রেলভ্রমণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০১৯, ১৬:৫৬

অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য

 

যে কবি কাব্যমধ্যে নিঃসংশয়ে ঘোষণা করেন- ‘এ প্রাণ রাতের রেলগাড়ি’, তার সমগ্র জীবনে তার সমগ্র সাহিত্যে রেলভ্রমণ ও রেলগাড়ির ভূমিকা যে কী বিস্ময়কর আসামান্যতা লাভ করতে পারে তা অনুসন্ধান না করলে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এই ভ্রমণরসিক বিশ^যাত্রী মানুষটি সারাজীবনে দেশ ও বিদেশ মিলিয়ে কত অযুত লক্ষ নিযুত মাইল যে রেলভ্রমণ করেছেন তা আজ পরিমাপ করা হয়তো সম্ভব নয়; কিন্তু সেই ভ্রমণ, দিনের ও রাতের সেই রেলযাত্রা যে তার মনের পটে রং-বেরঙের কত অজস্র ছবি এঁকে দিয়ে গেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সুখে-দুঃখে উচ্ছ্বাস-বেদনা-রঙ্গে সে-এক স্বতন্ত্র উপাখ্যান- তার চলমান জীবনের এক চমকপ্রদ ইতিবৃত্ত।
বিস্ময়ের কথা, তার আশি বছরের দীর্ঘ জীবনে আটষট্টি বছরব্যাপী তিনি রেলগাড়িতে চড়েছেন- তার মধ্যে তার প্রথম রেলভ্রমণ যে পথে গমন, তার জীবনের অন্তিমলগ্নে শেষ রেলযাত্রা সেই একই পথে প্রত্যাবর্তন। রেলগাড়িতে চেপে তার প্রথম যাওয়া হাওড়া স্টেশন থেকে বোলপুরে; সেদিন তিনি ছিলেন নিতান্ত বালক, হাফ টিকিটের যাত্রী- বয়স তখন সবে ১১ বছর ৯ মাস। আর রেলগাড়িতে চড়ে তার জীবনের শেষতম যাত্রা ওই বোলপুর স্টেশন থেকে হাওড়া স্টেশনে ফেরা- উৎকণ্ঠিত চিকিৎসকেরা অসুস্থ কবিকে শান্তনিকেতন থেকে কলকাতায় নিয়ে এলেন চিকিৎসার জন্য- বয়স তখন তার ঠিক ৮০ বছর দু-মাস। প্রথম রেলভ্রমণে বালক রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তার পিতার সঙ্গী। সেদিনটা ছিল ১৮৭৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, ৪ ফাল্গুন ১২৭৯, শুক্রবার। আর শেষ যেদিন বোলপুর থেকে হাওড়া স্টেশনে এলেন ইস্ট ইন্ডিয়া রেলের বিশেষ সেলুনকারে চেপে, সেদিনটাও ছিল ওই শুক্রবার, তারিখটা ছিল ২৫ জুলাই ১৯৪১, ৯ শ্রাবণ ১৩৪৮। কিন্তু শেষযাত্রার কথা শেষ পর্বেই বলা যাবে’খন, এখন কেন?
আমাদের দেশে রেলব্যবস্থার পত্তন প্রথম হয় বোম্বাইতে ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে, তার পরে হয় হাওড়ায় ১৮৫৪-তে, আর মাদ্রাজে তার পত্তন হয় ১৮৫৬ সালে। হাওড়া থেকে ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে কোম্পানি প্রথম প্যাসেঞ্জার গাড়ি চালান ১৮৫৪ সালের ১১ আগস্ট। গাড়ি হাওড়া থেকে চুঁচুড়া পর্যন্ত গিয়েছিল। এ-দিনটা ছিল ট্রায়াল রান বা পরীক্ষামূলক যাত্রা। হাওড়া ছাড়ে সকাল সাড়ে ৮টায়। বালি শ্রীরামপুর চন্দননগর পেরিয়ে হুগলি (চুঁচুড়া) পৌঁছায় ১০টা ১ মিনিটে। হাওড়া-হুগলির মধ্যে নিয়মিত ট্রেন চলাচল শুরু হয় ১৫ আগস্ট থেকে। প্রথম পর্যায়ে এই পথে দিনে মাত্র দুটি করে ট্রেনের আসা-যাওয়া ছিল। তার পরে রেল তার যাত্রাপথ বাড়াতে থাকে। ক্রমে লাইন এগিয়ে আসে বর্ধমান পর্যন্ত; তার পরে দ্রুতগামী ইঞ্জিনের মতো রেলের লাইনও দেশের বুকে ছড়িতে পড়তে থাকে ক্রমে ক্রমে। এক বছরের মধ্যেই রেলের রাস্তা পৌঁছে যায় হাওড়া থেকে রানিগঞ্জ। পরে খানাকে জংশন করে উত্তরবঙ্গের পথেও রেললাইন পাতা হয়।
দেখা যাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ তার বালক বয়সে প্রথম যখন রেলগাড়িতে চড়েছিলেন, তার মাত্র বছর ২০ আগে রেলগাড়ির পত্তন হয়েছিল আমাদের দেশের মাটিতে। রেলপথের যাত্রায় দেশের মানুষ তখনও সহজ অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। তাই সেই আমলে রেলগাড়িতে প্রথম চড়াটা ছিল সকলের কাছেই একটা বিরাট ঘটনা, একটা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। একদিকে যখন দেশের সাধারণ মানুষ এই রেলগাড়ি চলা ও চড়াকে এক ভীতিশঙ্কা মিশ্রিত বিস্ময় বলে বাধ করছে- যা রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল; অন্যদিকে ঠিক তখনই মাসিক বঙ্গদর্শনের পাতায় কমলাকান্তের দপ্তরে ব্যঙ্গত্মক রচনায় বঙ্কিমচন্দ্র   লিখেছেন, “ইংরেজি শাসন, ইংরেজি সভ্যতা ও ইংরেজি শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে মেটিরিয়েল্ প্রস্পেরিটির (বাহ্য সম্পদ) উপর অনুরাগ আসিয়া দেশ উৎসন্ন দিতে আরম্ভ করিয়াছে।... দেখ কত বাণিজ্য বাড়িতেছে- দেখ কেমন রেইলওয়েতে হিন্দুভূমি জালনিবন্দ হইয়া উঠিল- দেখিতেছ, টেলিগ্রাফ কেমন বস্তু! দেখিতেছি, কিন্তু কমলাকান্তের জিজ্ঞাসা এই যে, তোমার রেইলওয়ে টেলিগ্রাফে আমার কতটুকু মনের সুখ বাড়িবে? আমার এই হারানো মন খুঁজিয়া আনিয়া দিতে পারিবে?... না পারে, তবে তোমার রেইলওয়ে টেলিগ্রাফ প্রভৃতি উপাড়িয়া জলে ফেলিয়া দাও- কমলাকান্ত শর্মা তাতে ক্ষতি বিবেচনা করিবেন না।” বঙ্কিমের লেখা থেকে এই অংশ উদ্ধৃত করলাম এই জন্যে যে এদেশে রেল পত্তনের গোড়ার যুগে বালক থেকে বুদ্ধিজীবী সকলের চোখেই তা এক গভীর কৌতূহল বিস্ময় ও সংশয়ের কারণ হয়ে উঠেছিল।
সদ্য রেলভ্রমণের অভিজ্ঞতালব্ধ ভাগ্নে সত্যপ্রসাদ তার রবিমামাকে বলেছিল, “বিশেষ দক্ষতা না থাকিলে রেলগাড়িতে চড়া এক ভয়ঙ্কর সংকট। পা ফসকাইয়া গেলেই আর রক্ষা নাই। তারপর, গাড়ি যখন চলিতে আরম্ভ করে তখন শরীরের সমস্ত শক্তিকে আশ্রয় করিয়া খুব জোর করিয়া বসা চাই, নহিলে এমন ভয়ঙ্কর ধাক্কা দেয় যে মানুষ কে কোথায় ছিটকাইয়া পড়ে তাহার ঠিকানা পাওয়া যায় না।”
এ-রকম ভয়ঙ্কর সব সংবাদ মাথায় নিয়েই প্রথম রেলগাড়িতে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে পিতার সঙ্গে কিঞ্চিৎ শঙ্কিত চিত্তে রবীন্দ্রনাথের হাওড়া স্টেশনে প্রবেশ।
শুধুই কি ‘সত্য’-বচন, রবীন্দ্রনাথের মতো পড়–য়া বালক হয়তো প্রথম রেলযাত্রার পূর্বেই অক্ষয়কুমার দত্তের লেখা ‘বাষ্পীয় রথারোহীদিগের প্রতি উপদেশ’ অর্থাৎ “যাঁহারা কলের গাড়ী আরোহণ করিয়া গমন করেন, তাঁহাদের তৎ-সংক্রান্ত বিঘœ নিবারণের উপায় প্রদর্শন’ বইটি পড়ে নিয়ে থাকবেন। বইটি ‘তত্ত্ববোধিনী সভার যন্ত্রালয়ে মুদ্রিত’ হয়েছিল ১৭৭৬ শতাব্দের মাঘ মাসে, অর্থাৎ ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে। ইংরেজিতে এই বইয়ের পরিচয় ছিল ‘উরৎবপঃরড়হং ভড়ৎ ধ জধরষধিু-ঞৎধাবষষবৎ’। এটি ছিল এদেশে নতুন রেলযাত্রীদের জন্য তেরোটি নিয়ম-নির্দেশ সংবলিত একটি ছোট্ট পুস্তিকা। নর্মাল স্কুলে অক্ষয় দত্তের ‘পদার্থবিদ্যা’ পড়ে রবীন্দ্রনাথ আনন্দ পাননি; কিন্তু তাঁরই লেখা রেলভ্রমণের গাইডবুক পড়ে নিশ্চয় রোমাঞ্চিত হয়েছিলেন। আবার এও বলতে পারি না ‘হুতোম প্যাঁচার নক্শা’র (১৮৬১ খ্রি.) ‘রেলওয়ে’ অংশটি রবীন্দ্রের ইতিমধ্যে পাঠ করা হয়ে গিয়েছিল কি না এবং তা পড়ে রেল ও রেলযাত্রা সম্পর্কে অনভিজ্ঞ পাঠক রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন কি না!”
যাই হোক রবীন্দ্রনাথ তো কিছুটা ভয়ে-ভয়েই বাবার সঙ্গে হাওড়া স্টেশনে এসে পৌঁছলেন রেলপথে বোলপুর যাবার জন্যে। ইঞ্জিনের বাঁশি বাজল, গাড়ি ছাড়ল। “যখন অত্যন্ত সহজে গাড়ি ছাড়িয়া দিল তখন কোথাও বিপদের একটুও আভাস না পাইয়া মনটা বিমর্ষ হইয়া গেল।” ট্রেনের দুই দিকের ছবি ঝরনার মতো বেগে গাড়ির পিছনে ছুটতে লাগল। সন্ধ্যায় ট্রেন বোলপুরে পৌঁছল।
বোলপুরে ক’দিন কাটিয়েই পিতা-পুত্রে রেলযোগে চললেন উত্তর-ভারতের পথে। বোলপুর থেকে সাহেবগঞ্জ দানাপুর এলাহাবাদ কানপুর প্রভৃতি জায়গায় অল্প থেমে থেমে এগোতে লাগলেন। সব শেষে অমৃতসর এসে পৌঁছন। তার জীবনের এই প্রথম পর্যায়ের রেলভ্রমণের মধ্যে একটা বিশেষ ঘটনা তার কাছে চিরকালের জন্য স্মরণীয় হয়ে থেকেছে।
আমরা আগেই বলেছি, রবীন্দ্র যখন বাবার সঙ্গে কলকাতা থেকে যাত্রা শুরু করেন তখন তার বয়স ১১ বছর ৯ মাস। তার এই পর্বের ভ্রমণ ছিল তিন মাস কয়েক দিন। অমৃতসর থেকে রবীন্দ্র কলকাতায় ফিরে আসেন মে মাসের শেষ সপ্তাহের আগেই। মার্চের মাঝামাঝি অমৃতসরে পৌঁছেছিলেন। অর্থাৎ তখনও পর্যন্ত তার ১২ বছর পূর্ণ হয়নি। একালের মতো সেকালেও রেলে ছোটদের ১২ বছর বয়স পর্যন্ত হাফ টিকিটের সুযোগ ছিল। বালক রবীন্দ্রের জন্য পিতা দেবেন্দ্রনাথও তাই হাফ টিকিট কেটেছিলেন। যাত্রাপথে কোনো এক বড় স্টেশনে গাড়ি থামলে টিকিট-পরীক্ষক দেবেন্দ্রনাথের কাছে টিকিট দেখতে চান। পিতা-পুত্রে ছিলেন ট্রেনের প্রথম শ্রেণির যাত্রী। সে-সময় যাত্রীদের জন্যে ছিল ট্রেনের ৩টি শ্রেণি। ফার্স্ট ক্লাস, সেকেন্ড ক্লাস আর থার্ড ক্লাস। কিছু পরে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির মধ্যে একটা ইন্টারমিডিয়েট বা ইন্টারক্লাস চালু হয়েছিল। আমার খুব ছেলেবেলায় ওই ইন্টারক্লাসে চড়েছি মনে পড়ে। ফার্স্ট ক্লাসটা ছিল সাহেব-সুবোদের জন্য আর খুব ধনীদের জন্য। তখনকার দিনে সব ক্লাসের কোচেরই পৃথক পৃথক কামরা থাকত। প্রথম শ্রেণির কামরায় থাকত ৪টি বাথ্। দুটো নিচে দুটো উপরে। কামরার একদিকের প্রান্তে থাকত বড় টয়লেট বাথ্- মনোরম স্নানঘর; আর অন্যপ্রান্তের মাঝখানে থাকত ম্যান্টেল পিস, আয়না আর ছোট র‌্যাক। মেঝেতে বিছানো পুরু লিনেলিয়াম। কামরার ভিতরের ও বাইরের সব হাতল ছিল ঝকঝকে পিতলের। তা কামরায় টিকিট চেকার উঠে টিকিট দেখতে চাইলে মহর্ষি জোব্বা থেকে বের করে দুটি টিকিট দেখালেন। টিকিট পরীক্ষক দেখলেন একটি ফুল টিকিট ও একটি হাফ টিকিট। বালকটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন চেকারটি; তারপরে কিছু না বলেই কেমন যেন একটা সংশয় নিয়ে নিচে নেমে গেলেন। অতঃপর আবার একজন এলেন। কামরার সামনে দাঁড়িয়ে দুজনের কীসের কথাবার্তা হলো নিজেদের মধ্যে। শুধু যে রবীন্দ্রের বাড়ন্ত চেহারা দেখেই সংশয় হয়েছিল, তাই নয়, মনে হয় তারা হয়তো এমনও ভাবছিলেন- এমন এক বৃদ্ধ যাত্রীর মাত্র ১২ বছর বয়সের ছেলে! পিতা মহর্ষিদেব ও কণিষ্ঠ পুত্র রবি ঠিক সেই মুহূর্তে কেমনটি দেখতে ছিলেন- তার এক অসামান্য চিত্ররূপ পাই গগণেন্দ্রনাথের আঁকা ‘জীবনস্মৃতি’র ইলাস্স্ট্রেশনে। সত্যিই সেই ছবি দেখে কে বলবে বৃদ্ধ এই মহর্ষিদেবের এমন এক বালক-পুত্র! যাই হোক, তৃতীয়বার সম্ভবত খোদ স্টেশনমাস্টার নিজে এসে উপস্থিত হলেন টিকিট পরীক্ষার জন্য। তাকেও পুনরায় টিকিট দেখালেন দেবেন্দ্রনাথ। স্টেশনমাস্টার টিকিট হাতে নিয়ে বললেন- এই বালকটির বয়স কি ১২ বছরের বেশি নয়? দেবেন্দ্রনাথ অত্যন্ত অসন্তোষের সঙ্গে বললেন- ১২ বছরের বেশিই যদি হবে তবে তার হাফ টিকিট কাটব কেন? বালক রবীন্দ্রের এই সময়কার তারুণ্যোজ্জ্বল চেহারাটি কেমন ছিল তা জানতে পারি ইংরেজ ফটোগ্রাফারের তোলা শ্রীকণ্ঠ সিংহের সঙ্গে সোমেন্দ্রনাথ সত্যপ্রসাদ ও রবীন্দ্রনাথের গ্রুফ ছবিতে। ডান হাতের কনুই কাঠের চেয়ারের মাথায় ঠেক দিয়ে দাঁড়ানো চাপা কুর্তা ঢোলা জোব্বা ও মাথায় টুপি পরিহিত উদীয়মান রবি। ছবিতে ৩টি বালকের মস্তকেই টুপি। মাথার অনাবৃত অংশ থেকে দেখা যাচ্ছে তাদের মাথায় চুলও রয়েছে যথেষ্ট। টুপিগুলি মাথার ঠিক মাঝে বসানো, পাশের চুল তাই স্পষ্টতই দৃশ্যমান। এর থেকে মনে হয় এই ফটোচিত্র অমৃতসর থেকে ফিরে আসার পরেই তোলা হয়েছিল। কারণ এই বালক ৩টির একই সঙ্গে উপনয়ন হয়েছিল ১৮৭৩-এর ৬ ফেব্রুয়ারি। রবীন্দ্রনাথ বাবার সঙ্গে ট্রেনে উঠেছিলেন পৈতের মাত্র আট দিন পরে, ১৪ ফেব্রুয়ারি। সুতরাং এই কয়দিনের মধ্যে যে এ ছবি তোলা নয়, তা বালকদের মাথায় কালো চুলের ঘনত্ব দেখেই সিদ্ধান্ত করা যায়। যাই হোক, ট্রেনের টিকিট পরীক্ষক ঠিক কোন্ চেহারার বালকটিকে দেখে দ্বাদশ-ঊর্ধ্ব বলে সন্দেহ করেছিলেন তার একটা হদিস মেলে পুরাতন ওই ফটোচিত্রে। রবীন্দ্রনাথ ছোটবেলা থেকেই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বাড়ন্ত বালক ছিলেন। সুদর্শন দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ বুদ্ধিদীপ্ত উজ্জ্বল চেহারা। তার ওপরে রেলযাত্রা পর্বে মাথার ওপরে আবার চড়েছে একখানা জমকালো জড়িদার উঁচু টুপি। ফলে আরও লম্বা আরও বড়সড় লাগছে সদ্য গায়ত্রীমন্ত্রে দীক্ষাপ্রাপ্ত বালকটিকে।
স্টেশনমাস্টার সাহেবটির বিশ^াসই হলো না হাফ টিকিটের এই রেলযাত্রী অনূর্ধ্ব ১২ বছরের বালক। তিনি সোজাসুজি দেবেন্দ্রনাথকে বললেন- মহাশয়, এর জন্যে পুরো টিকিটের ভাড়াই আপনাকে দিতে হবে। এমন কথা শোনামাত্র দেবেন্দ্রনাথ অসম্মানে অপমানে রাগে একেবারে আগুনের মতো জ¦লে উঠলেন। মুহূর্তমাত্র বিলম্ব না করে তখনই বাক্স থেকে একখানা গোটা নোট বের করে টিকিট পরীক্ষকের হাতে দিলেন। টিকিট পরীক্ষক রসিদ কেটে সেইসঙ্গে বাকি টাকা ফেরত দিলেন। সেই টাকাগুলো মুঠোর মধ্যে নিয়ে কামরার জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে প্ল্যাটফর্মের পাথরে ছুড়ে ফেলে দিলেন। বাইরে ফাল্গুনের বাতাসে টাকার নোটগুলো ভেসে ভেসে উড়তে লাগল, কয়েনগুলো রেলের চাকার মতোই ঝন্ঝন্ করে গড়িয়ে চলল প্ল্যাটফর্ম জুড়ে। এমন অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা অর্জন করে স্টেশনমাস্টারের বুঝতে আর বিলম্ব হলো না যে তিনি নিজে কতখানি ভুল করেছেন এবং কী অন্যায় কাজই না করেছেন। লজ্জায় অপরাধীর মতো মুখ নিচু করে কামরা থেকে নিচে নেমে গেলেন। প্ল্যাটফর্ম জুড়ে খুচরো টাকাগুলো তখনও হয়তো বাতাসে উড়ছিল। অন্যদিকে ঋষিতুল্য পিতৃদেবের যে চরিত্র বালক রবি ট্রেনের কামরায় বসে দেখলেন, তা তার মনের কামরায় চিরদিনের জন্য বাসা বেঁধে রইল। পরিণত বয়সেও এ-ঘটনাটি কবি ভুলতে পারেন নি।
পরিণত বয়সে ‘অপরিচিতা’ গল্পটি লেখার সময় বাল্যকালের এই ঘটনা কি কোনো ছায়া ফেলে থাকতে পারে? সেই কোনো এক বড় স্টেশনে ট্রেন দাঁড়ানো, দেশীয় আরোহীর প্রতি রেলকর্মচারীর অন্যায় আচরণ, কামরায় ইংরেজ স্টেশনমাস্টারের আসা এবং রেলযাত্রী এক ১৫-১৬ বছরের মেয়ের নির্ভীক বলিষ্ট সৎসাহস- সব কিছুর মধ্যে যেন কবির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার স্পর্শের ছোঁয়া পাওয়া যায়।
কামরায় রয়েছে গল্পের নায়ক ও তার তীর্থযাত্রী মা। কামরায় সহযাত্রী কয়েকটি মেয়ে- তাদের নেতৃত্বে কল্যাণী নামে তরুণীটি; যারা গল্পের নায়ক ও তার মায়ের অপরিচিতা। গল্পের শেষাংশ থেকে একটি অংশ উদ্ধৃত করছি।
“এমন সময়ে গাড়ি একটা বড়ো স্টেশনে আসিয়া থামিল। সেই জেনারেল সাহেবের একদল অনুসঙ্গী এই স্টেশন হইতে উঠিবার উদ্যোগ করিতেছে। গাড়িতে কোথাও জায়গা নাই। বারবার আমাদের গাড়ির সামনে দিয়া তারা ঘুরিয়া গেল। মা তো ভয়ে আড়ষ্ট, আমি মনের মধ্যে শান্তি পাইতেছিলাম না।
গাড়ি ছাড়িবার অল্পকাল পূর্ব একজন দেশী রেলোয়ে কর্মচারী, নাম লেখা দুইখানা টিকিট দুই বেঞ্চের শিয়রের কাছে লট্কাইয়া দিয়া আমাকে বলিল, “এ গাড়ির এই দুই বেঞ্চ আগে হইতেই দুই সাহেব রিজার্ভ করিয়াছেন, আপনাদিগকে অন্য গাড়িতে যাইতে হইবে।”
আমি তো তাড়াতাড়ি ব্যস্ত হইয়া দাঁড়াইয়া উঠিলাম। মেয়েটি হিন্দিতে বলিল, “না, আমরা গাড়ি ছাড়িব না।”
সে লোকটি রোখ করিয়া বলিল, “না ছাড়িয়া উপায় নাই।”
কিন্তু মেয়েটির চলিষ্ণুতার কোনো লক্ষণ না দেখিয়া সে নামিয়া গিয়া ইংরেজ স্টেশন-মাস্টারকে ডাকিয়া আনিল। সে আসিয়া আমাকে বলিল, “আমি দুঃখিত, কিন্তু-”
শুনিয়া আমি ‘কুলি কুলি’ করিয়া ডাক ছাড়িতে লাগিলাম। মেয়েটি উঠিয়া দুই চক্ষে অগ্নিবর্ষণ করিয়া বলিল, “না, আপনি যাইতে পারিবেন না, যেমন আছেন বসিয়া থাকুন।”
বলিয়া সে দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া স্টেশন-মাস্টারকে ইংরেজি ভাষায় বলিল, “এ গাড়ি আগে হইতে রিজার্ভ করা, এ কথা মিথ্যা কথা।”
বলিয়া নাম-লেখা টিকিট খুলিয়া প্ল্যাটফর্মে ছুড়িয়া ফেলিয়া দিল।”
হিমালয় থেকে রবীন্দ্রনাথ যখন কলকাতায় ফিরলেন তখন আর সঙ্গে বাবা নেই। হিমালয়ে অবস্থানকালেই রবীন্দ্রের ১২ বছর পূর্ণ হয়েছে। মাস তিনেকের শৈলাবাসে রবীন্দ্রের শরীর স্বাস্থ্যের আরও উন্নতি ঘটেছে। এসেছিলেন মহর্ষির সঙ্গে অনূর্ধ্ব ১২ হাফ টিকিটের যাত্রী হয়ে; ফিরছেন একাকী ঊর্ধ্ব ১২ আরও সুন্দর সুদেহী পূর্ণ টিকিটের যাত্রীরূপে একটি ভৃত্যকে মাত্র সঙ্গে নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “ফিরিবার সময়ে রেলের পথেই আমার ভাগ্যে আদর শুরু হইল।... পথে যেখানে যত সাহেব মেম গাড়িতে উঠিত আমাকে নাড়াচাড়া না করিয়া ছাড়িত না।” যাবার সময় ট্রেনের মধ্যে টিকিটচেকারদের দ্বারা অন্যায় হয়রানি, আর ফেরার সময় সেই ট্রেনের কামরায় বালককে নিয়ে সাহেব-মেমদের সাদর ‘নাড়াচাড়া’- দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন রসের বিপরীত স্বাদের অভিজ্ঞতা। এমন বিচিত্র অভিজ্ঞতা রেলভ্রমণ ছাড়া আর কোথায় হবে?”
মাসিক পত্রিকা ‘ভারতী’ প্রকাশিত হয়েছে ঠাকুরবাড়ি থেকে। সম্পাদক বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ। দাদাদের কাগজে তরুণ রবীন্দ্রনাথ রীতিমতো লেখালেখি শুরু করে দিয়েছেন প্রথম থেকেই। তার একখানা ধারাবাহিক উপন্যাসও সেখানে ছাপা হচ্ছে। এদিকে বয়স তো তখন সবেমাত্র ১৬। কিন্তু তাতে কী? বড়দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিনিই তো ভারতীর প্রধান লেখক। ‘করুণা’ উপন্যাসটি ১২৮৪ আশি^ন থেকে বেরতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে ১২৮৫-র জ্যৈষ্ঠে, মে ১৮৭৮-এর মাঝামাঝি মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে আমেদাবাদ যাত্রা করলেন রবীন্দ্র। প্রথমবার চলেছিলেন বাবার সঙ্গে ভারতের উত্তর প্রান্তে, দ্বিতীয়বার চললেন দাদার সঙ্গে পশ্চিম ভারতের পথে। এবারের রেলভ্রমণের তেমন কোনো বিবরণ আমরা পাই না কিন্তু; কিন্তু মনে হয় এই রেলভ্রমণও বুঝি তার তাৎক্ষণিক সাহিত্যসৃষ্টির কাজে লেগেছিল। তার ‘করুণা’ উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীদের অনেকেই দেখি ঘর ছেড়ে রেলস্টেশনমুখী। রেলগাড়ির কামরাতেই অনেকটা সময় পাত্র-পাত্রীদের অবস্থান; ট্রেন চলার সঙ্গে সঙ্গে উপন্যাসের কাহিনিও তার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলে।
জ্যৈষ্ঠের ২ তারিখ ১৫ মে রবীন্দ্রনাথ ট্রেনে উঠেছিলেন আমেদাবাদের পথে। আর উপন্যাসের চরিত্র স্বরূপচন্দ্রকে ভারতীর শ্রাবণ সংখ্যায় দেখি এলাহাবাদ যাবে বলে স্টেশনের পথে চলেছে ট্রেন ধরতে। স্টেশনে আসার পথে স্বামী নরেন্দ্র কর্তৃক বাড়ি থেকে বিতাড়িত করুণাময়ী করুণার সঙ্গে এক গাছের তলায় সাক্ষাৎ স্বরূপের। “স্বরূপ প্রস্তাব করিল, করুণা তাহার সঙ্গে পশ্চিমে চলুক। তাহা হইলে আর কোনো ভাবনা ভাবিতে হইবে না।... কিন্তু স্বরূপের উপর তাহার এমন একটা ভয় আছে যে, পা আর উঠিতে চায় না। করুণা ভাবিল এই গাছের তলায় নিশ্চেষ্ট হইয়া পড়িয়া থাকি, না খাইয়া দাইয়া মরিয়া যাইব। কিন্তু রক্ত মাংসের শরীরে কত সহিবে বল- এ ভবনা আর বেশিক্ষণ স্থান পাইল না স্বরূপের প্রস্তাবে সম্মত হইল। সন্ধ্যা হইল। করুণা ও স্বরূপ এখন ট্রেনের মধ্যে।”
করুণা ও স্বরূপ কয়েকদিন কাশীতে কাটাল। কিন্তু স্বরূপের মনস্কামনা পূর্ণ হয় না। এদিকে এলাহাবাদ যাবার সময়ও এগিয়ে আসছে। এ তো নিজের দেশ নয়, করুণা একা মহিলা কাশীতে কেমন করে থাকবে? সে স্বরূপের সঙ্গেই এলাহাবাদ যেতে প্রস্তুত হলো।
সেদিনের রেলস্টেশনের একটা সংক্ষিপ্ত ছবি পেয়ে যাই উপন্যাসের বিংশ পরিচ্ছেদ থেকে। স্টেশন কাশী।
“উভয়ে [করুণা ও স্বরূপ] স্টেশনে গিয়া উপস্থিত হইল। গাড়ি ছাড়িতে এখনও দেরি আছে। জিনিসপত্র পুঁটুলি বোঁচকা লইয়া যাত্রিগণ মহা কোলাহল করিতেছে। কানে কলমগোঁজা রেলের ক্লার্কগণ ভারি উঁচু চালে ব্যস্তভাবে ইতস্তত র্ফর্ফ করিয়া বেড়াইতেছেন। পান সোডাওয়াটার নানা প্রকার মিষ্টান্নের বোঝা লইয়া ফেরিওয়ালারা আগামী গাড়ির জন্য অপেক্ষা করিতেছে।”
এই স্টেশনের প্ল্যাটফর্মেই উপন্যাসের কত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে খুব অল্প সময়ের মধ্যে। এলাহাবাদগামী একটা ট্রেন কাশী স্টেশন ছেড়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে কী গভীর করুণ পরিণাম নেমে আসে করুণার ভবিষ্যৎ জীবনে।
কাশী স্টেশনেই অকস্মাৎ করুণার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় ভট্টাচার্য প-িত মশাইয়ের। তিনি নিধিকে সঙ্গে নিয়ে কাশী দর্শনে এসে এখন প্রয়াগের পথে চলেছেন। করুণার মুখে তার দুঃসহ দুঃখের কাহিনি শুনে প-িত মশাই আর অশ্রু সংবরণ করতে পারেন না। গদগদ স্বরে বলেন- মা যা হবার তা হয়েছে তার জন্য আর ভেব না- আমি প্রয়াগে যাচ্ছি আমার সঙ্গে এস- আমি যতদিন বাঁচি তুমি আমার কাছেই থাকবে-  তোমার কোনো ভাবনা নেই। এমন সময় নিধি এসে প-িত মশাইকে দূরে ডেকে নিয়ে গিয়ে অনেক উল্টো কথা বোঝাল। প-িত মশাই যখন অসম্ভব একটা দ্বিধার মধ্যে কী করেন না করেন- করুণা যখন তার পা জড়িয়ে ধরে বলছে আমাকে ছেড়ে যাবেন না- প-িত মশাইয়ের চোখের জল আর বাধা মানছে না- যখন ঠিক করছেন- না একে ছেড়ে যেতে পারব না; ঠিক তখনই “নিধি ছুটিয়া আসিয়া মহা একটা ধমক দিয়া কহিল- ‘এখানে হাঁ করিয়া দাঁড়াইয়া থাকিলে কি হইবে? গাড়ি যে চলিয়া যায়।’ এই বলিয়া প-িত মহাশয়ের হাত ধরিয়া হড়হড় করিয়া টানিয়া একটা গাড়ির মধ্যে পূরিয়া দিল। করুণা অন্ধকার দেখিতে লাগিল- মাথা ঘুরিয়া মুখ চক্ষু বিবর্ণ হইয়া সেইখানে মূর্ছিত হইয়া পড়িল। স্বরূপের দেখা সাক্ষাৎ নাই, সে গোলমালে অনেকক্ষণ হইল গাড়িতে উঠিয়া পড়িয়াছে। অগ্নিময় অঙ্কুশের তাপে আর্তনাদ করিয়া লৌহময় গজ হন হন করিয়া অগ্রসর হইল। স্টেশনে আর বড় লোক নাই।”
মহেন্দ্র লাহোর থেকে কলকাতায় ফেরার পথে কাশীতে নেমে ছিল। সে কাশী থেকে কলকাতার ট্রেন ধরার জন্য স্টেশনে এসেছে। কাশীর স্টেশনে করুণাকে নিয়ে যে-সমস্ত ঘটনা ঘটে তা সমস্ত সে দূর থেকে লক্ষ্য করে। যখন দেখে সকলেই চলে গেল- করুণা স্টেশনের উপরে একাকী মূর্ছিত অবস্থায় পড়ে- মহেন্দ্র তখন কলকাতা-যাত্রা বাতিল করে একটা গাড়িতে তুলে করুণাকে নিজের বাসাবাড়িতে নিয়ে এলো। তারপর কী হলো? সে-ঘটনা জানতে গেলে পাঠককে মূল উপন্যাস পড়তে হবে। রেলগাড়ির কাহিনি যতটুকু তা আমরা বলেছি, গল্পের কৌতূহল মেটাতে গেলে ‘করুণা’ পড়–ন।
আমেদাবাদ ও বোম্বাইয়ে মাস ছয়েক কাটিয়ে রবীন্দ্রনাথ বিলেত যাত্রা করেন ১৮৭৮-এর ২০ সেপ্টেম্বর, ৫ আশি^ন ১২৮৫। বিলেতে তার রেলভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে তার সেই সময়ে লেখা ও সেই সময়ে ভারতী’তে প্রকাশিত পত্রধারায়।
সুয়েজ থেকে সারারাত রেলভ্রমণের পর রবীন্দ্রনাথ সকালবেলায় আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছান। সময়টা অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ।
“সুয়েজে আমরা রেলোয়ে উঠলেম। এ রেলগাড়ির অনেক প্রকার রোগ আছে। প্রথমতঃ শোবার কোনো বন্দোবস্ত নেই, কেননা বসবার জায়গাগুলি অংশে অংশে বিভক্ত। দ্বিতীয়তঃ এমন গজগামিনী রেলগাড়ি সর্বত্র দেখতে পাওয়া যায় না। সমস্ত রাত্রিই গাড়ি চলেছে; দিনের বেলা যখন জেগে উঠলেম তখন দেখলুম ধুলোয় আমাদের কেবল গোর হয়নি, আর সব হয়েছে। চুলে হাত দিতে গিয়ে দেখি, চুলে এমন এক স্তর মাটি জমেছে যে মাথায় অনায়াসে ধান চাষ করা যায়। এই রকম ধুলোমাখা সন্ন্যাসীর বেশে আমরা অ্যালেকজান্দ্রিয়াতে গিয়ে পৌঁছলেম। রেলের লাইনের দুপারে সবুজ শস্যক্ষেত্র। জায়গায় জায়গায় খেজুরের গাছে থোলো থোলো খেজুর ফলে রয়েছে। মাঠের মাঝে মাঝে কুয়ো। মাঝে মাঝে দুই-একটা কোঠাবাড়ি- বাড়িগুলো চৌকোনো, থাম নেই, বারান্দা নেই- সমস্তটাই দেয়ালের মতো, সেই দেয়ালের মধ্যে মধ্যে দুই-একটা জানলা।”
ক’দিন পর ইতালির ব্রিন্দিশি থেকে ট্রেনে উঠলেন বিকেল তিনটের সময়। পরের দিন সকালে পৌঁছলেন প্যারিসে। প্রায় ১৬-১৭ ঘণ্টার দীর্ঘ রেলজার্নি। এই রেলভ্রমণটা কবির কাছে ছিল একটা নতুন কাব্যপাঠের মতোই আকর্ষক ও মনোরম। রেল তো শুধু মানুষকে গন্তব্যস্থলেই পৌঁছে দেয় না; মানুষের প্রয়োজনের দিকটা তো সে মেটাচ্ছেই- কিন্তু সেইসঙ্গে তার আরও একটা বড় কাজ হলো মানুষকে প্রভূত আনন্দ দান করা। রেলগাড়ির কামরায় এত যে জানলা সে কি শুধু হাওয়া খেলার জন্যে, চোখের খেলা মনের খেলার জন্যে নয়?
তা ব্রিন্দিশি থেকে তো ট্রেন ছাড়ল যথাসময়ে। তারপর আঙুরের ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে কবির রেলগাড়ি এগুতে শুরু করলে। “চার দিকের দৃশ্য এমন সুন্দর যে কী বলব। পর্বত নদী হ্রদ কুটির ক্ষেত্র ছোট ছোট গ্রাম প্রভৃতি যত-কিছু কবির স্বপ্নের ধন সমস্ত চারিদিকে শোভা পাচ্ছে। গাছপালার মধ্যে থেকে যখন কোনো-একটি দূরস্থ নগর-তার প্রাসাদচূড়া, তার চর্চের শিখর, তার ছবির মতো বাড়িগুলি আস্তে আস্তে চোখে পড়ে তখন বড় ভালো লাগে। এক-একটি দৃশ্য আমার এত ভালো লেগেছিল যে তা বর্ণনা করতে আমার ইচ্ছে করছে না। সন্ধেবেলায় একটি পাহাড়ের নিচে অতি সুন্দর একটি হ্রদ দেখেছিলেম, তা আর আমি ভুলতে পারব না। তার চারিদিকে গাছপালা, সন্ধ্যার ছায়া জলে পড়েছে। সে অতি সুন্দর, তা আমি বর্ণনা করতে চাইনে।” জগতে এমন কিছু কিছু সৌন্দর্য সত্যিই আছে, যা বর্ণনায় অতীত।
আলপস পর্বতমালার বিখ্যাত গড়হঃ ঈবহরং-এর টানেল অতিক্রম করতে হয়েছিল ব্রিন্দিশি থেকে প্যারিস যাবার এই পথেই। এই গহ্বরের ভেতর দিয়ে রেলগাড়ি পার হতে পুরো আধ ঘণ্টা সময় লাগে। এই বিশাল রেল-টানেল কীভাবে প্রস্তুত হয়েছিল, তাও রবীন্দ্রনাথ জেনে নিয়েছিলেন এবং বঙ্গীয় এই যুবক যাত্রীটি বঙ্গভারতীর পাঠকদের তা জানিয়েও দিয়েছিলেন।
“রেলোয়ে করে যেতে যেতে আমরা গড়হঃ ঈবহরং-এর বিখ্যাত ঃঁহহবষ দেখলেম। এই পর্বতের এ-পাশ থেকে ফরাসীরা, ও-পাশ থেকে ইটালিয়ানরা একসঙ্গে খুদতে আরম্ভ করে; কয়েক বৎসর খুদতে খুদতে দুই যন্ত্রীদল ঠিক মাঝামাঝি এসে পরস্পরের সমুখা-সমুখী উপস্থিত হয়। এই গুহা অতিক্রম করতে রেলগাড়ির ঠিক আধ ঘণ্টা লাগল। সে অন্ধকারে আমরা যেন হাঁফিয়ে উঠছিলেম। এখানকার রেলগাড়ির মধ্যে দিনরাত আলো জ¦ালাই আছে; কেননা, এক-এক স্থানে প্রায় পাঁচ মিনিট অন্তর এক-একটা পর্বতগুহা ভেদ করতে হয়- সুতরাং দিনের আলো খুব অল্পক্ষণ পাওয়া যায়। ইটালি থেকে ফ্রান্স পর্যন্ত সমস্ত রাস্তা- নির্ঝর নদী পর্বত গ্রাম হ্রদ দেখতে দেখতে আমরা পথের কষ্ট ভুলে গিয়েছিলেম। এই রাস্তাটুকু আমরা যেন একটি কাব্য পড়তে পড়তে গিয়েছিলাম।”
ইংল্যান্ডের সবচেয়ে যে দুটি জিনিস কবির চোখ কেড়েছিল তা হলো লোকজনের ব্যস্ততা আর ছোট্ট দেশটাজুড়ে রেলগাড়ির বাহুল্য। যেদিকেই তাকানো যায় যেন শহরজুড়ে রেলের জাল পাতা। পাঁচ মিনিট অন্তর এক একটি আসছে যাচ্ছে। এক-একটা রেলস্টেশনে পাশাপাশি কতশত লাইন। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, “দেশ তো এই এক রত্তি, নড়ে চড়ে বেড়াবার জায়গা নেই, দু পা চললেই ভয় হয় পাছে সমুদ্রে গিয়ে পড়ি। এখানে এত ট্রেন যে কেন ভেবে পাই নে!”
কবি জানিয়েছেন একবার লন্ডনে যাবার সময় একটুর জন্য ট্রেন মিস করেছিলেন তিনি, কিন্তু সেজন্য তার বাড়ি ফিরতে বিলম্ব হয়নি; আধ ঘণ্টার মধ্যেই আর একটি ট্রেন এসে তাকে তুলে নিয়ে যায়।
এই ট্রেন মিসের ব্যাপার নিয়েই ‘রেলগাড়ি’ নামে একটা লেখা পাই ভারতী পত্রিকায় ১২৮৮ অগ্রহায়ণ সংখ্যায়। বিশ^ভারতী রবীন্দ্র-রচনাবলীর ৩০ খ-ে রচনাটি সংকলিত। কমলাকান্তের দপ্তরের ‘মনুষ্যফল’ ‘বড়বাজার’ প্রভৃতি রচনার অনুবর্তন রয়েছে এই ‘রেলগাড়ি’তে। বঙ্গীয় সাহিত্যের সঙ্গে রেলগাড়ি রেললাইন রেলস্টেশন রেলের কামরা রেলের যাত্রী-আরোহী ইত্যাদির বিচিত্র সাদৃশ্য আবিষ্কৃত হয়েছে এই রম্য নিবন্ধে।
“যাঁহারা টিকিট কাটিয়া ট্রেন মিস্ করেন, তাঁহাদের জন্য বড়ো মায়া করে। তাঁহারা ঠিক সময়ে আসনে নাই। সময়মাফিক আসিয়াছিল বলিয়া কত থার্ড ক্লাসের লোক গাড়িতে উঠিল, এমন-কি, কত লোক টিকিট না কিনিয়াও গাড়িতে উঠিল; অসময়ে আসিয়াছেন বলিয়া কত ফার্স্ট ক্লাসের লোক পড়িয়া রহিলেন। যাহা হউক, তাঁহাদের জন্য ভবিষ্যৎ আছে, দ্বিতীয় ট্রেন আসিলে তাঁহারা চড়িতে পাইবেন। কিন্তু ইঁহাদের অনেকে বিরক্ত, ক্ষুব্ধ হইয়া বাড়িতে ফিরিয়া যান, স্টেশনে অপেক্ষা করেন না। এইরূপে কত প্রথম শ্রেণীর ব্যক্তি বিরক্ত হইয়া তাঁহাদের টিকিট ছিঁড়িয়া ফেলিয়াছেন, পকেটে পয়সা আনিয়া টিকিট ক্রয় করেন নাই, তাঁহাদের সংখ্যা গণণা কে করিবে? জেফ্রি যে ট্রেনে গার্ড ছিলেন, বাইরন যে ট্রেনে আরোহী ছিলেন, সেই ট্রেন ধরিবার জন্য ওয়ার্ড্স্বার্থ ও শেলী স্টেশনে উপস্থিত হইলেন, কিন্তু তখন গাড়ি দ্রুতবেগে চলিয়াছে; তাঁহারা ট্রেন মিস্ করিলেন; দ্বিতীয় ট্রেন আসিলে পর তাঁহারা স্থান পাইলেন। আমাদের বঙ্গীয় সাহিত্যে সম্প্রতি যে ট্রেন চলিতেছে, অনেক বড়ো বড়ো ব্যক্তি সে ট্রেনটা মিস্ করিয়াছেন। কিন্তু তাঁহারা কেন নিরাশ হইতেছেন? দশ মিনিট সবুর করুণ আর একখানা ট্রেন এল বলে!”
সাহিত্যের রেলগাড়িতে লেখকরা আরোহী, পাঠক ও সমালোচক সম্প্রদায় হলো গার্ড সাহেব, যশের ইঞ্জিন কালের রাস্তা দিয়ে চলেছে। রেলগাড়ির মধ্যে কামরায় কামরায় শ্রেণিভেদ; ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড ক্লাস থার্ড ক্লাস। গার্ড কখনও কখনও থার্ড ক্লাসের আরোহীকেও সুযোগ করে দেন ফার্স্ট ক্লাসে বসতে দেবার। শুধু সাহিত্যের যাত্রীগাড়িই নয়, সেইসঙ্গে মালগাড়িও রয়েছে। দেশের খবরের কাগজের সঙ্গে মালবহনকারী গুড্স ট্রেনের তুলনা করা হয়েছে। তবে এখানে গুড্স্ ট্রেনের বাংলা পরিভাষার প্রতিই লেখকের আকর্ষণটা বেশি। বুঝতে পারি না খবরের কাগজ ও তার সম্পাদকের প্রতি মানুষ সবসময় এত ক্ষুব্ধ থাকে কেন? তবে রেলের গার্ডসাহেবের কর্মতৎপরাতাও ‘রেলগাড়ি’র লেখকের নজর এড়িয়ে যায়নি।
আমরা কথায় কথায় ভারতীর ‘রেলগাড়ি’তে চড়ে বসেছিলাম। এখন আবার আমাদের ফিরে আসতে হবে লন্ডনে- রাতের এক রেলগাড়িতে রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণসঙ্গী হয়ে। লন্ডনের শীতল রাত্রে সেই রেলযাত্রা ছিল বড়ই দুর্যোগপূর্ণ। সে এক আশ্চর্য ভ্রমণবৃত্তান্ত।
ভারতের এক উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মচারীর বিধবা স্ত্রী মিসেস উড্। থাকেন লন্ডন থেকে কিছু দূরে এক শহরে। ঘরোয়া এক অনুষ্ঠানে যোগ দেবার জন্য রবিকে তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। রবির গলায় তার স্বামীর উদ্দেশে লেখা ইংরেজি একটি বিলাপগান বেহাগরাগিণীতে শুনতে তিনি ভালোবাসতেন। ইংরেজ এই প্রবীণার অনুরোধ প্রায় বাধ্য হয়ে কয়েকবার মান্য করতে হয়েছিল রবীন্দ্রকে। এবারে তার সানুনয় অনুরোধ এসেছে টেলিগ্রামে- আসতেই হবে। এদিকে রবীন্দ্রের কলকাতায় ফেরবারও সময় হয়ে আসছিল। তাই বিধবার অনুরোধ রক্ষা করবার জন্য সেই দিনই স্টেশনে বিকেলের ট্রেন ধরলেন। লোকাল ট্রেন। আমাদের যেমন হাওড়া-বর্ধমান লাইন আর কি।
“সেদিন বড়ো দুর্যোগ। খুব শীত, বরফ পড়িতেছে, কুয়াশায় আকাশ আচ্ছন্ন। যেখানে যাইতে হইবে সেই স্টেশনেই এ-লাইনের শেষ গম্যস্থান, তাই নিশ্চিন্ত হইয়া বসিলাম। কখন গাড়ি হইতে নামিতে হইবে তাহা সন্ধান লইবার প্রয়োজন বোধ করিলাম না।”
তা যাত্রীমহাশয় তো আরাম করে রেলের কৌচে বসলেন। বসার ব্যাপারেও আগেই চিন্তা-ভাবনা করে নিলেন- কোন্ দিকে বসবেন- এদিকের জানলায় না ওদিকের। যেহেতু স্টেশনগুলি ডানদিকের জানলার ধারেই পড়বে, তাই ডানদিকের জানলা বেছেই বসলেন। সকাল সকাল সন্ধ্যা নেমে অন্ধকার হয়ে এসেছে, বাইরে আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। লন্ডন থেকে যে-কজন যাত্রী উঠেছিল তারাও নিজ নিজ গম্যস্থানে একে একে নেমে গেল।
ঘটনাটা যে আরোহীটিকে নিয়ে, তার নিজের কণ্ঠেই সে-কাহিনিটা শোনা যাক।
“গন্তব্য স্টেশনের পূর্ব স্টেশন ছাড়িয়া গাড়ি চলিল। এক জায়গায় একবার গাড়ি থামিল। জানালা হইতে মুখ বাড়াইয়া দেখিলাম, সমস্ত অন্ধকার। লোকজন নাই, আলো নাই, প্ল্যাটফর্ম নাই, কিছুই নাই। ভিতরে যাহারা থাকে তাহারাই প্রকৃত তত্ত্ব জানা হইতে বঞ্চিত- রেলগাড়ি কেন যে অস্থানে অসময়ে থামিয়া বসিয়া থাকে রেলের আরোহীদের তাহা বুঝিবার উপায় নাই, অতএব পুনরায় পড়ায় মন দিলাম। কিছুক্ষণ বাদে গাড়ি পিছু হটিতে লাগিল- মনে ঠিক করিলাম, রেলগাড়ির চরিত্র বুঝিবার চেষ্টা করা মিথ্যা। কিন্তু যখন দেখিলাম যে-স্টেশনটি ছাড়িয়া গিয়াছিলাম সেই স্টেশনে আসিয়া গাড়ি থামিল, তখন উদাসীন থাকা আমার পক্ষে কঠিন হইল। স্টেশনের লোককে জিজ্ঞাসা করিলাম, অমুক স্টেশন কখন পাওয়া যাইবে। সে কহিল, সেইখান হইতেই তো এ গাড়ি এইমাত্র আসিয়াছে। ব্যাকুল হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, কোথায় যাইতেছে। সে কহিল, লন্ডনে। বুঝিলাম এ গাড়ি খেয়াগাড়ি, পারাপার করে। ব্যতিব্যস্ত হইয়া হঠাৎ সেইখানে নামিয়া পড়িলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম, উত্তরের গাড়ি কখন পাওয়া যাইবে। সে কহিল, আজ রাত্রে নয়। জিজ্ঞাসা করিলাম, কাছাকাছির মধ্যে সরাই কোথাও আছে? সে বলিল, পাঁচ মাইলের মধ্যে না।
প্রাতে দশটার সময় আহার করিয়া বাহির হইয়াছি, ইতিমধ্যে জলস্পর্শ করি নাই। কিন্তু বৈরাগ্য ছাড়া যখন দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা না থাকে তখন নিবৃত্তিই সবচেয়ে সোজা; মোটা ওভারকোটের বোতাম গলা পর্যন্ত আঁটিয়া স্টেশনের দীপস্তম্ভের নীচে বেঞ্চের উপর বসিয়া বই পড়িতে লাগিলাম। বইটা ছিল স্পেন্সরের উধঃধ ড়ভ ঊঃযরপং, সেটি তখন সবেমাত্র প্রকাশিত হইয়াছে। গত্যন্তর যখন নাই তখন এই জাতীয় বই মনোযোগ দিয়া পড়িবার এমন পরিপূর্ণ অবকাশ আর জুটিবে না, এই বলিয়া মনকে প্রবোধ দিলাম।
কিছুকাল পরে পোর্টার আসিয়া কহিল, আজ একটি স্পেশাল আছে- আধঘণ্টার মধ্যে আসিয়া পৌঁছিবে। শুনিয়া মনে এত স্ফূর্তির সঞ্চার হইল যে, তাহার পর হইতে উধঃধ ড়ভ ঊঃযরপং-এ মনোযোগ করা আমার পক্ষে অসাধ্য হইয়া উঠিল।
সাতটার সময় যেখানে পৌঁছিবার কথা সেখানে পৌঁছিতে সাড়ে-নয়টা হইল।”
সেই রাত্রে ইংরেজ গৃহকর্ত্রীর কীরূপ আপ্যায়ন লাভ করে। রবিকে সারারাত অনাহারে কাটাতে হয়েছিল সে-ইতিহাস আরও মর্মান্তিক। সে তো ব্রিটিশ রেলওয়ের কাহিনি নয়, তা হলো এক বৃদ্ধা ইংরেজ বিধবা রমণীর বৃত্তান্ত। সেই রাত্রে যেভাবে উপবাসে কাটাতে হয়েছিল তার জন্য কবি নিশ্চয় সে-দেশের রেল-কোম্পানিকে দোষ দেবেন না।
পাহাড়ি রেলে চেপে দার্জিলিংয়ে পাঁচ বছরের মধ্যে দু-দুবার বেড়াতে যান রবীন্দ্রনাথ। একবার জ্যোতিদাদার সঙ্গে, আর একবার নদিদিদের সঙ্গে সপরিবারে। প্রথমবার ১২৮৯ কার্তিকে, ১৮৮২ অক্টোবরে, দুর্গাপূজার সময়; দ্বিতীয়বারও ওই শরৎকালে- ১২৯৪ ভাদ্রের শেষে, ১৮৮৭ সেপ্টেম্বরে। প্রথমবারের দার্জিলিং যাওয়া-আসার রেলভ্রমণের তেমন কোনো বিবরণ আমরা পাই না। কবিও সে-বিষয়ে কিছু লিখে যাননি। মনে হয় রেলভ্রমণ অপেক্ষা রেলের কামরায় ভ্রমণসঙ্গীরাই ছিল তার কাছে বেশি আকর্ষণের। যাত্রাপথের সঙ্গী যখন প্রিয় জ্যোতিদাদা ও ততোধিক প্রিয় নতুন বৌঠান তখন অন্য সবকিছুর আকর্ষণ তার কাছে নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে চালু হওয়ার অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই দেখি এই তিন হিমালয়দর্শনার্থী যাত্রীকে হিমালয়ের পথে।
১২৯২-এ (১৮৮৫ খ্রি.) গ্রীষ্মের এক ছুটিতে আদরের ভাইপো-ভাইঝির আবদার এড়াতে না পেরে তাদের নিয়ে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কবি চড়েছেন রেলগাড়ির কামরায়- গন্তব্য হাজারিবাগ। সব মিলিয়ে যাত্রী চারজন। রবীন্দ্রনাথ, সুরেন্দ্রনাথ (বয়স ১৩), ইন্দিরা (বয়স ১২); আর একজন সঙ্গী ‘মোটাসোটা, গোলগাল, সাদাসিধে মানুষ।’
যাত্রা হাজারিবাগ হলেও তখনও গ্রান্ডকর্ড লাইনের হাজারিবাগ-রোড স্টেশনের পথ হয়নি। সুতরাং যেতে হবে প্রথমে মধুপুর স্টেশনে। সেখানে নেমে ট্রেন বদল করতে হবে। দ্বিতীয় ট্রেনে যাত্রা গিরিডি পর্যন্ত। তখন হাজারিবাগ যেতে ট্রেন ছিল এই পর্যন্তই। তারপর সেখান থেকে হাজারিবাগ পৌঁছতে অনেক দীর্ঘ পথ। গিরিডি থেকে গাড়ি করে সে-পথে যেতে হয়। সে-এক অদ্ভুত গাড়ি। ‘একে কি আর গাড়ি বলে? চারটে চাকার উপর একটা ছোট খাঁচা মাত্র।’ এ-গাড়ি চার চাকার হলেও তা কিন্তু মোটরগাড়িও নয়, ঘোড়ারগাড়িও নয়- কয়েকটা মানুষে মিলে ঠেলে নিয়ে যাওয়া ফোরহুইলার! এই গাড়ির নাম ‘পুশ্পুশ’। যাই হোক পুশ্পুশ্ থেকে আমাদের কৌতূহল-দৃষ্টি সরিয়ে এনে হাওড়া-মধুপুর লাইনে রবীন্দ্রনাথের ট্রেনের কামরায় চলে আসি। রেলগাড়িতে রাত্রের সব ভ্রমণই যে সুখপ্রদ হয়, তা হয়তো নয়। যদিও নিজের প্রাণের সঙ্গে রাতের রেলগাড়ির তিনিই তুলনা করতে পারেন, তথাপি সব রাতের রেলভ্রমণই যে মনোরম ও প্রাণবন্ত হবে তার নিশ্চয়ই কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবুও রাতের রেলগাড়িতে আর পাঁচজন যাত্রী থেকে হিসেবে রবীন্দ্রনাথ একেবারেই আলাদা। রাতের রেলগাড়ি মানেই চলন্ত কামরায় শুয়ে চোখ বুজিয়ে হাজারো স্বপ্ন দেখা, আর রবীন্দ্রনাথে স্বপ্ন দেখা মানেই তো হলো তার সৃষ্টির নতুনতর অগ্রবর্তী কোনো স্টেশনে গিয়ে পৌঁছানো।
“রাত্রে হাবড়ায় রেলগাড়িতে চড়িলাম। গাড়ির ঝাঁকানিতে নাড়া খাইয়া ঘুমটা যেন ঘোলাইয়া যায়। চেতনায় ঘুমে, স্বপ্নে জাগরণে, খিচুড়ি পাকাইয়া যায়। মাঝে মাঝে আলোর শ্রেণী, ঘণ্টাধ্বনি, কোলাহল, বিচিত্র আওয়াজে স্টেশনের নাম হাঁকা, আবার ঠং ঠং ঠং তিনটে ঘণ্টার শব্দে মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত অন্তর্হিত, সমস্ত অন্ধকার, সমস্ত নিস্তব্ধ, কেবল স্তিমিততারা নিশীথিনী মধ্যে গাড়ির চাকার অবিশ্রাম শব্দ। সেই শব্দের তালে তালে মাথার ভিতরে সৃষ্টিছাড়া স্বপ্নের দল সমস্ত রাত্রি ধরিয়া নৃত্য করিতে থাকে।”
কালো অন্ধকারের বুক চিরে ছুটন্ত রেলের কামরার মধ্যে কবির মাথার ভিতরে যে সৃষ্টিছাড়া স্বপ্নের দল রাতভর নৃত্য করে, তারাই আবার নৃত্যের তালে তালে নতুন নতুন সৃষ্টির বীজ ওই চার দেওয়ালের মধ্যে এসেই কবিকে উপহার দিয়ে যায়। চেতনায় ঘুমে, স্বপ্নে জাগরণে যা খিচুড়ি পাকিয়ে যাচ্ছে, সেটাই আবার সৃষ্টির রন্ধনশালায় এসে পরমান্ন হয়ে পরিবেশিত হচ্ছে কবির হস্তস্পর্শে।
রবীন্দ্রনাথের লিখিত বর্ণনা পড়তে পড়তে কার না সেই পুরনো দিনের রেলভ্রমণের কথা মনে পড়বে! যেন কোনো হারিয়ে যাওয়া প্রিয়সঙ্গীর স্মৃতি! সেই পুরাতন ইঞ্জিন, সামনে শুঁড় তোলা ধোঁয়া ছাড়ার গোল চিম্নি, কেবিনের মধ্যে জ¦লন্ত কয়লার চুল্লি- যেন মণিকর্ণিকা ঘাট, মাথায় ফেট্টি-বাঁধা সর্বাগ্নে কালিমাখা ব্যস্ত ইঞ্জিন ড্রাইভার, গাড়ি চলার সঙ্গে সঙ্গে আকাশে কালবৈশাখীর কালো মেঘের উড়ে চলা, গভীর রাত্রে স্টেশনে ট্রেন থামলে জানালার পাশ দিয়ে স্টেশনের নাম হেঁকে যাওয়া, ইঞ্জিন থেকে সাদা বাষ্প নির্গত করা ‘কানে তালা খুশি উতলা’ ভেঁপু- নতুন করে আবার চলার সংকেত, তারপর হাজার শব্দের হারমোনিয়াম বাজিয়ে সেই বিশাল সরীসৃপ-যানের এগিয়ে চলা-কু-ঝিকঝিক কু-ঝিকঝিক। প্রথমে আস্তে, তারপর জোরে, তারপর আরও জোরে, কামরা থেকে জানলার বাইরে মুখ বের করা দায়। বাতাসে দম বন্ধ হয়ে আসে, চোখে কয়লা পড়ে!
তা রবীন্দ্রনাথ তো চলেছেন তার খুদে সঙ্গীদের নিয়ে হাজারিবাগের পথে। রাতের রেলগাড়িতে হাওড়া থেকে মধুপুরে এসে ভোর চারটের সময় সেখানে গাড়িবদল করে গিরিডির ট্রেন ধরতে হলো।
“অন্ধকার মিলাইয়া আসিলে পর প্রভাতের আলোকে গাড়ির জানলায় বসিয়া বাহিরে চাহিয়া দেখিলাম।”
কী দেখলেন?
যে চোখ গত সন্ধ্যায় শহর কলকাতাকে দেখেছে, এই কয়েকটা মাত্র ঘণ্টার ব্যবধানে আজ প্রত্যুষে এ কী নতুন দৃশ্য!
“এ কি নতুন দেশ! আমাদের সমতল দেশটা যেন হঠাৎ কি একটা গোলযোগে ভাঙ্গিয়া চুরিয়া ফাটিয়া গেছে। চারিদিকে উঁচু-নীচু, কঠিন, ভাঙ্গা; ছোট-বড় শালগাছে পরিপূর্ণ। শালগাছ অনেক আছে বটে কিন্তু আমদের বাঙ্গলা দেশের মতো গাছে গাছে তেমন গলাগলি ভাব নাই। প্রত্যেক গাছ আপনাপন জমিতে স্বতন্ত্র স্বাধীন হইয়া দাঁড়াইয়া আছে। আমাদের বাঙ্গলা দেশে উদ্ভিদ পরিবারের মধ্যে যেমন একান্নবর্তিত্বের সহস্র বন্ধন, লতায় লতায় গুল্মে গাছে জড়াজড়ি, এখানকার কঠিন মাটিতে সে ভাব দেখিলাম না। এখানকার মানুষদের মধ্যেও বোধকরি সেইরূপ ভাব। লোকালয় বড় দেখা যায় না। দৈবাৎ মাঝে মাঝে এক একটা কুটির সঙ্গীহীন দাঁড়াইয়া।”
রেলের কামরা থেকে আরও কত দৃশ্য দেখতে দেখতে চললেন একের পর এক- যেন ছবির অ্যালবামে এক একটি পাতা উল্টে চলেছেন।
গাড়ি অবিশ্রাম ছুটে সকাল ছটার মধ্যে গিরিডি স্টেশনে এসে পৌঁছল। এখান থেকে শুরু হবে পুশ্পুশ্ যাত্রা।
মনে হয় হাজারিবাগ ভ্রমণ সেরে কলকাতায় ফিরেই রবীন্দ্রনাথকে আবার হাওড়ায় ট্রেনে চাপতে হয় একেবারে দেওঘরে যাবার প্রয়োজনে। উদ্দেশ্য, দেওঘরে তার বাল্যশিক্ষক সুবিখ্যাত রাজনারায়ণ বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। দেওঘর থেকে রাত্রের ট্রেনে কলকাতায় ফিরছেন- সেই বিবরণ রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে পাই। রাতের এই রেলগাড়িই বাংলা সাহিত্যকে উপহার দেয় রাজর্ষি উপন্যাস, যে উপন্যাসের কাহিনি অবলম্বনে কবি পুনরায় বিসর্জন নাটক লিখেছিলেন।
ঠাকুরবাড়ি থেকে বালকদের জন্য মাসিক ‘বালক’ পত্রিকার প্রকাশ শুরু হয়েছে ১২৯২ বৈশাখ থেকে (১৮৮৫ খ্রি.)। যদিও জ্ঞান জ্ঞানদানন্দিনী দেবী নামে- সম্পাদক, তবে হাল ধরতে হয়েছে সবটা ওই ছোট দেবরটিকেই। পত্রিকার অধিকাংশ পাতা পূরণের দায়িত্বও রবীন্দ্রনাথেরই। সুতরাং সবসময় মাথার মধ্যে কী লিখি কী লিখি- এই ভাবনাটা জেগে রয়েছে। ফলে চলন্ত রেলগাড়িতে রাতের শয্যা গ্রহণ করেও ওই একই চিন্তা।
কবির প্রদত্ত বিবরণ : “দুই-এক সংখ্যা বালক বাহির হইবার পর একবার দুই-এক দিনের জন্য দেওঘরে রাজনারায়ণবাবুকে দেখিতে যাই। কলিকাতায় ফিরিবার সময় রাত্রের গাড়িতে ভিড় ছিল, ভালো করিয়া ঘুম হইতেছিল না- ঠিক চোখের উপর আলো জ¦লিতেছিল। মনে করিলাম, ঘুম যখন হইবেই না তখন এই সুযোগে বালকের জন্য একটা গল্প ভাবিয়া রাখি। গল্প ভাবিবার ব্যর্থ চেষ্টার টানে গল্প আসিল না, ঘুম আসিয়া পড়িল। স্বপ্ন দেখিলাম, কোন্ এক মন্দিরের সিঁড়ির ওপর বলির রক্তচিহ্ন দেখিয়া একটি বালিকা অত্যন্ত করুণ ব্যাকুলতার সঙ্গে তাহার বাপকে জিজ্ঞাসা করিতেছে, ‘বাবা, এ কী! এ-যে রক্ত!’ বালিকার এই কাতরতায় তাহার বাপ অন্তরে ব্যথিত হইয়া অথচ বাহিরে রাগের ভাণ করিয়া কোনোমতে তার প্রশ্নটাকে চাপা দিতে চেষ্টা করিতেছে- জাগিয়া উঠিয়াই মনে হইল, এটি আমার স্বপ্নলব্ধ গল্প।”
জানি না ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে রেলের কামরায় বসেই উপন্যাসটি লিখতে শুরু করে দিয়েছিলেন কি না! দেওয়াই সম্ভব। কারণ বালক পত্রিকার আষাঢ় সংখ্যা থেকেই রাজর্ষি উপন্যাসের ধারাবাহিক প্রকাশ শুরু হয়ে যায়। ট্রেনে যখন তিনি স্বপ্ন দেখছেন তখনই তো বালক-এর বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা বেরিয়ে গেছে। সুতরাং, লেখার সূচনা ও ছাপার মধ্যে সময় তো সামান্যই। তাই রেলগাড়িতে বসে যদি লেখার কাজ শুরু নাও হয়, তাহলেও সমগ্র উপন্যাসের ছকটা নিশ্চয় চলন্ত ট্রেনের মধ্যেই তৈরি করে ফেলেছিলেন। ধন্যবাদ তদানীন্তন রেল-কোম্পানিকে, সেদিনের সেই রাতের রেলগাড়িকে, সেই ভিড়ের কামরাটিকে এবং কবির চোখের সামনে সেই রাতজাগা বাতিটিকে। এরাই না আমাদের উপহার দিয়েছে রবীন্দ্রনাথের রাজর্ষি। অনেক পরে লেখা তার গল্পের একটি চরিত্রকে দেখি রেলগাড়ির কামরায় ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখতে। গল্পের নাম ‘অপরিচিতা’। দেওঘর থেকে প্রত্যাগত বাষ্পীয় রথারোহীর সঙ্গে গল্পের ‘আমি’র ভাব-ভাবনার মধ্যে খুব একটা যেন তফাৎ নেই।
“মাকে লইয়া তীর্থে চলিয়াছিলাম।... রেলগাড়িতে ঘুমাইতেছিলাম। ঝাঁকানি খাইতে খাইতে মাথার মধ্যে নানা প্রকার স্বপ্নের ঝুমঝুমি বাজিতেছিল। হঠাৎ একটা কোন্ স্টেশনে জাগিয়া উঠিলাম। আলোতে অন্ধকারে মেশা সেও এক স্বপ্ন; কেবল আকাশের তারাগুলি চিরপরিচিত- আর সবই অজানা অস্পষ্ট; স্টেশনের দীপ-কয়টা খাড়া হইয়া দাঁড়াইয়া আলো ধরিয়া এই পৃথিবীটা যে কত অচেনা, এবং যাহা চারিদিকে তাহা যে কতই বহু দূরে, তাহাই দেখাইয়া দিতেছে। গাড়ির মধ্যে মা ঘুমাইতেছেন; আলোর নিচে সবুজ পর্দা টানা; তোরঙ্গ বাক্স জিনিসপত্র সমস্তই কে কার ঘাড়ে এলোমেলো হইয়া রহিয়াছে, তাহারা যেন স্বপ্নলোকের উলটপালট আসবাব, সবুজ প্রদোষের মিট্মিটে আলোতে থাকা এবং না-থাকার মাঝখানে কেমন- একরকম হইয়া পড়িয়া আছে।”
চলো দার্জিলিং। ১৮৮৭ সাল। শরৎকাল। কবি চলেছেন সপরিজন শৈলাবাস দার্জিলিংয়ে। বিরাট দল। দলে একমাত্র পুরুষ দেবেন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্র রবীন্দ্রনাথ। বাকি সবাই প্রমীলা। সর্বনিম্নের বয়স এক। যাত্রীদলের এই পুরুষ দলপতিটি কারও স্বামী, কারও পিতা, কারও অনুজ ভ্রাতা, কারও প্রিয় মাতুল। কবির সঙ্গে চলেছেন স্ত্রী মৃণালিনী দেবী, বড়দিদি সৌদামিনী দেবী, নদিদি স্বর্ণকুমারী দেবী, তার দুই কন্যা- উনিশ বছরের হিরণ¥য়ী ও পঞ্চদশী সরলা, তাছাড়া কবির এক বছরের প্রথম সন্তান- শিশুকন্যা বেলা এবং তাদের সঙ্গে এক দাসী। এতগুলি মহিলা নিয়ে একা রবীন্দ্রনাথ চলেছেন পাহাড়ে। অভিজ্ঞতা মানে- বছর পাঁচেক আগে এই পথে একবার আসা জ্যোতিদাদার সঙ্গে।
তখনও পদ্মার ওপরে সারা ব্রিজ হয়নি, স্টিমারে করে নদী পেরিয়ে মিটার গেজের ছোট গাড়িতে উঠতে হতো শিলিগুড়ি যাবার জন্য। সে ছিল সত্যিই এক ঝঞ্ঝাট দার্জিলিং যাবার পক্ষে। অথচ কয়েকদিন দার্জিলিংয়ে গিয়ে থাকার জন্য মালপত্রের বোঝা তো আর কম হয় না। আর একালের মতো সেকালে তো লোকে অমন হোটেল-মোটেলে গিয়ে উঠত না; উঠতে হতো রীতিমতো আগে থেকে বাড়িঘর ভাড়া করে নিজেদের আয়োজনে সবকিছু ব্যবস্থাপত্র করে। তার উপরে আবার দার্জিলিং শীতের দেশ, সেপ্টেম্বর অক্টোবরে সেখানে শীত যথেষ্ট জাঁকিয়েই পড়ে। সুতরাং এতগুলি মহিলা বালিকা নাবালিকা ও শিশু নিয়ে মাসখানেকের পরিকল্পনায় দার্জিলিং যাওয়া মানে মালপত্রের বোঝা যে কী বিপুল পরিমাণ হবে তা অনুমেয়। সেকালের মতো একালে আর কেউ বেড়াতে যাবার জন্য বাসন-কোসন বিছানা-বেডিং নেয় না। এখন তো রেলগাড়ির মধ্যেই বেডরোল মিলছে।
কিন্তু ১৮৮৭ সালের ভারতবর্ষের রেলে তো আর সে-ব্যবস্থা ছিল না; আর দার্জিলিংয়ে খুব ভালো হোটেলের সমারোহও তখন ছিল না- সুতরাং ঠাকুরবাড়ির লোকেদের দার্জিলিংয়ে থাকার জন্য ২৪৩ টাকা দক্ষিণায় ঈধংঃষবঃড়হ ঐড়ঁংব ভাড়া নিতে হয়েছিল।
সকালের ট্রেন রাত্রে পদ্মাপাড়ে এসে থমকে যায়। রেললাইন এখানে এসে দাঁড়িয়ে গেছে। এখন রেলযাত্রীদের মালপত্র-তল্পিতল্পা নিয়ে নতুন করে স্টিমারে ওঠার পালা- কারণ নদী পেরিয়ে ওপারে গিয়ে আবার ধরতে হবে অন্য রেলগাড়ি।
ট্রেন থেকে স্টিমার, স্টিমার থেকে নেমে আবার ট্রেন- সেই ব্যস্ত হন্তদন্ত ছোটাছুটি হাঙ্গামার বিবরণ সরাসরি কবির মুখ থেকেই শোনা যাক।
“সারা-ঘাটে স্টিমারে ওঠবার সময় মহা হাঙ্গাম। রাত্রি দশটা- জিনিসপত্র সহস্র, কুলি গোটাকতক, মেয়েমানুষ পাঁচটা এবং পুরুষমানুষ একটিমাত্র। নদী পেরিয়ে একটি ছোটো রেলগাড়িতে ওঠা গেল- তাতে চারটে করে শয্যা, আমরা (মাখন-সুদ্ধ) ছটা মনিষ্যি। মেয়েদের এবং অন্যান্য জিনিসপত্র খধফরবং ঈড়সঢ়ধৎঃসবহঃ-এ তোলা গেল- কথাটা শুনতে যত সংক্ষেপ হল কাজে ঠিক তেমনটা হয়নি। ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি, ছুটোছুটি নিতান্ত অল্প হয়নি- তবু নদিদি বলেন আমি কিছ্ইু করিনি। অর্থাৎ, আমার মতো ডাগর পুরুষমানুষের পক্ষে পাঁচজন মেয়ে নিয়ে এর চেয়ে ঢের বেশি ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি এবং ছুটোছুটি করা উচিত ছিল, মাঝে মাঝে যেখানে সেখানে নেবে হিন্দুস্তানি বুলিতে চষধঃভড়ৎস-ময় দাপিয়ে বেড়ানো উচিত ছিল। অর্থাৎ, একখান আস্ত মানুষ একেবারে আস্ত রকম ক্ষেপলে যে রকমটা হয় সেই প্রকার মূর্তি ধারণ করলে ঠিক পুরুষমানুষের উপযুক্ত হত। আমার ঠা-া ভাব দেখে নদিদি নিতান্ত ফরংধঢ়ঢ়ড়রহঃবফ। কিন্তু এই দুদিনে এত বাক্স খুলেছি এবং বন্ধ করেছি এবং বেঞ্চির নিচে ঠেলে গুঁজেছি এবং উক্ত স্থান থেকে টেনে বের করেছি, এত বাক্স এবং পুঁটুলির পিছনে আমি ফিরেছি এবং এত বাক্স এবং পুঁটুলি আমার পিছনে অভিশাপের মতো ফিরেছে, এত হারিয়েছে এবং এত ফের পাওয়া গেছে এবং এত পাওয়া যায়নি এবং পাবার জন্য এত চেষ্টা করা গেছে এবং যাচ্ছে যে, কোনো ছাব্বিশ বৎসর বয়সের ভদ্র সন্তানের অদৃষ্টে এমনটা ঘটেনি।”
মিটার গেজের ছোট গাড়িতে মেয়েদের লেডিজ কম্পার্টমেন্টে তুলে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজে অন্য একটি কামরায় এসে উঠলেন।
রাতটা তো গাড়ির কামরাতেই কাটল। পরের দিন শিলিগুড়িতে নেমে আবার ট্রেনবদল। কলকাতা থেকে সারা-ঘাট পর্যন্ত ট্রেন এল ব্রডগেজে, পদ্মা পেরিয়ে শিলিগুড়ি পর্যন্ত রেললাইন হল মিটারগেজ, তারপর শিলিগুড়ি থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে ঘুরতে ঘুরতে উঠতে উঠতে যে সরু লাইন দার্জিলিং স্টেশনে গিয়ে পৌঁছেছে তা হল ন্যারোগেজ। এই ন্যারোগেজ লাইনের ওপর দিয়েই চলে ছোট-বড় সকলের মনভোলানো জগৎ-বিখ্যাত টয়ট্রেন- যেন শিশুদের খেলনার রেলগাড়ি। ইঞ্জিনের ভোঁস ভোঁস আওয়াজ পাহাড়ে-পাহাড়ে যতই প্রতিধ্বনি তুলুক, তার গতি অতি মন্থর। স্টেশন থেকে ট্রেন ছেড়ে দিলেও মাটির ভাঁড়ে চা খেতে খেতে চলন্ত ট্রেনে ওঠা যায়। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ট্রেন যখন ঝিকঝিক করে চলে, তখন জানলা দিয়ে এক পাশে দেখা যায় গা-ছম্ছম্-করা গভীর নিচু খাদ আর অন্য দিকে হাত বাড়ালেই পাহাড়ি ফুলের বন্যা। যেন পাহাড় জুড়ে ফুলের রংমশাল। একটি একটি করে তুলতে তুলতে কামরা কখন ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। ছুটে চলা পাহাড়ি মেয়ের মত দেখতে লাগে বাঁকে বাঁকে হারিয়ে যাওয়া এই তন্বী রেলগাড়িকে। যারা তার আতিথ্য পায় তারা সত্যিই সৌভাগ্যবান।
সুতরাং এই পুতুল রেলে চেপে দার্জিলিং পাহাড়ে উঠতে উঠতে রবীন্দ্রের পঞ্চদশী কিশোরী ভাগ্নীটি যদি জানলার ধারে বসে বারেবারেই রবিমামার চাপকান টেনে টেনে বলে ‘ওমা কী চমৎকার’ ‘কী আশ্চর্য’ ‘কী সুন্দর’ ‘রবিমামা দেখো দেখো’ তাহলে তা আদৌ অস্বাভাবিক বা অন্যায় নয়। সঙ্গে চলেছে ভাগ্নীরা, চিঠি লিখছেন ভাইঝিকে।
“গাড়ি চলতে লাগল। বেলি ঘুমোতে লাগল, বন পাহাড় পর্বত ঝর্ণা মেঘ এবং বিস্তর খাঁদা নাক এবং বাঁকা চোখ দেখা দিতে লাগল। ক্রমে ঠা-া,তার পরে মেঘ, তার পরে নদিদির সর্দি, তার পরে বড়দিদির হাঁচি, তার পরে শাল কম্বল বালাপোষ, মোটা মোজা, পা কন্কন্, হাত ঠা-া, মুখ নীল, গলা ভার ভার এবং ঠিক তার পরেই দার্জিলিং।”
রবীন্দ্রনাথ যদিও চিঠিতে লিখেছেন- গাড়ি চলল, মেঘ জমল, ঠা-া নামল এবং শেষে দার্জিলিংয়ে এসে গাড়ি থামল; কিন্তু সত্যি সত্যিই সে-যাত্রায় দার্জিলিং তাদের কাছে অত সহজে আসেনি। মেঘে ঢাকা শীত-কনকনে পূর্ববর্তী ‘ঘুম’ স্টেশনকেই যে ভুল করে দার্জিলিং ভেবে সদলবলে ট্রেন থেকে নেমে পড়তে গিয়েছিলেন- সেই করুণ কাহিনি কি আর যাত্রীদলের একমাত্র পুরুষ ‘অভিভাবক’ নিজের কলমে লিপিবদ্ধ করে রাখেন? কিন্তু এই রেলভ্রমণে স্নেহের ছোট ভাই রবির কীর্তি-কাহিনি অপ্রচারিত রাখার মত দিদি তো আর নদিদি নন। নদিদি স্বর্ণকুমারী তার ভারতী পত্রিকায় দার্জিলিং ভ্রমণপর্বে রবিকে ঘিরে রেলরঙ্গের কথা ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করে দিলেন। এও এক কবি-কাহিনি।
“আমরা যদিও এই নূতন দার্জিলিং আসিয়াছি, কিন্তু আমাদের অভিভাবকটি... আগে আর একবার আসিয়াছিলেন। ঘুম স্টেশনে পৌঁছিবার কিছু আগে হইতে তিনি ভাবিয়া লইয়াছেন এইবার ট্রেন দার্জিলিং স্টেশনে আসিবে। তিনি যত বাড়ি ঘর দেখিতেছেন ততই প্রফুল্ল হইয়া উঠিতেছেন, তাঁহার পূর্ব স্মৃতি ততই নূতন হইয়া উঠিতেছে, গতবার যে বাড়িতে ছিলেন তাহার কাছে যে ঝরনাটি ছিল সেটি পর্যন্ত তিনি আমাদের দেখাইলেন, সবই মিলিয়া গেল, এখন কেবল গাড়ি থামিলে হয়- দার্জিলিং এ নামামাত্র বাকি। গাড়িও থামিল, তিনি চারিদিকে চাহিয়া দেখিলেন আমাদের কেহ লইতে আসিয়াছে কি না, দেখিলেন কোথাও কেহ নাই। কাজেই আমরা গাড়িতে বসিয়া রহিলাম, লোকজন ডাকিয়া আমাদের যাইবার বন্দোবস্ত করিবেন বলিয়া তিনি নামিলেন। এদিকে কুলিরা জিনিস লইতে উপস্থিত... জিনিস লইবে কি না জিজ্ঞাসা করিতেছে। আমরা কি বলিব- কিছু ভাবিয়া পাইতেছি না,- আমাদের ভাব দেখিয়া একজন কুলি একটা বাক্সে হাত দিয়া চোখ নাড়িয়া বলিল- গুম-গুম-স্টিশন উতরেগা? আমরা তখন বুঝিলাম এটা দার্জিলিং নয়- এই সময় আমাদের অভিভাবকটিও ফিরিয়া আসিলেন, তখন ঘুম শুনিয়া তাঁহার ঘুম ছুটিয়া গেল। নহিলে সেইখানে সেই শীতে রাত কাটাইতে হইলেই হইয়াছিল আর কি, সে রাতে তো ট্রেন ছিল না।”
নদিদির কথায় ভ্রাতার ঘুম তো ছুটল। এদিকে পুতুলরেলও অল্প বিরাম নিয়ে দার্জিলিংয়ের পথে ঘুম থেকে ছুটল। এবং শেষ পর্যন্ত সে-গাড়ি সত্যি সত্যিই আকাক্সিক্ষত দার্জিলিং স্টেশনে এসে পৌঁছল।
সুতরাং ‘আবার সেই বাক্স, সেই ব্যাগ, সেই বিছানা, সেই পুঁটুলি। মোটের ওপর মোট, মুটের ওপর মুটে। ব্রেক থেকে জিনিসপত্র দেখে নামানো, চিনে নেওয়া, মুটের মাথায় চাপানো, সাহেবকে রসিদ দেখানো, সাহেবের সঙ্গে তর্কবিতর্ক, জিনিস খুঁজে না পাওয়া, এবং হারানো জিনিস পুনরুদ্ধারের জন্য বিবিধ বন্দোবস্ত করা’- এতে কবিবর রবীন্দ্রনাথের ঘণ্টা দুই সময় লেগেছিল।
ঘুমের ঘটনা নিয়ে নদিদি যে একটা স্টোরি বানাবেন- রবি বুঝি তখনই কিছুটা শঙ্কিত-অনুমান করেছিলেন। তাই দার্জিলিংয়ে পৌঁছেই ইন্দিরাকে লেখা চিঠিতে তার পিসির কাহিনিও আগেভাগে শুনিয়ে রাখেন রবিকা।
ট্রেন থেকে নেমে এই যে ঘণ্টা দুই সময় গেল, ভাই জানেন, এর জন্যও নদিদির কাছে প্রাপ্য হয়ে উঠল কিঞ্চিৎ স্নেহমিশ্রিত অনুযোগ। তাই কবি ভাইঝিকে নদিদি সম্পর্কেও দু-কথা লিখতে ছাড়েন না। দার্জিলিং স্টেশনে যখন সবকিছু গুছিয়ে নিতে রবীন্দ্রনাথ ব্যস্ত, “ততক্ষণে নদিদিরা ডুলিতে চ’ড়ে বাড়িতে গিয়ে, শালটি মুড়ি দিয়ে, সোফায় শুয়ে বিশ্রাম করছিলেন এবং কল্পনা করছিলেন যে রবি ঠিক পুরুষ মানুষের মতো নয়।”
এর পরের চিঠিতেই কবি লিখছেন নিদারুণ কোমরের যন্ত্রণায় তিনি শয্যাগত। লিখছেন, “প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন, তবু কোমর কেন টন্টন্ করে রে!” তা কোমরের আর দোষ কি? এই দুদিনে তার ওপর দিয়ে কম ধক্কল গেল? সে এই দুদিনে কম মাল কি ওঠাল-নামাল?
[চলবে]

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ আগস্ট ২০১৯

  • ০৮ আগস্ট ২০১৯