আরেকটা টিএন শেষনের জন্য অনেককাল অপেক্ষা করতে হবে

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০১৯, ১৬:১৮

গৌতম রায়

 

প্রশাসন আর প্রশাসকদের ওপরে দেশের মানুষের আস্থার পরিমাণটা যখন ক্রমশ তলানিতে ঠেকছে, এ-রকম একটা সময়ে যিনি আমলাতন্ত্রের অঙ্গীভূত হয়েও, আমলাতন্ত্রের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে বেরিয়ে এসে, সাম্প্রতিক অতীতে সাধারণ মানুষের মধ্যে, প্রশাসন এবং প্রশাসকদের সম্পর্কে একটা আস্থার পরিবেশ তৈরি করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন, সেই টিএন শেষনের সম্প্রতি জীবনাবসান হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনার হিসেবে টিএন শেষন সম্ভবত প্রথম এবং এখনও পর্যন্ত একমাত্র বর্ণময় ব্যক্তিত্ব। দেশের প্রথম নির্বাচন কমিশনার বাঙালি আইসিএস সুকুমার সেনের স্মৃতি এখনকার প্রজন্মের মানুষের কাছে প্রায় ঝাপসা হয়ে এসেছে। সদ্য স্বাধীন দেশে ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-নিরক্ষর নির্বিশেষে সকলের ভোটাধিকার নিশ্চিত করবার লক্ষ্যে একটি সামগ্রিক রূপরেখা প্রণয়নে সুকুমার সেন যে ভূমিকা এবং অবদান রেখেছিলেন, শেষন সেই পটভূমিকাকেই সময়ের ও অভিজ্ঞতার নিরিখে একটি নির্দিষ্ট লক্ষমাত্রার দিকে উপনীত করার চেষ্টা করেছিলেন।

সুকুমার সেনের পর বহু মানুষ দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা প্রত্যেকেই নিজের নিজের অঙ্গন থেকে যথেষ্ট দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও দেশের প্রতিটি মানুষের নির্বাচনী অধিকার সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে, নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে, বিশেষ করে জাল ভোট ও ছাপ্পা ভোটকে রোখার ভাবনাকে কেন্দ্র করে প্রথম নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেন যে ভাবনা-চিন্তাগুলো করেছিলেন, সেই সমস্ত পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে প্রথম উদ্যোগী হয়েছিলেন শেষন।

আজকের ভারতবর্ষে প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তার প্রতিটি ক্ষেত্রে ভোটার কার্ডের গুরুত্বের কথা কেউ অস্বীকার করতে পারেন না। অথচ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে শেষন যখন এই ভোটার কার্ড প্রণয়নের কথা চিন্তা-ভাবনা করেন, তখন দলমত নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই এই ভোটার কার্ড প্রণয়নের ভাবনাটাকে একটা পাগলামো বলে প্রকাশ্যে অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন।

বামপন্থি থেকে দক্ষিণপন্থি কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বই তখন ভোটার কার্ড ঘিরে তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার শেষনের অনড় অবস্থানকে ‘পাগলামো’ বলতে প্রকাশ্যে দ্বিধাবোধ করেননি। ভোটার কার্ড প্রণয়ন ঘিরে সেদিন শেষনের যে অনড় অবস্থান, সেই অবস্থান নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু যে-ধরনের মন্তব্য করেছিলেন তা জ্যোতি বাবুর সামগ্রিক রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে কতখানি সংগতিপূর্ণ, তা নিয়েও ঘোরতর বিতর্ক রয়েছে। শাসকবিরোধী, সব শিবিরের সমস্ত রকমের বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও প্রতিটি ভোটারের সচিত্র পরিচয়পত্রের বিষয়টি থেকে কিন্তু শেষন সরে আসেননি। কোনোরকম আপস করেননি। যে প্রশ্নগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তোলা হচ্ছিল, সেগুলোর প্রাসঙ্গিকতা যথেষ্ট ছিল। ভারতবর্ষের একটা বড় অংশের মানুষের মাথাগোঁজার ঠাঁই নেই। তারা দুবেলা-দুমুঠো খেতে পান না। এসব মানুষজন, এই সচিত্র পরিচয়পত্র কীভাবে নিজেদের কাছে সুরক্ষিত রাখতে পারবেন এবং পরবর্তী ভোটের সময় সেই সচিত্র পরিচয়পত্র দাখিল করে তাদের নাগরিক অধিকার জ্ঞাপন করবেনÑ এই প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠলেও, শেষন তার আমলা জীবনের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার দ্বারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, রাজনৈতিক দলগুলোর ভোট জালিয়াতি রুখবার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

শেষন অনুভব করেছিলেন যে, সচিত্র পরিচয়পত্রের ভিতর দিয়ে সামগ্রিকভাবে ভোট জালিয়াতির অবসান হয়তো সম্ভবপর হবে না, তবু ভোট জালিয়াতি রুখবার জন্য এই যে উদ্যোগ, সেটি যদি গ্রহণ করা না হয়, তাহলে আগামী দিনে গোটা ভারতবর্ষের সমস্ত স্তরের গণতান্ত্রিক পদ্ধতির নির্বাচন-ব্যবস্থা কার্যত একটা প্রহসনে পরিণত হবে। এই দূরদৃষ্টির তাগিদ থেকেই শেষন সমস্ত রাজনৈতিক দলের যাবতীয় উপহাসকে উপেক্ষা করে সচিত্র পরিচয়পত্রের প্রশ্নে কার্যত একগুঁয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন। সচিত্র পরিচয়পত্র নিয়ে এই অবস্থানের পাশাপাশি নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে শাসকদলের আধিপত্য খর্ব করে, গোটা বিষয়টির ভেতরে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষতার পরিবেশ তৈরি করে, সাধারণ মানুষের কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি, প্রশাসনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়ার সময় নির্বাচন কমিশনকে সক্রিয় করার ক্ষেত্রে টিএন শেষন যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন তা আজ সবাই স্বীকার করেন।

সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তথা ত্রিপুরা রাজ্যের প্রাদেশিক সম্পাদক গৌতম দাশ প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, ত্রিপুরা কংগ্রেস সরকার তাদের মেয়াদ শেষে নির্বাচনের সময়ে ভয়াবহ ভোট ডাকাতির উপক্রম করেছিল। যে পদ্ধতিতে তারা তাদের রাজ্যের বিগত নির্বাচনে দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সন্তোষমোহন দেবের নেতৃত্বে ভোট ডাকাতির ভেতর দিয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছিল ত্রিপুরা রাজ্যে, সেই পদ্ধতি পুনঃপ্রয়োগের যাবতীয় ষড়যন্ত্র ত্রিপুরার তৎকালীন কংগ্রেস সরকার করে ফেলেছিল। গোটা বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে দেশের তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার শেষনকে জানায় সেই সময়ের বিরোধী বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো। সঠিক তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার পর, সেই নির্বাচনকে যথাযথ করতে, সমস্ত মানুষ যাতে সুনির্দিষ্টভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে, রাজনৈতিক দল পরিচালিত প্রশাসনকে অতিক্রম করে, দেশের সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে যে দায়িত্বভার অর্পণ করেছে, সেই দায়িত্বভারের সঠিক প্রয়োগ ঘটিয়ে, ত্রিপুরায় একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার যাবতীয় ব্যবস্থা মূলত শেষন উদ্যোগী হওয়াতেই সম্ভবপর হয়েছিল। সেই নির্বাচনে সাধারণ মানুষ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার ফলে, বামপন্থিরা সে রাজ্যে আবার ক্ষমতাসীন হয়। টিএন শেষন নয় মৃত্যুর অব্যবহিত পরে, সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে সিপিএমের ত্রিপুরা রাজ্য কমিটির সম্পাদক গৌতম দাশের এই মূল্যায়ন একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত হিসেবে বর্তমান অস্থির রাজনৈতিক সময়ের বুকে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সচিত্র পরিচয়পত্র ঘিরে শেষনের ভূমিকা নিয়ে জ্যোতি বসুর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আজও বহু মানুষ নানা ধরনের রাজনৈতিক মন্তব্যের মাধ্যমে বামপন্থিদের অসম্মান, অমর্যাদা করে থাকে। কিন্তু বামপন্থিরা ইতিহাসের নির্মম মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ভারতবর্ষের সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ব্যতিক্রমী, সেই কথাটি আজ শেষনের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে সেদিনের ত্রিপুরায় অবাধ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে শেষনের নিরপেক্ষ ভূমিকার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে গৌতম দাশের শ্রদ্ধার্ঘ্যরে ভেতর দিয়ে ফুটে উঠেছে।

শেষন নির্বাচন পরিচালনার বিষয়াবলিকে অবাধ করবার তাগিদে সচিত্র পরিচয়পত্রের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেই উদ্যোগটিও সম্পূর্ণ সফল হয়েছে এ-কথা বলা যায় না। কারণ নানা সময়, নানাভাবে নকল পরিচয়পত্র তৈরির নানা খবর আমরা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারি। তা সত্ত্বেও বলতে হবে, জরুরি অবস্থা থেকে শুরু করে ভি পি সিংয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বকালে হরিয়ানার মেহাম নির্বাচন কেন্দ্রের নির্বাচনী অনাচার ঘিরে সাধারণ মানুষের ভেতরে যে প্রবল হতাশার পরিবেশ রচিত হয়েছিল, তার জের নির্বাচনী পরিম-লকে অতিক্রম করে প্রশাসনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও পড়তে শুরু করেছিল।

গোটা বিষয়টি দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে এক ধরনের ভয়াবহ বিপদের সম্ভাবনা তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছিল। এই প্রেক্ষিতকে প্রতিরোধ করে, প্রশাসন, আমলাতন্ত্রের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে টিএন শেষন একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে গেছেন। শেষন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার থাকাকালীন দু-একটি জায়গায় পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএম যন্ত্র ব্যবহার করা হলেও, মূলত পোস্টাল ব্যালটেরই প্রচলন ছিল তখন।
এখন ভারতবর্ষের প্রায় সবকটি নির্বাচনেই ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ হয়। এই ইভিএম ঘিরেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নানা ধরনের অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা প্রকাশ্যে ইভিএম ঘিরে যে-ধরনের মন্তব্য করছেন, তাতে ইভিএমের নিরপেক্ষতা নিয়ে সাধারণ মানুষের সংশয়ী হয়ে ওঠাটা বিচিত্র কোনো ব্যাপার নয়। এই সংশয় দূর করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন। আজ পর্যন্ত কোনো দৃঢ় অবস্থান নেয়নি। ইভিএম ঘিরে যে অভিযোগ, সেটির কোনো সারবত্তা আছে কি না, তা নিয়ে সুস্পষ্টভাবে নির্বাচন কমিশন আজ পর্যন্ত প্রকাশ্যে কিছু বলেনি।

অপরপক্ষে কিছু কিছু রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রকাশ্যে বলছেন, মানুষ ইভিএমের যে বোতাম টিপুক না কেন, একটি দলের চিহ্নেই ভোট যাবে। এ-রকম কথা বলার পরেও, কিন্তু সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সেই নেতাদের বিরুদ্ধে কোনোরকম সতর্কতা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের ভেতরে ইভিএম যন্ত্র নিয়ে একটা সংশয়ের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। তাই সাধারণ মানুষের কাছে এখন বারবার মনে হচ্ছে টিএন শেষনের মতো একজন ব্যক্তিত্ব যদি নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বে থাকতেন তাহলে হয়তো এই সংশয়ের পরিবেশটা তৈরি হতো না। বস্তুত শাসককে তোয়াক্কা না করে নিজের বিবেক অনুযায়ী সততার সঙ্গে প্রশাসনের নিজের ভূমিকা পালন করার যে দৃষ্টান্ত ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার শেষন রেখে গেছেন, তেমন ভূমিকাতে কোনো আমলাকে আবার দেখবার জন্য হয়তো আমাদের আরও বহুকাল অপেক্ষা করে থাকতে হবে।

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৭ অক্টোবর ২০১৯

  • ৩ অক্টোবর ২০১৯

  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯