শেখ হাসিনাকে যেমন দেখেছি

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ১৪:০২

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত


প্রথম সন্তান যখন জন্মালেন তখন শিশু কন্যাটিকে কোলে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘হা চিনা’ বলে তাকে ডাকতে শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনিই হলে শেখ হাসিনা। বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধু তার প্রথম সন্তানকে রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে আসতে দিতেন কি না তা বলা শক্ত। তবে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার সময় হাসিনা ছাত্রলীগের নেত্রী ছিলেন। কিন্তু পিতা-মাতাসহ পরিবারের সকলের হত্যার পর বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ তাকেই বেছে নিলেন অভিভাবক হিসেবে। আওয়ামী লীগের মধ্যে তখন কিছুটা মতপার্থক্য থাকলেও তাজউদ্দীন সাহেবের স্ত্রী বেগম জহুরা তাজউদ্দীন হাসিনাকেই নেতৃত্বে বসানোর জন্য তৎপরতার সঙ্গে কাজ করেন।
হাসিনার সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ হয় সম্ভবত ১৯৭২ সালের ২৩-২৪ জানুয়ারি, তার বাবার ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়িতে। এর আগের বছর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমি ও আমার এক চিত্রসাংবাদিক সহকর্মী ৩২ নম্বর ধানমন্ডি রোডের বাড়িতে গিয়েছিলাম। তখন দেখেছিলাম বেগম মুজিব একটি পাকিস্তানি পতাকা পা দিয়ে মাড়িয়ে দিচ্ছেন, কথা হয়নি। তখন বাড়িটি ঘিরে রেখেছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর লোকরা। সেদিনই আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি খান সেনারা ঐ বাড়ির দিকে এগোতেই তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ভারতীয় সেনারা এবং তাদের সবাইকে গ্রেফতার করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়।
আজকের দিনে যিনি হাসিনার বড় সমালোচক সেই খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেননি, তার স্বামী মেজর জিয়াউর রহমান ত্রিপুরায় ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। জিয়া নয় মাসে অন্তত চারবার তার স্ত্রী খালেদাকে ত্রিপুরায় আসার জন্য অনুরোধ করে লোক পাঠান। খালেদা তাদের ফিরিয়ে দেন। দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী তখন আমি নিয়মিত বিকেলের দিকে খবর সন্ধানে গণভবনে যেতাম। তখন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব ছিলেন বর্তমানে প্রবীণ মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, তোফায়েল আহমেদ ’৭১ সালে ‘মুজিব বাহিনী’ নামে কলকাতায় একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সেই সুবাদে আমরা দুজনেই খুব বন্ধু। একদিন আমাকে তোফায়েল ইঙ্গিতে বললেন- আপনি যাবেন না, বড় খবর পাবেন। খবরের নেশায় আমিও চুপটি করে বঙ্গবন্ধুর ঘরের বাইরে বেঞ্চে বসেছিলাম। হঠাৎ দেখি হাসিনা সঙ্গে ঘোমটা দেওয়া এক মহিলাকে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত বেগে বাবার ঘরে ঢুকে গেলেন। পেছনে পেছনে তোফায়েলও। কয়েক মিনিটের মধ্যে তোফায়েল বঙ্গবন্ধুর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে বললেন- চিনতে পারলেন হাসিনার সঙ্গে কে এসেছে? আমি বললাম- না। তোফায়েল উত্তর দিলেন- আপনারা ত্রিপুরায় যে মেজরকে চেনেন উনি তার স্ত্রী। খালেদা জিয়া। ইনি হাসিনাকে ধরে বঙ্গবন্ধুর কাছে এসেছে স্বামীর কাছে ফিরে যাবার জন্য।
তোফায়েল সাহেব বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ক্যান্টনমেন্ট থেকে জিপ গাড়ি চালিয়ে গণভবনে এসে দ্রুতবেগে বঙ্গবন্ধুর ঘরে ঢুকলেন। বঙ্গবন্ধু আস্তে কথা বলতেন না। আমি বাইরে থেকে শুনলাম- তিনি বললেন, আমি তোমাকে হুকুম দিচ্ছি- তুমি তোমার বউকে নিয়ে বাড়ি চলে যাও। জিয়া  তখন বঙ্গবন্ধুকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, তার স্ত্রী খালেদা ঐ ৯ মাস ক্যান্টনমেন্টে এক পাকিস্তানি সামরিক অফিসারের সঙ্গে ছিলেন। তাই তিনি তাকে নিতে অস্বীকার করেন। বঙ্গবন্ধু এবার একটু উত্তেজিত হয়ে বললেন- এটা আমার হুকুম। এটা তোমাকে মানতে হবে। জিয়া কথা বাড়ানোর চেষ্টা করলেন কিন্তু বঙ্গবন্ধু শুনতে নারাজ। সেদিন হাসিনাই বেগমের সঙ্গে তার স্বামীর মিল ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। হাসিনাও বাবার ঘর থেকে হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলেন।
সেই বেগম খালেদা জিয়া ২০০১ সালে সামরিক বাহিনীর সহায়তায় এবং পাকিস্তান ও আমেরিকার সহায়তায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হয়েই তার প্রথম উদ্দেশ্যে ছিল হাসিনাকে হত্যা করা। বেগমের অপশাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে হাসিনা এবং তার দল। বেগমের প্রথম পুত্র তারেক রহমান তখন হাসিনাকে হত্যা এবং তার দলকে ধ্বংস করার জন্য- খালেদার নির্দেশে তাদের ওপর গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। সেই হামলায় হাসিনা ঈশ^রের দয়ায় বেঁচে গেলেও- আওয়ামী লীগের প্রথম সারির বেশ কিছু নেতা নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন- বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির স্ত্রী আইভি রহমান। গুরুতর আহত অবস্থায় ৪০-৫০ জন প্রথম সারির আওয়ামী লীগ নেতাকে বিশেষ বিমানে উড়িয়ে এনে দিল্লিতে চিকিৎসা করা হয় বেশ কিছুদিন ধরে। এটাই ছিল স্বামী-স্ত্রীকে মিলিয়ে দেবার প্রতিদান। সেই থেকেই বাংলাদেশের মুক্তিপ্রেমী মানুষ খালেদার প্রতি ধিক্কার ও ঘৃণা প্রকাশ করতে থাকেন।
হাসিনাকে আমি খুব কাছ থেকে একাধিকবার দেখেছি ও কথা বলেছি। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার দিন হাসিনা, তার স্বামী ড. ওয়াজেদ, ছোট বোন রেহানা জার্মানিতে (তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে) ছিলেন। খবরটা যখন গোটা বিশে^ ছড়িয়ে পড়ল তখন সমস্ত ভারতবর্ষ শোকস্তব্ধ হয়ে গেল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী খবরটি পেয়েই গভীর রাতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকেন আর সেই বৈঠকে বিশেষভাবে ডাকা হয় ভারতের সাবেক সামরিক বাহিনীর প্রধান, মুক্তিযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই জেনারেল মানেকশ্-কে। আমি ইন্দিরা গান্ধীর ছোট ছেলে সঞ্জয় গান্ধী ও তার স্ত্রী মেনোকা গান্ধীর থেকে সেদিন ২ নম্বর সফদরজং রোডের বাড়িতে কি হয়েছিল সব শুনেছি। ইন্দিরা গান্ধী নৈশ পোশাক পরে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ‘মুজিব ভাই’ মুজিব ভাই বলে চিৎকার করতে থাকেন। তার চিৎকার শুনে ছেলে সঞ্জয় ও পুত্রবধূ ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। এসব কথা আমি আগেও লিখেছি। সঞ্জয় সেদিন বলেছিলেন- মামিকে আর থামানো যাচ্ছিল না। মামি ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। মনে হচ্ছিল মামি যেন পরিবারের কোনো মামার মৃত্যুতে এই ধরনের শোকপ্রকাশ করে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন। একে একে মন্ত্রিসভার সদস্যরা আসতেই মামি নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে শুরু করলেন। তারপরেই দেখলাম মামি পশ্চিম জার্মানিতে ভারতের রাষ্ট্রদূতকে ফোন করলেন, এবং তাকে নির্দেশ দিলেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা, জামাতা এবং তাদের ছেলে-মেয়েদের হোটেল থেকে আপনার বাড়িতে এনে রাখুন এবং আমাকে জানান। তখনকার ভারতের বিদেশ সচিব টি.এন. কল ও ‘র’-এর প্রধান ইন্দিরা গান্ধীকে জানালেন, আমাদের জার্মানের রাষ্ট্রদূত তারা হাসিনা ও বাকি সকলের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। ভোর হতেই ডেকে পাঠালেন ডেপুটি মিনিস্টার প্রণব মুখার্জিকে। প্রণববাবুকে নির্দেশ দিলেন- তুমি এই মুহূর্তে আমার বিশেষ এয়ারফোর্সের বিমানটি নিয়ে জার্মানি চলে যাও।
আমি এদিকে দেখছি ওদের সব ব্যবস্থা আমি করছি, ইন্দিরা গান্ধীর দীর্ঘদিনের একান্ত সচিব আর কে ধাওয়ানকে বললেন- তুমি এদিকে ওদের জন্য বড় একটা ফ্ল্যাট দেখে সব ঠিকঠাক করে রাখ। প্রণব কাকাই ওদের নিয়ে আসবে। আর প্রণববাবুকেও বলে দিলেন ওরা এখানে এলে তুমি ওদের সব দেখভাল করবে আর নিরাপত্তার ব্যবস্থাটা আমি করব। তার নির্দেশ মতোই সব কাজ হলো। ওরাও দীর্ঘদিন দিল্লির পান্ডারা রোডের সরকারি আবাসনে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশেই হাসিনার সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা হলো।
বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা হাসিনা দিল্লি থাকাকালীন এসে গোপনে হাসিনার সঙ্গে দেখা করতেন এবং সে-দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাকে ওয়াকিবহাল করতেন। কিন্তু যে জিয়া বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে হত্যার ষড়যন্ত্রে ছিলেন তিনিও একদিন সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে নিহত হলেন। হাসিনা দিল্লিতে থাকাকালীন আমি একাধিকবার তার পান্ডারা রোডের বাসভবনে দেখা করেছি, কথা বলেছি। আমার যতদূর মনে পড়ে সে-সময় দিল্লির একটি পাবলিশিং হাউস বঙ্গবন্ধুর হত্যার নেপথ্যে ষড়যন্ত্র নিয়ে আমার লেখা বইটি ‘গরফহরমযঃ গধংধপধৎ রহ উযধশধ’ আমার বন্ধুরা বললেন, বইটি আপনি নিজে গিয়ে হাসিনার হাতে দিয়ে আসুন। আমি প্রথমে নিরাপত্তা বাহিনীর অনুমতি নিয়ে পান্ডারা রোডে তার বাড়িতে গেলাম, তার হাতে বইটি তুলে দিতেই তিনি আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে বললেন- আমি এই বইটির বিজ্ঞাপন ‘ঞরসবং ড়ভ ওহফরধ’-তে দেখেছি। কিন্তু আমাদের বেরেনো বারণ। তাই আপনি নিয়ে এসেছেন ভালোই হলো। আমি বইটি পড়ে আপনাকে জানাব। আমি বললাম- আপনাকে জানাতে হবে না। আমি একদিন এসে আপনার সঙ্গে দেখা করে জেনে যাব। তাই হয়েছিল, বইটি প্রকাশিত হবার পর জিয়াউর রহমান বইটি বাংলাদেশে বিক্রি হওয়া নিষিদ্ধ করে দিলেন। নিষিদ্ধ করলেন আমার বাংলাদেশ সফর। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের বাঙালিরা বিপুল ভোটে জয়ী করে হাসিনাকে সে-দেশের প্রধানমন্ত্রী করলেন। প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভেঙে পড়া সুসম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করলেন। তিনি একে একে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার জন্য অগ্রাধিকার দিতে শুরু করলেন। তার শাসনকালে তিনি কলকাতার বইমেলায় এসেছিলেন। সেই সময় তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল এবং নানা বিষয়ে তার সঙ্গে আমার মতবিনিময় হয়। এখানে আর একটি বিষয় উল্লেখ করছি, তা হলো দিল্লি থেকে তিনি যেদিন কলকাতা হয়ে ঢাকায় ফেরেন ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব শরদিন্দু চট্টোপাধ্যায় আমাকে ফোন করে বললেন- তার সঙ্গে বিমানবন্দরে যেতে হবে কারণ হাসিনা আসছে, আমার যতদূর মনে পড়ে সেদিন তার সঙ্গে ছিলেন তাজউদ্দীন পতœী জহুরা তাজউদ্দীন এবং আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতা আবদুস সামাদ আজাদ। কিছু সময় বিমানবন্দরে বিশ্রাম নেবার পর শরদিন্দু বাবু আমাকে বললেন- চলুন গাড়িতে উঠি। আমাদের গাড়িতে উঠলেন সামাদ সাহেবও। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে আমরা যশোর রোডের দিকে চলে গেলাম, বিমানবন্দরের কাছেই যশোর রোডের ওপর একটি মসজিদ আছে। বঙ্গবন্ধু-কন্যা সেদিন মসজিদে নামাজ আদায় করলেন, আবার ফিরে গেলাম বিমানবন্দরে। এবার ঢাকার বিমানে আমরা তাকে তুলে দিলাম। তিনি প্রথমবার ঢাকায় গিয়ে দলকে শক্তিশালী করার জন্য জেলায় জেলায় সফর করতে শুরু করলেন।
ছয়-সাত বছর দিল্লিতে থাকাকালীন তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন ইন্দিরা গান্ধীর সুদিন ও দুর্দিন। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তার যেন মা-বোনের সম্পর্ক ছিল। ইন্দিরা গান্ধী প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহে তিন-চার দিন তার সঙ্গে টেলিফোনে বা বাড়িতে ডেকে কথা বলতেন ও সান্ত¡না দিতেন। কতগুলো উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো- প্রধানমন্ত্রী হয়েই তিনি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ফারাক্কা পানি চুক্তি সম্পাদন করা, হাসিনা দেশে ফিরে যাওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই ইন্দিরাকেও নিজের বাড়িতে আততায়ীর হাতে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ইন্দিরা হত্যার খবর পেয়েই হাসিনা দিল্লিতে ছুটে এসেছিলেন। তিনি তার শোকবার্তায় সেদিন বলেছিলেন, বাংলাদেশ হারাল তাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নেত্রীকে। আর বঙ্গবন্ধু থেকে ইন্দিরা এই দুই হত্যার নেপথ্যেই কাজ করেছে পাকিস্তান আর আমেরিকা, যারা বাংলাদেশকে মুক্ত হবার পথে বিরোধিতা করেছিল।
ফারাক্কা চুক্তির কথা আগেই উল্লেখ করেছি। ফারাক্কা চুক্তি করার জন্য তার মন্ত্রিসভার মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাককে (স্বাধীনতা সংগ্রামী) সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে দেখা করতে পাঠিয়েছিলেন। জ্যোতিবাবু তখন দিল্লিতে। রাজ্জাক সাহেব দিল্লিতে তার সঙ্গে দেখা করলে জ্যোতিবাবু তাকে পরামর্শ দেন- তিনি যেন কলকাতায় গিয়ে এই প্রতিবেদক অর্থাৎ আমি আর প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি সোমেন মিত্রের সঙ্গে দেখা করেন। রাজ্জাক সাহেব জ্যোতিবাবুর কথা মতো কলকাতায় এসে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। আমি ও সোমেনবাবু রাজ্জাক সাহেবকে নিয়ে মালদায় গেলাম। আমাদের সঙ্গে রাজ্জাক সাহেবকে দেখে বরকত সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন- ইনি কে? আমরা বললাম, ইনি বাংলাদেশের সেচমন্ত্রী। শুনেই বরকত সাহেব রেগে গিয়ে বললেন, ওরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। ওদের কেন আমার বাড়িতে নিয়ে এসেছেন, সোমেন মিত্র বললেন- শুনুন ওরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি, উনি হাসিনার মন্ত্রিসভার একজন মন্ত্রী। শুনে বরকত সাহেব একটু আশ^স্ত হয়ে বললেন- হাসিনা তো ভালোই চালাচ্ছে। তার মন্তব্য শুনে আমরা তাকে তার বেডরুমে নিয়ে গিয়ে জ্যোতি বসুর বক্তব্য জানালাম। তিনি জ্যোতিবাবুকে ফোন করলেন। জ্যোতিবাবু ফোনে বললেন- ফারাক্কা চুক্তি করুন আমার কোনো আপত্তি নেই। ফারাক্কা চুক্তি সই হওয়া হাসিনার বিদেশনীতির একটা বড় সাফল্য। আরও সাফল্য দীর্ঘদিনের বকেয়া ছিটমহল বিনিময়, সীমান্ত চুক্তি এবং বাংলাদেশের নানা উন্নয়নের ব্যাপারে তার সাফল্য। তিনি সাফল্য অর্জন করেছেন বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করে। আরও সাফল্য এসেছে যে ’৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বক্তৃতা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে স্বীকৃতি লাভ। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় তার জিরো টলারেন্স নীতি, বিদেশনীতির ক্ষেত্রে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নয়নের নীতি, তিনি ড. মনমোহন সিংহ থেকে নরেন্দ্র মোদি সকলের সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের সুসম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে তিনি কখনো পিছিয়ে পড়েন নি। পিতা বঙ্গবন্ধু যেভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্নকে পূরণ করার জন্য তার কন্যা আদাজল খেয়ে উঠে পড়েছেন। শিক্ষা ও ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাপারে হাসিনার অবদান বাংলাদেশ চিরদিন মনে রাখবে, মনে রাখবে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ।
হাসিনা বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে যে কতটা আগ্রহী তা তার সঙ্গে কথা না বলে বোঝা যাবে না। এপার বাংলা থেকে কোনো বাংলা ভালো লেখা প্রকাশ হলে তিনি তা পড়ে ফেলেন। এ-কথা আমার শোনা, সমরেশ মজুমদারের কাছ থেকে। এখানে একটি কথা উল্লেখ না করে শেষ করতে পারছি না। ২০১২ সালে আমি যখন মুক্তিযুদ্ধের সম্মান পেলাম তখন তার দেওয়া নৈশভোজে আমরা কয়েকজন বসে এক টেবিলে খাচ্ছিলাম। আমায় দেখে হাসিনা আসতেই আমি প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান জানানোর জন্য উঠে দাঁড়ালাম। তিনি আমার মাথায় হাত দিয়ে বসিয়ে দিয়ে বললেন, ভালোভাবে খান। তারপর প্রশ্ন করলেন, কেমন আছেন? কবে যাচ্ছেন? আমি বললাম- কাল ফিরে যাচ্ছি- কলকাতায়। তিনি বললেন- কাল যাবার কি দরকার কয়েকদিন থেকে যান। আমি মাথা নিচু করে বললাম যে, আপনার সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী ফিরে যাচ্ছি। দূরে দাঁড়িয়ে অন্যদের খাবার তদারকি করছিলেন দীপুমনি। দীপুমনি বিদেশমন্ত্রী। তিনি ডেকে দীপুমনিকে বললেন- উনি যতদিন থাকতে চান থাকবেন। তুমি সব ব্যবস্থা করো। হোটেলে ফিরে এসে কাউন্টারে চাবি নিতে গেলে, আমাকে বলা হলো- আমরা বিদেশমন্ত্রক থেকে নির্দেশ পেয়েছি। আপনি কতদিন থাকবেন বলুন। এটাই ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার সম্পর্ক।

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৭ অক্টোবর ২০১৯

  • ৩ অক্টোবর ২০১৯

  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯