টরন্টোয় পাঠশালার চতুর্দশ আসর

ট্রুডোর গ্রন্থ ‘কমন গ্রাউন্ড’ নিয়ে আলোচনা

প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ১২:২৬

অনলাইন ডেস্ক

 

কানাডার টরন্টোভিত্তিক শিল্প-সাহিত্য চর্চার প্ল্যাটফর্ম পাঠশালার চতুর্দশ আসর হয়ে গেল গত ২৯ আগস্ট। স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় এগলিন্টন স্কয়ারে টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান একই সঙ্গে দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির আসরও। পাঠশালার এবারের আসরে কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর লেখা আত্মজৈবনিক রাজনৈতিক স্মৃতিকথনমূলক গ্রন্থ ‘কমন গ্রাউন্ড’ নিয়ে আলোচনা করেন বইটির বাংলা অনুবাদক মনিস রফিক।
কমন গ্রাউন্ড ২০১৪ সালে হারপার কলিন্স থেকে প্রকাশিত হয়। বইটি প্রকাশের সময় জাস্টিন ট্রুডো লিবারেল পার্টির নেতা ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হন বই প্রকাশের পর।
মনিস রফিক আলোচনার শুরুতে বইটির ব্যাপারে তার আগ্রহ জন্মানো এবং পরবর্তী সময়ে অনুবাদের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। এরপর তিনি একে একে বইটির প্রতিটি অধ্যায় নিয়ে আলোকপাত করেন। কমন গ্রাউন্ড বইটি ৯টি অধ্যায়ে ভাগ করা। প্রথম অধ্যায় চাইল্ডহুড অ্যাট টোয়েন্টিফোর সাসেক্স। ২৪ সাসেক্স কানাডার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন। ওখানেই কাটে জাস্টিনের শৈশব। তার বাবা পিয়েরে এলিয়ট ট্রুডো তখন কানাডার প্রধানমন্ত্রী। বাবার প্রধানমন্ত্রিত্ব শেষ হওয়ার পর জাস্টিনরা সপরিবার চলে যান মন্ট্রিয়লে। তারপরেই দ্বিতীয় অধ্যায় গ্রোয়িং আপ ইন মন্ট্রিয়ল।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন বা অটোয়ায় প্রধানমন্ত্রীকেন্দ্রিক যে রাজনীতি এবং তার পরিবারের কথা বলতে বলতে জাস্টিন চলে যান মন্ট্রিয়ল পর্বে। মন্ট্রিয়লে বেড়ে ওঠা, স্কুলে পড়া, বিশ^বিদ্যালয়ে পড়া, বিশ^বিদ্যালয়ের বিতর্ক দলে যোগ দেওয়া, রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হওয়া ইত্যাদি। এই অংশের পরপরই আসে বিশ^বিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েশনের পরপর জাস্টিনের ঘুরতে বেরিয়ে যাওয়ার কথা। তার বাবাও ছিলেন অসম্ভব ভ্রমণপিপাসু। ঘুরেছেন অসংখ্য দেশ।
১৯৯৫ সালে ২৩ বছর বয়সে কানাডার ম্যাকগিল বিশ^বিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যের সদ্য-গ্র্যাজুয়েট জাস্টিন কয়েকজন বন্ধুসহ বেরিয়ে পড়েন এক বছরের জন্য বিশ^ ভ্রমণে। সঙ্গে শুধু একটা ব্যাকপ্যাক। গন্তব্য তিন মহাদেশের বেশ কয়েকটি জায়গা। এর আগেই ৫০টির বেশি দেশ ঘুরেছেন তিনি বাবার সঙ্গে। ফ্রান্সের নরম্যান্ডি হয়ে প্যারিস, লন্ডন, স্পেন, জিব্রালটার থেকে ফেরিতে করে মরক্কো, সাহারা মরুভূমি, মৌরিতানিয়া, মালি, বুরকিনা ফাসো, আইভরি কোস্ট, ঘানা, টোগো, বেনিন হয়ে নাইজেরিয়া, এরোফ্লেট ফ্লাইটে করে মাল্টা ও মস্কো হয়ে হেলসিংকি, ফিনল্যান্ড, মস্কো থেকে ট্রান্স-সাইবেরিয়ান এক্সপ্রেস ট্রেনে ৯ হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বেইজিং, সাংহাই, হংকং, হ্যানয়, ব্যাংকক।
বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা নিয়ে এক বছর পর ফেরেন তিনি। জাস্টিনের ভাষ্যে, ‘এ-রকম ব্যাপৃত ও বিস্তৃত ভ্রমণ, প্রতিটি ভ্রমণকারীকেই কিছু-না-কিছু বদলে দেয়। আমার ক্ষেত্রেই তা-ই হয়েছে। এই ভ্রমণ ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে জানা-বোঝা এবং এর গুরুত্বের ব্যাপারে আমার সচেতনতা অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়। আরও ভালো করে বুঝতে পারি, এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করতে পারে আমাদের ‘কমন গ্রাউন্ড’। পৃথিবীর নানান জায়গা ঘুরে আমি দেখেছি, বদ্ধ সমাজের চেয়ে, নানান সংস্কৃতিকে ধারণ
করা সমাজ অনেক বেশি ডায়নামিক। এই ভ্রমণে আমি সব জায়গায় স্থানীয়দের দেখেছি। এরাই সংখ্যাগুরু। এরাই মূলধারা।
এছাড়া অন্যরা, প্যারিসের উত্তর আফ্রিকানরা, বুরকিনা ফাসোয় ইউরোপিয়ানরা, আইভরি কোস্টে লেবাননের সুপারমার্কেটের মালিকেরা, রাশিয়ার চায়নিজ ছাত্ররা, থাইল্যান্ডে অস্ট্রেলিয়ানরা, সব জায়গার বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীÑ সবাই ‘আদার্স’। এর ঠিক উল্টোটা আমরা দেখি কানাডায়। আধুনিক কানাডিয়ান আইডেনটিটির ভিত্তি এথনিক-ধর্মীয়। ঐতিহাসিক বা ভৌগোলিক অঞ্চলভিত্তিক না। কানাডীয়রা অনেক বর্ণের, অনেক সংস্কৃতির, অনেক ধর্মের। আমরা বরং একটা ন্যাশনাল আইডেনটিটি তৈরি করতে পেরেছি। যার ভিত্তি শেয়ারড ভ্যালুজ। যেমনÑ উন্মুক্ততা, শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার, সমতা ও সুযোগ-সুবিধা।
‘আমার সারাজীবনে যে শ-খানেক দেশ ভ্রমণ করেছি। তার অনেকগুলোতেই এসব মূল্যবোধের প্রতি আকাক্সক্ষা দেখেছি। কিন্তু বলা চলে, কানাডাই সেই অর্থে একমাত্র দেশ, যেখানে এসব মূল্যবোধ দিয়েই ব্যক্তির আইডেনটিটি নির্ধারিত হয়। আর এ কারণেই, এই পৃথিবীতে আমাদের দেশই একমাত্র জায়গা, যা ভিন্নতা সত্ত্বেও শক্তিশালী নয়, বরং ভিন্নতার জন্যই শক্তিশালী।’
মনিসের আলোচনায় জানা যায়, জাস্টিন কখনও ভাবেননি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হবেন। ভ্রমণের সময়ে, আফ্রিকায় প্রবেশের আগে ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে পাহাড়ি একটা নীরব জায়গায়, ধ্যানস্থ হয়ে তিনি তার আগামীর কথা ভাবেন। আসলে এই গোটা সফরের পেছনের একটা উদ্দেশ্য ছিল। নিজের সঙ্গে কথা বলা, নিজেকে ফিরে দেখা, নিজের জীবনের লক্ষ্য নিয়ে ভাবা।
নরম্যান্ডিতে তার মনে হয় তিনি স্কুলশিক্ষক হবেন। সেখান থেকেই রীতিমতো উচ্ছ্বসিত হয়ে মা মার্গারেট সিনক্লেয়ার ট্রুডোকে ফোন করে জানান ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা। মা খুব খুশি হয়ে জাস্টিনকে মনে করিয়ে দেন, তার পরিবারের শিক্ষকতার লেগাসির কথা। জাস্টিনের বাবার মতো নানা জিমি সিনক্লেয়ারও ছিলেন রাজনীতিবিদ। জিমি উত্তর ভ্যাঙ্কুভার থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। গত শতকের ষাটের দশকের লিবারেল পার্টির নেতা জিমি ফেডারেলের ফিশারিজ মন্ত্রী ছিলেন। অত্যন্ত বিদগ্ধ এই মানুষ দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধে কানাডার হয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
নানা জিমি সিনক্লেয়ারের গল্প করতে করতেই জাস্টিন চলে যান তৃতীয় অধ্যায় ‘ট্রাভেলিং ইস্ট, গোয়িং ওয়েস্ট’-এ। এই অধ্যায়ে আসে জাস্টিনের ভ্যাঙ্কুভারে শিক্ষকতার কথা। এর মধ্যে আসে পারিবারিক কিছু গল্প। তার সবচেয়ে ছোট ভাই মিশেলের মৃত্যুর কথা। তার দুই বছর পর বাবার মৃত্যুর কথা। ভাইয়ের মৃত্যু তার বাবা আসলে মেনে নিতে পারেননি। আর এই বিষাদের কথা ঠাঁই পেয়েছে পরবর্তী অধ্যায় ‘দ্য উডস আর লাভলি ডার্ক অ্যান্ড ডিপ’-এ।
বিখ্যাত মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা থেকে নেওয়া নাম। ‘...দ্য উডস আর লাভলি ডার্ক অ্যান্ড ডিপ/বাট আই হ্যাভ প্রমিজেস টু কিপ/অ্যান্ড মাইলস টু গো বিফোর আই সিøপ/অ্যান্ড মাইলস টু গো বিফোর আই সিøপ।’
জাস্টিনের মনে হয়, মৃত্যুর আগে তার অনেক কাজ রয়ে গেছে। ভাই মিশেল মারা গেল, বাবা মারা গেলেন। মা একা হয়ে গেলেন। জাস্টিন তার কাজগুলো সারার জন্য ফিরে আসেন আবার মন্ট্রিয়লে।
মনিস বলেন, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৯৬৪ সালে মারা যান। মৃত্যুর সময় তার টেবিলের ওপর এই লাইনগুলো লেখা পাওয়া গিয়েছিল। এই কবিতা উদ্ধৃত করে জাস্টিন তার কষ্টের স্মৃতিগুলো লিখেছেন। পরের অধ্যায়ের নাম দিয়েছেন ‘টু লাইফ চেঞ্জিং ডিসিশনস’। এ পর্যায়ে তাকে অতিগুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। তিনি বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। একটা সুখী পরিবার তার খুব আরাধ্য ছিল। কারণ, জাস্টিনের বাবার দাম্পত্য জীবন খুব সুখের হয়নি। পিয়েরে ট্রুডো প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় ৫২ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন রাজনীতিবিদ জিমি সিনক্লেয়ারের চতুর্থ কন্যা মার্গারেট সিনক্লেয়ারকে। মার্গারেটের বয়স তখন ২২। ৩০ বছরের ব্যবধান পিয়েরে ও মার্গারেটের। কিন্তু তারপরও জাস্টিন নিজের কাছাকাছি বয়সের কাউকে বিয়ে থা করে সন্তান নিতে চাইছিলেন। কারণ, তিনি তার বাবার প্রচ- সন্তানবাৎসল্য দেখেছেন। এটা ছিল জাস্টিনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আর দ্বিতীয়টি ছিল রাজনীতিতে যোগদান। তিনি যদিও সেভাবে আসতে চাননি; কিন্তু জীবনের এই পর্যায়ে রাজনীতিতে যোগদান তার জন্য অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।
মনিস বলেন, জাস্টিনের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া, এমপি নির্বাচিত হওয়া এসবের কথা আছে পঞ্চম অধ্যায় ‘পাপিনো : পলিটিকস ফ্রম ডাউন আপ’-এ। তার বাবার রাইডিং ছিল মন্ট্রিয়লের অভিজাত রয়্যাল মাউন্ট। আর জাস্টিন বেছে নেন পাপিনো রাইডিং। এই এলাকা আয়তনে খুব ছোট। আবার অর্থনৈতিকভাবে খুব সাধারণ মানুষের রাইডিং। পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকে আসা বিভিন্ন ভাষাভাষী অভিবাসীদের বসবাস সেখানে। মাল্টিকালচারিজম ও চার্টার অব রাইটসকে অগ্রাধিকার দেওয়া জাস্টিন খুব সচেতনভাবেই পাপিনো রাইডিং বেছে নেন। যেখানে বিচিত্র ধর্ম-বর্ণ-ভাষার লোকজন মিলে এক বৈচিত্র্যপূর্ণ পৃথিবী গড়ে তুলেছে। এই রাইডিং থেকে তিনি ফেডারেল নির্বাচনে লিবারেল পার্টি থেকে প্রার্থী হন।
এখানে উল্লেখ্য, নির্বাচনে দলের নমিনেশন কিন্তু জাস্টিনকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পেতে হয়েছিল। রীতিমতো প্রতিবাদ করে। প্রথমে দলের সমর্থন ছিল না। বাবা পিয়েরের পরিচিতিতে না, একদম নিজের পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে, নিজ যোগ্যতায় তিনি সেটি অর্জন করেন। পাপিনো থেকে তিনি নির্বাচিত হন। আর এই এমপি হিসেবে তার কর্মযাত্রার কথা জানা যায় পরবর্তী অধ্যায় ‘লাইফ অ্যাজ রুকি এমপি’ থেকে। এমপি হওয়ার পর অনেকেই জনগণের সঙ্গে আর যুক্ত থাকেন না। জাস্টিন এই ধারণাকে একদম ভেঙে দেন। এই অধ্যায়ে তার নির্বাচনী এলাকা পাপিনোর মানুষের সঙ্গে তার নানা মাত্রায় পথচলার গল্প উঠে এসেছে।
এরপরের অধ্যায়ে এসেছে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কথা। ২০০০ সালে লিবারেল পার্টির আসনসংখ্যা ছিল ১৭৬। ২০১১ সালে এসে তা দাঁড়ায় ৩৪টিতে। কানাডার এই ঐতিহ্যবাহী দলটির অস্তিত্ব তখন প্রশ্নের মুখে। এনডিপিও তখন পেয়েছিল ১০৩টি আসন। আর কনজারভেটিভরা ১৬৬ আসন। অনেক রাজনৈতিক বোদ্ধা মন্তব্য করেছেন, লিবারেল পার্টি শেষ। এটিকে এনডিপি’র সঙ্গে যুক্ত করা ছাড়া আর উপায় নেই।
আর এসবের আলোচনার সঙ্গে সঙ্গেই আসছে ‘দ্য পাথ টু লিডারশিপ’ অধ্যায়টি। তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাস্টিনের নেতৃত্বে আসার পথ উন্মোচিত হয়। যদিও তিনি নিজে তা চাননি। দলকে মুমূর্ষু অবস্থা থেকে বাঁচাতে উপায়ান্তর না দেখেই আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বদানের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হয় তাকে। একদম শেষ অধ্যায় ‘হোপ অ্যান্ড হার্ড ওয়ার্ক’। এখানে জানা যায়, সেই সময় কানাডায় লিবারেল পার্টির সদস্যসংখ্যা ছিল ৩০ হাজার। জাস্টিন পুরো কানাডার এমাথা-ওমাথা চষে বেড়ান। এভাবে লিবারেল পার্টির সদস্যসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ লাখে। মনিস যোগ করেন, এসব অগ্রগতির ধারাবাহিকতাতেই ২০১৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনে লিবারেলরা জয়ী হয়ে মেজরিটি সরকার গঠন করে। ওই সময়কার প্রাদেশিক নির্বাচনেও দেখা যায় লিবারেলদের জয়জয়কার। বইটি এভাবে ৯টি অধ্যায়ে সাজানো।
মনিস বলেন, কমন গ্রাউন্ড বইয়ের ৯টি অধ্যায়ের বাইরে, শুরুতে আছে প্রাক্?-কথন আর শেষে অ্যাপেন্ডিকস। পাপিনোর লিবারেল নমিনেশনের, লিবারেল পার্টির লিডারশিপ রেস শুরুর সময়ের, লিবারেল পার্টির লিডারশিপ রেসের, লিবারেল পার্টির নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণের সময়কার দেওয়া বক্তৃতাগুলো স্থান পেয়েছে অ্যাপেন্ডিকসে। বইটির ভাষা এত সরল ও প্রাণবন্ত যে পাঠক অনায়াসে বইটির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতে পারেন। পড়লেই বোঝা যায়, লেখক হিসেবে জাস্টিনের আন্তরিক প্রয়াস। বইয়ে তিনি কোনো রাখঢাক রাখেননি। নিজের সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন, মায়ের ব্যাপারে লিখেছেন। কিছুই লুকাননি। বাড়িয়েও লেখেননি।
বইটির নাম প্রসঙ্গে মনিস বলেন, কানাডা দেশটিই সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের কমন জায়গা। যেখানে মানুষেরা একই মূল্যবোধে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। আর জাস্টিন এই কমন গ্রাউন্ডকে তার দার্শনিক বোধে সার্বক্ষণিকভাবে ধারণ ও লালন করেন। একে অগ্রাধিকার দেন। এ পর্যায়ে মনিস আত্মজীবনীর তুলনামূলক আলোচনা করেন। বলেন, পৃথিবীতে খুব কম দেশই আছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী বাবা-মায়ের সন্তান প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে, আমেরিকা মহাদেশে এটি খুব সাধারণ চিত্র না। আর প্রধানমন্ত্রীর সন্তান তার রাজনৈতিক-ব্যক্তিক-দার্শনিক ভাবনাকে তুলে ধরে আত্মজৈবনিক লেখা লিখেছেন, এমন সংখ্যা আরও কম।
জওহরলাল নেহরুর কন্যা ইন্দিরা গান্ধীর কিছু স্মৃতিকথন আছে। তবে সম্পাদিত। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর কন্যা বেনজির ভুট্টো লিখেছেন। যোগ্যতায় অনেকাংশে জাস্টিন ট্রুডোর সঙ্গে তার সাযুজ্য পাওয়া যায়। বেনজির লিখেছেন ‘ডটার অব দ্য ইস্ট’। বেনজির ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। দু-দফায় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
জাস্টিন বিরোধী দলের নেতা থাকাকালে বই লেখেন। আর বেনজির লেখেন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর। জাস্টিন পড়েছেন কানাডার ম্যাকগিল বিশ^বিদ্যালয়, ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ^বিদ্যালয় ও মন্ট্রিয়ল বিশ^বিদ্যালয়ে। বেনজির পড়েছেন আমেরিকার হার্ভার্ড ও ব্রিটেনের অক্সফোর্ডে। জাস্টিন ছিলেন ম্যাকগিলের ডিবেটিং ইউনিয়নে। বেনজিরও ছিলেন অক্সফোর্ডের ডিবেটিং ইউনিয়নের সভাপতি। জাস্টিন তুখোড় বক্তা। বেনজিরও।
কিন্তু এত মিলের পরেও দুজনের মধ্যে বিস্তর ফারাক। জাস্টিন আত্মজীবনীর নাম দিলেন ‘কমন গ্রাউন্ড’। আর বেনজিরের বইয়ের নাম ‘ডটার অব দ্য ইস্ট’। নামকরণেও দুজনের মনোজগতের ভিন্নতা কিছুটা বোঝা যায়। জীবনের মানে খুঁজতে জাস্টিন এক বছরের জন্য বিশ^ভ্রমণে গিয়ে ফ্রান্সের নরম্যান্ডির পাহাড়ে আবিষ্কার করলেন নিজের পথ। ঠিক করলেন ছোট বাচ্চাদের পড়াবেন। আর বেনজিরের স্বপ্নই ছিল ন্যূনতম ফরেন সার্ভিসে যোগদান।
বেনজির তার পূর্বপুরুষের আলোচনায় লিখছেনÑ এক ব্রিটিশ প্রশাসক লারকানা অঞ্চল ঘুরতে বেরিয়ে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করেন, জায়গাটা কার? ড্রাইভার জানায়, ভুট্টোর। এভাবে কয়েক দফা জিজ্ঞাসার পর ড্রাইভার কিছুটা বিরক্ত হয়ে পড়লে সেই প্রশাসক বলেন, তিনি ঘুমাবেন, লারকানার ভুট্টোর অঞ্চল শেষ হলে যেন তাকে ডেকে দেওয়া হয়। একসময় ঘুম ভেঙে তিনি জিজ্ঞেস করেন, জায়গাটা কার? ড্রাইভারের উত্তর, ভুট্টোর। বেনজির লিখেছেন, পাকিস্তানের অন্য ভূস্বামীদের জমিজমা মাপা হয় একরে। আর তাদেরটা করা হয় মাইলে। মাটির কাছে, তৃণের কাছে, গণমানুষের কাছে, পায়ে-পায়ে বেনজির কখনও হাঁটতে পারেননি।
আর ওদিকে কমন গ্রাউন্ডের ভূমিকার এক জায়গায় জাস্টিন ট্রুডো লিখেছেনÑ এই দেশকে নিয়ে আমার স্বপ্ন রূপ পেয়েছে আমার নিজ অভিজ্ঞতা এবং আমার ওপর ট্রুডো ও সিনক্লেয়ার-বাবা ও মা-ফরাসি ও ইংরেজ-পূর্ব ও পশ্চিমের প্রভাবে। প্রতিটি নদী যেমন শত শত শাখানদীর সমষ্টি, ঠিক তেমনি আমিও নানা ধরনের মানুষের, নানা অঞ্চলের সমষ্টি। আমি কারও সন্তান; কিন্তু আজ আমি একজন স্বামী, বাবা এবং নিজ দেশের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত এক মানুষ। কানাডাকে ন্যায়বিচার, সমতা ও সম-অভিপ্রায়ের দিকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে আসীন হতে আমি মনে করি, আমার নিজের ভাষায় নিজের গল্পগুলো তোমাদের জানানো খুব দরকার। তাহলে তোমরা আমাকে ঠিকঠাক বুঝতে পারবে, রাজনীতির চাকচিক্যের বাইরের এই আমাকে তোমরা চিনে নিতে পারবে। আমাকে চালিত করা মূল দায়িত্ব তোমাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে চাই। আর সেটা হচ্ছেÑ কমন গ্রাউন্ডকে লালন করে দেশের সেবা করা, যেই ন্যায্য দেশে কানাডার প্রত্যেক নাগরিক তার নিজের স্থান খুঁজে নেবে।
আলোচক মনিস বলেন, আত্মজীবনীর খুব একটা চ্যালেঞ্জিং জায়গা হচ্ছে শুরুটা। শুরুতেই ফুটে ওঠে ব্যক্তির মনন, বোধ, মনোজগতের অনেকটুকু। জাস্টিন তার বইয়ের একদম শুরুতে চলে যান ১৯১১ সালের স্কটল্যান্ডের ছোট্ট শহর এবারডিনশায়ারে। সেই শহরে বাস করতেন জেমস জর্জ সিনক্লেয়ার নামের এক শিক্ষক। তার খুব মাছ ধরার নেশা। একদিন এক জায়গায় মাছ ধরতে গেলে মালিকের ভৃত্য তাকে বাধা দেয়। তিনি প্রতিবাদ করলে তাকে জেল-জরিমানার ভয় দেখানো হয়।
তখন তার এক বন্ধু জানায় একটি জায়গার কথা। ৪ কিলোমিটার দূরে, আটলান্টিকের ওপারে, নাম ব্রিটিশ কলম্বিয়া। ওখানে উন্মুক্ত নদ-নদী-প্রান্তর রাষ্ট্রের মালিকানায়। ব্যক্তির নয়, সামন্ত প্রভুর নয়। ওখানে ইচ্ছেমতো মাছ ধরা যাবে। তখন জেমস তার পূর্বপুরুষের জন্মভিটার মায়া ছেড়ে, রীতিমতো বিদ্রোহ করে ১৯১৩ সালে তিন বছরের সন্তান জিমি সিনক্লেয়ারকে সঙ্গে নিয়ে সপরিবার পাড়ি জমান ব্রিটিশ কলম্বিয়ায়। এই জিমি সিনক্লেয়ারই জাস্টিনের নানা। জিমির চতুর্থ সন্তান মার্গারেট জাস্টিনের মা।
জেমসের গল্পটা জাস্টিন এনেছেন কমন গ্রাউন্ডের কথা বলতে গিয়ে। জেমসের মতো আরও লাখ মানুষ নানা মাত্রায়, নানাভাবে কানাডাকে বেছে নিয়েছে তাদের নিজেদের স্থান হিসেবে, কমন গ্রাউন্ড হিসেবে। এ পর্যায়ে জাস্টিন বেশ নাটকীয়ভাবে উল্লেখ করেন অসম্ভব মেধাবী, পিয়ারসন্সের মন্ত্রিসভার আইনমন্ত্রী, পরবর্তী সময়ে দু-দফায় ১৫ বছর কানাডার প্রধানমন্ত্রী, কানাডার অন্যতম সম্পদ চার্টার অব রাইটসের জনকÑ পিয়েরে ট্রুডোর কথা। ১৯৪১ সালে নানা জিমি তখন লিবারেল পার্টির হয়ে নির্বাচনে জিতে মন্ত্রী হয়ে বেশ আলোচনায়। ঠিক একই সময় আরেকটি ঘটনা বেশ সাড়া ফেলে দেয়। মন্ট্রিয়লের একদল ছেলে ডিঙিতে করে ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার জলপথ পাড়ি দিয়ে জেমস বেতে পৌঁছায়। এর মধ্যে ছয়জনের ছবি বেশ ফলাও করে মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। তাদেরই একজন ফরাসি-কানাডিয়ান বুদ্ধিজীবী পিয়েরে এলিয়ট ট্রুডোÑ জাস্টিনের বাবা।
মনিস বলেন, ২৪ সাসেক্সে জাস্টিন তাদের জীবনের গল্পগুলো বলতে গিয়ে তার জন্মের সময়কার গল্প বলেন। জাস্টিনের জন্মটা বেশ প্রতীকী। তখন কানাডাসহ উন্নত অনেক দেশেই হাসপাতালে সন্তান জন্মদানের সময় বাবা উপস্থিত থাকার অনুমতি ছিল না। ১৯৭১ সালে জাস্টিন হওয়ার সময় মা মার্গারেট বেঁকে বসেন। বলেন, হয় সন্তান জন্মদানের সময় স্বামী থাকবেন, না হয় তিনি হাসপাতালে যাবেন না। বাসাতেই জন্ম নেবে সন্তান। মার্গারেটের এই দাবি সংগত কারণেই কর্তৃপক্ষের মাথাব্যথার কারণ হয়। মার্গারেটের অনড় অবস্থানেই কারণেই শত বছরের পুরনো নিয়ম বদলায়। সেই থেকে হাসপাতালে সন্তান জন্মদানের সময় বাবার উপস্থিতি শুরু হয়। একদিকে জাস্টিনের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘদিনের পুরনো নিয়মের অবসান ঘটে, আরেক দিকে জাস্টিনের জন্ম ২৫ ডিসেম্বরে। মনিসের ভাষ্যে, যিশুর মতো ত্রাতা হিসেবে যেন তিনি আবির্ভূত হন।
মনিসের আলোচনায় আরও জানা যায়, জাস্টিনরা তিন ভাই। তিনি বড়। তার দুই বছরের ছোট ভাই আলেকজান্ডার ট্রুডো সাশা ও সাশার দুই বছরের ছোট ভাই মিশেল। সাশা ডকু-ফিল্ম নির্মাতা ও লেখক। তিন ভাইয়ের শৈশবের দুরন্তপনা, দস্যিপনার গল্প আছে প্রথম অধ্যায়জুড়ে। বাবার সঙ্গে তিন ভাই স্কির সঙ্গী হতো, লেকে ডিঙি বাইত, ট্রেকিং করত, বাবার উৎসাহে কারাতে-বক্সিংসহ আরও নানা কিছুর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের সঙ্গে দেখা হওয়ার স্মৃতি জাস্টিন বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তার স্বপ্নের কাউবয়-নায়ক রিগ্যান তাকে কয়েকটা কবিতা শোনান। সে-সবের রেফারেন্স ধরে জাস্টিন আবার বইগুলো পড়েন। খুব ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার নেশা জাস্টিনের। এই বইয়েও অসংখ্য বইয়ের রেফারেন্স এসেছে। বাবা-মায়ের দাম্পত্য-সংকটের কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়েও বইয়ের প্রসঙ্গ এসেছে। অনেক অনেক আনন্দের মধ্যেও এই সংকট বিষাদে ডুবিয়ে দিত তাকে। সেই সময়গুলোতে তিনি বইয়ের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতেন, খুঁজতেন বইয়ের মধ্যে পরিত্রাণ।
বয়সের পার্থক্য ছাড়াও বেড়ে ওঠার ভিন্নতার কারণে বাবা-মায়ের ব্যক্তিত্বের সংঘাত প্রবল হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। পিয়েরে ছোটবেলা থেকেই ছিলেন নিয়মনিষ্ঠ, পরিশ্রমী ও কাজ-পাগল। মা ছিলেন আবেগী। বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ জাস্টিনের জীবনে এক বিরাট ক্ষত। তবে পরে যখন জাস্টিন মা মার্গারেটের বাইপোলার ডিজঅর্ডারের কথা জানতে পারেন, তখন উপলব্ধি হয়, তিনিসহ কেউই আসলে মাকে বুঝতে পারেননি। ওই সময়কার মানসিক রোগের ব্যাপারে অসম্ভব স্টিগমাটাইজড সমাজে মার্গারেট ট্রুডো একসময় প্রকাশ্যে মানসিক রোগের ব্যাপারে মুখ খোলেন ও ক্যাম্পেইন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তার ‘চেঞ্জিং মাই মাইন্ড’ বইটি লেখা। মার্গারেট হলিউড ও কানাডার কয়েকটি ফিল্মে অভিনয়ও করেছেন। একসময় জাস্টিনের সঙ্গে মা মার্গারেটের খুব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মজার ব্যাপার হলো, বাবা পিয়েরে তার গাইড, ফিলোসফার, আদর্শ হলেও স্বভাবগতভাবে তিনি বাবার মতো নন; বরং মায়ের মতো।
আলোচক মনিস বলেন, কমন গ্রাউন্ডের দুই পাতাজুড়ে আছে বাংলাদেশের স্মৃতিচারণা। খুব ছোট্ট একটি ঘটনা বালক জাস্টিনের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। জাস্টিনের ভাষ্যে, ‘১৯৮৩ সালে নয়াদিল্লিতে কমনওয়েলথ রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মেলনে বাবা যোগ দেন। সেবারে বাবার সঙ্গে আমিও ছিলাম। দিল্লি যাওয়ার পথে, বাবা বাংলাদেশে যাত্রাবিরতি করেন। কানাডার আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশে একটি বাঁধের নির্মাণকাজ পরিদর্শন করতে। কানাডার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মধ্য দিয়ে আমাদের গাড়িবহর যাওয়ার সময় এক ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যামে অসহায়ভাবে আটকা পড়ে।’
‘এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ও ব্যস্ত শহরের প্রধান এক সড়কে স্থবির সেই গাড়িবহরের একটি সরকারি গাড়ির পেছনের সিটে ছিলাম আমি। আশপাশের সবাই জ্যাম ছাড়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। আমি গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। দেখি রাস্তার পাশে এক বৃদ্ধ তার সাইকেল নিয়ে রাস্তা পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমাদের গাড়িবহরটি গেলেই তিনি রাস্তা পার হবেন। বৃদ্ধের মুখে অসংখ্য বলিরেখা। বিপর্যস্ত জীবনের কাছে হার মানার ক্লান্তি তার চেহারায়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য এই বৃদ্ধের আর আমার যাত্রাপথ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আমার ভেতরে অদ্ভুত এক বেদনাবোধ তৈরি হয় এই ভেবে যে এই বৃদ্ধের জীবনের গল্প কোনো দিনই জানা হবে না আমার। তিনি কোথা থেকে এসেছেন, কোথায় যাচ্ছেন, তার জীবনটা কেমন, কিছুই জানা হয়ে উঠবে না আমার। তার জীবনের নানান ঘটনা, স্বপ্ন, উদ্বেগÑ সব মিলিয়ে তিনি আমার মতোই বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ। আকস্মিকভাবে আমার উপলব্ধি ঘটে, এই পৃথিবীর বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষের মতো তিনি ও আমি, আমরাও কেবল দুটি মানুষ। প্রত্যেকেই একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে বিবেচনার দাবি রাখে। আমাদের প্রত্যেকেরই বলার মতো নিজস্ব একটা গল্প আছে।
‘আমার ধারণা, ১২ বছরের বালকের এমন বোধোদয় বিচিত্র কিছু না। কেউ কেউ অবশ্য এগুলো ভুলে যায় পরমুহূর্তেই। আবার কেউ কেউ টের পায়, সামান্য কয়েকটি মুহূর্তের অভিজ্ঞতা জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আমূল পাল্টে দিতে পারে। আমি দ্বিতীয় দলে। আমার সেই সফরের সব সুখস্মৃতিসহ বাবার সঙ্গের আরও বহু অসাধারণ সব ভ্রমণের মধ্যে, এই ঘটনা বিশেষ সুবিধাভোগী এক বালক আর একমাত্র সম্বল জং ধরা সাইকেল থেকে বাধ্য হয়ে নেমে পড়া এক বৃদ্ধের মধ্যকার সরু কিন্তু গভীর ফাঁক আবিষ্কার করার মুহূর্তটাÑ আমার মনে আজীবনের জন্য গেঁথে যায়। তখন থেকে আমার জীবন ও পারিপাশির্^কতা দেখার দৃষ্টি অনেকটাই বদলে যায়।’
বইজুড়ে এ-রকম ছোটখাটো আরও অনেক না-ভোলা ঘটনার দারুণ সব স্মৃতিচারণা, মানুষ হিসেবে জাস্টিনের সংবেদনশীলতা, মানবিকতার দিকটি স্পষ্ট করে তোলে। আরেক জায়গায় জাস্টিন লিখছেন, ‘আমার বাবার ক্যারিয়ার ও বাসার বাইরের সময়টুকু আসলে তিনি কী করতেন, আট-নয় বছর বয়স পর্যন্ত আমি তা ঠিক ধরে উঠতে পারিনি। মায়ের গল্পে জানতে পারি, আমি না-কি একবার ছেলেবেলায় বাবা সম্পর্কে বলেছিলাম, দ্য বস অব কানাডা। কিন্তু তখন জানতাম না কথাটার মানে কী? আমার বন্ধুদের বাবা-মায়েরা যে কাজ করতেন, তা আমি বুঝতে পারতাম। কেউ হয়তো স্টোরে কাজ করতেন, কেউ ছিলেন ডাক্তার, কেউবা কাজ করতেন রেডিওতে। কিন্তু পাবলিক সার্ভিস ব্যাপারটা আমার কাছে খুব দুর্বোধ্য ঠেকত। কদিন বাবাকে আমাদের বাড়ির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে, খটকা আরও বাড়ে। বাবা জানান, আমাদের কাপড়চোপড়, বইপত্রের মালিক যেমন আমরা, সেই অর্থে বাড়িটা আমাদের না। বাবার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে যাই। প্রশ্ন করি, আমরা তো ২৪ সাসেক্সের বাড়িটায় থাকি, তাহলে কেন ওটা আমাদের হবে না? বাবা বোঝান, ওটার মালিক সরকার। বাবার এমন উত্তর আমার কাছে আরও বেশি দুর্বোধ্য ঠেকে। ভাবিÑ আমার বাবা তো কানাডার বস, তাহলে ওটা আমাদের হবে না কেন? তবে কিছুদিনের মধ্যেই এর উত্তর পেয়ে যাই। ১৯৭৯ সালে ফেডারেল নির্বাচনে লিবারেল পার্টি হেরে গেলে আমাদের রাতারাতি ২৪ সাসেক্সের বাড়িটা ছেড়ে কয়েক ব্লক পরে বিরোধী দলের নেতার স্টোরনোওয়ের বাসভবনে গিয়ে উঠতে হয়। ওই দিন সত্যি সত্যিই বুঝতে পেরেছিলাম, কানাডার জনগণই কানাডার আসল বস।
এই কথাটাই কিন্তু জাস্টিনের রাজনৈতিক দর্শনের মূল।
মনিসের আলোচনায় জানা যায়, ১৯৮৪ সালে জাস্টিনরা মন্ট্রিয়লে সপরিবার চলে গেলে, তিনি দ্বিভাষী অর্থাৎ ইংরেজি ও ফরাসি দুটো ভাষা জানলেও তাকে নানা পরিসরে নানারকম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। জাস্টিনের ভাষ্যেÑ অটোয়া থেকে মন্ট্রিয়লের দূরত্ব দুই ঘণ্টার হলেও সংস্কৃতিগতভাবে যোজন যোজন ফারাক। বাবা যেই স্কুলে পড়তেন, সেই নামী ব্রেবফেই পড়েন তিনি। মেধাবী জাস্টিনের ইচ্ছে ছিল বাবার মতো ম্যাকগিলে আইন পড়ার। কিন্তু পরে তিনি মত পাল্টান। সিদ্ধান্ত নেন ইংরেজি সাহিত্যে পড়ার। তিনি মনে করেন, এই বিশ^সাহিত্যের সঙ্গে যোগ মানুষকে আরও মানবিক করে তুলতে পারে। এখনও তিনি, শত ব্যস্ততায় প্রতি মাসে অন্তত দুটি বই পড়েন। পড়ার স্বভাবটা ছাড়েননি তিনি একেবারেই। ম্যাকগিলে পড়াকালে রাজনীতির একরকম পাঠ হয় তার। কুইবেকে তখন স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে গণভোট হওয়ার কথা। আর জাস্টিন তার বাবার মতো মনেপ্রাণে ফেডারেলিস্ট। কারণ, কানাডার কমন গ্রাউন্ডের-মাল্টিকালচারিজমের দর্শন এই বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জাস্টিন তখন স্বায়ত্তশাসনের পক্ষের শার্লট চুক্তির নেতিবাচক দিক, ফাঁকফোকর নিয়ে ক্যাম্পেইন শুরু করেন। জনে জনে বোঝান চুক্তির খুঁটিনাটি। ১৯৯৫ সালের গণভোটে খুব অল্প ব্যবধানে সেপারেটিস্টরা হেরে যায়।
আলোচক বলেন, জাস্টিন ম্যাকগিল থেকে গ্র্যাজুয়েশনের পর, বিশ^ভ্রমণে বেরিয়ে, ফ্রান্সের নরম্যান্ডির পাহাড়ে নিজ জীবনের দিশা খুঁজে পেয়ে তা বাস্তবায়ন করতে চলে যান, নানাবাড়ির স্মৃতিবিজড়িত ব্রিটিশ কলম্বিয়ায়। শিক্ষকতার প্রস্তুতি হিসেবে, ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ^বিদ্যালয়ে অ্যাডুকেশনে পড়েন বছরখানেক। ভ্যাঙ্কুভারের ‘ওয়েস্ট গ্রে পয়েন্ট স্কুলে’ শিক্ষকতা শুরুর আগে চলার খরচ জোগানোর জন্য তিনি বাচ্চাদের স্নো-বোর্ডিং শেখাতেন। নাইট ক্লাবে সিকিউরিটির কাজও করেন এই সময়। খুব সাধারণ জীবনযাপন ছিল তার। ট্রুডো নামটাও অনেক জায়গায় এড়িয়ে যেতেন সচেতনভাবে। বাবা বলতেন, ‘দেখো, ট্রুডো নামের কিন্তু একটা ওজন আছে। অকারণে এই নাম ব্যবহার কোরো না।’ বক্সিং জাস্টিনের খুব পছন্দের। বক্সিং শিখতেন একসময়। তার ইনস্ট্রাক্টর প্রায় দেড় বছর পর কোনোভাবে জানতে পারেন যে তিনি প্রধানমন্ত্রীর ছেলে।
ওদিকে, ভ্যাঙ্কুভারে পড়ানোর সময়ই ঘটে ৯/১১-এর ঘটনা। তখনকার উপলব্ধি তিনি লিখছেন এক জায়গায়, ‘জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে; কিন্তু ভিজিল্যান্স যেন সব মুসলিমের জন্য আতঙ্কের না হয়ে ওঠে।’ আড়াই বছরের স্কুল-শিক্ষকতা তিনি মনেপ্রাণে উপভোগ করেন এবং বলেন, রাজনীতিবিদ হিসেবে তার সাফল্যের পেছনের অন্যতম কারণ তার শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা। ভালো শিক্ষক যেমন দুর্বল ছাত্রটির উত্তরণে চেষ্টা করেন, ঠিক তেমনি একজন যথার্থ রাজনীতিবিদ চেষ্টা করেন দুর্বলদের-প্রান্তিকদের-অরক্ষিতদের স্বার্থ দেখার।
আলোচনায় জানা যায়, জাস্টিন ভ্যাঙ্কুভারে থাকাকালে ১৯৯৮ সালে তার ছোট ভাই মিশেল মারা যায়। কোকনি পাহাড়ের গ্লেসিয়ারে চাপা পড়ে। অসম্ভব ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে পূর্ণ মিশেল ছিল পুরোদস্তুর প্রকৃতির সন্তান। ভালোবাসত আদিবাসীদের। নানারকম দুঃসাহসিক অভিযান করে বেড়াত সে গহিন অঞ্চলে। স্কির প্রতি ছিল অসম্ভব দুর্বলতা। আর তার মৃত্যুও ঘটে অসময়ে স্কি অভিযানে গিয়ে। ভাইয়ের মৃত্যুর পর জাস্টিন খুব সক্রিয়ভাবে পরিবেশ ও এভালানশ সেফটি নিয়ে ক্যাম্পেইন শুরু করেন কানাডাজুড়ে। মিশেলের মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি বাবা-মা। রোগে ভুগলেও, মানসিকভাবে একদম ভেঙে পড়েছিলেন বাবা। এই পরিস্থিতিতে জাস্টিন আবার মন্ট্রিয়লে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। মিশেলের মৃত্যুর দুই বছরের মাথায় বাবা পিয়েরে মারা যান। বাবা ও ভাইয়ের মৃত্যুতে মাও মানসিকভাবে খুব আক্রান্ত হন। ততদিনে তিনি আবার বিয়ে করেছেন, সন্তানও হয়েছে।
মনিস বলেন, মন্ট্রিয়লে ফিরে জাস্টিনের পরিচয় হয় খুব আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের সংবাদ পাঠক, উপস্থাপক সোফির সঙ্গে। সোফির সঙ্গে বিয়ের গাঁটছড়া বাঁধেন জাস্টিন। সোফি সর্বার্থেই জাস্টিনের জীবনসঙ্গী। জাস্টিনের জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে তিনি বিচক্ষণ বন্ধুর মতো পাশে থেকেছেন, আছেন। তাদের তিন সন্তান, দুই পুত্র ও এক কন্যাÑ জাভিয়ের, এলা গ্রেস, হাদ্রিয়েন।
এ-সময় কাতিমাভিক নামের এক যুব সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন জাস্টিন। এর সদস্যসংখ্যা তখন ছিল ১০ হাজারের মতো। ওই সময় থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন ইয়ুথ অ্যাকটিভিস্ট। তরুণদের ব্যাপারে সম্যক ধারণা তাকে রাজনীতিতে উৎসাহিত করে তোলে। রাজনীতিতে আসার পেছনে, অটোয়ার লিডারশিপ কনভেনশনে তার ইতিবাচক ভূমিকার একটা যোগ ছিল। তখনকার লিবারেল পার্টির প্রধান স্টিফেন ডিওন ওই কনভেনশনের সময়ই সে-রকম একটা আভাস দিয়েছিলেন। আর জাস্টিন জানতেন, লিবারেলিজমের ব্যাপারে, মাল্টিকালচারিজমের ব্যাপারে, চার্টার অব রাইটসের ব্যাপারে তার অবস্থানের কথা, যেগুলো আসলে কানাডার কেন্দ্রীয় মূল্যবোধ। কিন্তু পাপিনোর নমিনেশনে তাকে পার্টির পক্ষ থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়। কিন্তু তিনি তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন নির্বাচন করার। দোরে দোরে গিয়ে, প্রতিটি মানুষের সঙ্গে কথা বলে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মনেপ্রাণে একাত্ম হয়ে শুরু করলেন প্রচারণার কাজ।
মজার ব্যাপার হলো, জাস্টিন কিন্তু নিজেকে যতটা না ‘ড্যাডিস চাইল্ড’ বলেন, তার চাইতে বেশি তিনি নিজেকে পরিচয় দেন ‘জিমিস গ্র্যান্ডচাইল্ড’ হিসেবে। কারণ, জাস্টিনের রাজনৈতিক অ্যাপ্রোচ, ক্যাম্পেইনের ধরনধারণ বাবা পিয়েরে ট্রুডোর মতো নয়, বরং নানা জিমি সিনক্লেয়ারের মতো। পিয়েরে ট্রুডোর অ্যাপ্রোচ ছিল ইন্টেলেকচুয়াল। আর জাস্টিন হচ্ছেন নানা জিমির মতো রিটেইল পলিটিশিয়ান। প্রচুরসংখ্যক সদস্য সংগ্রহ করে, ২০০৭ সালে দলের হেভিওয়েট নমিনেশন প্রার্থী ম্যারি ডেরসকে হারিয়ে অবিশ^াস্যভাবে নমিনেশন জেতেন তিনি। বাবার পরিচয় তো দূরের কথা, এমনকি মাকেও নিজের নির্বাচনী প্রচারণায় সামনে আনেননি তিনি। পাপিনো তখন লিবারেলদের হাতছাড়া। কুইবেকের স্বায়ত্তশাসনের প্রবক্তা-দল ব্লক কুইবেকোয়া ওই আসনে জেতেন তার আগের নির্বাচনে। হেভিওয়েট প্রার্থীর সঙ্গে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। দীর্ঘ ১৭ মাসের, দিন-রাত অমানুষিক খাটুনিতে তিনি জিতে নেন মানুষের মন। নির্বাচনে হেভিওয়েট প্রার্থী ভিভিয়ান বারবকে খুব অল্প ব্যবধানে হারিয়ে পাপিনো রাইডিংয়ে জয়ী হন তিনি।
জাস্টিন নিজে জিতলেও ২০০৮ সালের ওই ফেডারেল নির্বাচনে আসনসংখ্যা আগেরবারের চেয়ে আরও বাড়িয়ে ক্ষমতায় থাকে কনজারভেটিভরা। লিবারেলরা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। জাস্টিন লিখছেনÑ মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া দূরত্ব এই পরাজয়ের মূল কারণ। দলকে বাঁচাতে হলে, এর খোলনলচে পাল্টে ফেলতে হবে, দলে গ্রাসরুট ভয়েস আনতে হবে, প্রচ- পরিশ্রম করতে হবে, গণমানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হবে। লিবারেল পার্টির অহমিকা ঝেড়ে ফেলতে হবে। লিবারেল পার্টি ক্রিয়েটেড কানাডা এই প্রচলিত ধারণা ভেঙে বিশ^াস করতে হবে কানাডা ক্রিয়েটেড লিবারেল পার্টি।
পাপিনোতে নির্বাচনের সময় তিনি প্রচারণায় যে নতুন ধারার সূচনা করেন, নির্বাচিত হওয়ার পরও এই গণসংলগ্নতা অব্যাহত রাখেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি অসংখ্য তরুণকে যুক্ত করে, ভলান্টিয়ারিজমকে উৎসাহিত করে, অসংখ্য মানুষের কাছে গিয়ে তাদের প্রয়োজন-প্রায়োরিটির কথা জেনে সেভাবেই তার রাজনৈতিক অগ্রাধিকারকে চিহ্নিত করেছেন। এই অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে চার্টার অব রাইটসের সর্বোচ্চ প্রয়োগ, মধ্যবিত্তের অর্থনীতিকে চাঙা করা, পরিবেশ সচেতনতা, সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিসরে দেশের সব প্রদেশের, সব অঞ্চলের মধ্যে ন্যায্য সাম্য রাখা ইত্যাদি। গণসংলগ্ন ক্যাম্পেইনের ফলে ২০১৩ সালে তিনি কানাডার বৃহত্তম ও প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল লিবারেল পার্টির লিডার নির্বাচিত হন।
মনিস বলেন, জাস্টিন তার ভাই মিশেলের মৃত্যুর আনুষ্ঠানিকতায় ফার্স্ট নেশনদের একটি প্রার্থনা পাঠ করেছিলেন। বইটি শেষ হয়, বৃহৎ সত্তার কাছে নিবেদিত, ফার্স্ট নেশনদের সেই প্রার্থনার মধ্য দিয়ে।
ফারহানা আজিম শিউলীর সঞ্চালনায় পাঠশালার এই আসরে কমন গ্রাউন্ড থেকে কিছু অংশ পাঠ করে শোনান সানন্দা চক্রবর্তী। আলোচক মনিস রফিকের সার্বিক আলোচনায় উঠে আসে একজন মানবিক মানুষ, মানবিক রাজনীতিবিদের চিত্র এবং সেই সঙ্গে ভয়ের ও নেতিবাচক রাজনীতি থেকে মুক্ত হয়ে ইনক্লুসিভ ও ইতিবাচক রাজনীতির দর্শন, যার ভিত্তি কমন গ্রাউন্ড।
সামনে কানাডার ফেডারেল নির্বাচন। আর এই সময়টায় কানাডার জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি বইÑ আলোচনা যথেষ্ট অর্থপূর্ণ ও তাৎপর্যময় মাত্রা যোগ করবে বলে পাঠশালার পক্ষ থেকে প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
 

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৭ অক্টোবর ২০১৯

  • ৩ অক্টোবর ২০১৯

  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯