স্টপ জেনোসাইড

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৪:৩০

অনলাইন ডেস্ক

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা বলছে, গত দুই সপ্তাহে ২ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এ সংখ্যা ৩ লাখ ছাড়াবে বলে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা ধারণা করছেন। এর আগে গত বছরের ৯ অক্টোবর থেকে এ বছরের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত এসেছে ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। তারও আগে থেকে এ দেশে অবস্থান করছে মিয়ানমারের প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা। এর বাইরে এ দেশে শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিত আছে ৩৩ হাজার রোহিঙ্গা। এ হিসাব অনুযায়ীই বর্তমানে মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নতুন করে আর মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ধারণের ক্ষমতা নেই বাংলাদেশের। তাই মিয়ানমারেই রোহিঙ্গাদের নিরাপদে বাঁচার সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গাদের অন্তত ৬ হাজার ৮০১টি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আর ইউরোপে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সংগঠন ইউরোপিয়ান রোহিঙ্গা কাউন্সিল’র (ইআরসি) দাবি, ২৫ আগস্ট থেকে তিন দিনেই ২ থেকে ৩ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী হত্যা করেছে। এর মধ্যে শুধু ২৭ আগস্ট রাখাইনের রাথেডং শহরের সগপাড়া এলাকায় ৯০০ থেকে ১ হাজার জনকে হত্যা করা হয়। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বড় এই মানবিক সংকটের নানা দিক নিয়েই ‘বাংলা বিচিত্রা’র প্রতিবেদন।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ২৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা নিধন অভিযানের শেষ হওয়ার কোনো বার্তা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। মাত্র ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে বিতাড়িত করতে সেনাবাহিনী লেলিয়ে দিয়েছে দেশটি, যারা সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর চালিয়ে যাচ্ছে গণহত্যা, পাশবিক সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ আর অবর্ণনীয় নির্মম নির্যাতন। ওই রাজ্যে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ ও তার সুরক্ষা দিতেই সংখ্যাগুরু ও জাতি-বিদ্বেষী বার্মিজ শাসকগোষ্ঠী রোহিঙ্গা নিধন অভিযান ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ শুরু করেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে।
অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়াল গণহত্যা-ধর্ষণ-লুণ্ঠন-অগ্নিসংযোগে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গা জন¯্রােত। জাতিসংঘ ধারণা করছে, গণহত্যার হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে অন্তত ৩ লাখ রোহিঙ্গা আসতে পারে বাংলাদেশে। এমনিতেই অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও শরণার্থীর ভারে ধুঁকছে বাংলাদেশ। তার ওপর নতুন করে আরও এ বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর সংস্থান কীভাবে করবে, তা নিয়েও ভয়াবহ দুঃশ্চিন্তায় রয়েছে বাংলাদেশের সরকার।

রোহিঙ্গা হত্যার পক্ষে আবারও সু চি’র সাফাই
দুই সপ্তাহব্যাপী রাখাইন রাজ্যে চলমান গণহত্যাকে উপেক্ষা করে আবারও সাফাই গেয়েছেন মিয়ানমারের গণতন্ত্রীপন্থি নেত্রী ও রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি। একটি টিভি সাক্ষাৎকারে রাখাইনে প্রত্যেককে রক্ষায় সরকার সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ভারতীয় এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সু চি বলেন, ‘আমাদের নাগরিকদের দেখভাল আমাদের করতে হবে, যারা আমাদের দেশে আছে, তাদের প্রত্যেকের দেখভাল আমাদের করতে হবে, তারা আমাদের নাগরিক হোক বা না-ই হোক।’
টেলিভিশনটিকে সু চি বলেন, কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত যে ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে, আমরা ঠিক একই রকম সমস্যায় পড়েছি। আমরা আমাদের নিরপরাধ নাগরিকদের রক্ষার চেষ্টা করছি। আমাদের সম্পদ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তারপরও আমরা সবার জন্য সর্বোচ্চটা করার এবং আইনানুযায়ী সবাইকে নিরাপত্তা সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর সু চি এর আগেও ৬ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে দাবি করেছিলেন, রাখাইন রাজ্যে সবার নিরাপত্তা বিধান করা হচ্ছে! প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে তার দেওয়া এ বিবৃতির বিষয়ে বিশ্বনেতাদের অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করে তার কঠোর সমালোচনা করেন। তারপরও দ্বিতীয়বারের মতো সু চি একই কথার পুনরাবৃত্তি করলেন, যা দীর্ঘমেয়াদে সহিংসতা চলবে এমনই ইঙ্গিত দেয়।

নাগরিকত্বের প্রমাণ ছাড়া কাউকে ফেরত না নেওয়ার ঘোষণা
রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার ঘটনায় পালিয়ে বাংলাদেশে আসা লোকজনকে নাগরিকত্বের প্রমাণ ছাড়া ফেরত নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে মিয়ানমার। ৬ সেপ্টেম্বর স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি’র অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনে মিয়ানমারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) ইউ থং তুন এ কথা জানান।  প্রকৃতপক্ষে এ  ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত নেওয়া হবে না বলেই পরোক্ষভাবে জানিয়ে দেওয়া হলো। কারণ শত শত বছর ধরে রাজ্যটিতে বাস করা রোহিঙ্গাদের এখনও নাগরিকত্বের স্বীকৃতি দেয়নি মিয়ানমার সরকার।
সংবাদ সম্মেলনে ইউ থং তুন বলেন, নাগরিকরা কত দিন ধরে মিয়ানমারে বসবাস করেছে; সে বিষয়ে অবশ্যই প্রমাণ থাকতে হবে। যদি সঠিক প্রমাণ পাওয়া যায়, তা হলে তারা ফেরত আসতে পারবেন।
রাজধানী নেইপিদো, ইয়াঙ্গুন, মান্দালয় ও মল্যামিয়াংসহ দেশটির প্রধান প্রধান কিছু শহরে নিরাপত্তা সতর্কতা সম্পর্কে তিনি বলেন, জনগণের চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। মধ্যপ্রাচ্যে দুর্বল হয়ে পড়া জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনুপ্রবেশের চেষ্টা করতে পারে তাই বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি দেশটির নেত্রী সু চি’র কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলেন, রাষ্ট্র ও জনগণের সুরক্ষা দিতেই রাখাইন রাজ্যে পুলিশের শক্তি বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

আশ্রয়হীন ক্ষুধার্ত হাজারো রোহিঙ্গার আহাজারি
ক্ষুধার্ত চেহারা। মুখে কোনো শব্দ নেই। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। আর কিছুক্ষণ পরপর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। ভীত-বিধ্বস্ত চেহারা। ভয়ে অনেকটা কাতর। নতুন কাউকে দেখলে আঁতকে ওঠে। রাস্তার পাশে কিংবা পাহাড়ের পাদদেশে ঝুপড়ি করে অবস্থান নিয়েছেন তারা। কখন খেয়েছে কেউ জানে না। একটু পানি যেন তাদের সম্বল। সেই পানিটুকুও ঠিকমতো পাচ্ছে না তারা। এই চিত্র এখন কক্সবাজার জেলার উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, হোয়াইক্যংসহ আশপাশ এলাকায় অবস্থানরত মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা হাজারো রোহিঙ্গাদের।
প্রাণ বাঁচাতে অনাহার-অর্ধাহারে রাত-দিন দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসেছে তারা। এমন করুণ পরিণতি নিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছার পরও খাদ্য-পানি এবং চিকিৎসার অভাবে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে একের পর এক রোহিঙ্গা। ছোট ছোট শিশুদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। অপুষ্টি ও ক্ষুধায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ধকল সইতে না পেরে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে শিশুরা। অসুস্থ বৃদ্ধরাও চরম কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। ক্ষুধা ও অসুস্থতায় চিকিৎসার অভাবে কারও কারও মৃত্যু হচ্ছে। সব মিলিয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে রোহিঙ্গারা।
রোহিঙ্গারা কতটা নাজুক পরিস্থিতিতে আছে তা বোঝাতে বাংলাদেশে জাতিসংঘের প্রধান সমন্বয়কারী কর্মকর্তা ৬ সেপ্টেম্বর বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বলেন, অনেকেই খোলা আকাশের নিচে ঘুমাচ্ছেন। দিনের পর দিন হেঁটে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে আসা এই লোকজনের জরুরি খাবার ও পানির প্রয়োজন।
এদিকে সম্প্রতি রাখাইন থেকে ফিরে বিবিসির একজন সংবাদদাতা বলেছেন, তিনি দেখেছেন স্থানীয় রাখাইন যুবকরা জগভর্তি পেট্রল ঢেলে মুসলিমদের গ্রামগুলো পুড়িয়ে দিচ্ছে। যেদিকে চোখ যায়, বিস্তীর্ণ এলাকা জনশূন্য চারদিকে পোড়া ক্ষেত এবং ফেলে যাওয়া গবাদি পশু।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সাথে সাথে রাখাইনে প্রবেশ করতে পারা ওই সাংবাদিক জানান, বাধ্যবাধতার মুখে যতটুকু দেখেছেন তাতেই বোঝা যায় প্রকৃত অবস্থাটা আসলে কী? কতটা ভয়ানক পরিস্থিতিতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়।

পাহাড়-জঙ্গলে লতাপাতা খেয়ে বেঁচে ছিলেন তারা
দিল বাহারের বয়স ৬০। মিয়ানমারের রাখাইনে সেনা অভিযানে প্রাণ গেছে তার ছেলে মাহবুবের। ঘরবাড়ি ছারখার হয়েছে। নাতি আর স্বামীকে নিয়ে পালিয়ে ১২ দিন কাটিয়েছেন পাহাড়-জঙ্গলে। সাথে থাকা চাল শেষ হয়ে গেছে আট দিনেই। বাকি দিনগুলো কাটিয়েছেন বৃষ্টির পানি আর লতাপাতা খেয়ে। এরপর মাছ ধরার কাঠের নৌকায় চেপে এসে নেমেছেন বাংলাদেশ সীমান্তের উপকূলে। সেখানে তার সাথে দেখা হয় বিবিসির সাংবাদিক সঞ্জয় মজুমদারের সাথে।
সঞ্জয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, দিল বাহার একটানা কাঁদছিলেন। তার স্বামী জাকির মামুন পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন। মুখে দাড়ি। দুর্বল শরীর। সাথে রয়েছে নাতি মাহবুব। কিশোর মাহবুবের হাত ব্যান্ডেজের মতো করে বেঁধে রাখা হয়েছে। ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে তার মুখ। দিল বাহার জানালেন, মাহবুবের হাতে গুলি লেগেছে।
জাকির মামুন জানালেন, বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে মিয়ানমারের বুথিডং এলাকায় তাদের বাড়ি। হঠাৎই হামলা চলে তাদের গ্রামে। জাকির বলেন, সেনাবাহিনী আমাদের বাড়িসহ অনেক বাড়িতে বোমা ছোড়ে। আগুন ধরিয়ে দেয়। গ্রামবাসী পালানোর চেষ্টা করলে নির্বিচারে গুলি চালায়। সারারাত ধরে গুলি চলেছে। পরদিন সকালে দেখি গ্রামটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গ্রামের বাড়িগুলো থেকে ধোঁয়া উড়ছে। সবকিছু হারিয়েছি আমরা। হামলায় মারা গেছে আমার ছেলে মাহবুব। পরে আমরা প্রাণ নিয়ে কোনো রকমে পালিয়ে পাহাড়ি এলাকায় ঢুকে পড়ি। জাকির-দিল বাহারের সাথে কথা বলে জানা গেল, প্রাণভয়ে বিধ্বস্ত বাড়ি থেকে কয়েকটি বাসনপত্র ও চাল নিয়ে বের হন তারা। ১২ দিন ধরে তারা দুটি পাহাড় ও বনজঙ্গলে ঘুরেছেন। তাদের কাছে যেটুকু চাল ছিল, তা আট দিনেই শেষ হয়ে যায়। নিরুপায় হয়ে লতাপাতা ও বৃষ্টির পানি খেয়ে প্রাণ বাঁচান তারা। বাংলাদেশ সীমান্তের উপকূলে নামার পর আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) পরিচালিত একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে মাহবুবকে।
কক্সবাজারে বালুখালীর একটি শরণার্থীশিবিরে আছেন অনেক রোহিঙ্গা। অনিশ্চিত জীবনের দুশ্চিন্তায় থাকা রোহিঙ্গাদের জন্য এটি একটি অস্থায়ী আবাস। সাধারণ প্লাস্টিক ও বাঁশ দিয়ে এই শিবির তৈরি করা হয়েছে। সেখানে তাদের ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে।
জাকির মামুন বলেন, বাংলাদেশে পৌঁছে তিনি একটু স্বস্তি পাচ্ছেন। এটি মুসলিমপ্রধান দেশ। এখানে তারা নিরাপদে থাকবেন।

আসছে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা
মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর আক্রমণের হাত থেকে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ইতোমধ্যে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের কর্মীরা। তারা আশঙ্কা করছেন, ঘটনার মাত্রা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে নতুন করে আরও দেড় লাখ অর্থাৎ ৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা সহিংসতা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে।
এ বিষয়ে বিশ^ খাদ্য কর্মসূচির বাংলাদেশ প্রধান দীপন ভট্টাচার্য বলেন, শরণার্থীর সংখ্যা ৩ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। এদের জন্য জরুরিভিত্তিতে খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন। বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গাদের সহায়তায় এগিয়ে আসছে। রোহিঙ্গাদের সংখ্যার আধিক্যতার কারণে সুষ্ঠুভাবে ত্রাণ বিতরণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের জন্য খাবার, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ^ খাদ্য কর্মসূচি বাংলাদেশ প্রধান আরও বলেন, বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গারা প্রত্যেকেই অপুষ্টিতে ভুগছে। মাসেরও বেশি সময় ধরে তারা ঠিকমতো খেতে পারছেন না। তাদের অনেকেই আহত কিংবা অসুস্থ।
এদিকে, শরণার্থী সামলানোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারে জানিয়ে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর কর্মকর্তা ভিভিয়েন ট্যান বলেন, যেভাবে শরণার্থীর সংখ্যা বাড়ছে তাতে শিগগিরই আশ্রয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের জরুরি সংকট তৈরি হতে পারে। কেননা পুরনো যে দুটো রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির (কুতুপালং এবং নয়াপাড়া) তাতে আর তিল ধারণের জায়গা নেই। স্থানীয় স্কুল-মাদ্রাসা ছাড়াও বিভিন্ন খোলা জায়গায় তাঁবু খাটিয়ে পালিয়ে আসা মানুষজনকে ঠাঁই দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু বর্তমান হারে শরণার্থী আসতে থাকলে পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারে।

যে কারণে রোহিঙ্গামুক্ত করা হচ্ছে রাখাইন
বিদেশি বিনিয়োগে বিশেষ শিল্প ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং তার নিরাপত্তা বিধান করতেই রাখাইন রাজ্য রোহিঙ্গামুক্ত করা হচ্ছে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হয়, মিয়ানমারে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগ শুরু হওয়ার পর শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলার লক্ষ্যে সে দেশের সরকার রাখাইন রাজ্যকে বেছে নিয়েছে। এতে এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতো সুফল আসবে বলে সামরিক জান্তার মদদপুষ্ট কথিত গণতান্ত্রিক সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলের ধারণা। কারণ হিসেবে আরও বলা হচ্ছে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সরকারের জন্য বড় ধরনের মাথাব্যথা হয়ে আছে।
বহুজাতিক কোম্পানিসহ বিদেশিদের মোটা অঙ্কের পুঁজি বিনিয়োগ যাতে হাতছাড়া না হয়,  সে লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের হত্যা ও বিতাড়িত করে রাখাইন রাজ্যকে বিনিয়োগবান্ধব করে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েই তারা রোহিঙ্গাদের ওপর মরণ কামড় দিয়েছে। এবারের সেনা অভিযান রাখাইনকে রোহিঙ্গামুক্তকরণ অভিযান। অন্যদিকে, রাখাইন রাজ্যে সে দেশের নাগরিক তথা বৌদ্ধ ধর্মীয় গোষ্ঠীর সদস্যরা রয়েছে, তাদেরও সরিয়ে নেওয়ার তৎপরতা শুরু হয়ে তা অব্যাহত রয়েছে।
প্রসঙ্গত, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান ইস্যুতে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে অং সান সু চি’র গঠিত কফি আনান অ্যাডভাইজরি কমিশন গত ২৪ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে ১৯৮২ সালের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনে সংশোধন এনে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দেওয়ার সুপারিশ ছাড়াও রাখাইনে মানবিক ত্রাণসহায়তা বিতরণ ও গণমাধ্যম কর্মীদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। ওইদিন রাতেই রাখাইন বিদ্রোহী কর্তৃক কয়েকটি পুলিশ ফাঁড়িতে হামলার অভিযোগ তুলে দেশটির রাখাইন রাজ্যে ২৫ আগস্ট ভোর থেকে নতুন করে সেনা অভিযান শুরু হয়।
এ অভিযানে এখন পর্যন্ত ৪০০ জনকে হত্যা এবং ২ হাজার ৬০০ ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। জাতিসংঘ বলছে, অক্টোবরের পর এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে। প্রতিদিনই এ সংখ্যা বাড়ছে।
এর আগেও, জাতিগত দ্বন্দ্বের জেরে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো একই রকম অভিযানে কয়েকশ রোহিঙ্গা নিহত হয়। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় হাজারো ঘরবাড়ি। ওই অভিযানের বর্বরতায় বাধ্য হয়ে অন্তত ৮০ হাজার রোহিঙ্গা পাশর্^বর্তী বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে।
২৫ আগস্ট থেকে দেশটির সেনাবাহিনী ‘কিলিং অভিযান’ শুরুর পর মিয়ানমার থেকে এখন পর্যন্ত মোট কত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে তা নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও বিভিন্ন দেশি বিদেশি সূত্র বলছে, সংখ্যাটি ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার। তবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জেনেভায় ৫ সেপ্টেম্বর  এক ব্রিফিংয়ে জানায়, আগস্ট মাস থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ১ লাখ ২৩ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে।
এদিকে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে সু চি’র নীরব ভূমিকার নিন্দায় সরব হয়েছে বিশ^। দেশে দেশে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ থেকে শান্তিতে এই নোবেল জয়ীর পুরস্কার ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি তোলা হয়েছে।
রোহিঙ্গা একটি নৃগোষ্ঠীর নাম, যাদের প্রায় ৯০ শতাংশ ইসলাম ও ১০ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। রোহিঙ্গাদের আদি আবাসস্থল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। শত শত বছর ধরে রাজ্যটিতে বাস করা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি না দিয়ে মিয়ানমার সরকার এ জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালাচ্ছে।

রোহিঙ্গা নির্যাতনের নিন্দা জানিয়েছে বৌদ্ধসমাজ
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সরকারের নিপীড়ন-নির্যাতনের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশের সম্মিলিত বৌদ্ধসমাজ। মানববন্ধন থেকে রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক আচরণ করতে এবং বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানান সংগঠনটির নেতারা। মানববন্ধনে সংগঠনের মুখ্য সমন্বয়ক অশোক বড়–য়া লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা, হত্যা ও নিপীড়ন চলছে। তারা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। মিয়ানমারের ঘটনাকে মানবিক বিপর্যয় উল্লেখ করে তারা রোহিঙ্গাদের রক্ষায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাহায্য কামনা করেন। এ ছাড়া দেশে নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ সহায়তা প্রদানের জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তারা। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকার মিয়ানমার দূতাবাসে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হবে বলেও জানানো হয়। বাংলাদেশের সম্মিলিত বৌদ্ধ সমাজের মুখ্য সমন্বয়ক অশোক বড়–য়া বলেন, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা নির্যাতন করছে। এটি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য না। অবিলম্বে এই নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশনের সভাপতি অসীম রঞ্জন বড়–য়া বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতন ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি। মিয়ানমার একটি বৌদ্ধপ্রধান দেশ হিসেবে বৌদ্ধ ধর্মবিরোধী কাজ করছে। বৌদ্ধ ধর্মে এভাবে মানুষ নির্যাতনের কোনো অনুমোদন নেই। অবিলম্বে এই নিপীড়ন বন্ধ হোক।
মানববন্ধনে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধবিহারের ভিক্ষু ধর্মমিত্র মহাথেরো, বৌদ্ধ প্রচার সংঘের সভাপতি সংঘনায়ক সুধানন্দ মহাথেরো প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে ভারতের উদ্বেগ
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ভারত। ৯ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে ভারত সরকার বলেছে, সংযতভাবে ও সতর্কতার সাথে রাখাইন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে, নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি বেসামরিক মানুষের কল্যাণের কথা ভাবতে হবে। সহিংসতা বন্ধ করে ওই রাজ্যে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা অত্যাবশ্যক। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাম্প্রতিক মিয়ানমার সফরে রোহিঙ্গা নিপীড়ন নিয়ে নিশ্চুপ থাকায় সমালোচনার মধ্যে ছিল নয়াদিল্লি। এরই মধ্যে দিল্লি থেকে এমন বিবৃতি এলো।সূত্রমতে, এরই মধ্যে ৩ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে বলে ধারণা করছে জাতিসংঘ। নয়াদিল্লি বলছে, প্রথমে তারা রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সম্প্রতি মিয়ানমার সফরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য হতাহতের পাশাপাশি নিরীহ মানুষের প্রাণহানির জন্য উদ্বেগ জানিয়েছেন।
শান্তি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক মর্যাদাবোধ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে এই সংকটের সমাধানের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। মোদির সফরে মিয়ানমার সরকারের রাখাইন স্টেট ডেভেলপমেন্ট প্রোগামে ভারতের সহায়তার বিষয়ে মতৈক্য হয় বলেও বিবৃতিতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের উদারতার প্রশংসায় যুক্তরাষ্ট্র
রোহিঙ্গাদের মানবিক সংকটে বাংলাদেশ সরকারের উদারতার প্রশংসা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ৯ সেপ্টেম্বর মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এ প্রশংসা করে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এক বিবৃতিতে বলেছে, ভুক্তভোগী (পালিয়ে আসা) রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কাছে সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের অব্যাহত প্রচেষ্টারও প্রশংসা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ জানায়, মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান সহিংস দমন-পীড়নের মুখে গত ২৫ আগস্ট থেকে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। রাখাইনে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিপ্রেক্ষিতে সেখান থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আসার বিষয়ে জাতিসংঘের তথ্যে যুক্তরাষ্ট্র গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানায়, শরণার্থী রোহিঙ্গাদের জরুরি সহায়তা দিতে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা, রেডক্রসসহ অংশীদারদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছে। ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য প্রায় ৬৩ মিলিয়ন ডলার মানবিক সহায়তা দিয়েছে বলে জানানো হয়।

রোহিঙ্গা নির্যাতনকে ‘জাতিগত নির্মূল’ বললেন ডেসমন্ড টুটু
শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ডেসমন্ড টুটু মিয়ানমারে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সামরিক অভিযানের নামে নিপীড়ন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। সেই সাথে অং সান সু চি’র নীরবতার নিন্দা জানিয়েছেন তিনি। টুইটারে নিজের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা এক খোলা চিঠিতে টুটু মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান নিপীড়নকে ‘জাতিগত নির্মূল’ বলেও মন্তব্য করেন।
৮৫ বছর বয়সী ডেসমন্ড টুটু দক্ষিণ আফ্রিকার একজন সমাজকর্মী এবং কেপটাউনের আর্চবিশপ ইমেরিটাস। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ১৯৮০ সালের দিকে বিশ^জুড়ে সাড়া ফেলে দেন তিনি। ১৯৮৪ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান টুটু।
ডেসমন্ড টুটু খোলা চিঠিতে লেখেন ‘আমি এখন বৃদ্ধ, জরাগ্রস্ত এবং আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরপ্রাপ্ত। তারপরও গভীর বিষণœতা থেকে নীরব থাকার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলাম আমি। বছরের পর বছর ধরে আমার টেবিলে আপনার একটি ছবি ছিল। মিয়ানমারের জনগণের জন্য ভালোবাসা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষায় আপনাকে যে অবিচার এবং ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, তা মনে করিয়ে দিত এই ছবিটি। আপনি ন্যায়পরায়ণতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।’
চিঠিতে টুটু আরও লেখেন, ‘জনজীবনে আপনার (সু চি) উত্থানের পর রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতার কারণে আমাদের উদ্বেগ প্রশমিত হয়েছিল। কিন্তু কিছু মানুষের মতে “জাতিগত নির্মূল” এবং অন্যদের মতে “মন্থর গণহত্যা” চলছেই এবং সম্প্রতি তা আরও বেড়েছে। ন্যায়পরায়ণতার প্রতীক হয়ে ওঠা একজনের জন্য এমন একটি দেশের নেতৃত্ব দেওয়া বেমানান। আপনার নীরবতা যদি মিয়ানমারের সর্বোচ্চ কার্যালয়ে উত্তরণের রাজনৈতিক মূল্য হয়ে থাকে, তবে এই মূল্য নিশ্চিতভাবেই মাত্রাধিক।’
ডেসমন্ড টুটু চিঠিতে লেখেন ‘আপনার জন্য প্রার্থনা করি, আপনি আবার সাহসী এবং প্রাণবন্ত হয়ে উঠুন। আমরা প্রার্থনা করি, আপনি ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং আপনার জনগণের একতার কথা বলুন। আমরা প্রার্থনা করি, বাড়তে থাকা এ সংকটে আপনি হস্তক্ষেপ করুন এবং জনগণকে ন্যায়পরায়ণতার পথে ফিরে যেতে আপনি আবার পথ দেখান।’

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ চান মালালা
শান্তিতে নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একই সাথে তিনি রোহিঙ্গাদের পক্ষে মুখ খোলার জন্য মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি’র প্রতি আহ্বান জানান। মানবাধিকারকর্মী মালালা বলেন, হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। এ অবস্থায় আমরা চুপ থাকতে পারি না।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাচ্ছেন মালালা। সেখানকার নতুন জীবন নিয়ে খানিকটা নার্ভাস বলে জানালেন তিনি। সেই অক্সফোর্ডে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কথা বলতে গিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি এ আহ্বান জানান। মামলা বলেন, এটি মানবাধিকার ইস্যু। সরকারের উচিত প্রতিক্রিয়া দেখানো। জনগণ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে। শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছে সব ধরনের মৌলিক অধিকার থেকে। সহিংস অবস্থার মধ্যে তাদের বাস করতে হচ্ছে। এমন সহিংস অবস্থার মধ্যে বাস করাটা খুবই কঠিন। আমাদের উচিত এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। এবং আমি আশা করব, অং সান সু চিও সাড়া দেবেন। এর আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতার নিন্দা জানান বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী পাকিস্তানি নারী শিক্ষা আন্দোলনকর্মী মালালা ইউসুফজাই। বলেন, শান্তিতে নোবেল জয়ী মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অং সান সু চি রোহিঙ্গাদের প্রতি তার দেশের লজ্জাজনক আচরণের নিন্দা জানাবেন, এই অপেক্ষায় আছেন তিনি।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরব বিশ্ব
সন্ত্রাস দমনের নামে মিয়ানমারে যা হচ্ছে, দৃশ্যত তা গণহত্যা। জাতিসংঘও স্বীকার করে নিয়েছে সাধারণ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী দমনের নামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইনের এই জনগোষ্ঠীকে সমূলে উৎপাটন করতে চাইছে। মানবাধিকারের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘এথনিক ক্লিনজিং’। মিয়ানমারে এমন ঘটনা যে এবারই প্রথম হচ্ছে, তা নয়। এর আগেও এমন ঘটনা সেখানে ঘটেছে। প্রতিবারই বিশ^ জনমত মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। কিন্তু এবারে মিয়ানমারের কৌশল একটু ভিন্ন কি না, তা ভেবে দেখতে হচ্ছে। রাখাইন রাজ্য পুরোপুরি রোহিঙ্গামুক্ত করতে পারলে দেশটিকে আর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়তে হবে না। গত বছর এমন কথা উচ্চারণ করেছিলেন নোবেল বিজয়ী ডেসমন্ড টুটু। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে লেখা এক চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, ‘মিয়ানমারের পরিস্থিতি সামাল দেওয়া না গেলে সেখানেও রুয়ান্ডা, দারফুর, বসনিয়া বা কসোভোর মতো গণহত্যা অবধারিত।’ মিয়ানমার অনিবার্যভাবে সে পরিস্থিতির দিকেই হাঁটছে।
মিয়ানমারের সরকারও যেন এই গণহত্যাকে সমর্থন করছে। বিশ্ব সরব হলেও এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে নীরব মিয়ানমার। প্রতিদিন ¯্রােতের মতো রোহিঙ্গারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে বাংলাদেশে। এরই মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেছেন। রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখেছেন তুরস্কের ফার্স্ট লেডি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী। রোহিঙ্গা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন জাতিসংঘের মহাসচিব। নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির কাছে লেখা এক চিঠিতে তিনি এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ভয়াবহ বলে উল্লেখ করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে চলতে মিয়ানমারকে পরামর্শ দিয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। এত কিছুর পরও অভিযান থেকে বিরত থাকার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; বরং নিরাপত্তা পরিষদে যাতে বিষয়টি না ওঠে সে জন্য কয়েকটি দেশের সাথে আলোচনা করেছে মিয়ানমার।
মিয়ানমারকে এই গণহত্যা বন্ধ করতে হবে। রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা অধিবাসীদের তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। ফিরিয়ে নিতে হবে বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের।
সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কয়েকশ সদস্যকে দমনের নামে নির্বিচারে মানুষ হত্যা, আবাসভূমি থেকে তাদের উচ্ছেদ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। মানবিক কারণে এখন আশ্রয় দিলেও এই বিপুল জনগোষ্ঠীর ভার বহন করার মতো ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। তা ছাড়া দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনোভাবেই জেনেশুনে কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দেবে না বাংলাদেশ। কাজেই রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে। মানবিকতার এ বিপর্যয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ডেকে দেখাতে হবে। সবার কাছে পরিকল্পিত ‘এথনিক ক্লিনজিং’-এর ভয়াবহতা তুলে ধরতে হবে।

বাংলা বিচিত্রা/ মানিক সরকার/ হামিদ মোহাম্মদ জসিম

পুরনো সংখ্যা
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  • ২৯ আগস্ট ২০১৯

  • ০৮ আগস্ট ২০১৯