রোহিঙ্গা সংকট এখন কোন পর্যায়ে

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:৩৮

ডা. এস এ মালেক


দুই বছর পূর্বে যখন দল বেঁধে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ শুরু করে তখন অনুমান করা গেছে যে, রোহিঙ্গা শরণার্থীরাই একদিন বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াবে। এর পূর্বেও রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। যে সংখ্যায় এরা প্রবেশ করেছিল তার একটা ক্ষুদ্র অংশ মিয়ানমারে ফিরে গেছে। বাকিরা সব এখানেই থেকে গেছে। তাদের সংখ্যা কম হলেও প্রায় ৪ লক্ষাধিক। তবে এবার মিয়ানমারের বর্বর সেনাবাহিনী ও পুলিশ রাখাইন রাজ্যে যে ভয়াবহ তা-বলীলা সৃষ্টি করেছিল, নির্বিচারে নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে, নারী ধর্ষণ করেছে, বিশেষ করে যুবক সম্প্রদায়কে হয় হত্যা, না হয় দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছে। আর কোনোদিন যাতে তারা তাদের বসতবাড়িতে ফিরে যেতে না পারে, সেই লক্ষ্যে ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দিয়েছে। সে-কারণে মাত্র তিন সপ্তাহে ৩ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সারাবিশ^ দেখেছে সেই করুণ দৃশ্য। কীভাবে তারা জীবন বাজি রেখে নদীপথে, জঙ্গল ও পাহাড় পেরিয়ে কি অসহায়ভাবে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশ সরকার মানবতাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। স্থানীয় জনগণ নিজেদের বাসস্থানে পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের থাকার জায়গা দিয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। রোহিঙ্গাদের কারণে আশপাশের বন-জঙ্গলের বিরাট ক্ষতিসাধন হয়েছে, মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটেছে। প্রশ্ন উঠেছে তাদের দ্রুত ফিরিয়ে নেওয়ার। সারাবিশে^র দৃষ্টি রোহিঙ্গাদের ওপর। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানরা, মানবাধিকার সংগঠন, দাতা সংস্থা, জাতিসংঘের প্রতিনিধিসহ দায়িত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে গেছেন। রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ, মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন, খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ তারা করেছেন। সকলেরই একই কথা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে। জাতিসংঘে এ নিয়ে কয়েকবার আলোচনা হয়েছে এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুকে আন্তর্জাতিক সমস্যা উল্লেখ করে তিনি এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনামূলক প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। তবে রোহিঙ্গা সংকটের কোনো সমাধান হয়নি। পৃথিবীর বৃহত্তম শক্তিগুলো তাদের স্বার্থের অনুকূলে বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য পেশ করছেন, যা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আজ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। কোনো কোনো সরকারপ্রধান মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে অবরোধ সৃষ্টির কথা বললেও চীন ও রাশিয়ার ভেটো প্রয়োগের কারণে, তা কার্যকর করা যায়নি। কোনো কোনো দেশ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও বরং প্রত্যেকটি দেশ নিজেদের স্বার্থ সংশ্লিষ্টতার কারণে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে যে ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তা নিতে নারাজ বলে মনে হয়। মহাচীন রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের পক্ষে সব সময় কথা বলে আসছেন। কিন্তু মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে তারা নন। কেন নন, তা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এবারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চীন সফরের পর রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে অনুরোধ জানিয়েছেন; কিন্তু ফেরত নেওয়ার ক্ষণেই দেখা গেল রোহিঙ্গারা বেঁকে বসেছে। বিশাল সমাবেশ ডেকে রোহিঙ্গারা দাবি তুলেছে নাগরিকত্ব প্রদান ও সম্পূর্ণ নিরাপত্তা না দিলে তারা দেশে ফিরে যাবে না বলে জানিয়েছে। বরং বাংলাদেশকে দোষারোপ করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দিতে অক্ষম। জাপান বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু-রাষ্ট্র। মিয়ানমারের সাথেও দেশটির সম্পর্ক ভালো। জাপান রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল; কিন্তু তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণে উচ্চ গলায় কিছু বলছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসম্যান যেভাবে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের পরামর্শ দিয়েছেন, অনেকেই একে বিপজ্জনক বলে মনে করছেন। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এতে কোনো সাড়া দেননি। পাশর্^বর্তী রাষ্ট্র ভারত সব সময় বাংলাদেশকে সমর্থন করে আসছে এবং রোহিঙ্গা প্রশ্নে যেসব সাহায্য-সহযোগিতা এসেছে, তার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এসেছে ভারত থেকে। রাশিয়া তো বোধহয়, তার দেশের অস্ত্র বিক্রির স্বার্থের কারণে মিয়ানমারকে অসন্তুষ্ট করতে রাজি নন। এই যখন আন্তর্জাতিক বাস্তবতা, তখন রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কোন পথে। এ ব্যাপারে এখন প্রয়োজন জাতিসংঘসহ বিশ^ নেতৃবৃন্দকে এগিয়ে আসা। বিশে^র অন্যান্য ক্ষেত্রে যেভাবে শরণার্থী সংকটের সমাধান করা হয়েছে, বাংলাদেশের ব্যাপারে অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ ব্যাপারে আগ বাড়িয়ে কিছু বলা না গেলেও বিশ^ সম্প্রদায় আন্তরিক হলে, বিশেষ করে ওআইসি-র সমর্থন পেলে সংকটের পথ সহজ হবে বলে মনে হয়। আসলে জাতিসংঘের দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। জাতিসংঘ যারা নিয়ন্ত্রণ করেন সেই মহাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর তাদের কয়েকজনকে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো দেওয়ার অধিকার আছে। তারা সংকট নিরসনে যুক্তি ও মানবতাবাদী হয়ে এগিয়ে না এলে বাংলাদেশের পক্ষে এই ১১ লাখ রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে ভরণপোষণ করা এবং এর সাথে প্রতি বছর যুক্ত হওয়া ১ লাখ নতুন মুখ যোগ হচ্ছে, সুতরাং এই ভয়াবহ সংকট সমাধান সম্ভব নয়। শুধু অর্থনীতি নয়, নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা, হত্যা, ধর্ষণ, মাদকাসক্ত, সন্ত্রাসসহ সবকিছু বিবেচনায় নিলে রোহিঙ্গারা আজ মহা অশুভ শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের জন্য হুমকিস্বরূপ। রোহিঙ্গাদের সর্বশেষ অবস্থানে বাংলাদেশ সত্যই বিব্রতবোধ করছে। কেউ নিজ ইচ্ছেয় যেতে না চাইলে বল প্রয়োগ করে ফেরত দেওয়া জাতিসংঘের নীতি নয়। আর ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাদের ফেরত দিতে গেলে যে ভয়াবহ বাস্তবতার সৃষ্টি হবে, তা যাতে না হয়, সেই কারণেই বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আগমনের বিরোধিতা করেনি। কিন্তু রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, নিরাপত্তা বিঘিœত হতে দেওয়া যায় না। সরকার দ্রুত উন্নয়নশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ আজ বিশে^ উন্নয়নের রোল মডেল। অনেক উন্নত ও ধনী রাষ্ট্র যেখানে দ্রুত উন্নয়ন কর্মকা-ে ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নে সফলতা অর্জন করেছে। আজ বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট প্রায় ৫.২৩ লাখ কোটি টাকার ওপর। সুতরাং যে কোনো বিষয়ে আমরা আজ পিছনের দিকে ধাবিত হতে পারি না। রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন। এটা বাংলাদেশের একক কোনো সংকট নয়, এটা বিশ^বাসীর মানবতার সংকট। এরূপ সংকট জাতিসংঘ সমাধান করতে না পারলে, তাহলে জাতিসংঘের থেকে লাভ কি? হঠাৎ করে দেশের বাইরে ও ভিতরে বেশ কিছু অস্থিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে; কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগেও যা বলেছেন, এখনও তাই বলছেন, এতদ্বাঞ্চলে যে কোনো সংঘাতের পথ এড়িয়ে সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। মনে হয়, কোনো কোনো মহল সংঘাত সৃষ্টিতে আগ্রহী। ইয়েমেনে যা ঘটে চলেছে; সিরিয়া যে কারণে বিধ্বস্তÑ ঐরূপ একটা যুদ্ধময় পরিবেশ বাংলাদেশে সৃষ্টি করা যায় কি না; এরূপ অসৎ উদ্দেশ্য যাদের রয়েছে; তারা রোহিঙ্গা ইস্যুকে আরও জটিল করার চেষ্টা করছে। তারাই বোধহয় যুক্তি দিচ্ছেন বর্তমানে রোহিঙ্গাদের ফেরত দেওয়া সঠিক হবে না।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মানবিক কারণে নির্যাতিত দেশত্যাগী রোহিঙ্গাদের দেশে বসবাসের সুযোগ দিয়েছেন। দেশরতœ, সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার এই উদ্যোগ দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। ইতোমধ্যেই তিনি বিশে^ মানবতার মা হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছেন। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও উদারনীতি বিশে^ ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে অবস্থান করলে আমাদের দেশের স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাহীনতা, পরিবেশ বিপর্যয়সহ অনকেগুলো সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর দ্রুত সুষ্ঠু সমাধান ছাড়া এ মুহূর্তে কোনো কিছু ভাববার নেই। কূটনৈতিক ব্যর্থতার যেসব কথা বলা হচ্ছে বিরোধী দল থেকে, এটা আদৌ সঠিক নয়। বাংলাদেশ সরকার সবসময় কূটনৈতিক চ্যানেলে সমস্যার সমাধানে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে অযথা জল ঘোলা করার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশ সরকার একক কোনো সিদ্ধান্তে নয়; বরং বিশ^বাসীর সমর্থন নিয়েই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তরিক। বিশ^ বিবেক মানবতার এই চরম বিপর্যয়ে এগিয়ে আসুক, এই প্রত্যাশা দেশবাসীর।

লেখক : কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ আগস্ট ২০১৯

  • ০৮ আগস্ট ২০১৯