হিসেব

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০১৭, ১৬:৫৮ | আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০১৭, ১৭:০১

অনলাইন ডেস্ক

খোন্দকার কাওসার আহমেদ

কাজের মেয়ের টাকা বুঝিয়ে দিয়ে আম্মু চলে গেলেন ছোট খালার বাসায়। তারও আগে আব্বু অফিসে। ছোট বোনটা আম্মুর সাথে। বাসায় আমি একা। দু’দিন পর ঈদ। দেয়ালের ঘড়িতে এখন বাজে সকাল দশটা। কাজের মেয়েটার আসার সময় হয়েছে। ওর বয়স তেরো। আমি নতুন হিসেব মেলাতে বসে গেলাম।
কলিং বেল নষ্ট। দরজায় নক্ হচ্ছে। টক্ টক্। দরজা খুলে দিলাম।  
-    এই যে তুমি এসেছ? এসো। আচ্ছা, তুমি ঐ চেয়ারটায় বসো। তোমার সঙ্গে আমার একটা হিসেব আছে।
সে বসলো না। যেখানে প্রথমে এসে দাঁড়িয়েছিল, সেখানেই সে মাথা নিচু করে নিশ্চল। আসলে এ ধরনের আপ্যায়ন তার কপালে জোটেনি। আমি বল্লাম,
-    ঠিক আছে। তুমি বরং আমার ঐ আরাম-নরম খাটে পা ঝুলিয়ে বসে থাকো। ঈদের বোনাসসহ গত মাসের বেতন তোমাকে দেওয়া হবে।
হিসেবের কাগজে মন দিলাম। তীক্ষè মনোযোগ। দ্রুত কলম চল্ছে। খস্খস্ কাটাকুটির শব্দ। হিসেবটা ছিল সু²।
-    তোমার মাসিক বেতন পাঁচশত টাকা। ঈদ বোনাস দুইশত টাকা। অর্থাৎ তুমি পাচ্ছো সাতশ টাকা। অবশ্য আমার কাছে ‘সাতশ’ অংকটা ভালো ঠেকছেনা। তোমাকে বরং পুরোটাই মানে, এক হাজার টাকা দেওয়া উচিৎ। কি বলো?
মুখের দিকে তাকালাম। পরিবর্তন। সত্যি বলছি, স্পষ্ট পরিবর্তন দেখতে পেলাম। মুখাবয়ব ঈষৎ রক্তিম। চোখ দুটো ঝিলমিল করছে।
-    তুমি আমার টেবিলের কার্নিস ঘেঁসে দাঁড়াও এবং যদি পড়তে পারো তাহলে এই হিসেবের কাগজের দিকে তাকাও।
দেখ,
-    হিসেবটা আমি কিন্তু অতি যতœ সহকারে তৈরি করেছি। যাকে বলে চুলচেরা হিসেব। কোন গড়মিল নেই। তুমি নিশ্চিত থাকতে পারো।
দেখ,
-    তুমি গত মাসের পাঁচ তারিখে আমার একটা দামী বিদেশী গেঞ্জিতে সাবান ঘষতে গিয়ে ছিঁড়ে ফেলেছ, যা এখন ব্যবহার অযোগ্য। ওর মূল্য ছিল তিনশত টাকা। কেটে নেওয়া হলো।
এইখানে দেখ। হ্যাঁ এইখানে। একটু ঝুঁকে দেখো,
-    পনের তারিখে একটা ট্রে ভেঙ্গে ফেলেছ। দাম একশত পঞ্চাশ টাকা। কেটে নেওয়া হলো।
তার দিকে তাকালাম। যেখানে দাঁড়িয়েছিল ঠিক তার মাথার উপর ফ্যান ঘুরছিল। ফুল স্পীডে। সে তবুও ঘামছিল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামর শ্বেত বিন্দু। ও- হ্যাঁ। আর এই দেখ,
-    এখানে লিখা আছে। গত মাসের বাইশ তারিখে বাবার চিকিৎসার জন্য পাঁচশ টাকা নিয়েছ। এটাও কেটে নেওয়া হলো।
আমি হিসেবের কাগজে মনোযোগ আরও গভীর করলাম। গণন যন্ত্রের বাটনে দুটো আঙ্গুল দ্রুত ওঠানামা করলো। সেদিকে তাকিয়ে কাটাকাটা উচ্চারণে বল্লাম, তুমি-পাচ্ছো-পঞ্চাশ-টাকা-মাত্র। তার দিকে একটা হলুদ খাম এগিয়ে দিলাম। বল্লাম- নাও।
চোখ দুটো তার কান্নায় উছলে উঠেছে। জলে ভরভর করছে। পাখরের মত নিথর। হাত বাড়াচ্ছে না। অসহ্য। আমি ধমক দিলাম,
-    না- ও। খুচরো টাকা সবই। গুণে গুণে নাও।
কম্পিত হস্তে খাম খুললো। এক-দুই-তিন। পাঁচশ-পাঁচশ-পাঁচশ।
পনেরশ। জলে ভরভর চোখ দুটো জল আর ধরে রাখতে পারলোনা। হা- হতোস্মি। বললাম,
-    রিমিকে (ছোটবোন) এবারের ঈদে দুই হাজার টাকা দিয়েছি। তোমাকে না হয় একটু কম-ই দিলাম। যা দিলাম বোনের মত গ্রহণ করো।
আমার পায়ের দিকে তার দুটো হাত ঝুঁকে আসছিল। আমি বাধা দিলাম। যাবার সময় মখমলের গলায় বলে গেল-
-    ভাইজান! সেলামালাইকুম।
বুঝলাম, মানুষকে কষ্ট দেওয়া কত কষ্টের অথচ খুশি করা কত সহজ।


লেখক : সহকারী শিক্ষক, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, পাবনা

 

 

পুরনো সংখ্যা
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ আগস্ট ২০১৯

  • ০৮ আগস্ট ২০১৯