বীর্যধারণই জীবন, বীর্যপাতই মৃত্যু আর বীর্যরক্ষার কৌশলই যোগ

প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ১২:৩৩

প্রমিথিয়াস চৌধুরী

 

শরীরই সাধনার ভিত্তিভূমি। ভিত্তিভূমি যদি সুদৃঢ় হয়, তবেই সে-ভিত্তির ওপর উচ্চস্তরের জীবনসৌধ, দিব্য জীবনের আকাশচুম্বী সৌধ গড়ে তোলা যায়। এ ভিত্তিভূমি সুদৃঢ় করার জন্য দেহস্থ স্নায়ু, পেশি ও গ্রন্থির কার্যকারিতা যথাযথ হওয়া দরকার। আর এর কার্যকারিতায় ত্রুটি ঘটিলে দেহ-মন পাশবিকভাবের দিকে ধাবিত হয়ে কুকাজ ও কুচিন্তায় লিপ্ত হয়।
দেহস্থ স্নায়ু, পেশি ও গ্রন্থি দুর্বল হলে মানুষ ওষুধ ও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়, কিন্তু রোগ তার সঙ্গ ছাড়ে না। এক অসুখ ভালো করে তো উদরস্থ ওষুধবিষেই নতুন রোগ সৃষ্টি হয়, কিছুদিন পরই আবার সে অন্য অসুখে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে। এভাবে বারবার অসুখে ভুগে তার অকালমৃত্যু ঘটে।
প্রাকৃতিক চিকিৎসা তথা যৌগিক চিকিৎসা দেহের পক্ষে অনিষ্টকর হয় না; আশু স্বাস্থ্যলাভেরও প্রতিবন্ধকতা করে না। সুতরাং ওষুধের চিকিৎসার চেয়ে যৌগিক চিকিৎসা মানুষের দেহের পক্ষে অধিকতর কল্যাণজনক।
যৌগিক চিকিৎসা যেমন রোগ আরোগ্য করতেও পারে, তেমনি আশু রোগের আক্রমণ প্রতিরোধ করবার ক্ষমতাও তৈরি করতে পারে। যৌগিক আসন, মুদ্রা, ধৌতি, বস্তিক্রিয়া ও প্রাণায়াম অভ্যাসে স্নায়ু, পেশি, ধমনি, গ্রন্থি, হৃদপি-, ফুসফুস প্রভৃতি দেহ পরিচালক যন্ত্রগুলো এমন সবলতর হয়, এমন প্রাণবান হয়ে ওঠে যে কোনো রোগবিষ বা কোনো রোগ জীবাণু দেহে প্রবেশ করে বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ পায় না।
উল্লেখ্য, পাঁচ বছরের শিশু থেকে ৯০ বছরের বৃদ্ধ পর্যন্ত সব বয়সের নর-নারীর উপযোগী সহজ সহজ যৌগিক ক্রিয়া আছে। আহারে-বিহারে সংযত থেকে, সুষম পথ্য বা আদর্শ পথ্য গ্রহণ করে মাঝে মাঝে কিছু সময় যৌগিক আসন, মুদ্রা, ধৌতি, বস্তিক্রিয়া ও প্রাণায়ামাদির চর্চা করলে আমরণ দেহকে নীরোগ রাখা যায়, আমরণ যৌবনকে অটুট রাখা যায়।
এবার যোগ সম্বন্ধে আলোচনায় বলা যাক : যোগ এক ধরনের বিশেষ বিজ্ঞান, যার মাধ্যমে চিত্ত বহির্মুখী ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণে অসংখ্য বৃত্তিতে রূপান্তরিত না হয়ে বিশেষ একটি লক্ষ্যে স্থির করার কৌশল। মনরূপ জীব দেহে অহং বুদ্ধিতে সর্বদাই নশ^র ভোগ্য বিষয়ের সঙ্গে ঐক্যসাধন করে বহির্মুখী হয়ে থাকে। সেই বহির্মুখী জীবকে অন্তর্মুখী করলে জীব আর আত্মা যে একই বস্তু এই ঐক্যবোধ জন্মে; এর নাম যোগ। আমাদের চিত্তের অসংখ্য বৃত্তি; এই চিত্তকে নিশ্চলভাবে ধরে রাখতে পারাই হলো চিত্তবৃত্তি নিরোধ।
দেহ এবং মন যতদিন সুগঠিত না হয়, ততদিন দেহের সর্বোত্তম সার, দেহের প্রাণস্বরূপ শুক্র যাতে দেহে সংরক্ষিত, অবিচল ও অটুট থাকে, সেদিকে দৃষ্টি রেখেই জাতির ভবিষ্যৎ ভরসাস্থল, জাতির ভবিষ্যৎ কল্যাণের জীবন্ত বিগ্রহস্বরূপ ছাত্র-ছাত্রীদের যোগাভ্যাসের দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এজন্য প্রাচীন যুগের মহাজ্ঞানী ঋষিরা জাতির সর্বাঙ্গীন কল্যাণের কথা বিবেচনা করে যোগাভ্যাসের শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্রহ্মচর্যাশ্রমের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। বৈদিক ও পৌরাণিক যুগে, প্রত্যেক ছাত্রেরই ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে গুরুগৃহে গমন বাধ্যতামূলক ছিল। যে ছাত্র ব্রহ্মচর্যব্রত গ্রহণ করত না, তাকে ব্রাত্য নামে অভিহিত করা হতো। সমাজে সে ঘৃণ্যরূপে গণ্য হতো। এমন ব্রাত্য যুবক সমাজে বিয়ে করতে পারত না; কেউ তার কাছে মেয়ের  বিয়ে দিতেন না। আগেও যেমন আত্মোন্নতির জন্য, সমাজ-কল্যাণের জন্য ছাত্রদের ব্রহ্মচর্যব্রত গ্রহণের প্রয়োজন ছিল, এখন প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি। তবে প্রাচীন গুরুগৃহের জীবনযাপন প্রণালিকে এ-যুগে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাই এ-যুগে প্রত্যেকটি গৃহাশ্রমকেই গুরুগৃহের শুচিতা সংযম এবং সংস্কৃতি দিয়ে সঞ্জীবিত করে তোলাই আমাদের কর্তব্য।
আমাদের বৈদিক ঋষি ও যোগীরা সমগ্র ব্রহ্মা-কে ৭টি লোকে বা ৭টি স্তরে বিভক্ত করিয়াছেন- ভূঃ, ভূবঃ, স্বঃ, মহঃ, জনঃ, তপঃ ও সত্যলোক। এদের মতে, আমাদের দেহটি বিরাট ব্রহ্মা-েরই একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ, আমাদের দেহ-ব্রহ্মা-টিরও ৭টি স্তরে বা ৭টি প্রদেশ বা প্রধান গ্রন্থিচক্রে বিভক্ত। মস্তকে দুটি এবং মস্তকের নিম্নস্থ দেহে ৫টি। এই গ্রন্থিচক্রগুলোই দেহরাজ্যগুলোর নিয়ন্ত্রক। দেহ পোষণ, পালন ও রক্ষণের ভার এই গ্রন্থিগুলোর ওপর ন্যস্ত। প্রধানগ্রন্থি অনেকগুলো উপগ্রন্থিতে বিভক্ত। দেহ গঠনকারী পঞ্চতত্ত্ব বা পঞ্চমহাভূত দেহস্থ পঞ্চ
গ্রন্থিচক্রকে পরিচালিত করে। এই প্রধান গ্রন্থিগুলো হলো : মহৎ গ্রন্থি, অহং গ্রন্থি, ব্যোমগ্রন্থি, বায়ুগ্রন্থি, অগ্নিগ্রন্থি, বরুণগ্রন্থি ও পৃথ্বিগ্রন্থি।
এই প্রধান গ্রন্থিগুলোর অন্তর্মুখী রস সৃষ্টির ক্ষমতা আছে। এই অন্তর্মুখী রস রক্তের সঙ্গে মিশে দেহ গঠন ও দেহের স্বাস্থ্যরক্ষার কাজে নিয়োজিত হয়। এই প্রধান গ্রন্থিগুলো একযোগে সক্রিয় হয়ে উঠলেই, দেহে একটা অপূর্ব প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এ-সময় অহং গ্রন্থি সমস্ত ইন্দ্রিয়শক্তিকে সতেজ করে মন ও বুদ্ধিকে প্রস্ফুটিত করে তোলে; মহৎগ্রন্থি স্মৃতি ও অনুভব শক্তিকে জাগ্রত করে; অগ্নিগ্রন্থি দেহে প্রচুর রক্তোৎপাদন করে দেহের পুষ্টি ও শ্রীবৃদ্ধি সাধন করে; ব্যোমগ্রন্থি দেহকে সাধ্যমতো রোগমুক্ত রেখে দেহে যৌবনশক্তি সঞ্চারিত করে; বায়ুগ্রন্থি দেহকে প্রাণবান করে তোলে; বরুণগ্রন্থি দেহকে শক্তিমান, বীর্যবান করে এবং পৃথ্বিগ্রন্থি দেহে অস্থি ও মাংসময় স্থূলদেহ উৎপাদন করে।
আবার যকৃতের ক্রিয়া স্বাভাবিক না থাকলে মানুষের মেজাজ হয় খিটখিটে, ব্যবহার হয় রুক্ষ, কর্কশ। পিতৃগ্রন্থি (ঝবী এষধহফ) অস্বাভাবিক অর্থাৎ অতিক্রিয় বা স্বল্পক্রিয় হলে মানুষ অত্যধিক কামুক ও স্বার্থপর হয়। মঙ্গলগ্রন্থি (ঞযুসঁং) দোষযুক্ত হলে মানুষ হয় চোর-ডাকাত ও নরঘাতক। শিবসতী গ্রন্থি (চরঃঁরঃধৎু) দোষযুক্ত হলে মানুষ হয় ক্ষুদ্রচেতা, পরছিদ্রান্বেষী, নির্দয়, ঘুষখোর, কালোবাজারী।
এজন্যই বলা যায় দুর্নীতিপরায়ণ হওয়া সত্ত্বেও মানুষ খারাপ নয়; তাদের দেহযন্ত্র তথা দেহস্থ গ্রন্থি প্রভৃতির ক্রিয়া দোষযুক্ত হয়েছে বলেই কুকাজ ও কুচিন্তা তাদের দিয়ে সম্ভব হতে পারছে। সব মানুষের অন্তরে রয়েছে অনন্ত সত্তা। নির্দোষ খাবার এবং যোগের ক্রিয়াদির সাহায্যে দেহযন্ত্রের এই ত্রুটি অনায়াসে সংশোধন করে পশুমানবকে দেবমানবে রূপায়িত করা যায়।
পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ধর্ম বৈদিক ধর্ম একাধারে জ্ঞান ও ভক্তিধর্ম। যোগ এই জ্ঞানধর্মের অন্তর্গত। খ্রিষ্ট ও ইসলাম ধর্মও মূলত ভক্তিধর্ম। বৈদিক ধর্মে ভক্তিধর্মের যে দার্শনিকতা আছে, যে রস-মাধুর্য আছে, তার তুলনা নেই। বৈদিক ধর্ম কোনো ধর্মকে লুপ্ত করে না, গ্রাস করে না, তাকে পূর্ণতা প্রদান করে।
সবার উপরে মানুষ সত্য, সবার উপরে মানুষের অন্তর্নিহিত অদ্বয় অখ- সর্বব্যাপী পরমাত্মচেতনাই সত্য- এই মহাসত্য লাভই মানুষের কাম্য। মানুষে মানুষে ভেদ নাই, এক সত্য, এক স্রষ্টা। খ-ের মাঝে তিনি অখ-রূপে। দ্বৈতের মাঝে তিনি আছেন অদ্বৈতরূপে, সর্বজীবের মাঝে আছেন তিনি পরমাত্মা রূপে, এই বৈদিক জ্ঞানের প্রভায় সমুদয় মানবজাতি ভাস্বর হয়ে উঠুক। এ যোগবিদ্যা আয়ত্ত করলেই পশুমানবের লীলাভূমি জগৎ দেবমানবের লীলাভূমিতে রূপান্তরিত হতে পারে। এই দেবভূমিতে জরা নেই, স্বার্থপরতা নেই, কাম-ক্রোধ প্রভৃতি রিপুর প্রাধান্য নেই। এ জগতের মানুষ যেন জ্ঞান, প্রেম ও অহিংসার জীবন্ত প্রতীক; দেবভাবের জীবন্ত বিগ্রহ।
যোগের আসন-মুদ্রাদি শরীরকে নীরোগ করে; মনকে রোগমুক্ত করে সবল, শুদ্ধ ও নির্মল করে। যোগের ধ্যানাদির সাহায্যে আমরা অতীন্দ্রিয় রাজ্যে গমন করে পরমাত্মা বা স্রষ্টার সঙ্গে যুক্ত হই। এভাবে একসঙ্গে দৈহিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক এই ত্রিবিধ উন্নতির ব্যবস্থা ভক্তিপথেও নেই, জ্ঞানপথে বা অন্য কোনো পথেও নেই- আছে শুধু যোগ পথে। তাই দ্বিধাহীন চিত্তে ঘোষণা করা যায়- সাধারণ জরা, ব্যাধি ও অকালমৃত্যু জয় করে শতায়ু লাভ করতে পারা যায় শুধুমাত্র যোগাভ্যাসের মাধ্যমে।
বর্তমান যুগের সøটজফ প্রভৃতি বিখ্যাত রাসয়নিকরা মানব দেহে ক্ষরিত শুক্র নিয়েও গবেষণা করেছেন। শুক্রের রাসায়নিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা শুক্রের মধ্যে ক্যালসিয়াম, ফস্ফরাস, পটাসিয়াম, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, গন্ধক, লোহা প্রভৃতি দেহের যাবতীয় উপাদানের সন্ধান পেয়েছেন। সুতরাং আধুনিক রাসায়নিকদের মতেও শুক্র শুধু পিতৃগ্রন্থি বা অ-গ্রন্থিরস নয়, এর মধ্যে ভিতরে সমুদয় গ্রন্থিরস ও দেহপুষ্টির সমুদয় উপাদান নিহিত আছে।
শঙ্করাচার্য, বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ প্রভৃতি যুগপ্রবর্তক মহাপুরুষদের মতে অকালমৃত্যু রোধের একমাত্র উপায় ব্রহ্মচর্যপালন। ব্রহ্মচর্য সাধনায় সিদ্ধিলাভ করলে দেহস্থ শুক্র ঊর্ধ্বগামী হয়ে উৎকৃষ্ট মস্তিস্ক গঠন করবে; দেহ, মন উভয়ই তখন বলিষ্ঠ ও বীর্যবান হয়ে উঠবে। অলসতা, কাপুরুষতা, ভয় প্রভৃতি তামসিক বৃত্তি মন থেকে দূর হয়ে যাবে। মহাকর্মী, মহাজ্ঞানী হওয়ার প্রেরণা তখন অন্তরে অনুভব করবে।
আহার, নিদ্রা, ভয় ও মৈথুন- এ চতুর্বিধ পাশবিক বৃত্তি দিয়ে মানুষ পরিচালিত হচ্ছে। এই পশুভাবে অবস্থিতিই মানুষের নিয়তি নয়, মানুষকে পশুর স্তর অতিক্রম করে আরও ওপরে উঠতে হবে, নিজের চিদানন্দময় স্বরূপে অবগাহন করতে হবে, পরমাত্মস্বরূপে প্রতিষ্ঠালাভ করতে হবে- এই-ই মানব জীবনের লক্ষ্য। এ লক্ষে পৌঁছবার প্রধান সাধনাই শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক ব্রহ্মচর্য। দেহ যদি সুস্থ-সবল থাকে, মন যদি ষড়রিপুর প্রভাবমুক্ত হয়ে স্থির, শান্ত ও একাগ্র হয়, তাহলে ভাগবত চেতনার মাঝে, অমৃত-চেতনার মাঝে অবগাহন সাধকের পক্ষে, ব্রহ্মচারীর পক্ষে সহজসাধ্য হয়ে ওঠে।
সৃষ্টি ব্যাপারে কামাদি বৃত্তির প্রয়োজনীয়তা আছে বলেই, আমাদের অন্তরে এসব বৃত্তি স্বাভাবিকভাবে উদিত হয়। এসব বৃত্তিতে যখন আমরা অভিভূত হয়ে পড়ি, তখন অতিস্থূল ইন্দ্রিয়সুখের মোহ আমরা মন হতে দূর করতে পারি না, জড়-জগতের সঙ্গে আসক্তির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে, আমরা পশুভাব প্রাপ্ত হই; চিরসুখের চির-আনন্দের অক্ষয়-নিকেতন দেহাতীত, ইন্দ্রিয়াতীত অমৃতসত্তাকে আমাদের আত্মস্বরূপকে আমরা ভুলে যাই। এজন্যই কামাদি বৃত্তিগুলোকে বলা হয়েছে রিপু বা শত্রু। এই শত্রুরাই আমাদের আত্মস্বরূপ লাভের, ভগবৎলাভের বাধাস্বরূপ। যতদিন মনের মধ্যে এই শত্রুদের আধিপত্য থাকবে, ততদিন মন স্থির হবে না, শান্ত হবে না, আত্মস্বরূপে অবগাহনের উপযোগী হবে না।
আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে- পৃথিবীতে এসে ঈশ^রের স্বরূপ যদি জানতে না পারি, অতি তুচ্ছ দৈহিক ভোগসুখকেই আঁকড়ে থাকি, তাহলে সেই পশুতুল্য জীবনযাপনের কোনো সার্থকতা থাকে না। এজন্যই ঋষিরা বৃহ্মচর্যের ওপর এত জোর দিয়েছেন।
শাস্ত্রে বলা হয়, ‘বীর্য্যধারণম্ ব্রহ্মচর্য্যম্’ অর্থাৎ বীর্য্যধারণই ব্রহ্মচর্য্য। মানব শরীর সপ্তধাতুতে গঠিত। যেমন- রস, রক্ত, মাংস, মেদ, অস্থি, মজ্জা ও শুক্র। এই সপ্তধাতুর মধ্যে শুক্র বা বীর্যই প্রধান বা সকল ধাতুর সার। আমরা যা খাই তা পরিপাক করে পাঁচ দিনে রসে পরিণত হয়; ঐ রস পাঁচ দিনে পরিপাক হয়ে রক্তে পরিণত হয়; রক্ত পাঁচ দিনে মাংসে, মাংস পাঁচ দিনে মেদে, মেদ পাঁচ দিনে অস্থিতে, অস্থি পাঁচ দিনে মজ্জা এবং মজ্জা থেকে পাঁচ দিনে শুক্রে পরিণত হয়। আমাদের আহার্যদ্রব্য ক্রমান্বয়ে পরিপাক হইয়া বীর্যে পরিণত হতে এক মাসের বেশি অর্থাৎ পঁয়ত্রিশ দিন সময় লাগে। যে ব্যক্তি পাঁচ সপ্তাহকাল বীর্যক্ষয় করে না তার অর্দ্ধরসের পরিমিত রক্তে একবিন্দু বিশুদ্ধ বীর্য উৎপন্ন হয়। একবিন্দু বীর্য রাশি রাশি অন্নাদি ভোজনে উৎপন্ন হয়। এই বীর্যই জীবের জীবনীশক্তি, প্রাণের অবলম্বন। বীর্যধারণই হলো জীবন, বীর্যপাতই মৃত্যু।
বীর্য তথা শুক্রের অধঃস্রোত নিবারিত হয়ে শুক্র যখন ঊর্ধ্বস্রোতা হয়, প্রচুর শুক্র যখন মস্তিস্কে যাবার সুযোগ পায়, তখন তার প্রভাবে আত্মানুভবের সহায়কারী, ভগবৎ-লাভের সাহায্যকারী মস্তকের সর্বোচ্চস্থানের গ্রন্থিগুলো (তন্ত্রশাস্ত্রের ভাষায় অধোমুখী চক্র বা পদ্মগুলো) ঊর্ধ্বমুখী হয়ে প্রস্ফুটিত হয়, সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই গ্রন্থি বা চক্রগুলো সক্রিয় হয়ে উঠলে মানুষ দেবাভাবে ভাবিত হয়; মানুষ দেবত্ব লাভ করে, জীবন্মুক্ত অবস্থা লাভ করে। সুতরাং ব্রহ্মচর্যই সর্বোত্তম তপস্যা। যিনি ঊর্ধ্বরেতা তিনি মানুষ নন, তিনি দেবতুল্য।
বরাহ-দেহ, ক্ষীণ-দেহ, প্রভৃতি আদর্শ দেহ নয়; আদর্শ দেহে প্রয়োজনীয় চর্বি, সবল-সুস্থ স্নায়ুম-লী বিদ্যমান থাকবে। বিভিন্ন যৌগিক আসন-মুদ্রা ও সহজ প্রাণায়ামাদির অভ্যাসে এমন আদর্শ দেহ অনায়াসেই লাভ করা যায়। যোগবিদ্যার চর্চায় দেহ অদাহ্য, অক্লেদ্য এবং অশোষ্য হয়ে ওঠে অর্থাৎ ঝড়, বৃষ্টি এবং রোদের মধ্যে বহুক্ষণ থাকতে বাধ্য হলেও দেহ অসুস্থ বোধ হয় না। এমন যোগশক্তি-সুরক্ষিত দেহ যত খুশি শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করুক, যত খুশি ধ্যান-ধারণা করুক, এতে দৈহিক স্বাস্থ্য কখনও ক্ষুণœ হবে না। শুধু সুস্থ দেহ নয়, সবল, শুদ্ধ, প্রতিভাদীপ্ত মন গঠনেও যৌগিক ব্যায়াম বিশেষভাবে সাহায্য করে। আদর্শ দেহ, আদর্শ মনের, নির্মল-শুদ্ধ মনের অভিব্যক্তি আমরা যুবসমাজের মধ্যে দেখতে চাই।
মনে রাখা প্রয়োজন যে, আয়ুর্বেদ চিকিৎসা, এলোপ্যাথি বা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা অথবা অত্যাধুনিক হরমোন চিকিৎসা প্রভৃতি কোনো চিকিৎসাই স্বপ্নদোষ, আংশিক অক্ষমতা প্রভৃতি যৌনব্যাধি এবং প্রদরাদি স্ত্রী-ব্যাধি সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য করতে পারে না। এসব রোগে চিকিৎসকের শরণ নিয়ে শুধু অর্থনাশ ও মনস্তাপই ভোগ করতে হয়। এসব ওষুধের ব্যবহারের ফলে দেহের স্নায়ুম-লী উত্তেজিত হয়ে সাময়িক একটু সুফল প্রদান করে। অল্পদিন পরেই রোগ আবার পূর্বাবস্থা ধারণ করে এবং ক্রমশই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। সুতরাং ওষুধের বিজ্ঞাপনে ভুলে কেউ এসব রোগারোগ্যের জন্য ওষুধ ব্যবহার করতে গিয়ে নিজের ক্ষতিসাধন করবেন না। এ রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় হয় বিশেষ স্নানবিধি সহকারে যৌগিক আসন-মুদ্রার অভ্যাসে। বীর্যকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তৈরি করার একমাত্র মাধ্যম যোগাভ্যাস।
শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক ব্রহ্মচর্যের জীবন্ত প্রতীক হয়ে বর্তমান যুগের অন্যায়-অত্যাচার হিংসা-দ্বেষ ও স্বার্থপরতা প্রভৃতি আসুরিক ভাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে নিজেদের জন্মভূমিকে আনন্দভূমিতে রূপায়িত করবার সাধনায় আত্মনিয়োগ করাই হোক আন্তর্জাতিক যোগ দিবস পালনের প্রতিজ্ঞা।

লেখক : পরিচালক, আনন্দম্ ইনস্টিটিউট অব যোগ অ্যান্ড যৌগিক হসপিটাল; সম্পাদক ও প্রকাশক : দি নিউজ

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৭ অক্টোবর ২০১৯

  • ৩ অক্টোবর ২০১৯

  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯