কাতার: ব্ল্যাকলিস্টের নেপথ্যে

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৭, ১৪:১৪

অনলাইন ডেস্ক

সৌদি আরব, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমীরাত গত ৫ জুন কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং দেশটির সঙ্গে জল, স্থল ও আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। কাতারী নাগরিকদের ঐ তিনটি দেশ থেকে চলে যাওয়ার জন্য ১৪ দিনের সময় বেঁধে দেয়া হয়। আমীরাত তো এমনও ঘোষণা করে যে কাতারের প্রতি সমর্থন কাউকে ব্যক্ত করতে দেখা গেলে তার ১৫ বছর জেল হতে পারে। মিসরও ঐ তিন রাষ্ট্রের গৃহীত পদক্ষেপ সমর্থন দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সৌদি আরবের এই বক্তব্যের সঙ্গে বাহ্যত একমত হয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসবাদের পিছনে সবচেয়ে বড় অর্থ যোগানদাতা দেশ হলো কাতার। তিনি এই দেশটির সঙ্গে সৌদি, বাহরাইন ও আমীরাতের সম্পর্ক ছিন্ন করাতে খুব খুশি হন এবং টুইটারে মন্তব্য করেন ‘সম্ভবত এটা হবে সন্ত্রাসবাদের বিভীষিকার অবসানের সূচনা।’
উপসাগরের ক্ষুদ্র দেশ হলেও কাতারের গুরুত্ব আছে। এটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদক এবং এয়ারলাইনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কাতারেই রয়েছে আল জাজিরা সম্প্রচার কেন্দ্র সেখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সেন্সরবিহীন সংবাদ পরিবেশিত হয়। ইরানের সঙ্গে কাতারের সুসম্পর্ক আছে এবং এই দেশটির সহায়তায় কাতার তার বিশাল গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস আহরণ করে। কাতার রাজনৈতিক ইসলামের সবচেয়ে জনপ্রিয় রূপ সুন্নি সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডকেও সমর্থন যুগিয়ে থাকে।
এই সমস্ত কারণে সৌদি আরবের চক্ষুশূল হয়ে পড়েছে কাতার। অতীতে সৌদি সরকার কাতারকে তাদের ইচ্ছার অধীন করতে চেষ্টা করেছিল পারেনি। কাতারে আমেরিকার বিশাল বিমান ঘাঁটি আছে যার কারণে কাতার সরকার নিজেদের নিরাপদ বোধ করত। কিন্তু ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর কেউ আর এখন নিরাপদ বোধ করছে না। বিশেষ করে সৌদি পদক্ষেপকে ট্রাম্প যেভাবে ঢালাও সমর্থন দিয়ে চলেছেন তার জন্য তো বটেই।
কাতারকে কেন ব্ল্যাকলিস্ট করা হলো তার কোন সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শানো হয়নি। তবে প্রচুর গুঞ্জন আছে যে বিত্তশালী কাতারীরা সন্ত্রাসীদের অর্থ যোগান দিয়ে থাকে এমন অভিযোগ ধনী সৌদিদের বিরুদ্ধেও করা হয়। কিন্তু কোন অভিযোগই প্রমাণিত নয়। ফাইনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকার খবরে জানা গেছে যে কাতারী রাজপরিবারের কিছু সদস্য ইরাকে বাজপাখি শিকারের এক সফরে গিয়ে ইসলামী জঙ্গীদের হাতে জিম্মি হন। তাদের মুক্তি আদায়ের জন্য কাতার নাকি ইরানকে এবং আল-কায়েদার একটি অঙ্গ সংগঠনকে একশ’ কোটি ডলার দিয়েছিল। একশ’ কোটি ডলারের মুক্তিপণ দিয়ে প্রচুর অস্ত্র ও বিস্ফোরক কেনা সম্ভব। মুক্তিপণ দেয়ার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপসারগরীয় সহযোগিতা পরিষদে বিভাজন ঘটে। অথচ এই পরিষদ এতদিন যাবত অস্থিতিশীল একটা অঞ্চলে স্থিতিশীলতার শক্তি হিসেবে কাজ করছিল। কাতারের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপের ফলে কাতার তো বটেই এমনকি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের অপর দুই সদস্য কুয়েত ও ওমান যারা সৌদি পদক্ষেপকে সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তাদেরকেও ইরানের পক্ষপুটে আরও বেশি করে ঠেলে দেয়া হবে। ঘটনাটি নিয়ে সৃষ্ট উত্তাপ শেষ পর্যন্ত হয়ত প্রশমিক হবে। কিন্তু সৌদি আরবকে এর মূল্য কোন না কোনভাবে দিতে হবে।
কাতার প্রশ্নে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৌদি আরবকে যেভাবে সমর্থন দিয়েছেন তাতে আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণœ হবে। এ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে তাঁর নেতৃত্বে পরাশক্তি আমেরিকা তার মিত্রদের যে কোন সময় পরিত্যাগ করতে পারে।
কাতার-সৌদি আরববিরোধী এক অর্থে এই অঞ্চলে আলখানি ও আল সৌদি উপজাতীয় বিরোধের বহিঃপ্রকাশ। বলা-বাহুল্য যে আলখানি শেখরা কাতারের এবং আল সৌদিরা সৌদি আরবের শাসন ক্ষমতায়। আরব উপদ্বীপে এমন শাসক উপজাতি আরও আছে যেমন আল খলিফা, আল-সাবাহ। আরব উপদ্বীপটি এত বড় নয় যে এর সমস্ত শাসকের উচ্চাভিলাষ একসঙ্গে পূরণ করা সম্ভব। প্রতিটি শাসকগোষ্ঠী তার ভূখন্ডে আন্তর্জাতিক শিপিং, এয়ারলাইন্স ও মিডিয়ার প্রাণকেন্দ্র গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তা করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বিরোধ দেখা দিচ্ছে কাতারের সঙ্গে উপসাগরের অন্যান্য দেশের বর্তমান সঙ্কট সেই বিরোধেরই প্রতিফলন।
সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ২৭ আগস্ট ২০১৭

  • ১৩ আগস্ট ২০১৭

  • ০৬ আগস্ট ২০১৭

  • ৩০ জুলাই ২০১৭