নারীর ‘ক্ষমতায়ন’ ও আমার ভাবনা

প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০১৯, ১৬:৩৩

আবু এনএম ওয়াহিদ

নারী জন্মদাত্রী মা, নারী পুরুষের তামাম প্রেরণার উৎস, নারী দুর্দমনীয় ‘হিম্মত’-এর অধিকারিণী। কী সেই ‘হিম্মত’, সে-কথায় আসব পরে। ইতোমধ্যে যা বললাম, এর সবই তো সুন্দর, সবই তো সত্য। তার চেয়েও বড় সত্যটি বড়ই কুৎসিত, বড়ই কদাকার। বিষয়টি আর দশ-পাঁচজনের মতো আমাকেও পীড়া দেয়, ব্যথিত করে। আর সেটা হলো- যুগে যুগে, দেশে দেশে নারী লাঞ্ছিতা, নারী বঞ্চিতা, নারী কর্মক্ষেত্রে দারুণ বৈষম্যের শিকার। কিন্তু কেন? কী এসবের প্রতিকার? এই ‘কেন’র উত্তর পাওয়া গেলেও আজ অবধি ‘কী’র কোনো সমাধান মিলছে না। সমস্যার যতই গভীরে যাই, দেখি- অনেক কিছুই বুঝি না, যা বুঝি তা আমাকে আরেক ধন্দে ফেলে দেয়, কারণ নারী-বৈষম্যের জটিল অঙ্কগুলো ছোট ছোট, অথচ প্রত্যেকটির সমীকরণ মানব ইতিহাসের মতোই বিস্তৃত। এ ব্যাপারে যে প্রসঙ্গই উঠুক না কেন, তার জটিলতা ও গভীরতা যেন মহাসাগরের গহিনে গাঁথা, আমার মতো আম-মানুষের নাগালের বাইরে তো বটেই, ডুব দিয়ে এত নিচে গিয়ে মুক্তো তুলে আনার মতন লম্বা দম আমার নেই।
তবুও, নারী-জীবনের এ দুর্বোধ্য বিড়ম্বনাগুলো আমার পিছু ছাড়ে না, আমাকে যখন-তখন তাড়া করে, ভাবায়। কারণ, আমি তো নাড়ির বন্ধন ছিঁড়ে নারীরই পেট থেকে বেরিয়ে আসা নর, আমিও যে নারীর স্বামী, নারীর পিতা, নারীর ভাই, নারীর আরও কত কিছু। তার ওপর হাল আমলে নারী-জীবনের টানাপড়েন আমি খুব কাছে থেকে হামেশাই দেখি, গভীরভাবে অনুভব করি, অনেক সময় কষ্টও পাই, এসবের মাঝেই আমার বাস। তাই তো আজ নারী নিয়ে লিখতে বসা। লেখার মূল বিষয়বস্তুটি গুছিয়ে ওঠার আগেই ভাবলাম, একটু পেছন ফিরে তাকাই, ইতিহাস খুলে দেখি- দার্শনিক, রাষ্ট্রনায়ক ও জ্ঞানী-গুণীজন নারী নিয়ে কে কী বলে গেছেন। ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করে এ-বিষয়ে বড় বড় মানুষের অসংখ্য মূল্যবান উদ্ধৃতি পেলাম। সবগুলো পড়া হয়নি, যে ক’টাতে চোখ বুলিয়েছি, তাতে চারজনের ৪টি উক্তি বিশেষভাবে আমার নজর কেড়েছে। এদের তিনজনই পুরুষ, একজন নারী। আর এখান থেকেই পেয়ে গেলাম আমার আজকের টপিক।
প্রথম পুরুষের কথাটি আমি যদি ঠিকঠাক বুঝে থাকি তাহলে এটি একেবারেই হালকা, এ নিয়ে আর বেশি কথা বলে লাভ নেই :
১. “After about 20 years of marriage, I’m finally starting to scratch the surface of what women want. And I think the answer lies between conversation and chocolate.”

দ্বিতীয়জন নিজেই নারী, তার বাণীটি যথার্থ, অর্থবহ এবং ওজন ও তাৎপর্য মাঝারি গোছের :
২. “Woman is the dominant sex. Men have to do all sorts of stuff to prove that they are worthy of woman’s attention.”

তৃতীয়জন আবার পুরুষ, তার কথাটি ভারী, বেশ ওজনদার, আমার কাছে গভীর ও সুদূরপ্রসারি অর্থ বহন করে। এই উক্তির মূল বক্তব্যই হতে পারে আমার আজকের লেখার কেন্দ্রবিন্দু :
৩. “There are two powers in the world; one is the sword and the other is the pen. There is a great competition and rivalry between the two. There is a third power stronger than both, that of the women.” চতুর্থজনও পুরুষ, তিনি নতুন কথা কিছু বলেন নি, তৃতীয়জনের বক্তব্যকে আরেকটু খোলাসা করেছেন মাত্র, তবে অত্যন্ত চাঁছাছোলা ভাষায়, নগ্নভাবে। তার বক্তব্যের সুর ও লয় আমার একেবারেই পছন্দ হয়নি, নারীর জন্য বিব্রতকরও বটে। এ জন্য ওই বিজ্ঞজনের উক্তিটি আমি পুনরোক্তি করতে চাই না, তারপরও পথ চলতে চলতে দরকার হলে এই জায়গায় আবার ফিরে আসব। বিষয়টি আলগোছ ছুঁয়ে যাব। এখানে একটি কথা বলে রাখি, উদ্ধৃতিগুলোর উপস্থাপনায় আমি সময়ের ক্রমানুসরণ মানিনি। নারী সম্পর্কে মনীষীদের বক্তব্যের এ অতি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নও আমার নিজের, একান্তই ব্যক্তিগত। এখানে আপনারা আমার সঙ্গে একমত হতে পারেন, নাও পারেন। আমাদের আজকের আলোচনার জন্য এতে কিছু যায়-আসে না। কথোপকথন তার আপন গতিতে চলবে, যতখানি চালিয়ে নিতে পারি। যেখানে গিয়ে আটকে যাব সেখানেই ইতি টানব। উত্তর টেনে আনতে না পারলে, প্রসঙ্গ পাল্টাব নয় তো প্রশ্নবাণ আপনাদের দিকেই ছুড়ে দেব। ভেবে দেখার ফুরসৎ হবে তো?
ইতোমধ্যে নিশ্চয়ই আপনারা লক্ষ করেছেন, যাদের কথা আমি যতœ করে বাছাই করে এখানে তুলে এনেছি, তাদের নামগুলো কিন্তু আমিই সযতেœ মুছে দিয়েছি। এরও একটি কারণ আছে। ‘কে বলল’ তার ওপর আমি দৃষ্টি ফেলতে চাই না; বরং আমার কাছে মূল বিবেচ্য বিষয়, ‘কী বলা হলো’ তার একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ। এ-কাজটি আমি যতই কঠিন মনে করি না কেন, বাস্তবে এর কাঠিন্য তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। কারণ, আধুনিক মানুষের জীবন ও জীবনযাত্রা যারপরনাই জটিল ও কঠিন হয়ে গেছে। আজকাল নারী-পুরুষের সম্পর্ক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি এবং বিশ^াস-অবিশ^াসের দোলাচলে অনবরত দুলতে থাকে। তাদের একজনের হাত অন্যজনের হাতের সাথে, চিকন রং-বেরঙের অজস্র নরম সুতায় বাঁধা, কখন কোনটা ছিঁড়ে যায়, আওয়াজ ওঠে না, কেউ টেরও পায় না, ছিঁড়ে গেলে আর জোড়াও লাগে না। যখন সবগুলো সুতা কাটা পড়ে তখন আকাশে পরাজিত পড়ন্ত ঘুড়ির মতন জীবনে ডিগবাজি ছাড়া তাদের জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
তার ওপর নতুন এই শতাব্দীর গোড়ার দিকে আমরা এমন এক জমানায় বাস করছি, যেখানে সমাজ ও সমাজের মানুষ দারুণভাবে দ্বিধাবিভক্ত। সহমর্মিতা ও সহানুভূতির বদলে ঘৃণা ও বিদ্বেষের দ্বারা নিছক আবেগতাড়িত হয়েই আমরা কথা বলি- পথ চলি যার যার মতো করে। এই বাস্তবতায় নারীর মতন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো কথা বলার আগে ১৪ বার চিন্তা করা উচিত। আর কাউকে পরওয়া করি বা না করি, আমার প্রিয় পাঠকদের আমি বড়ই ভালোবাসি। নারী প্রসঙ্গে এমন কোনো ভুল কথা আমি ভুলেও বলতে চাই না, যাতে তারা আমাকে ভুল বুঝতে পারেন। আর তাই তো মনে রাখবেন, যা বলছি তা নির্ভয়ে নয়, সাবধানতার সাথে ভয়ে-ভয়েই বলছি। নারীর সাথে পুরুষের সম্পর্ক হতে পারে মামুলি- দেওয়া-নেওয়ার (প্রথম উদ্ধৃতি); হতে পারে গভীর প্রেম- ভালোবাসার (দ্বিতীয় উদ্ধৃতি); আবার এমনও হতে পারে- নারী এসবেরই ঊর্ধ্বে, অনেক উপরে। স্বাভাবিক আপন অন্তর্নিহিত শক্তিতে সে এতই বলীয়ান যে, সহসা সবাইকে চমকে দিতে পারে, জগৎকে বদলে দিতে পারে (তৃতীয় উদ্ধৃতি)!
যে নারী এতই শক্তিমান তাকে আরেকটু ভালো করে চিনে নেওয়া দরকার না? নারীর সাথে নরের সম্পর্ক বহুমাত্রিক বৈচিত্র্যে ভরা। ব্যক্তি নারী সম্বন্ধে ভিন্ন ভিন্ন পুরুষের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা থাকতেই পারে, তথাপি নারী জাতি এক ও অভিন্ন। বিবাহিত জীবনে কোনো পতিই নারী চরিত্রের যাবতীয় মধুময় উষ্ণতার ছোঁয়ায় সিক্ত হতে পারে না। নারীর হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার টান যেমন তীব্র, তেমনি তার আবেগ-আবদারও কম নয় এবং তা উপেক্ষা করার মতো তো নয়- ই। তার আনন্দ-উচ্ছ্বাস যেমন উত্তাল সাগরে ঢেউয়ের মতন খেলে, তার মান-অভিমান ও মনের মতিগতিও তেমনি চঞ্চল- ঝড়ো হাওয়ার মতন নিরন্তর বয়ে চলে। যেসব আদম সন্তান নারীর রূপমাধুর্যের একাধিক মাত্রা স্পর্শ করে, হৃদয় দিয়ে অনুভব করে, উপভোগ করে, তারা সুখি কি না জানি না, তবে নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান। নারী রহস্যময়ী, সে সবার কাছে সমানভাবে ধরা দেয় না। স্ত্রী সংস্পর্শের নির্মল প্রসাদ পেতে হলে স্বামীকে না-কি স্বামী হওয়ার আগে ‘পুরুষ’ হতে হয়। রবি ঠাকুরের লেখায় এমন আভাস পাওয়া যায়। নারীর ব্যক্তিত্ব যেমন বিচিত্র তার চাহিদাও তেমনি বহুমাত্রিক ও পরিবর্তনশীল। এক সময় নারীরা স্বামীকে পতিদেবতা হিসেবে মেনে নিত অথবা নিতে বাধ্য হতো, আজ তারা স্বামীকে কেবল স্বামী হিসেবেই দেখে না, তাকে বন্ধু হিসেবেও পেতে চায়। নারীর এ আকাক্সক্ষা যথার্থ এবং যৌক্তিক। বুঝতে পারি, দিনে দিনে, দিকে দিকে এ-ধারণার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। এখানে সমাজ পরিবর্তনশীল, সমাজ অগ্রসরমান।
অন্যদিকে এই আধুনিক সমাজের একটি অন্ধকার দিকও আছে। এই নারী কেন তার যথাযথ মর্যাদা পায় না, সে কেন অবহেলিত, সে কেন বারবার অপমানিত? সে কি দুর্বল? তার দৈহিক শক্তি কম হতে পারে, তার মনের জোর তো কম নয়। পুরুষের যেমন ছেলেমেয়ে আছে, মা-বাবা-আত্মীয়-পরিজন আছে, নারীর ও তো তাই। পুরুষের হাতে যত ক্ষমতাই থাকুক, দিনের শেষে সে তো নারী-প্রেমের শক্ত বাঁধনে বাঁধা; নারীর কাছে সে ভালোবাসার কাঙ্গাল নয় কি? এ-জন্যই বলা হয়ে থাকে ‘রাজা শাসিছে রাজ্য, রাজারে শাসিছে রানী’। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? নারীকে তার পূর্ণ মানবিক মর্যাদা ও বিষয়-সম্পত্তিতে ন্যায্য হিস্যা দিতে সমাজের এত অনিহা কেন? এ-সমস্যা শুধু বাংলাদেশে নয়, তাবৎ দুনিয়ায় কম-বেশি সর্বত্র একই হাল। নারীর প্রতি কেন এই অবিচার? দুঃখিত, এর জবাব আমার কাছে নেই। আগে যা বলেছিলাম, উত্তরবিহীন এ প্রশ্নটিকে এখানেই ধামাচাপা দেওয়া অথবা আপনাদের দিকে ছুড়ে দেওয়া ছাড়া আমার আর কোনো গতি নেই। আমার প্রথম মুসাবিদা পড়ে অগ্রজপ্রতীম বন্ধু ড. আর আই মোল্লা এ-প্রসঙ্গে একটি মন্তব্য করেছেন। আমি যদি সঠিকভাবে তার কথা বুঝে থাকি, তাহলে তিনি বলতে চেয়েছেন, ‘সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজে নারীর মর্যাদার জায়গাটুকু তৈরি করে নিতে হবে।’ কথাটি ষোলোআনা সঠিক, তথাপি আমার একটি প্রশ্ন- এত নারীবাদী সংগঠন ও কর্মতৎপরতা থাকতে এতদিনে কেন কোথাও উল্লেখযোগ্য কোনো ফলাফল দেখা যাচ্ছে না?
মুহূর্তের জন্য নারী থেকে একটু ছুটি নেই, প্রসঙ্গ পাল্টাই। মনে রাখবেন, সঙ্গে সঙ্গেই আবার ফিরে আসব এ জায়গায়- তিন নম্বর উদ্ধৃতিতে, যা কি না আমার আজকের রচনার বিষয়বস্তু। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত ২০ লাখ মানুষের শহর ন্যাশভিল। এখানে বেশ পুরনো একটি কলেজ আছে, যেটা এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কলেজটির এই করুণদশার অন্যতম প্রধান কারণ- বছর বছর ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা নিম্নগামী। শত চেষ্টা করেও যথেষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না। আমার বলতে দ্বিধা নেই, কলেজের জন্য এটা কোনো সমস্যাই ছিল না, যদি এ শহরে আমার মায়ের মতন আরও ৩০০ নারী থাকতেন। বলাই বাহুল্য, আমার মা তার জীবনে ১০টি সন্তান জন্ম দিয়েছেন। মানুষ করতে পেরেছেন কি না জানি না, তবে বড় করেছেন বড় মায়া-মমতা দিয়ে, আদর দিয়ে। তার মতো আরও ২৯৯ নারী থাকলে, তাদের গর্ভজাত ৩ হাজার ছেলে-মেয়ের পদভারে বনের নানা রঙের ফুল ও লাফালাফি করা চঞ্চল পাখির মতনই কলেজ প্রাঙ্গণ প্রাণোচ্ছ্বাসে ভরে উঠত। ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটি অকাল মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যেত; কিন্তু তা তো হওয়ার নয়, যা হওয়ার তা-ই হবে।
এবার একটু আমার মায়ের কথা বলি? তিনি যখন আমার বাবার সংসার করছেন তখন বাংলাদেশে ‘নারী ক্ষমতায়ন’র কোনো আন্দোলন ছিল না, তেমন কোনো সম্ভাবনাও ছিল না। অষ্টম শ্রেণি পড়–য়া মা আমার বাড়ির কোণায় একটি ছোট্ট বালিকা বিদ্যালয় চালাতেন। তার নিয়মিত কোনো বেতন-ভাতা ছিল না। তিন-চার বছর পরপর সরকার বাহাদুর এককালীন ‘থোক বরাদ্দ’ দিতেন, তাও সাকুল্লে তিন, কী সাড়ে ৩০০ টাকা। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে এটাও কম ছিল না; কিন্তু হলে কি হবে, মা কোনোদিন তার কামাই থেকে পছন্দমতো একটি কানাকড়িও খরচ করতে পারেন নি। এতে তার জীবনে যে কোনো দুঃখ ছিল না, তা বলা যায় না, তবে এ নিয়ে আমার আম্মার মনে সামান্যতম হতাশা কিংবা দ্রোহ-বিদ্রোহ দানা বাঁধেনি, এ-কথা আমি দৃঢ়তার সাথে বলতেই পারি। কেন বাঁধেনি, ছোটবেলা তার একটা কারণ জানতাম- ‘সব্র’। ইদানীং আমি এর অন্য একটি ব্যাখ্যাও দাঁড় করিয়েছি। ওই টাকার বিনিময়ে যৌথ পরিবারে থেকে মা তার ছেলে-মেয়েদের পেলেপুষে বড় করেছেন। তিনি হয়তো ভেবেছেন, ‘আমার সন্তানরাই তো আমার উপার্জন, এরাই তো আমার সঞ্চয়, এরাই তো আমার পুঁজি, এরাই তো আমার বিনিয়োগ, এখানেই আমার আনন্দ, এখানেই আমার জীবনের সফলতা ও সার্থকতা।
আমার মায়ের আপন প্রত্যক্ষ আয়ের ওপর তিনি ছিলেন ‘অসহায়’, ‘ক্ষমতাহীন’। এটা হলো তার জীবনের একটি দিক। অন্যদিকে, তিনি ছিলেন মাতৃত্বের মহিমায় উদ্ভাসিত। মাতৃত্বই তাকে করে গেছে বলীয়ান, মহীয়ান, বিশালভাবে ‘ক্ষমতায়িত’। মায়ের উৎপাদিত পুঁজি-পণ্যরা আজ দুনিয়ায় ছড়িয়ে গেছে। তার সন্তানরা যে যেখানে গেছে সে-ই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অবদান রাখছে। তার উৎপাদিত পণ্যের মুনাফা তিনি তেমন একটা ভোগ করতে পারেন নি, অন্যরা তো করছে। এখানে তিনি যেমন ‘ক্ষমতায়িত’, তেমনি ‘মহান’। আমার মায়ের মতন জগতের সকল মা আপনা থেকেই ‘ক্ষমতায়িত’। নারী জাতির জন্য মাতৃত্বজাত ‘ক্ষমতা’, চাকরিকালীন ক্ষমতা থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং সমাজ ও অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব ও ফলাফল অনেক বেশি টেকসই এবং সুদূরপ্রসারি! এ-কথা এর চেয়ে আর বেশি খোলাসা করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। উপরোক্ত তৃতীয় উদ্ধৃতিটিকে আমি এভাবেই ব্যাখ্যা করতে চাই। কারও দ্বিমত থাকলে অবশ্যই আমাকে লিখবেন।
আমার মা তার স্বাধীন ইচ্ছে প্রয়োগ করে ১০ সন্তানের জননী হননি, এটা যেমন সত্যি- তেমনি যা হয়েছে তাতে যে তার খুব একটা অমত ছিল, সেটাই বা বলি কি করে। ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী একবার বলেছিলেন, ‘ছেলেমেয়ে উৎপাদনে আমার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকলে আমি ১০ বার মা হতাম।’ শ্রীমতি গান্ধী ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও দুইয়ের অধিক মানব শিশু জন্ম দিতে পারেনি। আমার মা ইচ্ছে না থাকলেও ‘নিমরাজি’তে ১০টি ছেলেমেয়ে পেটে ধরেছেন। আমি যদি বলি, মাতৃত্বের গৌরবে আমার মাতা ইন্দিরাজীর চেয়েও বলীয়ান, তাহলে কি একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যায়? একজন পল্লিবধূর সঙ্গে একজন প্রধানমন্ত্রীর তুলনামূলক বৈষম্য টানাটানির জন্য আমি লজ্জিত এবং দুঃখিত। দয়া করে আমাকে ভুল বুঝবেন না।
আমার মা যেভাবে স্বামীর সংসার শুরু করেছিলেন, তাতে সহসাই ছন্দপতন ঘটে। তার জীবনের প্রথম ও শেষ বাঁক বদল হয়। যতদূর মনে পড়ে, তিন অথবা চার সন্তান ঘরে আসার পর মা আর স্কুল চালাতে পারেন নি। হয়ে গেলেন ফুলটাইম গৃহিণী। তার কাজ সন্তান জন্ম দেওয়া ও বড় করা। বাবা বাইরে কাজ করতেন। হাইস্কুলে পড়াতেন। এখন প্রশ্ন হলো, বাবাকে বাইরে ঠেলে দিয়ে অবশেষে মা কেন ঘরে থেকে বারবার ‘মা’ হওয়াটাকে বেছে নিলেন। এর উত্তর একেবারে সহজ। ১. মায়ের তো অন্য কোনো পছন্দ ছিল না, কোনো বিকল্প ছিল না, যা করেছেন বাধ্য হয়েই করেছেন। আমি যদি বলি, কেন করবেন না? এটি তো খুবই স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক শ্রমবিভাজন (ডিভিশন অব ল্যাবার)। এ-কথা তো আড়াইশ’ বছর আগেই অর্থশাস্ত্রের গুরু অ্যাডাম স্মিথ তার ‘ওয়েল্থ অব ন্যাশন্স’-এ বলে গেছেন। অর্থনীতিবিদরা ‘পিতার’ তত্ত্ব সব জায়গায় প্রয়োগ করবেন, অথচ নিজের ঘরে মানবেন না, এ কেমন কথা? আর না মেনে কী কোনো উপায় আছে? মাকেই তো ‘মা’ হতে হবে, মাকেই তো সন্তান দেখাশোনা করতে হবে, কারণ বাবা তো ইচ্ছে করলেও তার পেটে বাচ্চা নিতে পারবেন না, নবজাত শিশুকে বুকের দুধও খাওয়াতে পারবেন না। এখানে কথা উঠতেই পারে, ১০-এর বদলে দু-তিনেই তো তিনি ক্ষান্ত দিতে পারতেন। তখন পারতেন না, তবে এখন এটা সহজ ও সম্ভব; কিন্তু এ সম্ভাবনা সব সময় সব জাতির জন্য সমানভাবে রৌদ্রোজ্জ্বল কি না, এ নিয়ে আমার কথা আছে, আর সে-কথাই বলছি এখন।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কে ঘরে থেকে ঘরের কাজ করবে আর কে বাইরে গিয়ে হাওয়া খাবে, এই কাইজ্যা-ফ্যাসাদ করতে করতে নারী যদি মাতৃত্বকে পরিহার করে, মাতৃত্বকে অবহেলা করে, তাহলে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ কী হবে! একবার ভেবে দেখুন- জাপান, রাশিয়া, স্ক্যান্ডিনেভিয়া ও অন্যান্য পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর কী হাল। সব সময় কাগজে বের হয়, সে-সব দেশে মানুষের অভাবে স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, দোকানপাটে লালবাতি জ¦লছে, পোস্ট অফিসে পর্যাপ্ত লোক আসে না, রেলস্টেশনে যাত্রী নেই, ইত্যাদি ইত্যাদি। আরও ভেবে দেখুন, আজ যদি ভারতের জনসংখ্যা সোয়াশ’ কোটি না হয়ে মাত্র ৩০ কোটি হতো তাহলে আন্তর্জাতিক পরিম-লে তার কি এই মানমর্যাদা থাকত? অন্যদিকে ব্রিটেনের লোকসংখ্যা যদি ৭ কোটির বদলে ২৭ কোটি হতো, তাহলে ব্রিটেনকে কি আমেরিকার কাছে গিছে কাচুমাচু করতে হতো? কখনও না। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে তৈলাক্ত ডলার মাথা থেকে পা পর্যন্ত গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে, অথচ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কেবল ‘সৌদি’ বাদে তাদের তো কেউ পুছেও না। মূল কারণ, ওই সব মরুভূমির দেশে মানুষ নেই। তাহলে দেখা যায়, যেখানে মানুষ আছে সেখানেই কর্মতৎপরতা, সেখানেই সমৃদ্ধি, সেখানেই প্রাচুর্য, সেখানেই ‘ক্ষমতা’। আর বলাবাহুল্য, মানুষের উৎস নারীর জঠর। এবার ভেবে দেখুন, নারীর ‘ক্ষমতায়ন’ চাকরিতে, না-কি মাতৃত্বে?
রাজপ্রাসাদ হোক আর কুঁড়েঘর হোক, মায়ের অন্ধকার গর্ভ থেকে বেরিয়েই সন্তান ঘরকে আলোকিত করে। কারণ, সে শুধু একটি মুখ ও পেট নিয়ে জন্মায় না, সঙ্গে করে একটি মাথা ও দুটি হাতও নিয়ে আসে। অধিকন্তু কুঁড়েঘর কেবলই গরিবের থাকার জায়গা নয়। এটি একটি আধুনিক কারখানাও বটে। এই কারখানায় যারা থাকেন তারা একদিকে ভোক্তা, আরেকদিকে উদ্যোক্তাও বটে। ভোক্তা হিসেবে তারা বাজার থেকে চাল-ডাল-তেল-নুন কিনে খান। আর উদ্যোক্তা হিসেবে একই পরিবার উৎপাদন করে আদম সন্তান- যারা আগামী দিনের নাগরিক, আগামী দিনের শ্রমিক, আগামী দিনের সাংবাদিক, আগামী দিনের বিচারক, আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী।
মাতৃত্বের মর্যাদাকে আমি অনেক বড় করে দেখি। তথাপি, আমি নেপোলিওন বোনাপার্টের বিরোধিতা করি, যখন তিনি বলেন- ‘নারী কেবলই সন্তান উৎপাদনের একটি যন্ত্র’। আমার মতে, কথাটি এভাবে বলা নারীর জন্য অসম্মানের। নারী যন্ত্র তো নয়-ই, সে কেবল ‘নারী’ও নয়, সে তার চেয়ে বড়, তার চেয়ে মহৎ। সে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের মা, মহীয়সী মা। আমি এও মনে করি না যে আমার মায়ের মতন প্রতিটি নারীকে ১০ বা তার অধিক সন্তান জন্ম দিতে হবে। আপনাদের সবার মতন আমিও চাই, নারী তার সম্ভ্রম ও আব্রু বাঁচিয়ে আপন মর্যাদায় ও মহিমায় জীবনের সকল ক্ষেত্রে নিরাপদে সফলতার সঙ্গে বিচরণ করুক, তবে মাতৃত্বকে বাদ দিয়ে কিংবা পাশ কাটিয়ে নয়। যে জাতি এটি করবে, সে অদূরে না হলেও সুদূর ভবিষ্যতে যে দুনিয়া থেকে অবলুপ্ত হবে, এ-কথা নিঃসন্দেহে বলাই যায়।
লেখক : অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি; এডিটর, জার্নাল অব ডেভোলাপিং এরিয়াজ

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ আগস্ট ২০১৯

  • ০৮ আগস্ট ২০১৯