কবি বুলান্দ জাভীরের প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘গদ্যগুচ্ছ’

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৯, ১৩:০৯

রেজা ফারুক

 

কবিতা যদি হয় নৌকোর প্রতিরূপ- তথা রূপোঝুরি নদীর তরঙ্গায়িত জলস্রোতের গুঞ্জরনের অনবদ্য স্ফুরণ। পক্ষান্তরে গদ্য হলো শাটল্ ট্রেন। হিস্হিস্ কয়লার ধোঁয়া ওঠা এই শাটল্ ট্রেনের শান্টিঙের মতো গদ্য প্রস্ফুটিত হয় মনোজগতের দীর্ঘ রানওয়েতে। আর ওই রাওয়েতে অঝোর বর্ষণের নিঃস্বনে একেকটি গদ্যগাঁথা- একেকটি লালটালির স্টেশন ঘরের ছাউনির নিচে প্রতীক্ষমান তার প্রতীক কাঠের বেঞ্চিতে হেলান দিয়ে বসে থাকা কোনো নির্জন বিকেলের মতো গদ্যের আপ্ কিংবা ডাউন ট্রেনের টুটাফাটা ছায়া যার রয়েছে অনর্গল গদ্যবীথি।
গদ্যের রয়েছে নানারূপ, আঙ্গিক ও প্রকরণ। একজন প্রথাগত গদ্যশিল্পীর হাত গদ্যের অবয়বে যে নীল গাউন জড়িয়ে দেয়। একজন কবির গদ্যে এর অন্যরূপ প্রদর্শিত হয় অনিবার্যতার নিরিখে। প্রচলিত গদ্যের মর্মে-মর্মে একজন কবি অনন্য সুন্দর ভঙ্গিতে, তার রচনার ভাবার্থকে জড়িপার, নীলাম্বরী, জর্জেটের মিহি সাইরেন বাজিয়ে যায় ভোরের কুচি তোলা শিশিরের মতো। আর সে রূপটাই বিশাল ক্যানভাসে কখনও রোদ, কখনও জ্যোৎস্না, কখনও রৌদ্রের রংপেন্সিলে এঁকেছেন কবি বুলান্দ জাভীর।
আশির দশকের প্রধানসারির কবি বুলান্দ জাভীরের সদ্য প্রকাশিত প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘গদ্যগুচ্ছ’ তেমনই এক সদ্য প্রকাশিত প্রবন্ধ গ্রন্থ। যে গ্রন্থে ঠাঁই পেয়েছে দেশি-বিদেশি আটজন মনিষীর রচনার ওপর বিশ্লেষণাত্মক অভিব্যক্তি। এই অভিব্যক্তি একান্তই কবি বুলান্দ জাভীরের ব্যক্তিগত।
বুলান্দ জাভীর দীর্ঘ তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে তার সৃষ্টিমুখর সময়ে কাব্য চর্চ্চার পাশাপাশি গদ্য লিখেও সুধিজনের কাছে বিশেষ স্মরণযোগ্য গদ্য শিল্পীর প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন। তার দীর্ঘ কবিতার জার্নিরওয়েতে দাঁড়িয়ে তিনি দেখেছেন তারই অগ্রজ লেখকদের মনোভঙ্গি। যা তাকে আকৃষ্ট করেছে। অনুপ্রাণিত করেছে। ভালোলাগার স্পন্দনে স্পন্দিত করেছে। যার প্রকাশ এই প্রবন্ধমালা। যাদেরকে নিয়ে কবি বুলান্দ জাভীর তার গদ্য রচনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। তারা এই উত্তর আধুনিকতার প্রায় পাঁচ দর্শকের পূর্ব সমাজ-ভাবনায় আপ্লুত থেকেও যে পরম আধুনিক কনসেপ্ট নিজেদের মধ্যে ধারণ করতেন। সেই ভাবনাবোধের গহিনে নেমে গিয়ে বুলান্দ জাভীর খুঁজে আনার চেষ্টা করেছেন আকণ্ঠ কুশলতার মনোহর রাঙা মার্বেল। আলোচ্য গদ্য গ্রন্থে মৌলিক প্রবন্ধের সঙ্গে ৩টি অনুদিত গদ্যও উঠে এসেছে চমৎকার বয়ানে।
আর এখানেই কবি বুলান্দ জাভীর অন্য জগতের সঙ্গে পার্থক্যকে ‘ইন্ট্রিডিউস্’ করিয়ে দিয়েছেন। সব থেকে মজার বিষয় হলো- কবির হাতের গদ্যে যে বৃষ্টির রিদম্ ওঠে বেজে স্ববৈশিষ্ট্যে। বুলান্দ জাভীরের গদ্য তারই প্রতিরূপ। তার মেদহীন গদ্যের ঝাউবনে তাই রোজ ভোরবেলা কার পাতা ঝরার মিহিন শব্দ যায় বেজে।
কখনও কখনও খুব সেজেগুঁজে জ্যোৎস্নাঙ্কিত সন্ধ্যার মতো বুলান্দ জাভীরের গদ্যের পঙ্ক্তিরা নির্জন বাড়ির ছাদে এসে রেলিংয়ে ভর দিয়ে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে দ্যাখে দিগন্তের দূরতম তারাদের নীল কার্নিভাল। আর টাল্ খাওয়া মেঘের কহ্লারগুলো কী এক মায়াবি আমেজে ওটে ফুটে। কবি বুলান্দ জাভীর তার কাব্য রচনায় যেমন শিল্পমনস্ক থাকেন অনবরত। একইভাবে তার গদ্যের উদ্যানেও অবচেতনের কাঠগোলাপের গন্ধ যায় ছাড়িয়ে। আর যায় ঝরিয়ে ইল্শেগুঁড়ি বৃষ্টির দুপুর। সর্বোপরি কবি বুলান্দ জাভীরের গদ্যের মেঘ শিরিষের মাঠের হাওয়া- পাঠকের হাওয়াই শার্টের বুকপকেটে রুমালের মতো ভাঁজ হয়ে থাকে জেগে। এমনই বুলান্দ জাভীরের গদ্যশৈলী।
সদ্য প্রকাশিত কবি বুলান্দ জাভীরের প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘গদ্যগুচ্ছ’-এর প্রবন্ধবীথি গুঞ্জরিত ফ্ল্যাটের ডোরবেলে যখনই পাঠক রাখবে তার বিনম্র আঙ্গুলের ছোঁয়া। বোধকরি তখন ফ্ল্যাটের অন্দরমহল থেকে ভেসে আসবে মেলোডিয়াস সিম্ফনির এক নিবিড় অনুরণন।
কবি বুলান্দ জাভীরের প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘গদ্যগুচ্ছ’ প্রকাশ করেছে খেয়া।
প্রকাশকাল জুন-২০১৯। অসম্ভব সুন্দর-চাররঙা প্রচ্ছদ এঁকেছেন- প্রচ্ছদশিল্পী-মোস্তাফিজ কারিগর। মূল্য : ২০০ টাকা।

লেখক : কবি, সম্পাদক : বিনোদনপ্রহর, সারাপ্রহর

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ আগস্ট ২০১৯

  • ০৮ আগস্ট ২০১৯