্রবধূকে সঙ্গে নিয়ে। প্রথমে কলকাতা থেকে রেলযোগে বোম্বাই রওনা হলেন ১৯১২ সালের ২৪ মে। কলকাতা থেকে যাত্রার প্রারম্ভে হাওড়া স্টেশনে কবিকে যে বিদায়-সংবর্ধনা জানান হয় তার বিবরণ পাওয়া যায় পরের দিনের The Bengalee পত্রিকায়।
‘Babu Rabindranath Tagore accompanied by his son babu Rathindranath Tagore left Calcutta on Friday by B.N.Ry. Bombay Mail for Europe... Members of the Tagore Family, his friend and devotees, his Bolpur students and ex-students, with many of the teaching staff saw him off at the station.’
এই যাত্রার কবির আর এক সহযাত্রী হলেন ত্রিপুরার সোমেন্দ্রচন্দ্র দেববর্মা।
বোম্বাই যাবার পথে ট্রেন নাগপুর স্টেশনে দাঁড়ালে কবি সেখান থেকেই এক পত্রে অজিত চক্রবর্তীকে লেখেন, ‘নাগপুরে গাড়ি থেমেছে। গরম যাকে বলে। এখনো তিন ঘণ্টা রবিতাপ সহ্য করতে হবে।’
কবির এবারের রেলযাত্রাপর্বের নানা অন্তরঙ্গ ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় সহযাত্রী সোমেন্দ্রচন্দ্রের স্মৃতিকথায়। দুটি একটি ছবি তুলে আনা যেতে পারে সেই ভা-ার থেকে।
‘স্টেশনে কবিভক্তজনগণ-সমাগমে বিদায় মুহূর্ত মুখর হইয়া উঠিল, পুষ্পমাল্য উপহারের ভারে আমাদের ট্রেনের প্রকোষ্ঠ ভরিয়া উঠিল। আত্মীয়-স্বজনের চক্ষু বিদায়-বেলায় অশ্রুতে আর্দ্র করিয়া বিরাট লৌহদৈত্য নিমেষেই স্বীয় গতির বেগে ধাবিত হইল।... দেখিতে দেখিতে সন্ধ্যায় খড়্গপুর আসিয়া পৌঁছিলাম। লক্ষ্মীস্বরূপিণী শ্রমতী প্রতিমা দেবী তাহার ভা-ার খুলিয়া বসিলেন। রসনার তৃপ্তিকর খাদ্যসামগ্রী নিমেষেই স্বস্থানে। পৌঁছিল এবং আমার উপর কাঁটা চামচ প্রভৃতির শোধনকার্যের ভার পড়িল। দীর্ঘ বিদায়ের যে অবসাদ মনকে স্বভাবত পীড়িত করিয়া তুলিতেছিল, গুরুদেবের হাস্যরসসিক্ত আলাপ এবং বধূ-ঠাকুরাণীর ভা-ারের অবারিত দ্রব্যসম্ভার ক্ষণিকেই সে অবসাদ দূর করিয়া দিয়েছিল। হঠাৎ অসাবধনতাবশতঃ একটা কাঁটা হস্তচ্যুত হইয়া গাড়ির দরজার ভিতর দিয়া বাহিরে পড়িয়া গেল; বধূ-ঠাকুরাণীর নিকট কাঁটা হারানোর জন্য তিরস্কার ভাগ্যে ঘটিল। কারণ সঙ্গে একটি মাত্র কাঁটাই ছিল; সুদীর্ঘ পথে এ কাঁটার অভাবে গুরুদেবের আহারের কষ্ট হইতে পারে, ইহাই তাঁহার অনুযোগের কারণ ছিল। গুরুদেব বলিলেন- বৌমা, এর জন্য দুঃখ ক’রো না, বরং সোমেন্দ্রকে ধন্যবাদ দাও সে আমাদের যাত্রা নিষ্কণ্টক করিল। এমনি সরস গল্পে রেলযাত্রা শেষ হইয়া আমরা বম্বে আসিয়া একটি হোটেলে আশ্রয় লইলাম।’
কবি ফ্রান্স থেকে লন্ডনে এসেছিলেন। ডোভার থেকে রেলযান গ্রহণ করে তিনি লন্ডনে আসেন।
‘ট্রেন-প্রকোষ্ঠে ইংরাজ যাত্রীগণ স্বদেশী সজ্জায় সজ্জিত রবীন্দ্রনাতের প্রতিভাম-িত সৌম্যমূর্তির দিকে সোৎসুক দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল। হঠাৎ একজন ইংরাজ ধূমকেতুর ন্যায় নিকট আসিয়া ভাঙা হিন্দুস্থানীতে অনর্গল বক্তৃতা আরম্ভ করিলেন। বক্তৃতার সারমর্ম এই- “আপনি নিশ্চয় কোন ধর্মপ্রচারে এদেশে আসিয়াছেন,- আপনার চেহারা দেখিয়া মনে হয়, আপনি পাঞ্জাব হইতে আসিতেছেন। পাঞ্জাবীদের আমরা বিশেষ স্নেহের চক্ষে দেখিয়া থাকি। তাহারা রাজভক্ত এবং ভারতীয় সৈন্যের পুষ্টিসাধনে ইংরাজ-রাজকে তাহার বিশেষ সাহায্য করিতেছে। ভারতবাসীদের মধ্যে বাঙ্গালিকে আমি নিতান্ত ঘৃণা করি কারণ তাহারা sedition-এর বীজ ছড়াইয়া ইংরাজ রাজত্বে উৎপাত সৃষ্টি করিতেছে।” কবি নীরবেই এ উৎপাত সহ্য করিতেছিলেন। প্রত্যুত্তরে এই মাত্র বলিলেন- “I have the honour to represent the Bengali Race whom you hate most.” ইংরাজ ভদ্রলোক হতভম্ব হইয়া নিজ আসনে ফিরিয়া গেল।’
কলকাতা থেকে বেরিয়ে বাইশ দিন পর কবি লন্ডনে এসে পৌঁছলেন। ভ্রমণসঙ্গীরা ছাড়া কবির সঙ্গে এবার সবচেয়ে যে মূল্যবান সম্পদটি রয়েছে তা হল তার গীতাঞ্জলির ইংরেজি তর্জমার পা-ুলিপি। সেই পা-ুলিপিই টিউবরেলে যাবার পথে রথীন্দ্রনাথের হাত থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। যে অ্যাটাচিকেসে পা-ুলিপিটি ছিল সেটি ট্রেনযাত্রাপথে সযতেœ সুরক্ষার দায়িত্ব ছিল রথীন্দ্রনাথের হাতেই। গন্তব্যে পৌঁছে ট্রেন থেকে স্টেশনে নামার সময় ব্যসত্তার মধ্যে ওই মহামূল্যবান অ্যাটাচিটাই কবিপুত্র নামাতে ভুলে যান।
রথীন্দ্রনাথ নিজেই সে প্রসঙ্গে বলছেন : ‘মাটির তলায় সুড়ঙ্গ রেলপথে এই আমার প্রথম অভিযান। নূতন অভিজ্ঞতার জন্যই হোক কিংবা অত্যাধিক দায়িত্বভারের জন্যই হোক- আমি নিজের হাতে অতি সন্তপর্ণে বাবার যে অ্যাটাচিকেসটি বহন করে আনছিলাম, টিউব থেকে নামবার মুখে সেইটিই নামাতে ভুলে গেলাম। এই অ্যাটাচির মধ্যেই বাবার ইংরেজি অনুবাদের পা-ুলিপি ও আরও অনেক সব দরকারি কাগজপত্র ছিল।’
যে বইটি একদিন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার সম্মানে ভূষিত হবে তারই পা-ুলিপি রেলের কামরার মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল- রেলগাড়ির ইতিহাসে এর চেয়ে বড় দুর্ঘটনা বুঝি আর নেই। আর সেই ইতিকথার সবচেয়ে বড় স্মরণীয় ঘটনা বুঝি পরের দিন রেলস্টেশন থেকে সেই দুর্মূল্য পা-ুলিপিখানি ফিরে পাওয়া।
‘পরের দিন বাবা যখন রোটেনস্টাইনের বাড়ি যাবেন, অ্যাটাচির খোঁজ পড়ল, আর তখনই বোঝা গেল সেটি টিউবে ফেলে আসা হয়েছে। আমার অবস্থা অনুমেয়; শুকনো মুখে আমি চলে গেলাম টিউব রেলের লস্ট প্রপার্টি অফিসে। সেখানে যেতে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে হারানো ধন ফেরত পাওয়ার পর আমার প্রাণে যে কী গভীর স্বস্তি হয়েছিল- সে আমি কখনো ভুলব না।’ কবিপুত্র এ-কথা পিতৃস্মৃতিতে বলেন।
এখানে বলে নেওয়া যেতে পারে, মূল গীতাঞ্জলির অন্তত ছ’টি গান রবীন্দ্রনাথ কোনো না কোনো রেলপথেই লিখেছিলেন। গানগুলি হল ‘আছে আমার হৃদয় আছে ভরে’- ই.আই.আর.  রেলপথে লেখা ২১ আষাঢ় ১৩১৭, ‘গর্ব করে নিই নে ও নাম’- ই.বি.এস.আর. রেলপথে ২২ আষাঢ় ১৩১৭, ‘সংসারেতে আর-যাহারা আমায় ভালোবাসে’- ই.আই.আর. রেলপথে ২৫ শ্রাবণ ১৩১৭, ‘প্রেমের দূতকে পাঠাবে নাথ করে’- ই.আই.আর. রেলপথে ২৫ শ্রাবণ ১৩১৭, ‘গান গাওয়ালে আমায় তুমি’- ই.আই.আর. রেলপথে ২৫ শ্রাবণ ১৩১৭, ‘মনে করি এইখানে শেষ-’ ই.আই.আর. রেলপথে ২৫ শ্রাবণ ১৩১৭।
ইংল্যান্ডে রবীন্দ্রনাথকে ভিড়েঠাসা রেলপ্রকোষ্ঠে আর-এক মূর্তিতে দেখেছিলেন রেভারেন্ড অ্যান্ডরুজ। সেটা ছিল আগস্ট মাসের ২ তারিখ সকাল। সকালেই ট্রেন। কবি ব্যস্ততার মধ্যে আছেন। সেই সকালেই একটি পত্রে লিখছেন, ‘আজ এখানকার একটি পাড়াগাঁয়ে কিছুদিনের [জন্য] যাচ্ছি।... সকালেই ট্রেন ছাড়বে- এখনো জিনিসপত্র গোছানো হয়নি।’
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে রয়েছেন প্রতিমা দেবী; অ্যান্ডরুজ তাদের নিয়ে চলেছেন ইংল্যান্ডের এক পল্লীগ্রামে দিন কয়েকের জন্যে। গ্রামের নাম বাটারটন। ট্রেনের এই পথে মাঝে একবার গাড়ি পালটাতে হয়। অ্যান্ডরুজের তীক্ষè সতর্ক চোখ সদা-সর্বদা কবির দিকে। উভয় ট্রেনেই যথেষ্ট ভিড়- কোনো রকমে বসার একটু জায়গা পাওয়া গিয়েছিল মাত্র। এই ভিড়, স্থানাভাব, ঠেলাঠেলিতে কবির নিশ্চয় যথেষ্ট অসুবিধা এবং কষ্টও হচ্ছিল। কিন্তু অ্যান্ডরুজ কী লক্ষ্য করলেন?
‘I noticed that all through the long train journey Rabindranath sat, with his eyes closed, wrapt in meditation.’
হাওড়া স্টেশন থেকে বিলেতের পথে বোম্বাই যাত্রা করেছিলেন মে’র চতুর্থ সপ্তাহে। আর ফিরলেন দীর্ঘ এক বছর চার মাস পরে ওই হাওড়া স্টেশনে ১৯১৩-র ২৯ সেপ্টেম্বর। সকাল আটটায় কবির ট্রেন স্টেশনে এসে পৌঁছয়। সেখানে কবি বিপুলভাবে সংবর্ধিত হলেন। ‘On the morning of Monday the 29th September Babu Rabindranath Tagore reached Howrah Station and was accorded a worm welcome by a large number of his countrymen. As the train neared the platform cries of “Bande Matarm’’ were raised, and there was an eager rush towards the compartment in which he was. When Rabindranath alighted he was garlanded successively by Principal Brajendranath Seal, Principal Mahama hopadhyay Satish Chandra Vidyabhushan of the Sanskrit College and the Maharaja Bahadur of Susang; and bouquets of lotuses and roses were presentend to him by Babus Krishna Kumar Mitra, Hirendranath Datta, Nagendranath Basu Prachyavidyamahurnav, and others.’
সেদিন দুপুরের ট্রেনেই কবি শান্তিনিকেতনে ফিরে এলেন। অজয়ের ব্রিজ পেরিয়ে বোলপুর স্টেশনটার জন্য তার বড় ব্যাকুল।
কবি ছিলেন ভ্রমণরসিক মানুষ। এই এখন বোলপুর-শান্তিনিকেতনে, তো পরমুহূর্তে দেখা গেল ট্রেনে চেপে চলেছেন ভারতের দক্ষিণে পশ্চিমে বা উত্তর প্রান্তে। কখনও বা দেশ ছেড়ে বিদেশে। নোবেল পুরস্কার পাবার পর তার ভ্রমণপর্ব বুঝি আরও বেড়ে যায়।
পূজার সময় শরৎকালে আশ্রম বড় সুন্দর ও মনোরম হয়ে ওঠে। প্রিয় আশ্রমের বন্ধন ছেড়ে কোথাও যেতেও মন কেমন করে, আবার ছুটি ও অবকাশের জন্য কোথাও একটু দূরে পাড়ি দেবার জন্যও মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। শরতের সোনাঝরা রোদে শিলং পাহাড় কবিকে আমন্ত্রণ জানায়। সুতরাং আশ্রমের মায়া কাটিয়ে বোলপুর স্টেশনে চলে আসেন হাওড়ায় যাবার ট্রেন ধরতে। হাওড়া থেকে শিলং যাবার ট্রেন পরের দিন বিকেলে। বালিকা মানুকে ভানুসিংহের পত্রাবলীতে কবি লিখেছেন-
‘আমার জ্যোতিষ্ক-মিতাটি আকাশ নইলে বিচরণ করতে পারেন না- তারই নামধারী আমি অবকাশ নইলে টিকতে পারিনে। আমরা যদি কোনো আলো থাকে তবে সেই আলো প্রচুর অবকাশের মধ্যেই প্রকাশ পায়; সেইজন্যেই আমি ছুটির দরবার করি- কেননা, ছুটিতেই আমার যথার্থ কাজ। তাই লোক-সমাগম দেখে আমি আশ্রম ছেড়ে দৌড় দিয়েচি। অথচ এই সময়ই উজ্জ্বল সূর্যের আলোয়, রঙিন মেঘের ঘটায়, ঘাসে ঘাসে মেঠো ফুলের প্রাচুর্যে, হাওয়ায় হাওয়ায় দিকে দিকে কাশ-মঞ্জরির উল্লাস-হাস্য-হিল্লোলে আশ্রম খুব রমণীয় হয়ে উঠেছিল। স্টেশনের দিকে যখন গাড়ি চলেছিল তখন পিছনের দিকে মন টানছিল। কিন্তু স্টেশনে ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজল আর রেলগাড়িটা আমাদের আশ্রমকে যেন টিট্কারি দিয়ে পোঁ করে বাঁশি বাজিয়ে আমাকে টেনে নিয়ে চলে এলো। রাত এগারটায় হাওড়ায় উপস্থিত। এসে শুনি, হাওড়ায় উপস্থিত। এসে শুনি, হাওড়ার ব্রিজ খুলে দিয়েচে। নৌকায় গঙ্গা পার হতে হবে। মালপত্র ঘাড়ে নিয়ে ঘাটে গেলেম। সবে জোয়ার এসেচে- ডিঙ্গি নৌকো ঘাট থেকে একটু তফাতে। একটা মাল্লা এসে আমাকে আড়কোলা করে তুলে নিয়ে চলল। নৌকোর কাছাকাছি এসে আমাকে সুদ্ধ ঝপাস করে পড়ে গেল। গঙ্গামৃত্তিকায় লিপ্ত এবং গঙ্গাজলে আমার সেই ঝোলা-কাপড় নিয়ে সেইখানে জলে কাদায় লুটোপুটি ব্যাপার। গঙ্গাজলে অভিষিক্ত হয়ে নিশীথ রাত্রে বাড়ি এসে পৌঁছানো গেল। গঙ্গীতীরে বাস তবু ইচ্ছে করে বহুকাল গঙ্গাস্নান করিনি- ভীষ্ম-জননী ভাগীরথী সেই রাত্রে তার শোধ তুললেন। আজ বিকেলের গাড়িতে শিলং-পাহাড় যাত্রা করব; আশা করি এবারকার যাত্রাটা গতবারের গঙ্গাযাত্রার মতো হবে না।’
গতবারের মতো না হলেও শিলংযাত্রাও যে খুব মনোরম হয়েছিল- তেমনটা বলা যায় না। কবির রসিকতা : ‘মানলুম না, বৃহস্পতিবারের বারবেলায় কৃষ্ণপ্রতিপদ তিথিতে রেলে চড়ে বসলুম’- যেই তারই মাশুল দিতে হল কবিকে।
রেলভ্রমণকে ঘিরে তার এই রকম কৌতূহলী আর একবার দেখি আর এক শরতে রেলযোগে মাদ্রাজ যাত্রাপথে। রাণুকেই কবি লিখেছিলেন-
‘মাদ্রাজের দিকে যে-দিন যাত্রা করেছিলুম সে-দিন শনিবার এবং সপ্তমী, অন্যান্য অধিকাংশ বিদ্যারই মতো দিনক্ষণের বিদ্যা আমার জানা নেই। বলতে পারিনে আমার যাত্রার সময় লক্ষকোটি যোজন দূরে গ্রহণক্ষেত্রের বিরাট সভায় আমার এই ক্ষুদ্র মাদ্রাজ ভ্রমণ সম্বন্ধে কী রকম আলোচনা হয়েছিল; কিন্তু তার ফলের থেকে বোঝা যাচ্ছে জ্যোতিষ্কম-লীর মধ্যে ঘোরতর মতভেদ হয়েছিল। সেইজন্যে আমার ভ্রমণপথের হাজার মাইলের মধ্যে ছ-শো পর্যন্ত আমি সবেগে সগর্বে এগোতে পেরেছিলুম। কিন্তু বিরুদ্ধ জ্যোতিষ্কের দল কোমর বেঁধে এমনি অ্যাজিটেশন করতে লাগল যে, বাকি চারশো মাইলটুকু আর পেরোতে পারা গেল না। জ্যোতিষ্ক-সভায় কেবলমাত্র আমারই যাত্রা সম্বন্ধেই যে বিচার হয়েছিল তা নয়- বেঙ্গল-নাগপুর রেলোয়ে লাইনের যে ইঞ্জিনটা আমার গাড়ি টেনে নিয়ে যাবে, মঙ্গল, শনি এবং অন্যান্য ঝগড়াটে গ্রহেরা তার সম্বন্ধেও প্রতিকূল মন্তব্য প্রকাশ করেছিল-। ... যে মুহূর্তে হাওড়া স্টেশনে আমার রেলের এঞ্জিন বাঁশি বাজালে, সে-বাঁশির আওয়াজে কত তেজ, কত দর্প। আর রবীন্দ্রনাথ ওরফে ভানুদাদা নামক যে-ব্যক্তি তোরঙ্গ বাক্স ব্যাগ বিছানা গাড়িতে বোঝাই করে তার তক্তর উপড়ে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত হয়ে ইলেকট্রিক পাখার চলচ্চক্রগুঞ্জন-মুখর রথকক্ষে একাধিপত্য বিস্তার করলেন, তারই বা কত আশ^স্ততা। তার পরে কত গড় গড়, খড় খড়, ঝর ঝর, ভোঁ ভোঁ, ঢং ঢং, স্টেশনে স্টেশনে কত হাঁকডাক, হাঁসফাঁস, হন্ হন্, হট্ হট্, আমাদের গাড়ির দক্ষিণে বামে কত মাঠ বাট বন জঙ্গল নদী নালা গ্রাম শহর মন্দির মসজিদ কুটির ইমারত- যেন বাঘে তাড়া করা গরুর পালের মতো ঊর্ধ্বশ^াসে আমাদের বিপরীত দিকে ছুটে পালাতে লাগল। এমনিভাবে চলতে চলতে যখন পিঠাপুরমে পৌঁছতে মাঝে মাঝে কেবল একটা স্টেশন মাত্র আছে, এমন সময় এঞ্জিনটার উপরে নক্ষত্র- সভার অদৃশ্য পেয়াদা তার অদৃশ্য পরোয়ানা হাতে নিয়ে নেমে পড়ল, আর অমনি কোথায় গেল তার চাকার ঘুরনি, তার বাঁশির ডাক, তার দুশোদগার, তার পাথুরে কয়লার ভোজ! পাঁচ মিনিট যায়, দশ মিনিট যায়, বিশ মিনিট যায়, এক ঘণ্টা যায়, স্টেশন থেকে গাড়ি আর নড়েই না। সাড়ে পাঁচটায় পিঠাপুরমে পৌঁছবার কথা কিন্তু সাড়ে ছটা, সাড়ে সাতটা বাজে তবু এমনি সমস্ত স্থির হয়ে রইল যে “চরাচরমিদং সর্বং” যে চঞ্চল, এ কথাটা মিথ্যা বলে বোধ হল। এমন সময় হাঁপাতে হাঁপাতে ধক্ ধক্ ধুক্ ধুক্ করতে করত আর একটা এঞ্জিন এসে হাজির। তার পরে রাত্রি সাড়ে আটটার সময় আমি যখন পিঠাপুরমে রাজবাড়িতে গিয়ে উঠলুম তখন আমার মনের অবস্থাটা দেখি ঠিক সেই এঞ্জিনেরই মতো।... স্পষ্ট বোঝা গেল, দক্ষিণের দিকে সে আর এক পাও বাড়াবে না। মনের সঙ্গে বেঙ্গল-নাগপুরের ইঞ্জিনের একটা মস্ত প্রভেদ এই যে, এঞ্জিন বিগড়ে গেলে আর একটা এঞ্জিন টেলিফোন করে আনিয়ে নেওয়া যায়; কিন্তু মন বিগড়োলে সুবিধামতো আর একটা মন পাই কোথা থেকে। সুতরাং মাদ্রাজ চারশো মাইল দূরে পড়ে রইল আর আমি গতকল্য শনিবার মধ্যাহ্নে সেই হাবড়ায় ফিরে এলুম। যে শনিবার একদা তার কৌতূকহাস্য গোপন করে মাদ্রাজের গাড়িতে চড়িয়ে দিয়েছিল সেই শনিবারই আর একদিন আমাকে হাওড়ায় নামিয়ে দিয়ে তার নিঃশব্দ অট্টহাস্যে আকাশ প্রতপ্ত করে তুললে। এই তো গেল আমার ভ্রমণ-বৃত্তান্ত।’
১৯১৪ সালের পূজাবকাশের পর কবিকে দেখি গয়ায় গিয়েছেন। সেখানে আছেন কবিবন্ধু ব্যারিস্টার গল্পকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। গয়া থেকে দুটি স্টেশনের ব্যবধানে বেলা-স্টেশন। সেখান থেকে বৌদ্ধ আমলের গিরিগুহা দেখতে চলেছেন কবি। রেলগাড়ির মধ্যে লেখালেখির কাজে কবি অভ্যস্ত। ট্রেনের মধ্যে তিনি স্বপ্নও দেখেন কবিতাও লেখেন আবার বইপত্র এডিট ও প্রুফ-সংশোধনও করেন। গয়া থেকে বেলার পথে চলন্ত রেলগাড়িতে বসে লিখলেন গীতালির গীত- ‘পথে পথেই বাসা বাঁধি, মনে ভাবি পথ ফুরালো-’।
ট্রেন থেকে নেমে বেলা-স্টেশনের ওয়েটিংরুমে বসে লিখলেন আর একটি কবিতা। স্টেশন থেকে দ্রষ্টব্য স্থানে যেতে হবে পালকিতে। সেই পালকি তখনো এসে পৌঁছায়নি। প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে ট্রেন চলে গেল যাত্রীদের নামিয়ে, স্টেশন চত্বরে লোকজন ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে এলো, কবি কাগজ কলম বের করে পথে বসেই লিখলেন ‘পথের গান’।

‘পান্থ তুমি, পান্থজনের সখা হে,
পথে চলাই সেই তো তোমায় গাওয়া।
যাত্রাপথের আনন্দ গান যে গাহে
তারি কণ্ঠে তোমার গান গাওয়া।’

ফেরার পথে ট্রেনে রচিত হল আরও একটি পথের গান- ‘পথের সাথী, নমি বারম্বার’।
আচ্ছা, চলন্ত ট্রেনের মধ্যে লেখালেখিতে রবীন্দ্রনাথের হস্তাক্ষরটি কেমন থাকে? রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন তার হাতের লেখাকে সচেতনভাবেই সুন্দর থেকে সুন্দরতর করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন। তার যে কোনো পা-ুলিপির পাতাই উচ্চাঙ্গের ক্যালিগ্রাফির নিদর্শন। চলন্ত ট্রেনের মধ্যে নিত্য ঝাঁকুনিতে হাতের লেখা কখনও কখনও তার মনের মতো হতো না। তাতে তার মন খারাপ হতো।
একবার কানাডা যাবার সময় কলকাতা থেকে বোম্বাইয়ের পথে ট্রেনে নির্মলকুমারীকে যে চিঠি দেন, পরের দিন আর একখান নতুন চিঠি লিখেছিলুম। কিন্তু সে এমন একটা নাড়া-খাওয়া চিঠি, ভূমিকম্পে আগাগোড়া ফাটল-ধরা বাড়ির মতো। তার অক্ষরগুলো অশোকস্তম্ভের প্রাচীন অক্ষরের মতো আকার ধরেছে, পড়িতে নিতে গেলে রাখাল বাঁড়–জ্জের শরণ নিতে হয়। এইজন্যে সেই চিঠিখানার প্রত্যক্ষরীকরণে প্রবৃত্ত হতে হল।’ সৃজন এবং নির্মাণে এমনই খুঁতখুঁতে স্বভাবের মানুষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ; এমনকি চলমান রেলযাত্রাপথেও।
রবিজীবনের প্রথম রেলভ্রমণে মহর্ষি তার বালকপুত্রের মাথা থেকে সেই জরির টুপিখানি স্থানচ্যুত হতে দেননি কিছুতেই। রেলের কামরার মধ্যেও সাজপোশাক সম্বন্ধে দেবেন্দ্রনাথের সতর্ক দৃষ্টি। সবকিছু হতে হবে সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন। কোথাও নিমন্ত্রণে যেতে হলে বাড়িতে ছোট বোনেদের চুল বাঁধার দায়িত্ব পড়ত বড় মেয়ে সৌদামিনীর ওপর। সৌদামিনী দেবী তার ‘পিতৃস্মৃতি’তে লিখেছেন, ‘কেমন চুল বাঁধা হইল এক-একদিন তিনি তাহা নিজে দেখিতেন। তাঁহার পছন্দমতো না হইলে পুনর্বার খুলিয়া ভাল করিয়া বাঁধিতে হইত।’ তা রবীন্দ্রনাথ তো এই পিতারই পুত্র। ভিয়েনা থেকে বুদাপেস্টে চলেছেন রবীন্দ্রনাথ। সঙ্গে প্রশান্তচন্দ্র ও নির্মলকুমারী। স্টেশনে ট্রেন প্রায় পৌঁছবার মুখে। বাইরে প্রচ- শীতের রাত। লর্ড মেয়র নিজে স্টেশনে এসে কবিকে ট্রেন থেকে নামার সময় অভ্যর্থনা করবেন। নির্মলকুমারী বা রানীর মোটা ভারি চামড়ার লংকোটটা কবির মোটেই পছন্দ নয়। ট্রেন থামবার আগের মুহূর্তে কবি সস্নেহে ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘রানী, এ কোটটা খুলে ফ্যালো। স্টেশনে কত লোক আসবে; তাদের সামনে জলহস্তী সেজে আমি কিছুতেই তোমাকে নবতে দেব না।’ অগত্যা কোটটা হাতে নিয়েই ট্রেন থেকে নামতে হল রানীকে। কবিকে স্বাগত জানাতে স্টেশন সেদিন ছিল লোকে লোকারণ্য- সমস্ত শহর যেন ভেঙে পড়েছে এমনই ভিড়। কবি ট্রেন থেকে প্রসন্নচিত্তে নামতে নামতে এক ফাঁকে রানীকে বললেন- ‘দ্যাখো তো কী সুন্দর লাল শাড়ি। উনি এটাকে একেবারে ঢেকে দিয়েছিলেন। আমার তো নিজের দেশ সম্বন্ধে একটা গর্ব আছে।’
যাই হোক আমাদের কথা হচ্ছিল রেলগাড়িতে কবির লেখালেখি প্রসঙ্গে। শুধু কাব্য-কবিতা লেখাই নয়, গান লেখা এবং তাতে সুর দেওয়া এবং সেই সুর অন্যকে শিখিয়ে দেওয়ার কাজও চলে মধ্যরাত্রে রেলগাড়ির কামরায়। যে রেলগাড়িটা ইঞ্জিনসুদ্ধ জাহাজে চড়ে সমুদ্র পার হচ্ছিল তাতে বসেই কবি লিখলেন ‘সে কোন্ পাগল যায়’ গানখানি। এই গান লিখতে লিখতে কবি গানের নতুন সুরটি ট্রেনের কামরাতে বসেই শিখিয়ে দিলেন নির্মলকুমারীকে।
সহযাত্রিণী সেদিনের স্মৃতিকথা লিখেছেন এইভাবে : ‘৮ই সেপ্টেম্বর ১৯২৬] কোপেনহেগেন ছেড়ে ৯ই সকালে হামবুর্গ পৌঁছানো হল। রাত্রে হঠাৎ কোন্ একটা সময় জেগে মনে হল, কই, রেলগাড়ির ঝাঁকুনি বা আওয়াজ তো নেই। তবে কি গাড়ি কোথাও থেমে গেল? জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখি, আমাদের গোটা ট্রেনখানাই জাহাজে চড়ে বলটিক সমুদ্র পার হচ্ছে। আমার মতো এই গ্রাম্য বাঙালি মেয়ের কাছে এটা একেবারে তাজ্জব ব্যাপার। এর আগে শুনিওনি কখনও যে এই রকম করে সমস্ত যাত্রীসুদ্ধ গোটা রেলগাড়িই জাহাজে চড়ে সাগর পাড়ি দেয়।... আরো একটা কথা মনে আছে। সেই রাত্রে রেলের কামরায় কিন্তু জাহাজের ডেকে কবির ‘সে কোন্ পাগল যায়’ গানটা রচনা করা। গুনগুন করে সুর দিচ্ছেন শুনতে পেলাম। আমাদের পাশাপাশি গাড়ি। একটু পরেই ডাক দিয়ে বললেন : এ ঘরে এসে শিগ্গির সুরটা শিখে নাও। নয়ত কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলে হয়ত দেখব, একেবারে ভুলে গিয়েছি। তখন আবার নতুন করে সুর বসাতে হবে। সেই রাত্রেই গানটা রচনা করে সুর বসিয়ে তারপর আমাকে শিখিয়েছিলেন।’
এই নির্মলকুমারীকেই ১৯৩০ সালের ২ মার্চ রেলগাড়িতে চড়ে মাদ্রাজে যাবার পথে চিঠিতে লিখছেন-
‘আজ চলেচি রেলগাড়িতে চড়ে মাদ্রাজের দিকে। একটা ভারী গোছের নীল-মলাটওয়ালা বই এনেছিলুম- সে আর খোলা হল না। জানলার বাইরে আমার দুই চক্ষের অভিসার আর থামে না।... জানলা দিয়ে এই ফাগুনের রৌদ্রে যখন একটি অভাবনীয় মাধুরীর মূর্তি দেখি তখন নিশ্চিত জানি সেটা দেখতে দেখতে মিলিয়ে যাবে। মনকে জিজ্ঞাসা করি এই উপলব্ধিটা কি একেবারেই মায়া। মন তো তা স্বীকার করে না। যা দেখচি সে তো একলা আমারই আনন্দের দেখা নয়- এ তো একজন মানুষের খেয়াল নয় পাগলামি নয়, আমি যে সমস্ত মানুষের হয়ে দেখচি- আমি যাব কিন্তু মানুষ তো একলা আমারই আনন্দের দেখা নয়- এ তো একজন মানুষের খেয়াল নয়, পাগলামি নয়, আমি যে সমস্ত মানুষের হয়ে দেখচি- আমি যাব কিন্তু মানুষ তো যাবে না।... রেলগাড়ির মতো আমাদের প্রত্যেকের জীবন ছুটে চলেচে, কিন্তু তার মধ্যে থেকে যেটুকু পাচ্ছি সে ক্ষণকালীন নয়, সে চিরকালীন।... যারা এতকাল দেখেচে এবং চিরকাল দেখবে তাদেরই দেখাকে সংগ্রহ করে নিয়ে গেলুম- সেই সঙ্গে এই একটা কবিতাও লেখা গেল।’ কবিতার প্রথম দুটি ছত্র :

‘সুনীল সাগরের শ্যামল-কিনারে
দেখেছি পথে যেতে তুলনা-হীনারে।’

এই যে রেলগাড়ির মতো মানুষের জীবন ছুটে চলেছে, কোথাও দাঁড়িয়ে নেই থেমে নেই- সেই ভাবনাটাই কি দ্রোহিদ্রের মৃত্যুর পর কন্যাকে পত্রে লিখেছিলেন? নিজের ছোট ছেলে শীন্দ্রের মৃত্যুশোকের সান্ত¡না কি কবি চলন্ত রেলগাড়ির বাতায়নে বসেই পেয়েছিলেন? কবির স্বীকৃতি তো সেই রকমই।
পুত্রশোককাতর কন্যা মীরাকে সান্ত¡না দিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজের পুত্র-বিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে এনে লিখছেন-
‘শমী যে রাত্রে গেল তার পরের রাত্রে রেলে আসতে আসতে দেখলুম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কোথাও কিছু কম পড়েচে তার লক্ষণ নেই। মন বললে কম পড়েনি- সমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারি মধ্যে। সমস্তর জন্যে আমার কাজও বাকি রইল। যতদিন আছি সেই কাজের ধারা চলতে থাকবে।
শুধু যে রেলগাড়ির জানলা দিয়ে রবীন্দ্রনাথই বিশ^প্রকৃতি ও মানবজীবন দর্শন করছেন তাই নয়, আমরাও বাইরে থেকে সেই জানলার মধ্য দিয়ে রেলপ্রকোষ্ঠে উপবিষ্ট বিশ^কবির ভাবলোকের স্বরূপটিও কিছু-পরিমাণে অনুধাবন করার অবকাশ পাচ্ছি। রেলের কামরায় বসে জীবনদর্শনের কথা বলতে বলতে আবার কোন্ দিন কখন তাই নিয়েই রঙ্গরসিকতায় পৌঁছে যান।
সেবার এক প্রচ- গ্রীষ্মে হাওড়া থেকে ট্রেনে ফিরছিলেন বোলপুরে। রবীন্দ্রনাথের মতো মানুষের পক্ষেও সে গরম সহ্য করা অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। সেটা ১৯৩৬-এর এপ্রিলের মাঝামাঝি। ১৯৩৭-এর মে’র গোড়াতে হাওড়া থেকে আলমোড়া যাবার সময়েও ট্রেনে গরম কাকে বলে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। আগের আমলে গ্রীষ্মে ট্রেনের প্রথম শ্রেণিতে বরফের বড় বড় চাঁই দেবার ব্যবস্থা থাকত। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে কবির সঙ্গী কামরায় বরফ আনানোর জন্য উদ্যোগী হলে কবি তাতে অসম্মতি জানান। কষ্টকে সারাজীবন সহজভাবে মেনে নিতেই তিনি শিখেছেন। বরাবর এই হচ্ছে তার স্বভাব। কিন্তু ট্রেনের কামরায় সেবারের এপ্রিলের গরম এই মহাপুরুষটির পক্ষেও বোধহয় সহ্যের অতীত হয়ে উঠেছিল।
একটি পত্রে সেই রেলযাত্রার বিবরণ-
‘ঘটর ঘটর চলল গাড়ি- প্রত্যেক মুহূর্তে গ্রীষ্মকাতরতায় সুদীর্ঘ হয়ে উঠল। মর্ত্যলোক যে মর্ত্য, কিছুই যে চিরকাল থাকে না তা নিয়ে আমরা হাহুতাশ করে থাকি, কিন্তু কালকেকার রেলযাত্রা যদি অমর্ত্য হতো তা হলে কী হতো সেই কথা ভাবতে ভাবতে ব্যান্ডেল পার হলুম, মগরা ছাড়িয়ে গেল, পেরোলো পান্ডুয়া, তারপর এল নিদ্রাবেশ, সজাগ হযে উঠলুম বর্ধমানে এসে এক গেলাস লেমনেড পান করে অন্তরতাপ কিছু পরিমাণে নিবারণ হল। রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরের অভিমুকে পৌঁছলুম বোলপুরে। ডধৎস ৎবপবঢ়ঃরড়হ যাকে বলে।’ শারীরিক মানসিক যে-কোনো কষ্টকেই এক অদ্ভুত প্রশান্ত চিত্তে সহ্য করে নেবার আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল রবীন্দ্রনাথের।
বয়সে রেলজার্নি কিছু কষ্টকর হয়ে ওঠে। তাছাড়া আর-এক যন্ত্রণা পুল পার হয়ে অন্য প্ল্যাটফর্মে গিয়ে ট্রেন ধরা। অনেক সময়েই আবার দেখা যায় রেল কর্তৃপক্ষ একেবারে শেষ সময়ে প্ল্যাটফর্ম পরিবর্তনের সংবাদ দেয়। তখন মালপত্তর ঝোলাঝুলি নিয়ে ওরে দৌড়ো রে দৌড়ো। বয়স্ক মানুষদের সেই সময় কী কম দুর্ভোগ পোয়াতে হয়! হাঁটুর ব্যথাকে সঙ্গী করে কেমন করে ওভারব্রিজ পেরনো যাবে? যাত্রী একলা থাকলে কোনো কোনো সময় তা হয়ে ওঠে রীতিমতন বিপজ্জনক।
রবীন্দ্রনাথ বর্ধমানে ট্রেন থেকে নেমেছেন। এবারে বোলপুরে যাবার গাড়ি ধরবেন ওখান থেকে। বোলপুরের গাড়ি আসতে তখনো কিছু দেরি। কবি সময় কাটাবার জন্য স্টেশনের খাবার ঘরে বসেছেন।
‘ঠিক সময়েই বর্ধমানে গাড়ি পৌঁছল। স্টেশনে নেমে সময় কাটাবার উপলক্ষে খাবরঘরে ঢুকে টানাপাখার নিচে বসলুম- এক পেয়ালা কফি হুকুম করতে হল- বলা বাহুল্য সেটা অনাবশ্যক ছিল। যখন এল কফি, তখন দেখা গেল সেটা পান করা অনাবশ্যকের চেয়েও মন্দ। দ্বিতীয় গাড়ি আসতে পাঁচ মিনিট বাকি- আরিয়াম এসে বললে আজকের দিনেই বিশেষ কারণে গাড়ি অন্য প্ল্যাটফর্মে ভিড়বে- সাঁকো পার হয়ে যেতে হবে। আমাকে একটা ঝুলিবাহনে কুলিবাহন যোগে লাইন পার করবার ব্যবস্থা করেছিল- আমি এরকম অপ্রচলিত যানাধিষ্ঠিত হয়ে সাধারণের গোচর হতে আপত্তি করলুম। তার পরে সর্বসাধারণের নির্দিষ্ট পথে চলতে গিয়ে দেখলুম, প্রকৃতি সে পথের পথেয় আমার অনেক কমিয়ে দিয়েছেন।
রেল-স্টেশনে খাবার ঘরের গন্ধে একবার সেই কক্ষে ঢুকতে ইচ্ছে করে। কবি তো শুধু কফির অর্ডার দিয়েছিলেন- আর কী কী পাওয়া যায় ওই রিফ্রেশমেন্ট-রুমে? চা কফি থেকে ব্রেকফাস্ট ডিনার সবকিছুই? কীরকম দরদাম ছিল পুরনো দিনের রেলওয়ে স্টেশনের আহার কক্ষে? একশো বছর আগে কলকাতায় ছাপা একটি দুর্লভ রেলওয়ে টাইম-টেবিল থেকে সুকুমার সেই মশাই তার এক চমৎকার হদিস দিয়েছেন। কোনো কোনো বড় স্টেশনে রিফ্রেশমেন্ট-রুম ছিল দুটি করে- প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির যাত্রীদের জন্য পৃথক-পৃথক। শ্রেণিবিভাগ অনুসারে খাদ্যবস্তুর দামেরও পার্থক্য ছিল। যে স্টেশনে কেবল একটিই রিফ্রেশমেন্ট-রুম সেখানে শুধু প্রথম শ্রেণির দামই বর্তাবে। ১৯০১ সালে ছাপা টাইম-টেবিল থেকে খাবারের নাম ও দামের তালিকা দেওয়া হল-

                   রথম শ্রেণি        দ্বিতীয় শ্রেণি
                   টাকা আনা        টাকা আনা
ব্রেকফাস্ট (হট)      ১.১২            ১.০
টিফিন (হট)         ১.৮            ১.০
ডিনার (হট)         ২.৮            ১.৪
সাপার (হট)          ১.৮           ১.০
ব্রেকফাস্ট (কোল্ড)     ১.০           ০.১২
টিফিন (কোল্ড)        ১.০           ০.৮
সাপার (কোল্ড)        ১.০           ০.১২
স্যান্ডউইচেস হ্যাম      ১.০           ১.০
স্যান্ডউইচেস, বীফ অর মাটন ০.১২    ০.১২
মিল্ক (প্রতি সের)      ০.৪            ০.৪
চা এবং কফি (প্রতি কাপ) ০.৪          ০.২
চা ও কফি, রুটি ও মাখন সঙ্গে  ০.৮   ০.৬
চা ও কফি ডিমের সঙ্গে  ০.১২         ০.১০
রুটি ও মাখন চীজ        ০.৮         ০.৮
জ্যামের সঙ্গে রুটি ও মাখন   ০.৪        ০.৪
স্যুপ, এক প্লেট        ০.৮             ০.৮
এক প্লেট রাইস্ ও কারি  ০.১২           ০.৮

শেষ পাঁচ বছর রেলগাড়ি যেন কবির কাব্যে আলাদা এক বাণীশিল্প রূপে দেখা দিয়েছে মনে হয়। রেলগাড়ির কথা, আনুষঙ্গিক স্টেশন প্ল্যাটফর্ম টিকিট গার্ড আরোহী ইত্যাদির কথা বেশি করে এসেছে গোধূলিলগ্নের কাব্য-কবিতায়। শেষ বয়সে ট্রেন তার কবিতায় যেভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে তা লক্ষ্য করে দেখবার মতো। রেলগাড়ি যেন স্টেশনের বাঁধানো প্ল্যাটফর্ম পার হয়ে তার নির্দিষ্ট পথ অতিক্রম করে রবীন্দ্র-কবিতার অন্দরমহরের উঠোনে এসে প্রবেশ করেছে। বাংলা কাব্যসাহিত্যে রেল নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মতো এমন অসামান্য কবিতা একান্তই দুর্লভ। সারাজীবনের রেলভ্রমণের অভিজ্ঞতা, নানা ঘটনা, নানা কাহিনি, জীবনতত্ত্ব, অভিনব শিল্পরূপ লাভ করেছে তার শেষ বয়সের কবিতার পা-ুলিপিতে। এ-প্রসঙ্গে প্রথমেই মনে আসে শ্যামলী কাব্যগ্রন্থের ‘বঞ্চিত’ ও ‘অপরপক্ষ’ এই কবিতা দুটির কথা।
‘বঞ্চিত’ কবিতাটি ট্রেনযাত্রী একটি মেয়ের কাহিনি, আর ‘অপরপক্ষ’ কবিতাটি তার প্রেমিকের কাহিনি- যে হাওড়া স্টেশনে এসেছিল তার প্রেমিকাকে রিসিভ করতে। কলকাতার রাস্তার যানজটে তার স্টেশনে এসে পৌঁছতে হয় অনেক বিলম্ব; নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে এসে দেখে শুধু একটা শূন্য ফাঁকা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।

দাঁড়িয়ে আছে একটা খালি ট্রেন-
যেন আদিকালের প্রকা- সরীসৃপটার কঙ্কাল,
যেন একঘেষে অর্থের গ্রন্থিতে বাঁধা
অমরকোষের একটা লম্বা শব্দাবলী।
নির্বোধের মতো এলেম উঁকি মেরে মেয়ে-গাড়িগুলোতে।
ডাকলেম নাম ধরে,
‘কী জানি’ ছাড়া আর-কোনো কারণ নেই
সেই পাগলামির।
ভগ্ন আশা শূন্য প্ল্যাটফর্ম জুড়ে ভূলুণ্ঠিত।
বেরিয়ে এলুম বাইরে-।

অন্যদিকে মেয়েটি তার প্রেমিকের চিঠি পেয়েই মিলনকামনায় দ্রুতবেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে হাওড়াগামী ট্রেন ধরতে। ‘বঞ্চিত’ কবিতাটি সেই মেয়েটিরই স্বগতোক্তি।
স্টেশনে এসে দেখি গাড়ি আসেই না,
জানি নে কতক্ষণ গেল-
পাঁচ মিনিট, হয়তো বা পঁচিশ মিনিট।

একে তো ট্রেন প্রথমে অনেক দেরিতে এল; তার পরেও চলতে চলতে পথের মাঝে মাঝে গাড়ি দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। ‘শেষে দেখা দিল হাবড়া স্টেশন।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাক্ষাৎ ঘটল না উভয়ের।

আর-একবার পড়লুম পোস্ট্কার্ডখানা-
ভুল করি নি তো।
এখন ফিরতি গাড়ি নেই একটাও।
যদি বা থাকত, তবু কি-
বুকের মধ্যে পাক খেয়ে বেড়াচ্ছে
কত রকমের ‘হয়তো’
সবগুলিই সাংঘাতিক।
বেরিয়ে এসে তাকিয়ে রইলুম ব্রিজটার দিকে।

প্রেমিকের জন্যে হাতে করে যে চন্দ্রমল্লিকাটি সে এনেছিল সেটি সে দিলে ফেলে।
এই অসামান্য কবিতাটি পড়তে পড়তে বারেবারেই আমার মনে কৌতূহল জেগেছে- হাওড়ায় আসার জন্য কোন্ স্টেশন থেকে উঠেছিল মেয়েটি রেলগাড়িতে? বর্ধমান না খড়্ঙ্গপুর, না-কি ব্যান্ডেল অথবা বাগনান? রবীন্দ্রকাব্যের পাঠক হিসেবে বঞ্চিত মেয়েটির প্রতি গভীর মমতায় তার অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হই। শেষে কবির পা-ুলিপির কাটা বর্জিত পাঠের মধ্যে মেয়েটি কোন্ স্টেশন থেকে ট্রেন ধরতে উঠেছিল তার সন্ধানটি পাওয়া যায়। রবীন্দ্রকাব্য থেকে হারিয়ে যাওয়া সেই রেলস্টেশনটির নাম শেওড়াফুলি।
পা-ুলিপিতে রবীন্দ্রনাথ প্রথমে লিখেছিলেন-

সেওড়াফুলি স্টেশনে গিয়ে দেখি
গাড়ি আর আসেই না, আসেই না।

লিখতে লিখতেই ‘সেওড়াফুলি’ কেটে বর্জন করেন এবং ‘গিয়ে’ স্থলে ‘এসে’ করেন। বিশেষ একটি স্টেশনের নাম কেটে দেবার সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তে সেই মেয়েটি সব দেশের সব কালের বঞ্চিত হয়ে কাব্যে উপস্থাপিত হল। তা হোক, তবু শেওড়াফুলি স্টেশন দিয়ে ট্রেন পার হবার সময় রবীন্দ্রকাব্যের ওই কন্যাটির কথা মনে পড়ে।
এই ‘শ্যামলী’ কাব্যেরই আর-একটি কবিতার নাম ‘হঠাৎ-দেখা’। পুরুষের উক্তিতে এই কবিতা, যার প্রথম দুটি ছত্র-

রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা,
ভাবি নি সম্ভব হবে কোনোদিন।

ভাবতে ইচ্ছে হয় ‘বঞ্চিত’ ও ‘অপরপক্ষ’ কবিতার মেয়েটি ও ছেলেটিরই কি এতদিন পর রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা? ইতিমধ্যে মেয়েটির হয়েছে বিবাহ। সে-ই ‘এক সময়ে আঙুল নেড়ে জানালে কাছে আসতে।’

গাড়ির আওয়াজের আড়ালে
বললে মৃদুস্বরে,
“কিছু মনে কোরো না,
সময় কোথা সময় নষ্ট করবার।
আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই;
দূরে যাবে তুমি,
দেখা হবে না আর কোনোদিনই।
তারপরেই বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে সে শুধালে-
“আমাদের গেছে যে দিন
একেবারেই কি গেছে,
কিছুই কি নেই বাকি।”
একটু চুপ করে থেকে তার পরে ছেলেটি বললে-
“রাতের সব তারাই আছে
দিনের আলোর গভীরে।”

মেয়েটি পরের স্টেশনেই নেমে গেল; ছেলেটি চললে একা।
এই যে চলতে চলতে স্টেশন এলে কারোর নেমে যাওয়া, কিংবা কারো একলা আরও পথচলা- এরই মধ্য দিয়ে কবি জীবনের গভীর অন্তর্গূঢ় তত্ত্ব আবিষ্কার করে চলেছেন। তার চিন্তার জগতের সেই ভাবনাটিই বুঝি প্রকাশ পেয়েছে নবজাতক-এর ‘ইস্টেশন’ কবিতায়।
     
সকাল বিকাল ইস্টেশনে আসি,
চেয়ে চেয়ে দেখতে ভালবাসি।
কী দেখছেন স্টেশনে বসে কবি?
ব্যস্ত হয়ে ওরা টিকিট কেনে,
ভাঁটির ট্রেনে কেউ-বা চড়ে
কেউ বা উজান ট্রেনে।

স্টেশন থেকে স্টেশনে রেলগাড়ি ছুটে চলেছে ‘দিনরাত গড়্গড়্ ঘড়্ঘড়্’, আর তারই মধ্যে ‘গাড়িভরা মানুষের ছোটে ঝড়।’ এই ছুটেচলা যাত্রীদের কেউ চলেছে দক্ষিণে কেউ ইত্তরে, কেউ বা আবার পশ্চিমে বা পুবে। নিত্যদিনের এই চলমান ছবি দেখতে দেখতে কবি তারই মধ্যে যেন অন্য কোনো গভীরতর ব্যঞ্জনার ইঙ্গিত দেখেন, ভিন্নতর অর্থ সেখানে খুঁজে পান।

চলচ্ছবির এই যে মূর্তিখানি
মনেতে দেয় আনি
নিত্য-মেলার নিত্য-ভোলার ভাষা-
কেবল যাওয়া-আসা।

এইসব ভাবনাচিন্তারই ফসল হয়ে শেষে দেখা দেয় তার ‘রাতের গাড়ি’, নবজাতক-এর বিখ্যাত সেই কবিতা-

এ প্রাণ, রাতের রেলগাড়ি,
দিল পাড়ি-
কামরায় গাড়িভরা ঘুম,
রজনী নিঝুম।
... ... ...
গাড়ি চলে,
নিমেষ বিরাম নাই আকাশের তলে।
ঘুমের ভিতরে থাকে অচেতনে
কোন্ দূর প্রভাতের প্রত্যাশা নিদ্রিত মনে। রেলগাড়ি এতদিন রবীন্দ্রনাথকে বহন করে নিয়ে গেছে ‘কভু পশ্চিমে কভু পূর্বে- দেশ-বিদেশের চতুর্দিকে। কিন্তু শেষ বয়সে সেই রেলগাড়িই কবির ভাবনার বাহন হয়ে কাব্যরাজ্যের কোন্ অসীমতায় পৌঁছে যায়! সে-গাড়ি তখন বাঁধা-লাইনের ওপর দিয়ে টাইম-টেবিল মেনে চলে না; কবিকল্পনায় সে তখন ভেসে যায় দূর দূরান্তরে, অন্য কোথা অন্য কোনখানে।
যদি কোনো দিন এমন হতো যে রেল আছে অথচ রেল-দুর্ঘটনা নেই তাহলে রেলযাত্রীদের কাছে তার চেয়ে সুখের আর কিছুই ছিল না। রবীন্দ্রনাথের লেখার মধ্যে জাহাজ-দুর্ঘটনার কথা আছে, কিন্তু সেখানে রেল-দুর্ঘটনার কথা নেই। সেটা আমাদের পক্ষে সৌভাগ্যের। আমাদের আকর্ষণ ঘটনায়- দুর্ঘটনায় নয়। আমরা প্রার্থনা করে বলতে পারি আজ থেকে সকলের জন্য রেলযাত্রা হোক সম্পূর্ণ নির্বিঘœ ও দুর্ঘটনামুক্ত; কিন্তু কোনোদিন কেউ যদি বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত রেলগাড়ির ইতিহাস রচনা করে তবে তাকে রেল দুর্ঘটনার ইতিহাসমালাও লিখতে হবে। রেলের সঙ্গে যে রেল দুর্ঘটনাও আছে রবীন্দ্রনাথেরও তা নিশ্চয় অজানা ছিল না। তাই তিনিও চাইতেন যাতে রেল চলাচল করে সম্পূর্ণ বিপন্মুক্ত হয়ে। ট্রেন তার চলার পথে যেন ‘মাতলামি’ না করে, এ-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের সাবধান-বাণী ছিল। খুবই মূল্যবান ছিল সেই সতর্ক-বার্তা। রেলের বহু মারাত্মক দুর্ঘটনার পিছনে যে রেলকর্মীদের ভুলভ্রান্তি ও অসতর্কতাই দায়ী সে-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ শেষ বয়সে একটি ছোট্ট মজাদার খাপছড়া-কবিতা লিখে পরবর্তী প্রজন্মকে একপ্রকার সচেতন ও সাবধান করে দিয়ে গেছেন। কবি তো নিজেই বলে গিয়েছেন ‘সাবধান করে দিতে কবি লেখে পদ্য’। রেলগাড়ির সঙ্গে যিনি যেমনভাবেই জড়িত থাকুন তাদের সব্বার পড়া উচিত এই কবিতা সবটা। ছ’ছত্রের কবিতা- এমন তো কিছু বড় নয়।

গাড়িতে মদের পিপে        ছিল তেরো-চোদ্দো,
এঞ্জিনে জল দিতে        দিল ভুলে মদ্য।
চাকাগুলো ধেয়ে করে        ধানখেত-ধ্বংসন,
বাঁশি ডাকে কেঁদে কেঁদে        ‘কোথা কানু জংশন’-
ট্রেন করে মাতলামি        নেহাত অবোধ্য,
সাবধান করে দিতে        কবি লেখে পদ্য।

লাইন টপকে মাতাল রেল যদি ধানখেতের মধ্যে ঢুকে পড়ে, তাতে যে শুধু ধানখেতই ধ্বংস হয় তা তো নয়, রেলের ভেতরের বাইরের মানুষজনও সেই সঙ্গে বিধ্বংস হয়। দোষ তো ইঞ্জিনের নয়, রেলগাড়িটা যারা চালাচ্ছে, তাদের। যে ভুল করে এটার বদলে ওটা করল তার জন্যেই তো এই দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে এই পদ্যে মদ্য শব্দটির ব্যবহার মনে হয় কবি খুব সচেতনভাবেই করেছেন। কবিতাটি আমাদেরও সচেতনভাবে পড়া দরকার।
দেখতে দেখতে দিন কেমন শেষ হয়ে আসে। এসে গেল বাদলঝরা সেই বিষণœ-শ্রাবণ। বাংলা ৯ শ্রাবণ ১৩৪৮, ১৯৪১ সালের ২৫ জুলাই। অসুস্থ কবিকে অস্ত্রোপাচারের জন্য কলকাতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। পাঁকুড় প্যাসেঞ্জারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে কবির জন্য বিশেষ সেলুনকার। এই সেলুনকারটিকে বলা যায় আধুনিক বিলাসবহুল যেন একটি পূর্ণাঙ্গ একতলা বাসাবাড়ি। রয়েছে চারটি ঘর- দুই শয্যার একটি শয়নকক্ষ, একটি ড্রয়িংরুম, একটি খাবারঘর ও একটি কিচেন। তাছাড়া আছে দুটি স্নানের ঘর ও ভৃত্যদের ঘর। তখনো সেলুনকারের মধ্যে এয়ারকন্ডিশনের ব্যবস্থা হয়নি। প্রতিটি ঘরের জন্য ছিল দুটি করে ফ্যান। এই সেলুনকারটি আগের সন্ধ্যাতেই বোলপুর স্টেশনে নিয়ে আসা হয়েছে। সাইডিংয়ে রাখা হয়েছে সেটি। সকালে সেখানেই কবিকে এনে তোলা হয়। তারপর বগিটি মূল লাইনে নিয়ে এসে যাত্রীগাড়ির সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়।
কয়েক দিন ধরেই চলছে তার জ¦র। কখনও ৯৯ ডিগ্রি কখনও ১০০ ডিগ্রি কখনও ১০১ ডিগ্রি। খাওয়া-দাওয়া একেবারেই কমে গিয়েছে। শরীর শেষে এমনই দুর্বল হয়ে পড়ে যে চলা বা দাঁড়াবার ক্ষমতাও প্রায় হারিয়ে ফেলেন। বিধান রায়রা শান্তিনিকেতনে এসে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত করে যান। কবিকেও শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তেই সম্মতি জানাতে হয়। বোলপুর থেকে সকালে ট্রেনে কবি রওনা হবেন কলকাতায়। তাই ভোর চারটের মধ্যেই যাত্রার জন্য কবি সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে নিয়ে পুবের জানালায় এসে বসেছেন। শান্তিনিকেতন-আশ্রম চোখের জলে কবিকে বিদায় জানাল। অতিশয় সুব্যবস্থাযুক্ত সুদৃশ্য ও সুসজ্জিত সেলুনকারে কবিকে সবাই মিলে ধরে তুললেন। ট্রেনের কামরায় রইলেন কন্যা মীরা দেবী, নাতনী নন্দিতা এবং নির্মলকুমারী। স্টেশনে ঘণ্টা বাজল ঢংঢং করে গাড়ি ছাড়লাম। ইঞ্জিন আকাশে একরাশ কালো ধোঁয়া উড়িয়ে বাঁশি বাজিয়ে বোলপুরকে বিদায় জানিয়ে তার আপন ছন্দে গন্তব্যের পথে যাত্রা করলে। কোন্ ট্রেনে কবি কলকাতায় ফিরছেন তা কবির স্বাস্থ্যের কারণেই সর্বসাধারণের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল। এর কারণ মাস দশেক আগের একটি অভিজ্ঞতা। সেটা ছিল ১৯৪০-এর ২৮ জুলাই। অসুস্থ অচৈতন্য কবিকে কালিম্পং থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। কবির অসুস্থতার সংবাদ মিডিয়ার মাধ্যমে চারিদিকে প্রচারিত। শিলিগুড়ি স্টেশনে যখন কবিকে নিয়ে আসা হল তখন স্টেশন একেবারে লোকে লোকারণ্য। তাকে আনার জন্য ট্রেনের একাধিক কামরা রিজার্ভ করা হয়েছিল। শিলিগুড়ি থেকে হাওড়ার পথে প্রতিটি স্টেশনেই ছিল উৎকণ্ঠিত দর্শনার্থীদের বাঁধভাঙা ভিড়। সকলেই কামরার দরজার কাছে এসে জানতে চায় কবি কেমন আছেন? দর্শনার্থীরা রেলিংয়ের ওপর চড়ে কবি যে কামরায় আছেন তার ভেতর দেখতে চেষ্টা করেন। সে এক সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা অবস্থা। সেই অবস্থার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেজন্য এবার কবির হাওড়া স্টেমনে পৌঁছনোর সংবাদ কাউকে জানান হয়নি। সকলেরই একই লক্ষ্য, কবি যাতে নিরাপদে নির্বিঘেœ কলকাতায় এসে পৌঁছতে পারেন। সেলুনের মধ্যে রেল কর্তৃপক্ষ যতই সুব্যবস্থা রাখুন গ্রীষ্মের এই দুপুরে গরমের উত্তাপ সহ্য করা অসুস্থ শরীরে সহজ ছিল না। বোলপুর থেকে হাওড়া আসতে ট্রেনে পৌনে সাত ঘণ্টা সময় লেগেছিল। অসুস্থ শরীর দুপুরের তাপে আরও দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ২টা ৪০ মিনিটে ট্রেন এসে হাওড়ায় পৌঁছয়। ভাবতে অবাক লাগে শেষ যে-পথে ফিরলেন বোলপুর থেকে কলকাতায়, সেই একই পথে জীবনের প্রথম রেলগাড়িতে চড়ে বাবার সঙ্গে তার বোলপুরে যাওয়া।

ঢং ঢং বেজে ওঠে ঘণ্টা,
এসে পড়ে বিদায়ের ক্ষণটা।
মুখ রাখে জানলায় বাড়িয়ে,
নিমেষেই নিয়ে যায় ছাড়িয়ে।

সেলুনকার থেকে স্ট্রেচারে করে নামান হয় কবিকে। এই তার শেষ রেলভ্রমণ। ‘যাওয়া-আসার ইস্টেশন’ থেকে এই তার শেষ বিদায়গ্রহণ। হাওড়া স্টেশন থেকে তাকে নিয়ে মোটরগাড়ি বেরিয়ে যায় জোড়াসাঁকোর দিকে।

‘গেল গেল’ বলে যারা
ফুকরে কেঁদে ওঠে
ক্ষণেক-পরে কান্না-সমেত
তারাই পিছে ছোটে।

স্টেশনে দাঁড়িয়ে সেদিন কেউ কি ভাবতে পেরেছিল চিরবিদায়ের ক্ষণটি আসতে আর বেশি দেরি নেই!
তবুও বলি, রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে ‘বিদায়’ কথাটি কিছুতেই যেন মানায় না। কারণ রেলগাড়ির কামরায় বসে তিনিই না বলেছিলেন- ‘রেলগাড়ির মতো আমাদের প্রত্যেকের জীবন ছুটে চলেছে, কিন্তু তার মধ্যে থেকে যেটুকু পাচ্চি সে ক্ষণকালীন নয়, সে চিরকালীন।’ রেলের কামরায় বসে যারা এতকাল ধরে জগতের শোভা ও সৌন্দর্য দেখে এসেছে, কবি যে শুধু তাদের দেখাকেই সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন তা তো নয়, সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে চিরকাল ধরে যারা দেখবে তাদের দেখাকেও তিনি সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়েছেন। তাই কবির অবর্তমানেও চলন্ত রেলগাড়ির কামরায় আমাদের দৃষ্টির সঙ্গে তার দেখার একটা মিল নিশ্চয় আমাদের উভয়ের মধ্যে বিরামহীন একটি সম্পর্কের নৈকট্য যে শুধু আজ নয় চিরকালের জন্য রচনা করে চলবে আমাদের প্রতিদিনের রেলযাত্রায় ও রেলভ্রমণে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ২৫ জুলাই ২০১৯

  • ১১ জুলাই ২০১৯

  • ২৭ জুন ২০১৯

  • ২০ জুন ২০১৯