কী আছে নতুন সড়ক পরিবহন আইনে?

প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ১৩:৫২

অনলাইন ডেস্ক

 

কার্যকর হয়েছে নতুন ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’। বহুল আলোচিত এই আইনটি প্রণয়নের এক বছরেরও বেশি সময় পর এটি বাস্তবায়ন শুরু হলো। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বাধার মুখে এতদিন আইনটি বাস্তবায়নে যায়নি সরকার। ২২ অক্টোবর আইনটি কার্যকরের তারিখ ঘোষণা করে গেজেট জারি করে সরকার। নতুন আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সড়কে আইন লঙ্ঘন করলে নতুন আইনে সাজা দেওয়া হবে।
নতুন এই আইনে সব ধরনের সাজা বাড়ানো হয়েছে। আইনের ৬ ধারায় ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন, ঠিকানা পরিবর্তন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। চালকদের লাইসেন্স পেতে অষ্টম শ্রেণি, সহকারীকে পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে। অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে বয়স অন্যূন ১৮ বছর ও পেশাদারদের ক্ষেত্রে ২১ বছর হতে হবে। এছাড়া, শারীরিক-মানসিকভাবে সক্ষম ও মোটরযান চালনার যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই কেবল কেউ লাইসেন্স পাবেন। অন্যথায় লাইসেন্স পাবেন না।
বিদেশি নাগরিকগণ তার নিজ দেশের যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত ড্রাইভিং লাইসেন্স কর্তৃপক্ষের নিকট উপস্থাপন ও পৃষ্ঠাঙ্কন করে লাইসেন্সের মেয়াদকালে সমগ্র বাংলাদেশে ওই লাইসেন্স দিয়ে চলাচল করতে পারবেন। তবে যে কোনো বিদেশি নাগরিক ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য নির্দেশ প্রদানসাপেক্ষে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে পারবেন এবং আবেদন করা হলে তাকে এই আইনের অধীনে লাইসেন্স প্রদান করা হবে। এক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিক আইনের কোনো বিধান বা লাইসেন্স প্রদান করলে ড্রাইভিং লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল কিংবা অকার্যকর করতে পারবে না। এরূপ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে কোনো মোটরযান চালাতে পারবে না। শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যতীত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যে কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে ১২.১৫ পয়েন্ট থাকবে।
১৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে, ড্রাইভিং লাইসেন্স স্থগিত, প্রত্যাহার বা বাতিল করা হলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাকে মোটরচালক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করিতে পারিবে না। এছাড়া, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী লিখিত চুক্তি সম্পাদন ও নিয়োগপত্র প্রদান ব্যতীত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কাউকে গণপরিবহনের চালক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করিতে পারিবে না। নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো পরিবহনের চালক তার নিয়োগপত্র ও মোটরযান-সংক্রান্ত অন্যান্য কাগজপত্র গণপরিবহনে সংরক্ষণ করবেন। এই আইনের ১৬ ধারায় মোটরযান রেজিস্ট্রেশন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা মোটরযান মালিক রেজিস্ট্রেশন সনদ ব্যতীত সড়ক-মহাসড়ক বা পাবলিক প্লেসে চলাচল করিতে পারিবেন না। তবে প্রতিরক্ষা বাহিনীতে ব্যবহৃত মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন সংশ্লিষ্ট বাহিনী সম্পন্ন করিবে এবং উক্ত রেজিস্ট্রেশন সমগ্র বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য হবে।
এই আইনের ২৪ ধারায় রেজিস্ট্রেশনের কোনো শর্ত ভঙ্গ করিলে বা আইনের পরিপন্থী কোনো কার্য সম্পাদন করলে কর্তৃপক্ষ শুনানি গ্রহণ ও কারণ লিপিবদ্ধ করে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত বা বাতিল করিতে পারিবে। রেজিস্ট্রেশন স্থগিত বা বাতিল করা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে অনধিক ৩০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত
ফরমে আবেদন করিতে পারিবে। সরকার নির্ধারিত সময় ও পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি করিবে। আইনের ২৫ ধারায় মোটরযানের ফিটনেস সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। মোটরযানের-ফিটনেস সনদ ব্যতীত, ফিটনেস অনুপযোগী, ঝুঁকিপূর্ণ বা ক্ষতিগ্রস্ত, রংচটা, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতীত নির্ধারিত রং পরিবর্তন করে জরাজীর্ণ, বিবর্ণ বা পরিবেশ দূষণকারী কোনো মোটরযান চালনার অনুমতি প্রদান করা যাবে না। ফিটনেস প্রদান করলে, সনদ প্রদানকারী কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।
২৮ ধারায় বলা হয়েছে, রোড পারমিট ব্যতীত কোনো পরিবহন চলতে পারবে না। তবে ধর্মীয় ও সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা মৌসুমি ব্যবসা উপলক্ষে নির্ধারিত রুটের বাহিরে বিধি দ্বারা নির্ধারিত সময় ও শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কর্তৃপক্ষ বা পরিবহন কমিটি সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারী পরিবহন চলাচলের অনুমতি প্রদান করিতে পারিবে।
১১ ধরনের যানবাহনকে রুট পারমিট হতে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে আইনের ৩০ ধারায়। এগুলো হলো- সরকার বা সরকারের পক্ষে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার মালিকানাধীন পরিবহন, সরকার কর্তৃক প্রদানকৃত সরকারি কাজে ব্যবহৃত যে কোনো পরিবহন। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান মালিকানাধীন চুক্তিবদ্ধ নাগরিক সেবা প্রদানের পরিবহন। শৃঙ্খলা বাহিনীর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ব্যবহৃত পরিবহনযান। মৃতদেহ পরিবহন ও সৎকারে নিয়োজিত পরিবহন যান। যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মোটরযান প্রস্তুত বা নির্মাণ করেন অথবা চ্যাসিসে যুক্ত করিবার জন্য বডি নির্মাণ করেন। সরকার কর্তৃক স্বীকৃত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবহনযান। সরকার বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক স্বীকৃত মোটরযান প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত পরিবহনযান। ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার, ভ্রাম্যমাণ ওষুধালয়, ভ্রাম্যমাণ টয়লেট এবং অনুরূপ কার্যে ব্যবহৃত ভ্রাম্যমাণ পরিবহনযান। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গন্তব্য স্থানে পৌঁছানোর জন্য ভিন্ন পথে চালনা করা এই রূপ কোনো পরিবহনযান।
আইনের ৩৪ ধারায় গণপরিবহনের আসন সংখ্যা ও ভাড়া নির্ধারণ করেছে। কর্তৃপক্ষ বা যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি গণপরিবহনে নারী, শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বয়স্ক ব্যক্তি ও শিশুদের জন্য আসন সংখ্যা নির্ধারণ করিতে পারিবে। কোনো গণপরিবহন সহজে দৃশ্যমান স্থানে ভাড়ার চার্ট প্রদর্শন ব্যতীত যাত্রী পরিবহন করিতে পারিবে না। কোনো গণপরিবহনের মালিক, চালক, কন্ডাকটর, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া দাবি বা আদায় করিতে পারিবে না। এই আইনের ৩৮ ধারা অনুযায়ী, সরকার বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবহনযানের চালক, কন্ডাকটর, হেলপার কাম ক্লিনারের কর্মঘণ্টা ও বিরতিকাল নির্ধারণ করিতে পারিবে।
ট্রাফিক সংকেত ভঙ্গের জরিমানা : নতুন এই আইনে ট্রাফিক সংকেত ভঙ্গের জরিমানা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ হাজার, হেলমেট না পরলে জরিমানা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা করা হয়েছে। সিটবেল্ট না বাঁধলে, মোবাইল ফোনে কথা বললে চালকের সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে কাউকে আহত করলে ৩ লাখ টাকা জরিমানা ও তিন বছরের জেল হতে পারে।
ভাড়ার চাট প্রদর্শন না করার দ- : গণপরিবহনে ভাড়ার চার্ট প্রদর্শন না করলে বা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি কিংবা আদায় করলে এক মাসের জেল বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা। এছাড়া চালকের ১ পয়েন্ট কাটা যাবে। কনট্রাক্ট ক্যারিজের মিটার অবৈধভাবে পরিবর্তন বা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি বা আদায়-সংক্রান্ত ধারা ৩৫-এর বিধান লঙ্ঘনের দন্ড যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ৩৫-এর বিধান লঙ্ঘন করেন, এজন্য তিনি সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদ- বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন এবং চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কাটা হবে। কন্ডাকটর লাইসেন্স ছাড়া কোনো গণপরিবহনে কন্ডাকটর হিসেবে দায়িত্ব পালন-সংক্রান্ত ধারা ১৪-এর বিধান লঙ্ঘনের দন্ড যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ১৪-এর বিধান লঙ্ঘন করেন, এজন্য তিনি সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদ- বা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা অর্থদ-ে দ-িত হবেন। গণপরিবহনে ভাড়ার চার্ট প্রদর্শন ও নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া দাবি বা আদায়-সংক্রান্ত ধারা ৩৪-এর বিধান লঙ্ঘনের দন্ড যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ৩৪-এর উপধারা (৩) ও (৪)-এর বিধান লঙ্ঘন করেন, এজন্য তিনি সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদ- বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন এবং চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কাটা হবে।
রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরযান চালনার শাস্তি : মোটরযান রেজিস্ট্রেশন ছাড়া মোটরযান চালনা-সংক্রান্ত ধারা ১৬-এর বিধান লঙ্ঘনের দন্ড যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ১৬-এর বিধান লঙ্ঘন করেন, এজন্য তিনি সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদ- বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন। ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার ও প্রদর্শনে বিধিনিষেধ সংক্রান্ত ধারা ১৭-এর বিধান লঙ্ঘনের দন্ড যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ১৭-এর বিধান লঙ্ঘন করেন, এজন্য তিনি সর্বোচ্চ দুই বছর, তবে কমপক্ষে ছয় মাসের কারাদ- বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা, তবে কমপক্ষে ১ লাখ টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন। মোটরযানের মালিকানা পরিবর্তন বা হস্তান্তরের কারণে হস্তান্তর গ্রহীতার রেজিস্ট্রেশন-সংক্রান্ত ধারা ২১-এর বিধান লঙ্ঘনের দ-- যদি কোনো হস্তান্তর গ্রহীতা ধারা ২১-এর বিধান লঙ্ঘন করেন, এজন্য তিনি সর্বোচ্চ এক মাস কারাদ- বা সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন।
ফিটনেসবিহীন পরিবহন পরিচালনার শাস্তি : মোটরযানের ফিটনেস সনদ ছাড়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেস সনদ ব্যবহার করে বা ইকোনমিক লাইফ অতিক্রান্ত বা ফিটনেসের অনুপযোগী, ঝুঁকিপূর্ণ মোটরযান চালনা-সংক্রান্ত ধারা ২৫-এর বিধান লঙ্ঘনের দ-- যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ২৫-এর বিধান লঙ্ঘন করেন, এজন্য তিনি সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদ- বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন। ট্যাক্স-টোকেন ছাড়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ ট্যাক্স-টোকেন ব্যবহার করে মোটরযান চালনা-সংক্রান্ত ধারা ২৬-এর বিধান লঙ্ঘনের দন্ড যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ২৬-এর বিধান লঙ্ঘন করেন, এজন্য তিনি সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অর্থদ-ে দ-িত হবেন।
রুট পারমিটবিহীন পরিবহনের দ- : রুট পারমিট ছাড়া পাবলিক প্লেসে পরিবহন যান ব্যবহার-সংক্রান্ত ধারা ২৮-এর বিধান লঙ্ঘনের দন্ড যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ২৮-এর উপধারা (১)-এর বিধান লঙ্ঘন করেন, এজন্য তিনি সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদ- বা সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন। বিদেশি নাগরিকের বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিজ দেশের মোটরযান/গণপরিবহনের রুট পারমিট গ্রহণ না করা-সংক্রান্ত ধারা ২৯-এর বিধান লঙ্ঘনের দ-- যদি কোনো বিদেশি নাগরিক ধারা ২৯-এর বিধান লঙ্ঘন করেন, এজন্য তিনি সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা অর্থদ-ে দ-িত হবেন।
মোটরযানের বাণিজ্যিক ব্যবহারের বিধান লঙ্ঘনের দ- : মোটরযানের বাণিজ্যিক ব্যবহার-সংক্রান্ত ধারা ৩১-এর বিধান লঙ্ঘনের দ-- যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ৩১-এর বিধান লঙ্ঘন করেন, এজন্য তিনি সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদ- বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন এবং চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কাটা হবে।

বিবিসি’র বিশ্লেষণ
সড়ক আইন নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যত কথা

নতুন সড়ক আইন নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। রয়েছে বিরুদ্ধ মতও। বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রী আসমা আক্তার সেলিনা মনে করেন, নতুন এই আইনের ফলে মানুষ আগের চাইতে বেশি সচেতন হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে প্রতিদিন এত অ্যাকসিডেন্ট হয়, তারপরও কোনো চেঞ্জ নাই। কে কার আগে যাবে প্রতিযোগিতা করতে থাকে। মারা যায় ওই সাধারণ মানুষ। আবার পথচারীরাও ইচ্ছামতো রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছে। এই দুইটাই বন্ধ হওয়া উচিত। নতুন আইনে শাস্তি বাড়ানোয় মানুষ এখন আগের চাইতে ভয় পাবে, সাবধান হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন এই আইন প্রয়োগে তৎপর থাকে সে-ব্যাপারে নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন উম্মে সালমা সাথি। তিনি বলেন, ‘আইন তো অনেক আছে, কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন হয় কি না সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য পুলিশকে অ্যাকটিভ হতে হবে। বিদেশে দেখেন রাস্তায় এত মানুষ, এত গাড়ি- কেউ কিন্তু আইন ভাঙে না, কারণ পুলিশ অনেক টাকা জরিমানা করে। আসলে ভয় দেখানোর মতো আইন প্রয়োগ করলে শৃঙ্খলা আপনা আপনি আসবে।’
শাস্তি বাড়ানোর বিরোধিতা : সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর নামে পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে শাস্তি বাড়ানোর বিরোধিতা করেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান। শ্রমিকদের জন্য নতুন এই আইন নমনীয় করার দাবি জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘যদি সব মামলায় ৩০২ ধারা (মৃত্যুদ-) রাখা হয়, ড্রাইভারকে যদি যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয় ওই চালকের গরিব পরিবারের কী অবস্থা হবে? তাছাড়া আমাদের দেশে এমনিতেই লাখ লাখ ড্রাইভার কম আছে। জামিনযোগ্য শাস্তি না হলে ড্রাইভারের সংকট আরও বাড়বে। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করা দরকার।’ ‘আইন কার্যকর করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে শ্রমিকদের যেন হয়রানি হতে না হয়।’
মন্দের ভালো আইন : বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৫৫ ব্যক্তির প্রাণহানি হচ্ছে। আর বাংলাদেশ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে, দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ১২ হাজার মানুষ নিহত ও ৩৫ হাজার আহত হন। এই পটভূমিতে নতুন এই আইন সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে জানান যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তবে আইনটি আরও যাত্রীবান্ধব হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
মোজাম্মেল হক আরও বলেন, ‘আমাদের দেশ দীর্ঘদিন যাবত যেখানে আইনের শাসন অনুপস্থিত ছিল। সেখানে এই আইনে অপরাধ ও দ-ের পরিমাণটা যুগোপযোগী করা হয়েছে। তবে যাত্রী স্বার্থে দিকটা এখানে নজরে আনা হয়নি। তাই বলব- মন্দের ভালো আইন হয়েছে।’ ‘এই আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এই আইনটি সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হতে পারে।’
মামলার দীর্ঘসূত্রতা : মামলা দায়ের থেকে শুরু করে নিষ্পত্তি পর্যন্ত দীর্ঘসূত্রতা এবং সাক্ষ্য গ্রহণে জটিলতা মীমাংসা করা না গেলে আইনের সুফল থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হবে বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক সীমা জামান। তিনি বলেন, ‘একটা মামলায় জাজমেন্ট হয়, আপিল হয়, রিভিউ হয়। সব মিলিয়ে অনেক সময় লেগে যায়। ততদিনে ঘটনার ইমপ্যাক্টটা সেভাবে থাকে না।’ এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় সাক্ষ্য গ্রহণ নিশ্চিত করা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। পুলিশি তৎপরতারও একটা ব্যাপার আছে। এখন সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যদি একটা ট্রাইব্যুনাল থাকত। তদন্ত কর্মকর্তারা যদি চাপে থাকতেন যে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে, তাহলে সাধারণ মানুষ এই আইনের সুফলটা পেত।

অনেক দেশের তুলনায় নিরাপদ
বাংলাদেশের সড়ক

নতুন সড়ক আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সড়কে আইন লঙ্ঘন করলে নতুন আইনে সাজা দেওয়া হবে। নতুন এ আইনে সব ধরনের সাজা বাড়ানো হয়েছে। নতুন আইনে ট্রাফিক সংকেত ভঙ্গের জরিমানা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ হাজার, হেলমেট না পরলে জরিমানা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা করা হয়েছে। সিটবেল্ট না বাঁধলে, মোবাইল ফোনে কথা বললে চালকের সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে।
এর আগে রাজধানী ঢাকায় বাসচাপা পড়ে দুজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে ঘিরে ছাত্ররা নিরাপদ সড়কের দাবিতে পথে নেমেছেন। তাদের অবরোধ-আন্দোলনকে ঘিরে সরকারও বেশ বিব্রতকর অবস্থায়। কিন্তু বিশে^র অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের সড়ক আসলে ঠিক কতটা নিরাপদ? রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশে পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার তুলনামূলক দৃষ্টিতে কতটা কম বা বেশি?
জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু ২০১৫ সালে যে ‘গ্লাবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি’ প্রকাশ করেছিল, তাতে দেখা যায় পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার আসলে নিম্নআয়ের দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি। যদিও বাংলাদেশ তার অন্যতম। তবে জনসংখ্যার সঙ্গে সারাদেশে দুর্ঘটনার সংখ্যা তুলনা করলে দেখা যাবে নিম্ন বা মধ্যআয়ের দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের চেয়ে শোচনীয় অবস্থা আরও অনেক দেশে। এর মধ্যে উল্লেখ করা যেতে পারে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল বা আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ার নাম। প্রতি ১ লাখ জনসংখ্যায় এ দুটি দেশে পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। এমন কী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামেও এই হার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি।
ইরানের জনসংখ্যা বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক; কিন্তু পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু বাংলাদেশের চেয়েও অনেক বেশি। তবে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে এখানে বাংলাদেশের কোনো তুলনা হতেই পারে না।
জাতিসংঘের পরিসংখ্যান বলছে পশ্চিমী দুনিয়ার বেশিরভাগ উচ্চআয়ের দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মতো দেশে পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার প্রায় আড়াই গুণ বেশি। এখানে বাংলাদেশের পরিস্থিতি কিন্তু ভারত, চীন বা মেক্সিকোর মতো জনবহুল দেশগুলোর সঙ্গেই তুলনীয়। এসব দেশে প্রতি ১ লাখ জনসংখ্যায় পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার যত, বাংলাদেশের পরিসংখ্যানও মোটামুটি তার কাছাকাছি।
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পথ দুর্ঘটনার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যে মুশকিল, জাতিসংঘের সংস্থা হু-র সমীক্ষায় সে-কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের’ (পিপিআরসি) একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পথ দুর্ঘটনা নিয়ে বছর কয়েক আগে উঠে এসেছিল কিছু ইন্টারেস্টিং তথ্য। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সেদেশে শহরের রাস্তায় অনেক দুর্ঘটনা ঘটলেও বেশির ভাগ দুর্ঘটনাই কিন্তু ঘটে জাতীয় বা আঞ্চলিক স্তরের হাইওয়ে বা মহাসড়কগুলোতে। যেমন- ২০১২ সালে বাংলাদেশে রাজধানী ঢাকার চেয়েও বেশি পথ দুর্ঘটনা ঘটেছিল কুমিল্লা জেলায়। সেই বছরে সর্বাধিক পথ দুর্ঘটনার ঘটনায় প্রথম ৫টি জেলা ছিল যথাক্রমে- কুমিল্লা, ঢাকা, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও চট্টগ্রাম।
পিপিআরসি-র প্রতিবেদনে বলা হয়, এই জেলাগুলোর ভেতর দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক গেছে বলেই এই জেলাগুলোয় দুর্ঘটনার হার এত বেশি। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টেও বলা হচ্ছে, বিশ^জুড়ে পথ দুর্ঘটনায় যারা মারা যান তার অর্ধেকই কিন্তু গাড়ির আরোহী নন। এদের মধ্যে ৪৯ শতাংশই আসলে পায়ে-হাঁটা পথচারী কিংবা সাইকেল বা মোটরবাইকের আরোহী। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। সেখানেও পথ দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে এই পদাতিক বা বাইক-সাইকেল আরোহীর সংখ্যাই অর্ধেক। বছর তিনেক আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছিল, ‘নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু অগ্রগতি করলেও তাদের এখনও অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।’ বিভিন্ন ‘রিস্ক ফ্যাক্টর’ বা ঝুঁকির উপাদানগুলোর মোকাবিলা করে পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু কমাতে বাংলাদেশে একটি সুসংহত আইন প্রণয়নের ওপরও জোর দিয়েছিল জাতিসংঘের ওই সংস্থা।

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৭ অক্টোবর ২০১৯

  • ৩ অক্টোবর ২০১৯

  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯