‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’ উদ্বোধন

কলকাতা এখন আরও কাছে

প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০১৯, ১৬:৪২ | আপডেট : ২৮ জুলাই ২০১৯, ১৬:৪৫

অনলাইন ডেস্ক

 

স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর এই প্রথম ঢাকা-বেনাপোল রেলরুটে চালু হলো ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’ ট্রেন। গত ১৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই রেলরুট শুভ উদ্বোধন করেন। প্রথম দিনে ১১৫ যাত্রী নিয়ে ট্রেনটি রওনা হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ট্রেনটি সপ্তাহে ছয় দিন চলাচল করবে। প্রতিদিন দুপুর ১টায় বেনাপোল থেকে ছেড়ে যাবে। আবার ঢাকা থেকে রাত ১২টা ২০ মিনিটে বেনাপোলের উদ্দেশে ছেড়ে আসবে। বিরতিহীন এ ট্রেনটি কেবল যশোর ও ঈশ^রদী স্টেশনে থামবে।
রেলসূত্রে আরও জানা গেছে, ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’ ট্রেনে চড়ে যাত্রীরা নির্বিঘেœ সাড়ে ৭ ঘণ্টায় ঢাকায় যেতে পারবেন। এই ট্রেনটিতে থাকবে ১০টি বগি। এদের মধ্যে দুটি কেবিন, দুটি এসি চেয়ার ও বাকিগুলো চেয়ার রয়েছে। কেবিনের ভাড়া ১ হাজার ২০০ টাকা, এসি চেয়ারের ভাড়া ১ হাজার টাকা ও নন-এসি চেয়ার ভাড়া ৫০০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রেলসূত্র। এ ট্রেনের টিকিট অনলাইনে সংগ্রহ করতে পারবেন যাত্রীরা। সরাসরি এই রেল যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ায় সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হলো। এতে বেনাপোল বন্দরে আমদানি-রপ্তানির কাজে নিয়োজিত ব্যবসায়ীদের যাতায়াত সহজতর হয়েছে। পাশাপাশি পাসপোর্টধারী যাত্রীদের যাতায়াতের ব্যাপক সুবিধা হয়েছে।
বিষয়টি স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। যা বাস্তবায়ন হওয়ায় সব শ্রেণির মানুষ খুশি হয়েছেন। ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’ ট্রেন চালু হওয়ায় ভারতের সঙ্গে ও দেশের অভ্যন্তরে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটবে বলে জানান তারা।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান বলেন, যশোরের বেনাপোলকে উন্নয়নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। ঢাকা-বেনাপোল রেল চালু শুরু হওয়ায় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নও হবে। মানুষ রাজধানী ঢাকা থেকে যানজটমুক্ত নিরাপদে বেনাপোল আসতে পারবে। কারণ বেনাপোল আন্তর্জাতিক বর্ডারসহ এখানে রয়েছে ভারত-বাংলাদেশ তথা এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর। ব্যবসা-বাণিজ্য, পাসপোর্ট যাত্রীসহ এ অঞ্চলের মানুষের জন্য এই রেল মাইলফলক হয়েছে।
উল্লেখ্য, বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ হাজার পাসপোর্টধারী যাত্রী ভারতে যাতায়াত করে থাকেন। এসব যাত্রীর সিংহভাগই ঢাকা থেকে আসেন।
বেনাপোল রেল স্টেশনে আয়োজিত রেল রুটটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যশোর-১ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য আলহাজ শেখ আফিল উদ্দীন, যশোর-৩ (ঝিকরগাছা) আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য মো. নাসির উদ্দীন, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান, বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার বেলাল হোসাইন চৌধুরী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হোসাইন সাখাওয়াত প্রমুখ।

যেন ঈদ আনন্দ
৭০ বছরের কোটায় জহুরুল হকের বয়স। বয়সের ভারে আক্রান্ত হয়েছেন নানান অসুখ-বিসুখে। সম্প্রতি চিকিৎসার জন্য স্ত্রী, ছেলে ও নাতিকে নিয়ে বাসযোগে বেনাপোল থেকে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। আসার পথে আরিচা-দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে তীব্র গরমের মধ্যে যানজটে টানা পাঁচ ঘণ্টা আটকে থেকে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন।
তবে সপ্তাহের ব্যবধানে ঢাকায় বসে শুনেছেন বাড়ির সামনে দিয়েই ট্রেন চলছে। খবরটা জহুরুল হকের কাছে যেন ঈদের আনন্দ! তখনই ছেলের কাছে ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন ট্রেনেই বাড়ি ফিরবেন। ঠিক সেই কথামতো একটি কেবিন ভাড়া করেছেন ছেলে নান্নু। ২১ জুলাই রাত পৌনে ১টায় বেনাপোল এক্সপ্রেসের এসি কেবিনে শুয়ে কথাগুলো বলছিলেন বেনাপোল পোর্ট থানার লেবুতলা গ্রামের জহুরুল হক।
তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা থেকে সরাসরি এসি ট্রেনের কেবিনে শুয়ে বাড়ি যাচ্ছি সত্যিই এটা অকল্পনীয়। এ যেন স্বপ্নের যাত্রা। এই রুটে ট্রেন চালু করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা।’ সঙ্গে থাকা ছেলে নান্নু হক বলেন, ‘রোগী কিংবা বৃদ্ধ বয়সের লোক নিয়ে সড়কপথে চলাচল খুবই  কষ্টের। তবে ট্রেন অনেক আরামদায়ক।’
ট্রেনের ‘ছ’ বগির শোভন চেয়ারের যাত্রী ঢাকার যাত্রাবাড়ির বাসিন্দা ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চার ব্যবসায়ী বন্ধু কলকাতা যাওয়ার উদ্দেশে বেনাপোল যাচ্ছি। সকালে ট্রেন থেকে নেমেই বর্ডার পার হব। এই ট্রেনে বায়োট্রয়লেট, মোবাইল চার্জের ব্যবস্থা, প্রতিবন্ধীদের যাতায়াত উপযোগী সিট থাকায় যাত্রীরা আরামদায়ক ভ্রমণ করতে পারছেন।’ ট্রেনের এসি চেয়ারের যাত্রী কবির হোসেন বলেন, ‘ব্যবসার প্রয়োজনে মাঝে মধ্যে ঢাকায় আসি। ফেরিঘাটে জ্যামের খবর জানতে পারলে বিমানে আসি।’
বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনের বগিগুলো ঘুরে দেখা গেছে, অন্যরকম সন্তুষ্টি নিয়ে যাত্রীরা চেয়ারে বসেছেন। ট্রেনের ভিতরে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেমে হালকা সাউন্ডে বাজছে পুরনো দিনের বাংলা গান। অনেক যাত্রী ট্রেনের সিটের পাশে থাকা চার্জিং পয়েন্টে চার্জার লাগিয়ে মোবাইল সার্জ করাচ্ছেন। রয়েছে উন্নত বায়োট্রয়লেট। ঘুরছে ফ্যান। সব কিছুই আধুনিক। একইসঙ্গে কেবিন ঘুরে দেখা গেল, প্রতিটি কেবিনেই পরিষ্কার কম্বল-তোষক, বিছানার ছাদর সরবরাহ করা হয়েছে। এমন সেবায় খুশি প্রতিটি যাত্রী। সরকারের প্রশংসায় যেন সকলেই পঞ্চমুখ!
এই ট্রেনের যাত্রী কেশবপুরের ত্রিমোহিনী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘এই ট্রেন সার্ভিস চালুর মধ্য থেকেও জননেত্রী শেখ হাসিনার দেশপ্রেম, দেশের উন্নয়নমূলক ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে। আমরা যশোরাঞ্চলের মানুষ অনেক উন্নয়ন বঞ্চিত ছিলাম। এখন পাল্টে যাচ্ছে সব কিছু।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইন্দোনেশিয়া থেকে সদ্য আমদানি করা ১২টি কম্পার্টমেন্টসমৃদ্ধ বেনাপোল এক্সপ্রেসে ৮৯৬টি আসন রয়েছে। ট্রেনটি প্রতিদিন দুপুর ১টায় বেনাপোল থেকে ছেড়ে এসে সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ ঢাকায় পৌঁছায়। আর রাত সাড়ে ১২টায় ঢাকা থেকে ছেড়ে সকাল ৮টা নাগাদ বেনাপোলে গিয়ে পৌঁছায়। যাত্রাপথে ঈশ^রদী, যশোর ও ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশনে ট্রেনটি যাত্রাবিরতি দিচ্ছে।
ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার মোহাম্মদ আমিনুল হক বলেন, ‘বেনাপোল এক্সপ্রেসের টিকিট বিক্রিতে আশানুরূপ সাড়া পেয়েছি। সদ্য উদ্বোধন হওয়ায় সংবাদটি সাধারণ মানুষ পর্যায়ে হয়তো পৌঁছাতে বিলম্ব হয়েছে, এজন্য কিছু শোভন চেয়ারের টিকিট অবিক্রিত থাকছে। তবে, আমরা আশাবাদী দ্রুতই এ সমস্যা কেটে যাবে। সব মিলিয়ে বলা চলে, ট্রেনটি নিয়ে আমরা অত্যন্ত আশাবাদী এবং কমলাপুর স্টেশনের প্রতিটি ট্রেনেই যাত্রীরা সুশৃঙ্খলভাবে টিকিট কিনতে পারছেন। এ ব্যাপারে আমরা সর্বোচ্চ নজরদারি রেখেছি।’

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ আগস্ট ২০১৯

  • ০৮ আগস্ট ২০১৯