স্মৃতিভ্রম প্রতিরোধে

প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০১৭, ১৫:৩৫

অনলাইন ডেস্ক

প্রফেসর ড. জাকিয়া বেগম

মস্তিষ্কের স্নায়বিক বৈকল্যজনিত রোগ আলঝাইমার্স বা ‘স্মৃতিভ্রম অসুখ’। মস্তিষ্কের কোষকলায় ‘বিটা অ্যামাইলয়েড’ নামক এক প্রকার আমিষ জাতীয় ক্লেদ জমা হওয়া এবং ‘টাউ’ নামক অপর এক ধরনের আমিষের ক্ষয়প্রাপ্তি থেকে স্নায়ুকোষগুলোতে জট পাকানো অবস্থার সৃষ্টি হওয়া থেকে আলঝাইমার্স রোগের সূত্রপাত ঘটে।
কী কী কারণে কোষকলার মধ্যে এ ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হয় তা এখনও সঠিকভাবে জানা সম্ভব হয়ে ওঠেনি বলে এখন পর্যন্ত এই প্রক্রিয়াটিকে থামিয়ে দেয়া বা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার মতো কোনো ওষুধ বা পদ্ধতি আবিষ্কার করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আর তাই একবার আক্রান্ত হলে ক্রমে ক্রমে রোগটি এর স্বাভাবিক নিয়মে খারাপের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, মস্তিষ্কের কোষকলাগুলো মরে যেতে থাকে, স্মৃতিভ্রম ঘটে ও বোধশক্তি লোপ পেতে থাকে। ভুলে যাওয়া এবং নতুন কোনো তথ্য মনে রাখতে না পারাটা হচ্ছে রোগটির প্রাথমিক লক্ষণ। এই কারণে প্রাথমিক পর্যায়ের রোগীদের একই প্রশ্ন বার বার করতে দেখা যায়।
রোগীর আচরণগত পরিবর্তন দেখা দেয় যেমন; সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া, ঘরে বা বাইরে বেশ কাজ করত এমন কাউকে হয়তো দেখা যায় বেশি বেশি শুয়ে থাকছে, কাউকে হয়তো দেখা যাবে টেলিফোন করা বা ধরার ক্ষেত্রে অমনোযোগী হয়ে উঠেছে অথবা আগে অন্য যেসব ব্যাপারে আগ্রহ ছিল সেসব ব্যাপারে অনাগ্রহী হয়ে উঠছে।
অনেকের ক্ষেত্রে ঘ্রাণশক্তি বা খাদ্যের স্বাদ গ্রহণ ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটতে দেখা যায়, পছন্দের খাদ্যটিও কারও কারও কাছে অপছন্দনীয় হয়ে উঠতে পারে। রোগটি চিহ্নিত হওয়ার বেশ আগে থেকেই এ ধরনের পরিবর্তনের সূচনা ঘটে এবং কাছের মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই তা বুঝে উঠতে পারেন না। আক্রান্ত ব্যক্তি আস্তে আস্তে এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়ে যে তার পক্ষে একান্ত ব্যক্তিগত কাজকর্ম যেমন; কাপড় পরা, স্নান করা ইত্যাদি কঠিন হয়ে ওঠে। রাস্তা ভুলে যাওয়ায় একাকী বাড়ি থেকে বের হলে আর বাড়িতে ফিরে আসতে পারে না, চেনা মানুষ অচেনা হয়ে ওঠে, এমনকি নিজের একান্ত আপনজনকে পর্যন্ত চিনে উঠতে পারে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মল-মূত্র পরিত্যাগ প্রক্রিয়াও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে।
সঠিক সময়ে প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে আস্তে আস্তে রোগটির প্রকোপ বাড়তেই থাকে। বয়স্কদের আলঝাইমার্সে বেশি আক্রান্ত হতে দেখা গেলেও এটি বুড়িয়ে যাওয়া প্রক্রিয়ার অবশ্যম্ভাবী কোনো ধাপ নয়। ষাটোর্ধ্বদের মধ্যে এই রোগটির প্রকোপ বেশি এবং পুরুষের তুলনায় মহিলাদের বেশি আক্রান্ত হতে দেখা যায়। উন্নত বিশ্বে মানুষের গড় আয়ু বেশি হওয়ায় সেসব দেশে এই রোগের প্রকোপ অনেক বেশি। যেহেতু আমাদের দেশেও মানুষের গড় আয়ু বেড়ে চলেছে তাই এ রোগটির প্রকোপও দিন দিন বেড়ে চলেছে।
আলঝাইমার্স রোগের কারণগুলোকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। এড়ান সম্ভব নয় এমন কারণগুলো-

* বয়স একটি বড় কারণ হওয়ায় ৮৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ৬৫ বছর বয়সীদের তুলনায় আক্রান্তের হার বেশি।
* বংশগত কারণে অর্থাৎ পরিবারের কেউ আক্রান্ত হয়ে থাকলে সেই পরিবারের অন্য সদস্যদের আক্রান্ত হওয়ার আশংকা বেশি।
* শরীরে ‘অ্যাপোলিপো প্রোটিন ই’ (এপিওই) নামক বিশেষ এক ধরনের জীনের উপস্থিতি রোগটির আশংকা প্রায় ৮ গুণ বাড়িয়ে দেয়।

এড়ানো বা পরিবর্তন সম্ভব এমন কারণ
উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ মাত্রার অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ মাত্রার এলডিএল কোলেস্টেরল ইত্যাদি। এসব কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত সমস্যাও দেখা দিতে পারে এবং তা থেকেও আলঝাইমার্স দেখা দেয়ার আশংকা থাকে। ঘুমের সমস্যা, মাথায় আঘাত প্রাপ্তি, একাকীত্ব ইত্যাদি কারণেও এই রোগটি দেখা দিতে পারে। রোগটি প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান উপায় হল মস্তিষ্ককে সবসময় সচল রাখা। গবেষণায় দেখা গেছে মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা গেলে মস্তিষ্কস্থ কোষকলাগুলো কম ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, নতুন কোষকলা জন্ম লাভের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন কোষকলার মধ্যস্থ তথ্য আদান-প্রদান প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয় ফলে ক্লেদ জমার প্রক্রিয়া বাঁধাপ্রাপ্ত হয়।
শিক্ষকতা করা, নতুন কোনো ভাষা বা নতুন কোনো প্রযুক্তি শেখার চেষ্টা, গান বা কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজানোর চেষ্টা করা মস্তিষ্ককে সচল রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত শরীরচর্চা বা যোগ-ব্যায়ামও মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে মস্তিষ্ককে সচল রাখতে সাহায্য করে। তাছাড়া মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখার বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে হবে যেমন; নিয়মিতভাবে শব্দ সাজানোর ধাঁধা (ক্রসওয়ার্ড) বা পাজ্ল খেলা, মস্তিষ্কের জন্য ভালো কম্পিউটারের সাহায্যে এমন ধরনের গেমগুলোও খেলা যেতে পারে। দলগত কোনো কাজে অংশগ্রহণ, বাইরে ঘুরতে যাওয়া, সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধিও রোগটির ক্ষেত্রে ভালো সুফল বয়ে আনে।
আলঝাইমার্স চিকিৎসা বা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় শরীরের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের খনিজ এবং ভিটামিন পরিমাণ অনুযায়ী থাকা খুবই জরুরি। ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, ভিটামিন ‘ই’, ‘সি’ এবং ‘বি ১২’ মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষায় বেশ কার্যকর। আখরোট, বিভিন্ন প্রকার বাদাম, তিসির তেল, সয়াবিন, টুনা, সালমন ও বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছ, ঝিনুক (অয়েস্টার), ডিম ইত্যাদিতে ওমেগা-৩ উপাদানটি বেশি পাওয়া যায়।
ভিটামিন ‘সি’ বেশি থাকে লেবু, কমলা, পেয়ারা, আমলকী ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবুজ শাক-সবজিতে। জাম, আঙুর, স্ট্রবেরি ইত্যাদি ‘বেরি’ জাতীয় ফল, সবুজ চা, কফি, কালো চকলেট, হলুদ, অলিভ অয়েল, নারিকেল তেল ইত্যাদি খাদ্য মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। যদিও আলঝাইমার্স রোগ থেকে আরোগ্য লাভের সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি এখনও আবিষ্কার করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি তবে বর্তমানে কয়েকটি ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে রোগটির অগ্রগতি কিছুটা ঠেকানো সম্ভব হয়ে উঠেছে। প্রচলিত ওষুধগুলোর কোনটিই রোগটি নির্মূল করতে পারে না তবে এর অগ্রগতি কয়েক মাস থেকে বছর পর্যন্ত বিলম্বিত করতে এবং লক্ষণগুলোর তীব্রতা কিছুটা কমিয়ে আনতে সাহায্য করে।
ইতিমধ্যে জানা গেছে, যেসব রোগী ‘ওআরএম-১২৭৪১’ নামের ওষুধটি তিন মাসের বেশি ব্যবহার করেছেন তাদের স্মৃতিশক্তির সামান্য উন্নতি সাধিত হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের রোগীদের ক্ষেত্রে ‘মনোক্লোনাল এন্টিবডি’ জাতীয় ওষুধও কিছুটা কার্যকর হয়ে উঠতে দেখা গেছে। আলঝাইমার্স রোগ থেকে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভের কোনো কৌশল বা ওষুধ এখনও আবিষ্কৃত হয়নি অথচ বিশ্ব জুড়ে বয়স্ক জনশক্তি বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে তাই আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও দিন দিন বেড়ে চলেছে যা সমাজ তথা দেশের চিকিৎসা খাতে নেতিবাচক প্রাব বিস্তার করে চলেছে।
এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে তাই বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘মনোক্লোনাল এন্টিবডি’ পর্যায়ভুক্ত ওষুধ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ওষুধ নিয়ে কাজ চলছে। চলছে ভেকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা। এছাড়াও অন্যান্য বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে প্রচুর গবেষণা চলছে। সুইডেনের বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্ক ও মেরুদ-স্থ (সেরিব্রোস্পাইনাল) তরলের মধ্যে এমন এক ধরনের জৈবসূচক আবিষ্কারে অগ্রগতি লাভ করেছেন যা আক্রান্ত হওয়ার ৫-১০ বছর আগেই রোগটি সম্পর্কে আগাম সংকেত প্রদানে সক্ষম হবে। এর সাহায্যে হয়তো চিকিৎসা ক্ষেত্রেও কিছু অগ্রগতি লাভ করা সম্ভব হবে। অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীরা আলঝাইমার্সে আক্রান্ত ইঁদুরের চিকিৎসায় উচ্চ কম্পাঙ্কের আলট্রাসাউন্ড ব্যবহার করে মস্তিষ্কের মধ্যে রক্তস্থ আমিষ প্রবেশের পথ তৈরি করে মস্তিষ্ককে ক্লেদমুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন বলে জানা গেছে। আশা করা যাচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো এ পদ্ধতি আলঝাইমার্সে আক্রান্ত মানুষের উপরও প্রয়োগ করা সম্ভব হয়ে উঠবে।
যেহেতু একবার আলঝাইমার্সে আক্রান্ত হয়ে পড়লে ভালো হয়ে ওঠার পন্থা এখন পর্যন্ত আবিষ্কার করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি তাই পূর্বাহ্নেই রোগটির ব্যাপারে সচেতন হতে হবে এবং প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণের বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কে জানতে হবে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও বয়স্কদের সুস্থতার কথা চিন্তা করে তাদের ব্যাপারে অধিক মনোযোগী হয়ে উঠতে হবে। ড়
লেখক : পরমাণু বিজ্ঞানী এবং অধ্যাপক, ইস্টার্ণ ইউনিভার্সিটি

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ২৭ আগস্ট ২০১৭

  • ১৩ আগস্ট ২০১৭

  • ০৬ আগস্ট ২০১৭

  • ৩০ জুলাই ২০১৭